ভবিষ্যতে ইসরায়েলের প্রতি বৈরী মনোভাবাপন্ন কোনো মার্কিন প্রেসিডেন্ট ক্ষমতায় আসতে পারেন—এমন আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক নেতৃত্বে সম্ভাব্য পরিবর্তনের কারণে ইসরায়েলের সামরিক সহায়তা ও কৌশলগত সম্পর্ক ঝুঁকিতে পড়তে পারে বলে মনে করছেন তিনি। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করার পাশাপাশি ভারত ও লাতিন আমেরিকার দেশগুলোর সঙ্গে নতুন জোট গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী।
ইসরায়েলে আগামী ২৭ অক্টোবর অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া নির্বাচন সামনে রেখে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে নেতানিয়াহু এসব মন্তব্য করেন। তাঁর বক্তব্যের কয়েক ঘণ্টা আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রকাশ্যে নেতানিয়াহুর পুনর্নির্বাচনের পক্ষে সমর্থন জানান। তবে ট্রাম্পের বর্তমান সমর্থন থাকা সত্ত্বেও ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক পরিস্থিতি বদলে যেতে পারে বলে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী।নেতানিয়াহুর বক্তব্যে স্পষ্ট হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রাখার পাশাপাশি বিকল্প আন্তর্জাতিক অংশীদারত্ব তৈরির বিষয়টিও এখন ইসরায়েলের কৌশলগত চিন্তায় গুরুত্ব পাচ্ছে।
ভবিষ্যৎ মার্কিন প্রেসিডেন্ট নিয়ে নেতানিয়াহুর উদ্বেগ
অনুষ্ঠানে নেতানিয়াহু বলেন, আগামী দুই বছরের মধ্যেই এমন একজন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ক্ষমতায় আসতে পারেন, যিনি ইসরায়েলের প্রতি অত্যন্ত বৈরী মনোভাব পোষণ করবেন। তিনি পুরুষ কিংবা নারী—যেকোনো একজন হতে পারেন বলে মন্তব্য করেন ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী। তিনি প্রশ্ন তোলেন, এমন পরিস্থিতি তৈরি হলে ইসরায়েল কীভাবে তা মোকাবিলা করবে এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক কীভাবে পরিচালনা করবে। তাঁর এই বক্তব্যে ভবিষ্যৎ মার্কিন প্রশাসনের নীতিগত পরিবর্তন নিয়ে উদ্বেগের বিষয়টি উঠে এসেছে।
যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে ইসরায়েলের অন্যতম প্রধান সামরিক ও কৌশলগত অংশীদার। দেশটির সামরিক সহায়তা, প্রতিরক্ষা সহযোগিতা এবং আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে সমর্থন ইসরায়েলের নিরাপত্তা নীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ফলে ওয়াশিংটনের নীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন হলে ইসরায়েলের ওপর তার প্রভাব পড়তে পারে।নেতানিয়াহুর আশঙ্কা, ভবিষ্যতে কোনো মার্কিন প্রশাসন ইসরায়েলের প্রতি সমর্থন কমিয়ে দিলে শুধু দুই দেশের সম্পর্কই নয়, ইসরায়েলের আঞ্চলিক নিরাপত্তা কৌশলও নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক ধরে রাখার চেষ্টা
সম্ভাব্য রাজনৈতিক পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় ট্রাম্পের বর্তমান মেয়াদের বাকি সময়কে কাজে লাগানোর ওপর জোর দিয়েছেন নেতানিয়াহু। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্রের নীতিতে পরিবর্তন এলেও যেন ইসরায়েল তার স্বার্থ রক্ষা করতে পারে, সে প্রস্তুতি নেওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন তিনি। নেতানিয়াহু বলেন, আগামী দুই বছর এবং তার পরের দুই বছর—ভালো ও খারাপ সব পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে ইসরায়েলকে সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে। তাঁর বক্তব্য থেকে বোঝা যায়, বর্তমান মার্কিন প্রশাসনের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত পরিকল্পনা তৈরিও তাঁর সরকারের অগ্রাধিকারে রয়েছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের বিকল্প তৈরি করার অর্থ বিদ্যমান সম্পর্ক থেকে সরে আসা নয়; বরং সম্ভাব্য অনিশ্চয়তার মধ্যে ইসরায়েলের আন্তর্জাতিক অবস্থান শক্তিশালী করাই এর উদ্দেশ্য।
