পানির ওপর চাষ, বছরে আয় ১০ কোটি টাকা!
বছরের প্রায় ছয় মাস পানিতে নিমজ্জিত থাকে পিরোজপুরের নাজিরপুর উপজেলার দেউলবাড়ি-দোবরা ও নেছারাবাদ উপজেলার বলদিয়া ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ এলাকা। বর্ষায় জলাবদ্ধতা যেখানে অনেকের জীবিকা ও কৃষিকাজের জন্য বড় বাধা, সেখানে সেই পানিকেই কাজে লাগিয়ে সম্ভাবনার নতুন দুয়ার খুলেছেন স্থানীয় কৃষকেরা। ভাসমান বেড ও ধাপ পদ্ধতিতে উৎপাদন করছেন বিভিন্ন জাতের সবজির চারা। প্রতি মৌসুমে উৎপাদিত প্রায় এক কোটি চারা বিক্রি করে আয় হচ্ছে প্রায় ১০ কোটি টাকা। এ কৃষিকাজকে ঘিরে জীবিকার পথ তৈরি হয়েছে হাজারো পরিবারের।
প্রায় ২০০ বছরের ঐতিহ্যবাহী এই চাষপদ্ধতি স্থানীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। পুরুষের পাশাপাশি এতে যুক্ত হয়েছেন নারীরাও। তবে পর্যাপ্ত পুঁজি, প্রশিক্ষণ ও সরকারি সহায়তার অভাবে অনেক নারী শ্রমিক ও উদ্যোক্তা নিজেদের উদ্যোগ বড় করতে পারছেন না। সহজ শর্তে ঋণ ও প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ পেলে এ খাতে কর্মসংস্থান ও আয় আরও বাড়তে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। নাজিরপুরের দেউলবাড়ি-দোবরা এবং নেছারাবাদের বলদিয়া ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ বিলাঞ্চলে ভাসমান বেড ও ধাপ পদ্ধতিতে চারা উৎপাদন করা হয়। জলাবদ্ধ জমিতে প্রচলিত পদ্ধতিতে চাষাবাদ কঠিন হলেও পানির ওপর তৈরি বেডে বীজ বুনে চারা উৎপাদন করছেন কৃষকেরা।
লাউ, মিষ্টিকুমড়া, শিম, পেঁপে, করলা, বেগুন ও মরিচসহ বিভিন্ন জাতের সবজির চারা উৎপাদিত হচ্ছে এসব বেডে। পরে চারা সংগ্রহ করে স্থানীয় বাজারের পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পাঠানো হয়। পিরোজপুর ছাড়াও খুলনা, যশোর, গোপালগঞ্জ, বরিশাল ও ঢাকাসহ বিভিন্ন এলাকার কৃষক ও ব্যবসায়ীরা এসব চারা কিনে নেন।
দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা ও শ্রমের সমন্বয়ে এই চাষপদ্ধতি টিকে আছে। সময়ের সঙ্গে উৎপাদনপ্রক্রিয়ায় কিছু পরিবর্তন এলেও এর সম্ভাবনা পুরোপুরি কাজে লাগানো যায়নি। তবু ভাসমান বেডে চারা উৎপাদনকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে স্থানীয় পর্যায়ে একটি অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড, যেখানে কৃষক, নারী শ্রমিক ও চারার ব্যবসায়ীরা যুক্ত রয়েছেন। নেছারাবাদ উপজেলার বলদিয়া ইউনিয়নের গগন গ্রামের কৃষক জাকির হোসেনের স্ত্রী নুরজাহান বেগম। বিয়ের পর শ্বশুরবাড়িতে এসে ২০০৫ সাল থেকে ভাসমান বেডে সবজির চারা উৎপাদনের কাজ শুরু করেন তিনি। ধীরে ধীরে নিজের কাজের পরিসর বাড়ানোর পাশাপাশি স্থানীয় অসহায় ও কর্মহীন নারীদেরও যুক্ত করেছেন এই কাজে। বর্তমানে তাঁর সঙ্গে কাজ করছেন প্রায় ১০ জন নারী।
