ব্রিটিশ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রতিবেদন
২১ হাজারের বেশি রাজনৈতিক মামলা প্রত্যাহার বাংলাদেশে: ব্রিটিশ প্রতিবেদন
বিএনপি সরকার গঠনের পর বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে সামগ্রিক উন্নতি হয়েছে বলে উল্লেখ করেছে যুক্তরাজ্যের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি প্রতিবেদন। এতে বলা হয়েছে, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ের তুলনায় বর্তমানে রাজনৈতিক দল, সাংবাদিক, নাগরিক সমাজ ও মানবাধিকার সংগঠনগুলো স্বাধীনভাবে কার্যক্রম পরিচালনা এবং মতপ্রকাশের বেশি সুযোগ পাচ্ছে। একই সঙ্গে দেশে রাজনৈতিক সহিংসতা কমেছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
যুক্তরাজ্যের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কান্ট্রি পলিসি অ্যান্ড ইনফরমেশন টিমের (সিপিআইটি) তৈরি একটি ফ্যাক্ট-ফাইন্ডিং মিশনের প্রতিবেদনটি গতকাল সোমবার প্রকাশ করা হয়। চলতি বছরের ৭ থেকে ১৫ জুন পর্যন্ত ঢাকায় বিভিন্ন অংশীজনের সঙ্গে সরাসরি সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে তিন সদস্যের ব্রিটিশ প্রতিনিধিদল প্রতিবেদনটি তৈরি করে।
রাজনৈতিক দলগুলোর কার্যক্রমে স্বাধীনতার সুযোগ
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) এবং অন্যান্য বিরোধী রাজনৈতিক দল বর্তমানে স্বাধীনভাবে সাংগঠনিক কার্যক্রম পরিচালনা, প্রচার-প্রচারণা, সমাবেশ আয়োজন এবং সরকারের সমালোচনা করার সুযোগ পাচ্ছে।
তবে রাজনৈতিক পরিবেশে উন্নতির কথা বলা হলেও দেশে এখনো কিছু সহিংসতার ঘটনা ঘটছে। প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, এসব সহিংসতার বড় অংশ স্থানীয় পর্যায়ে প্রভাব বিস্তার, ব্যবসায়িক স্বার্থ এবং আধিপত্য প্রতিষ্ঠাকে কেন্দ্র করে সংঘটিত হচ্ছে।
২০২৬ সালের নির্বাচন ও রাজনৈতিক সহিংসতা
বাংলাদেশের ২০২৬ সালের নির্বাচনকে সার্বিকভাবে শান্তিপূর্ণ হিসেবে বর্ণনা করেছে ব্রিটিশ প্রতিনিধিদল। আগের নির্বাচনগুলোর তুলনায় এই নির্বাচনে সহিংসতা উল্লেখযোগ্যভাবে কম ছিল বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, নির্বাচনের পর থেকে দেশে রাজনৈতিক সহিংসতার মাত্রাও কমেছে। তবে রাজনৈতিক পরিস্থিতির এই পরিবর্তন সত্ত্বেও স্থানীয় পর্যায়ে সংঘাত ও প্রভাব বিস্তারকে কেন্দ্র করে সহিংসতার ঝুঁকি এখনো রয়েছে।
আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ, সমর্থকদেরও রয়েছে ঝুঁকি
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আওয়ামী লীগ দল হিসেবে এখনো নিষিদ্ধ রয়েছে। ক্ষমতায় থাকাকালে মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং ২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের ঘটনাবলির কারণে দলটির বিরুদ্ধে ব্যাপক জনক্ষোভ রয়েছে।
তবে দুর্নীতি, সহিংসতা কিংবা দমন-পীড়নের সঙ্গে সরাসরি জড়িত ছিলেন না—এমন তৃণমূল পর্যায়ের আওয়ামী লীগ সমর্থকেরা নিজ নিজ এলাকায় বসবাস করতে পারছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। যদিও প্রকাশ্যে দলটির প্রতি সমর্থন জানালে তাঁদের সামাজিক বৈরিতা, হয়রানি কিংবা সহিংসতার মুখে পড়ার ঝুঁকি রয়েছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, আওয়ামী লীগের সাবেক কিছু নেতাকর্মী অন্য রাজনৈতিক দলে যোগ দিয়েছেন, কেউ এলাকা পরিবর্তন করেছেন, আবার কেউ দেশ ছেড়েছেন।
জুলাই অভ্যুত্থানের ঘটনায় মামলা ও বিচার
২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থান এবং আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সংঘটিত অপরাধের অভিযোগে দলটির বিপুলসংখ্যক নেতা-কর্মী ও সরকারি কর্মকর্তার বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল এবং নিয়মিত আদালতে মামলা চলছে।
প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, কয়েকজন প্রভাবশালী নেতা জামিনে মুক্তি পেলেও অনেকে বিচারাধীন অবস্থায় কারাগারে রয়েছেন। এসব মামলা ও বিচারপ্রক্রিয়া বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে উঠে এসেছে প্রতিবেদনে।
প্রত্যাহার হয়েছে ২১ হাজারের বেশি রাজনৈতিক মামলা
আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে করা মামলায় গ্রেপ্তার হওয়া অধিকাংশ ব্যক্তি ইতিমধ্যে মুক্তি পেয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
পুলিশ সূত্রের বরাত দিয়ে এতে বলা হয়, এখন পর্যন্ত ২১ হাজারেরও বেশি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার করা হয়েছে। পুরোনো মামলাগুলো পর্যালোচনার প্রক্রিয়াও এখনো চলমান রয়েছে।
সব মিলিয়ে, যুক্তরাজ্যের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এই প্রতিবেদনে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিবেশ, বিরোধী দলগুলোর কার্যক্রম, নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতা এবং আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের পরিস্থিতি তুলে ধরা হয়েছে। প্রতিবেদনে রাজনৈতিক স্বাধীনতা ও মতপ্রকাশের সুযোগ বৃদ্ধির কথা বলা হলেও স্থানীয় পর্যায়ে সহিংসতা, রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে হয়রানির ঝুঁকি এবং চলমান বিচারপ্রক্রিয়ার বিষয়গুলোও গুরুত্ব পেয়েছে।
কালের আলো/এএএন/এমএসআইপি




আপনার মতামত লিখুন
[gs-fb-comments]