ভারতকে গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত অংশীদার হিসেবে দেখছেন নেতানিয়াহু
নতুন আন্তর্জাতিক জোট গঠনের ক্ষেত্রে ভারতের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, অন্যান্য দেশের সঙ্গে সম্পর্ক বাড়াতে হবে। এ লক্ষ্যে তিনি ইসরায়েলের নিজস্ব অঞ্চল এবং এর বাইরের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে কাজ করছেন। ভারতের প্রসঙ্গ টেনে নেতানিয়াহু বলেন, ভারত কোনো ছোট দেশ নয়; এমন আরও অনেক দেশ রয়েছে, যাদের সঙ্গে ইসরায়েল সম্পর্ক জোরদার করতে পারে। ভারত ও ইসরায়েলের সম্পর্ক সাম্প্রতিক বছরগুলোতে প্রতিরক্ষা, প্রযুক্তি, কৃষি, নিরাপত্তা এবং বাণিজ্যসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিস্তৃত হয়েছে।
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে নেতানিয়াহুর ঘনিষ্ঠ সম্পর্কও দুই দেশের কূটনৈতিক যোগাযোগের গুরুত্বপূর্ণ দিক। গত মে মাসে দেওয়া এক বক্তব্যেও নেতানিয়াহু ভারতকে বিশাল শক্তি হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন। দেশটির সঙ্গে ইসরায়েলের বিশেষ সম্পর্ক রয়েছে বলে দাবি করেন তিনি। ভারতে ইসরায়েলের প্রতি ব্যাপক সমর্থন রয়েছে বলেও মন্তব্য করেছিলেন ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইসরায়েলের অবস্থান নিয়ে বিতর্ক ও কূটনৈতিক চাপের মধ্যে ভারতের সঙ্গে এই সম্পর্ককে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে তুলে ধরছেন নেতানিয়াহু। তাঁর বিবেচনায়, ভারতের মতো বড় অর্থনীতি ও আঞ্চলিক শক্তির সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা ইসরায়েলের কূটনৈতিক পরিসর বাড়াতে সহায়তা করতে পারে।
লাতিন আমেরিকায় রাজনৈতিক পরিবর্তনকে সুযোগ হিসেবে দেখছেন
ভারতের পাশাপাশি লাতিন আমেরিকার দেশগুলোর সঙ্গেও সম্পর্ক বাড়ানোর পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন নেতানিয়াহু। তাঁর মতে, ওই অঞ্চলে রাজনৈতিক পরিবর্তন ঘটছে, যা ইসরায়েলের জন্য নতুন মিত্র তৈরির সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে। তিনি বলেন, লাতিন আমেরিকায় বড় ধরনের পরিবর্তন হচ্ছে। কয়েক দিনের মধ্যেই ব্রাজিলে বড় পরিবর্তন আসতে পারে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।তবে ব্রাজিলে ঠিক কী ধরনের পরিবর্তনের কথা তিনি বলেছেন, তা বক্তব্যে বিস্তারিত ব্যাখ্যা করেননি। ফলে তাঁর মন্তব্যকে নির্দিষ্ট কোনো রাজনৈতিক ফলাফলের নিশ্চিত পূর্বাভাস হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই। নেতানিয়াহু আরও বলেন, ইসরায়েলকে তার মিত্রদের পরিধি বাড়াতে হবে এবং এমন সক্ষমতা গড়ে তুলতে হবে, যাতে অন্য দেশগুলোর কাছে ইসরায়েলকে প্রয়োজনীয় অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করা হয়। বিশ্লেষণ অনুযায়ী, তাঁর এই কৌশলের লক্ষ্য হতে পারে এমন একটি আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা, যেখানে ইসরায়েল শুধু যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরশীল না থেকে বিভিন্ন অঞ্চলের প্রভাবশালী দেশগুলোর সঙ্গে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তাবিষয়ক সহযোগিতা বাড়াতে পারে।