কাজের জায়গায় কেউ দুলালী লতা দিয়ে তৈরি ম্যাদার ভেতর বিভিন্ন জাতের সবজির বীজ বুনছেন, কেউ আবার অঙ্কুরিত চারা সাজিয়ে রাখছেন। পানির ওপর তৈরি বেডে এভাবেই বেড়ে উঠছে নতুন চারা। এই কাজ নুরজাহানের নিজের আয়ের পাশাপাশি অন্য নারীদেরও উপার্জনের সুযোগ তৈরি করেছে। তবে উদ্যোগটি আরও বড় করার স্বপ্ন থাকলেও পুঁজির অভাবে এগোতে পারছেন না তিনি। পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ ও সরকারি সহায়তার ঘাটতিও তাঁর জন্য বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
নুরজাহান বেগম বলেন, ‘আমি একজন নারী উদ্যোক্তা। ২০০৫ সাল থেকে এই কাজ করে আসছি। অনেক পরিবার দুঃখ-কষ্টে আছে। আমি তাদের সামনে এগিয়ে নিতে চাই, কিন্তু পারছি না। সরকার যদি বিনা সুদে ঋণ দিত, তাহলে সামনে এগোতে পারতাম। নারীদের কাজ দিতে পারতাম, তারা ছেলেমেয়েদের মানুষ করতে পারত। আমি ঘরে বসে থাকা নারীদের নিয়ে কাজ করতে চাই, তাদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে চাই।’
ভাসমান বেডে চারা উৎপাদনের বিভিন্ন ধাপে নারীরা শ্রম দেন। কেউ বীজ বোনেন, কেউ চারা তৈরির উপকরণ প্রস্তুত করেন, আবার কেউ অঙ্কুরিত চারা সাজিয়ে রাখেন। কাজের পরিমাণ ও ধরন অনুযায়ী তাঁদের আয় হয়। প্রাথমিক কাজের অংশ হিসেবে এক হাজার দুলালী লতা দিয়ে ম্যাদা তৈরি করলে মজুরি মেলে ১৫০ টাকা।
বলদিয়া গ্রামের নারী শ্রমিক রহিমা বেগম জানান, সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত পরিশ্রম করেও অনেক সময় ২০০ টাকা আয় করা কঠিন হয়ে পড়ে। বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ সীমিত হওয়ায় বাধ্য হয়েই তাঁরা এ কাজ করছেন। তিনি বলেন, ‘সকাল থেকে বিকাল পর্যন্ত কাজ করি। সারাদিন এত পরিশ্রম করেও ২০০ টাকা আয় করতে অনেক কষ্ট হয়। নারীদের আর কোনো কাজ নেই, তাই এগুলোই করি। আমাদের ভালো প্রশিক্ষণ দেওয়া হলে ভালো হতো। এক হাজার ম্যাদা বানিয়ে দেড়শ টাকা পাই। তাতে কি আর সংসার চলে!’
স্থানীয় নারী শ্রমিকদের মতে, কাজের উপযুক্ত প্রশিক্ষণ ও সহজ শর্তে ঋণের ব্যবস্থা করা গেলে তাঁদের অনেকেই নিজেরাই উদ্যোক্তা হয়ে উঠতে পারবেন। এতে শুধু ব্যক্তিগত আয় বাড়বে না, গ্রামীণ এলাকায় নতুন কর্মসংস্থানও তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে যেসব নারী ঘরের বাইরে কাজের সুযোগ পান না, তাঁদের জন্য এ খাত বিকল্প জীবিকার পথ খুলে দিতে পারে।
ভাসমান বেডে উৎপাদিত চারার বাজার শুধু পিরোজপুরে সীমাবদ্ধ নয়। দেশের বিভিন্ন জেলার কৃষকেরা এসব চারা কিনে নিয়ে নিজেদের জমিতে চাষ করেন। ফলে স্থানীয় উৎপাদনব্যবস্থার সঙ্গে দেশের অন্যান্য অঞ্চলের কৃষিকাজেরও যোগসূত্র তৈরি হয়েছে। ভাসমান বেডে চারা উৎপাদনকারী কৃষক লুৎফুর রহমান বলেন, ‘এখানে সকাল ছয়টায় কাজ করতে আসি। বেডে চারা রোপণ করি, ওষুধ দিই, লতা পরিষ্কার করি। এখানকার চারা ঢাকা, খুলনা, গোপালগঞ্জ, বরিশালসহ অনেক জায়গায় যায়। প্রতিবছর এখানে লাখ লাখ চারা উৎপাদন হয়। বিভিন্ন জাতের সবজির চারা প্রতিটি ৩ থেকে ৭ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হয়।’ চারা উৎপাদনের পাশাপাশি পরিবহন, পাইকারি ও খুচরা বিক্রির কাজেও অনেকে যুক্ত রয়েছেন। এতে উৎপাদক কৃষকদের বাইরেও স্থানীয় ব্যবসায়ীদের আয়ের সুযোগ তৈরি হয়েছে।
