বাতি-ফ্যান চালিয়েই লাখ টাকার বিদ্যুৎ বিল!
কয়েকটি বাতি, দুটি ফ্যান, একটি ফ্রিজ আর একটি আইপিএস—একটি সাধারণ পরিবারের দৈনন্দিন বিদ্যুৎ ব্যবহারের সরঞ্জাম বলতে এটুকুই। এসব ব্যবহার করে প্রতি মাসে যেখানে বিদ্যুৎ বিল আসত গড়ে প্রায় ১ হাজার ৩০০ টাকা, সেখানে সেপ্টেম্বর মাসের বিল এসেছে ১ লাখ ১০ হাজার ৪৯৬ টাকা। বিলে বিদ্যুৎ ব্যবহারের পরিমাণ দেখানো হয়েছে ৬ হাজার ইউনিট। এমন অস্বাভাবিক বিল হাতে পেয়ে হতবাক ও ক্ষুব্ধ হয়ে পড়েছে পরিবারটি।
নোয়াখালীর চাটখিল উপজেলার বদলকোট ইউনিয়নের হরিকৃষ্ণপুর গ্রামের বড় তফদার বাড়িতে ঘটেছে এ ঘটনা। নোয়াখালী পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির পাঠানো এই বিলকে ‘ভুতুড়ে’ বলে অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগী গ্রাহক শহীদুল ইসলাম ওরফে রনি। তাঁর দাবি, নিয়মিত বিল পরিশোধ করে আসার পরও হঠাৎ এত বড় অঙ্কের বিল পাঠানো হয়েছে, যা তাঁদের স্বাভাবিক বিদ্যুৎ ব্যবহারের সঙ্গে কোনোভাবেই সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
পাঁচ মাসে গড় ব্যবহার ১৮৭ ইউনিট, সেপ্টেম্বরে দেখানো ৬ হাজার
ভুক্তভোগী শহীদুল ইসলাম জানান, গত পাঁচ মাস ধরে তাঁদের বাড়িতে প্রতি মাসে গড়ে মাত্র ১৮৭ ইউনিট বিদ্যুৎ খরচ হয়েছে। সেই হিসাবে সাধারণ বিদ্যুৎ ব্যবহারের বিপরীতে নিয়মিত বিলও এসেছে তুলনামূলক কম। কিন্তু সেপ্টেম্বর মাসের বিলে হঠাৎ বিদ্যুৎ ব্যবহারের পরিমাণ দেখানো হয়েছে ৬ হাজার ইউনিট।
পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির নথি অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট মিটারটি নিবন্ধিত রয়েছে ওই বাড়ির মৃত আবু তাহেরের নামে। বর্তমানে মিটারটি ব্যবহার করছেন তাঁর নাতি শহীদুল ইসলাম। সেপ্টেম্বর মাসের বিলের সঙ্গে ভ্যাট ও বিলম্ব মাশুল যোগ করে মোট পাওনা দেখানো হয়েছে ১ লাখ ১০ হাজার ৪৯৬ টাকা। শহীদুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা নিয়মিত বিল পরিশোধ করে আসছি। চলতি মাসে বিদ্যুৎ বিলের কপি হাতে পেয়ে আমরা স্তম্ভিত হয়ে যাই। সাধারণ বাতি-ফ্যান চালিয়ে কীভাবে এক লাখ টাকার বেশি বিল আসতে পারে?’ তাঁর অভিযোগ, বিল প্রস্তুতের দায়িত্বে থাকা কর্মীদের গাফিলতি ও দায়িত্বহীনতার কারণেই এমন অস্বাভাবিক বিল তৈরি হয়েছে।
বিল সংশোধনে গ্রাহককেই কার্যালয়ে যাওয়ার পরামর্শ
অস্বাভাবিক বিল হাতে পাওয়ার পর বিষয়টি বিদ্যুৎ বিল বিতরণের দায়িত্বে থাকা কর্মীকে জানান শহীদুল ইসলাম। এ সময় তাঁকে চাটখিল আঞ্চলিক কার্যালয়ে গিয়ে বিল সংশোধন করে নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়। এ পরামর্শে ক্ষোভ প্রকাশ করেন তিনি। তাঁর প্রশ্ন, বিল তৈরিতে কর্তৃপক্ষের ভুল হলে তা সংশোধনের জন্য গ্রাহককে কেন বারবার কার্যালয়ে যেতে হবে? শহীদুল ইসলাম বলেন, ‘তারা ভুল করবে, আর আমরা তা সংশোধনের জন্য তাদের দরজায় দরজায় ঘুরব—এটি কোন ধরনের কথা? আমি চাই, এই গাফিলতির জন্য দায়ী ব্যক্তির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হোক।’
ভুল স্বীকার পল্লী বিদ্যুতের, মিটার পরীক্ষার আশ্বাস
এ বিষয়ে নোয়াখালী পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির চাটখিল আঞ্চলিক কার্যালয়ের উপমহাব্যবস্থাপক (ডিজিএম) জুনায়েদুর রহমানের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তিনি প্রথমে বিলের কপি না দেখে মন্তব্য করতে রাজি হননি। পরে গ্রাহকের মূল বিলের কপি পাঠানো হলে তিনি বিষয়টি ভুলবশত হয়েছে বলে স্বীকার করেন। তিনি জানান, শিগগিরই সংশ্লিষ্ট গ্রাহকের বাড়িতে লোক পাঠিয়ে মিটার পরীক্ষা করা হবে। এরপর দ্রুত বিল সংশোধন করে দেওয়ার আশ্বাসও দেন তিনি।
ভুল বিলের দায় ও গ্রাহক ভোগান্তি নিয়ে প্রশ্ন
সাধারণ বিদ্যুৎ ব্যবহারের বিপরীতে লাখ টাকার বেশি বিল আসার ঘটনায় বিল প্রস্তুত ও মিটার রিডিংয়ের প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে আগের মাসগুলোর গড় ব্যবহার যেখানে ১৮৭ ইউনিট, সেখানে এক মাসে ৬ হাজার ইউনিট ব্যবহারের হিসাব কীভাবে তৈরি হলো, তা যাচাই করা জরুরি। পল্লী বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষ মিটার পরীক্ষা ও বিল সংশোধনের আশ্বাস দিলেও সংশোধিত বিল কবে দেওয়া হবে এবং এ ঘটনায় কোনো কর্মীর গাফিলতি ছিল কি না, তা এখনো নিশ্চিত হয়নি। অস্বাভাবিক বিলের কারণে গ্রাহককে যেন অযথা আর্থিক চাপ ও ভোগান্তিতে পড়তে না হয়, সে বিষয়ে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার প্রত্যাশা ভুক্তভোগী পরিবারের।
কালের আলো/এএএন/এমএসআইপি

আপনার মতামত লিখুন
[gs-fb-comments]