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইসরায়েলের কূটনৈতিক চাপ
গাজা যুদ্ধসহ মধ্যপ্রাচ্যের দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের কারণে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইসরায়েলের নীতি ও কর্মকাণ্ড নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক তৈরি হয়েছে। বিভিন্ন দেশের সরকার, আন্তর্জাতিক সংস্থা ও মানবাধিকার সংগঠন ইসরায়েলের সামরিক অভিযান এবং বেসামরিক মানুষের ওপর তার প্রভাব নিয়ে সমালোচনা করেছে। এই পরিস্থিতিতে ইসরায়েল সরকারের জন্য আন্তর্জাতিক সমর্থন ধরে রাখা একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ইসরায়েলকে সমর্থনের প্রশ্নে মতপার্থক্য বাড়লে তা দেশটির দীর্ঘদিনের কৌশলগত অবস্থানকে প্রভাবিত করতে পারে।
নেতানিয়াহু আগেও ভারতসহ বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সম্পর্কের গুরুত্ব তুলে ধরেছেন। তাঁর সরকারের লক্ষ্য, আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ইসরায়েলের পক্ষে সমর্থন বাড়ানো এবং কূটনৈতিক বিচ্ছিন্নতার ঝুঁকি কমানো।তবে নতুন জোট গঠন করলেই যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সহায়তা বা কৌশলগত সমর্থনের বিকল্প তৈরি হবে—এমন নিশ্চয়তা নেই। তাই ভারত ও লাতিন আমেরিকার দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক সম্প্রসারণের পাশাপাশি ওয়াশিংটনের সঙ্গে সহযোগিতা বজায় রাখাও ইসরায়েলের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে থাকবে।
নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক কৌশল নিয়ে বিশ্লেষকদের মত
ভারতীয় সংবাদ সংস্থা পিটিআইকে উদ্ধৃত করে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইসরায়েলের কয়েকজন বিশ্লেষকের মতে, মার্কিন প্রেসিডেন্টদের সঙ্গে মতবিরোধকে নেতানিয়াহু তাঁর সমর্থকদের সামনে শক্তিশালী নেতৃত্বের প্রমাণ হিসেবে তুলে ধরেছেন। তাঁদের মতে, ইসরায়েলের স্বার্থ রক্ষায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টদের বিরুদ্ধেও অবস্থান নিতে প্রস্তুত—এমন ভাবমূর্তি নেতানিয়াহুর নির্বাচনি রাজনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে। এই কৌশল তাঁকে রাজনৈতিকভাবে সুবিধা দিয়েছে এবং তিনি ইসরায়েলের সবচেয়ে দীর্ঘ সময় দায়িত্ব পালনকারী প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন।
সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা ও জো বাইডেনের সঙ্গে নেতানিয়াহুর সম্পর্ক বিভিন্ন সময়ে উত্তেজনাপূর্ণ ছিল। দুই দেশের ঘনিষ্ঠ মিত্রতার মধ্যেও মধ্যপ্রাচ্যনীতি, ইরান, ফিলিস্তিন প্রশ্ন এবং ইসরায়েলের সামরিক পদক্ষেপ নিয়ে মতপার্থক্য দেখা গেছে। বিশ্লেষকদের এই মূল্যায়নের প্রেক্ষাপটে নেতানিয়াহুর সাম্প্রতিক বক্তব্যকে শুধু পররাষ্ট্রনীতির ঘোষণা হিসেবে নয়, তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান ও নির্বাচনি কৌশলের অংশ হিসেবেও দেখা হচ্ছে।
সব মিলিয়ে, ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্ব পরিবর্তনের সম্ভাবনাকে সামনে রেখে ইসরায়েলের আন্তর্জাতিক সম্পর্কের পরিসর বাড়াতে চাইছেন নেতানিয়াহু। ভারত ও লাতিন আমেরিকার দেশগুলোর সঙ্গে নতুন জোট গঠনের আহ্বান তাঁর সেই পরিকল্পনারই ইঙ্গিত দেয়। তবে এসব উদ্যোগ কতটা কার্যকর হবে, তা নির্ভর করবে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর রাজনৈতিক অবস্থান, পারস্পরিক স্বার্থ এবং ইসরায়েলের সঙ্গে তাদের সম্পর্কের ভবিষ্যৎ গতিপথের ওপর। সূত্র: দ্য হিন্দু
কালের আলো/ইএকে/এসএ
আপনার মতামত লিখুন
[gs-fb-comments]