হরমুজ প্রণালিতে তেল পরিবহন ফিরেছে ৮০ শতাংশ, তবু কাটেনি বিশ্ববাজারের সংকট
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের যুদ্ধ শুরুর আগে হরমুজ প্রণালি দিয়ে যে পরিমাণ তেল পরিবহন হতো, তার প্রায় ৮০ শতাংশে ফিরে এসেছে সরবরাহ। বর্তমানে গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথ দিয়ে প্রতিদিন ১ কোটি ৩০ লাখ থেকে ১ কোটি ৪০ লাখ ব্যারেল তেল পরিবহন হচ্ছে বলে জানিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানিমন্ত্রী ক্রিস রাইট। তবে তেল পরিবহন বাড়লেও বিশ্ববাজারে জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ পুরোপুরি কাটেনি। অপরিশোধিত তেলের বাজার স্থিতিশীল রাখতে অতিরিক্ত উৎপাদন সক্ষমতা ও বিভিন্ন দেশে জমা থাকা মজুত সহায়ক ভূমিকা রাখছে। একই সঙ্গে ডিজেলের সরবরাহ বাড়াতে ইউরোপের দেশগুলোর সঙ্গে আলোচনা চালাচ্ছে ওয়াশিংটন।
হরমুজ প্রণালিতে তেল পরিবহন বেড়েছে, ফিরেছে আগের মাত্রার ৮০ শতাংশ
সোমবার (১৯ অক্টোবর) ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে মার্কিন জ্বালানিমন্ত্রী ক্রিস রাইট জানান, হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল পরিবহনের পরিমাণ যুদ্ধ শুরুর আগের পর্যায়ের প্রায় ৮০ শতাংশে পৌঁছেছে। বর্তমানে প্রতিদিন এ প্রণালি দিয়ে ১ কোটি ৩০ লাখ থেকে ১ কোটি ৪০ লাখ ব্যারেল তেল পরিবহন করা হচ্ছে।
বিশ্বের জ্বালানি বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রুট হরমুজ প্রণালি। মধ্যপ্রাচ্যের তেল উৎপাদনকারী দেশগুলো থেকে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেল ও জ্বালানি পরিবহনে এ নৌপথের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ফলে এখানে পরিবহন ব্যাহত হলে তার প্রভাব পড়ে বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহ, মূল্য এবং জ্বালানি আমদানিনির্ভর দেশগুলোর অর্থনীতিতে।
যুদ্ধের কারণে এ পথে তেল পরিবহনে বিঘ্ন তৈরি হলেও সরবরাহ আগের মাত্রার কাছাকাছি ফিরে আসার বিষয়টি বিশ্ববাজারের জন্য ইতিবাচক সংকেত। তবে পরিবহন এখনো যুদ্ধ-পূর্ব পর্যায়ে পৌঁছায়নি। ফলে পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়েছে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই।
অতিরিক্ত উৎপাদন ও মজুতে সামাল দেওয়া হচ্ছে তেলের সংকট
সাক্ষাৎকারে ক্রিস রাইট বলেন, সরবরাহে বাধা থাকা সত্ত্বেও অতিরিক্ত উৎপাদন সক্ষমতা এবং বিভিন্ন দেশের বড় জ্বালানি মজুতের কারণে বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের সংকট নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হয়েছে।
আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের সরবরাহ কমে গেলে সাধারণত দাম বাড়ার চাপ তৈরি হয়। এ পরিস্থিতিতে উৎপাদন বাড়ানোর সুযোগ এবং মজুত থেকে তেল সরবরাহ করার সক্ষমতা বাজারের ঘাটতি সামাল দিতে সহায়তা করে। হরমুজ প্রণালিতে পরিবহন বিঘ্নিত হওয়ার প্রভাব মোকাবিলায় এসব বিষয় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে বলে জানিয়েছেন মার্কিন জ্বালানিমন্ত্রী।
তবে সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নতি হলেও সমস্যার পুরোপুরি সমাধান হয়নি বলে সতর্ক করেছেন তিনি। অর্থাৎ, বর্তমান পরিস্থিতিতে তেলের সরবরাহ কিছুটা পুনরুদ্ধার হলেও যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট অনিশ্চয়তা এখনো আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের জন্য উদ্বেগের কারণ।
ডিজেলের মজুত বাজারে ছাড়তে ইউরোপের সঙ্গে আলোচনা