পিরোজপুর পৌর শহরে এসব চারা খুচরা বিক্রি করেন রফিক শেখ। তিনি নাজিরপুরের ভাসমান বেড থেকে বিভিন্ন জাতের চারা কিনে এনে বিক্রি করেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, প্রতিটি চারা ৫ থেকে ৭ টাকা দরে কিনে ১০ থেকে ১৫ টাকায় বিক্রি করেন তিনি। তবে পরিবহন খরচ, অবিক্রীত চারা ও অন্যান্য ব্যয়ের কারণে এই দামের পুরো ব্যবধান তাঁর লাভ নয়।
পিরোজপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক সৌমিত্র সরকার জানান, নাজিরপুর ও নেছারাবাদে ভাসমান বেডে উৎপাদিত সবজির চারা খুলনা, যশোর, ঢাকা ছাড়াও দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সরবরাহ করা হচ্ছে। এ পেশার সঙ্গে প্রায় ছয় হাজার কৃষক জড়িত। কৃষি অফিস থেকে তাঁদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। তিনি আরও জানান, প্রতি মৌসুমে ভাসমান বেডে বিভিন্ন প্রজাতির প্রায় এক কোটি সবজির চারা উৎপাদিত হয়। এসব চারা বিক্রি করে প্রায় ১০ কোটি টাকা আয় হয়। এই পরিসংখ্যান ভাসমান বেডে চারা উৎপাদনের অর্থনৈতিক গুরুত্ব তুলে ধরে। তবে উৎপাদন ও বিপণনের সঙ্গে যুক্ত কৃষক এবং শ্রমিকদের আয় এক রকম নয়। চারার দাম, উৎপাদন খরচ, শ্রমিকের মজুরি, পরিবহন ব্যয় ও বাজারের চাহিদার ওপর নির্ভর করে তাঁদের প্রকৃত আয় নির্ধারিত হয়।
প্রায় দুই শতাব্দীর ঐতিহ্য বহন করা ভাসমান বেডে চারা উৎপাদন এখন স্থানীয় অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। জলাবদ্ধ এলাকাকে কাজে লাগিয়ে কৃষকেরা যেমন আয়ের পথ তৈরি করেছেন, তেমনি এ উদ্যোগে নারীদের অংশগ্রহণও বাড়ছে। কিন্তু পর্যাপ্ত পুঁজি, আধুনিক উৎপাদনকৌশল সম্পর্কে প্রশিক্ষণ এবং সহজ শর্তে ঋণের সুযোগ না থাকায় অনেক সম্ভাবনাময় উদ্যোগ ছোট পরিসরেই আটকে আছে।
বিশেষ করে নুরজাহানের মতো নারী উদ্যোক্তারা যদি প্রয়োজনীয় আর্থিক সহায়তা ও প্রশিক্ষণ পান, তাহলে তাঁরা আরও বেশি নারীকে কাজে যুক্ত করতে পারবেন। এতে নারীদের নিজস্ব আয় বাড়ার পাশাপাশি পরিবারগুলোর আর্থিক নিরাপত্তা জোরদার হতে পারে। ভাসমান বেডে চারা উৎপাদনের এই ঐতিহ্যকে টেকসই করতে উৎপাদনের মান উন্নয়ন, বাজারসংযোগ, প্রশিক্ষণ এবং নারী উদ্যোক্তাদের জন্য উপযোগী ঋণসুবিধা গুরুত্বপূর্ণ। জলাবদ্ধতাকে সম্ভাবনায় রূপ দেওয়া এই কৃষিপদ্ধতি প্রমাণ করছে, স্থানীয় জ্ঞান ও শ্রমের সঙ্গে যথাযথ সহায়তা যুক্ত হলে গ্রামীণ অর্থনীতিতে নতুন সুযোগ তৈরি করা সম্ভব।
কালের আলো/এএএন/এমএসআইপি

আপনার মতামত লিখুন
[gs-fb-comments]