অপরিশোধিত তেলের পাশাপাশি ডিজেলের সরবরাহ নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের। ক্রিস রাইট জানান, বড় পরিমাণ ডিজেল মজুত বাজারে ছাড়ার বিষয়ে ইউরোপের দেশগুলোর সঙ্গে আলোচনা করছে ওয়াশিংটন। তবে এ বিষয়ে অগ্রগতি হচ্ছে ধীরগতিতে।
ডিজেল পরিবহন, পণ্য সরবরাহ, কৃষিকাজ এবং শিল্প উৎপাদনের মতো গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে ব্যবহৃত হয়। ফলে এ জ্বালানির সরবরাহে ঘাটতি তৈরি হলে শুধু পরিবহন ব্যয়ই নয়, পণ্য উৎপাদন ও সরবরাহব্যবস্থার ওপরও চাপ বাড়তে পারে।
এ অবস্থায় মজুত থেকে ডিজেল বাজারে ছাড়ার উদ্যোগ সরবরাহ বাড়াতে সহায়ক হতে পারে। তবে ইউরোপের দেশগুলোর সঙ্গে আলোচনায় ধীরগতির কারণে এ উদ্যোগের বাস্তব অগ্রগতি ও বাজারে এর প্রভাব এখনো অনিশ্চিত।
রাশিয়ার ডিজেল রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা শিথিল করল যুক্তরাষ্ট্র
জ্বালানি সরবরাহ বাড়ানোর প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে চলতি অক্টোবরের শুরুতে রাশিয়ার ডিজেল রপ্তানির ওপর কিছু নিষেধাজ্ঞা শিথিল করতে সম্মত হয় যুক্তরাষ্ট্র। এর আওতায় বিশ্ববাজারে ৩ লাখ মেট্রিক টনের বেশি ডিজেল সরবরাহের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে মস্কো।
ক্রিস রাইট স্পষ্ট করেছেন, রাশিয়ার ডিজেল রপ্তানির ওপর নিষেধাজ্ঞা শিথিলের সাম্প্রতিক সিদ্ধান্ত শুধু ডিজেল রপ্তানির ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। অর্থাৎ, এ সিদ্ধান্তকে রাশিয়ার জ্বালানি খাতের ওপর আরোপিত সব ধরনের নিষেধাজ্ঞা শিথিল করার পদক্ষেপ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
বিশ্ববাজারে ডিজেলের সরবরাহ বাড়াতে রাশিয়ার এই প্রতিশ্রুতি গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। তবে ঘোষিত পরিমাণের জ্বালানি কখন এবং কীভাবে বাজারে পৌঁছাবে, তার ওপরই সরবরাহ পরিস্থিতিতে উদ্যোগটির প্রকৃত প্রভাব নির্ভর করবে।
জ্বালানির দাম কমানোই ট্রাম্পের উদ্যোগের লক্ষ্য
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, রাশিয়ার ডিজেল রপ্তানি নিয়ে নেওয়া উদ্যোগের উদ্দেশ্য যুক্তরাষ্ট্রে সরাসরি জ্বালানি সরবরাহ করা নয়। বরং আন্তর্জাতিক বাজারে ডিজেলের সরবরাহ বাড়িয়ে জ্বালানির দাম কমানোই এর মূল লক্ষ্য।
বিশ্ববাজারে জ্বালানি সরবরাহ বাড়লে দাম বৃদ্ধির চাপ কমতে পারে। বিশেষ করে যুদ্ধের কারণে গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে পরিবহন ব্যাহত হলে বিকল্প উৎস থেকে জ্বালানি সরবরাহের সুযোগ বাজারকে স্থিতিশীল রাখতে সহায়তা করতে পারে। তবে সরবরাহ বৃদ্ধি কতটা দ্রুত হবে এবং তা আন্তর্জাতিক বাজারে দামের ওপর কতটা প্রভাব ফেলবে, সেটি নির্ভর করবে উৎপাদন, পরিবহন ও চাহিদার সামগ্রিক পরিস্থিতির ওপর।
বিশ্ব জ্বালানি বাজারে অনিশ্চয়তা এখনো কাটেনি
হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল পরিবহন যুদ্ধ-পূর্ব পর্যায়ের প্রায় ৮০ শতাংশে ফিরে আসা এবং রাশিয়ার ডিজেল রপ্তানি বাড়ানোর উদ্যোগ বিশ্ববাজারে সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নতির ইঙ্গিত দিচ্ছে। কিন্তু অপরিশোধিত তেল ও ডিজেলের সরবরাহ পুরোপুরি স্বাভাবিক না হওয়ায় জ্বালানি বাজারের ঝুঁকি এখনো রয়ে গেছে।
একদিকে হরমুজ প্রণালিতে পরিবহন পরিস্থিতি, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক বাজারে মজুত ব্যবস্থাপনা এবং রাশিয়ার ডিজেল রপ্তানির ওপর নিষেধাজ্ঞার পরিধি—সবকিছুই জ্বালানির ভবিষ্যৎ দাম নির্ধারণে ভূমিকা রাখতে পারে। তাই সরবরাহ বাড়ার ইতিবাচক খবর এলেও বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম ও স্থিতিশীলতা নিয়ে এখনই নিশ্চিন্ত হওয়ার সুযোগ নেই। সূত্র: শাফাক নিউজ
কালের আলো/এএইচ/এসএ

আপনার মতামত লিখুন
[gs-fb-comments]