মানুষের হয়ে দর–কষাকষি করবে এআই এজেন্ট আইনি ঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগ
মানুষের হয়ে পণ্যের দাম নিয়ে দর–কষাকষি, গ্রাহকের অভিযোগের সমাধান কিংবা চাকরির ক্ষেত্রে বেশি বেতনের প্রস্তাব আদায় করতে পারবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) এজেন্ট। ভবিষ্যতে এসব কাজের জন্য মানুষের সরাসরি অংশগ্রহণও কমে আসতে পারে। তবে এআই এজেন্টকে মানুষের প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করানোর ক্ষেত্রে আইনি ও নৈতিক সীমা কী হবে, তা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। এআই প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠান অ্যানথ্রপিক এ ধরনের প্রযুক্তির সম্ভাবনা ও ঝুঁকি খতিয়ে দেখতে আইনজীবীদের পরামর্শ নেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে।
মানুষের প্রতিনিধি হয়ে চুক্তি নিয়ে আলোচনা
এআই প্রযুক্তির দ্রুত উন্নতির ফলে এমন একটি ব্যবস্থার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে, যেখানে এআই এজেন্ট ব্যবহারকারীর হয়ে বিভিন্ন চুক্তি নিয়ে আলোচনা ও দর–কষাকষি করতে পারবে। এমনকি এক এআই এজেন্ট অন্য এআই এজেন্টের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করে নিজ নিজ ব্যবহারকারীর স্বার্থ রক্ষার চেষ্টা করতে পারে। এতে পণ্য কেনাবেচা, চাকরির বেতন নির্ধারণ, বাড়িভাড়ার চুক্তি কিংবা গ্রাহকের অভিযোগ নিষ্পত্তির মতো কাজে এআই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। ব্যবহারকারীকে প্রতিটি ধাপে সরাসরি অংশ নিতে না হলেও চলতে পারে। তবে এআই এজেন্ট কতটা স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেবে এবং কোন পর্যায়ে মানুষের অনুমতি নিতে হবে, তা নির্ধারণ করা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠছে।
পরীক্ষায় দর–কষাকষিতে সাফল্য এআইয়ের
অ্যানথ্রপিক গত সেপ্টেম্বরে প্রকাশিত এক ব্লগ পোস্টে জানিয়েছে, বাস্তব পরিস্থিতির আদলে তৈরি বিভিন্ন পরীক্ষার মাধ্যমে এআই এজেন্টের দর–কষাকষির সক্ষমতা যাচাই করেছে তারা। পরীক্ষায় কর্মীরা একটি ভার্চ্যুয়াল বাজারে এআই এজেন্ট ব্যবহার করে বই কেনাবেচা করেন। পরীক্ষার ফলাফলে দেখা যায়, কঠোরভাবে দর–কষাকষি করার নির্দেশনা পাওয়া এআই এজেন্টগুলো তুলনামূলকভাবে কিছুটা ভালো চুক্তি করতে পেরেছে। অন্যদিকে সহযোগিতামূলক আচরণে অভ্যস্ত এজেন্টগুলো কখনো কখনো নিজেদের কম পছন্দের বই গ্রহণ করেছে, যাতে লেনদেনে অংশ নেওয়া সবাই কিছু না কিছু সুবিধা পায়। এ পরীক্ষার ফলাফল ইঙ্গিত দেয়, এআই এজেন্টের আচরণ অনেকাংশে নির্ভর করতে পারে তাকে কী ধরনের নির্দেশনা দেওয়া হচ্ছে তার ওপর। অর্থাৎ, ব্যবহারকারীর স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়া এবং সব পক্ষের জন্য গ্রহণযোগ্য সমঝোতা তৈরির মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
অন্য এআইকে বিভ্রান্ত করে তথ্য আদায়ের ঝুঁকি
এআই এজেন্টের দর–কষাকষির সক্ষমতার পাশাপাশি এর সম্ভাব্য ঝুঁকি নিয়েও গবেষণা করছেন বিশেষজ্ঞরা। হার্ভার্ড বিজনেস স্কুলের সহকারী অধ্যাপক মিশেল ভাকারো এআই এজেন্টগুলোর মধ্যে ১ লাখ ৮০ হাজারের বেশি দর–কষাকষি নিয়ে গবেষণা করেছেন। এসব পরীক্ষায় চাকরির প্রস্তাব, বাড়িভাড়ার চুক্তিসহ বিভিন্ন পরিস্থিতি বিবেচনায় নেওয়া হয়। গবেষণায় দেখা গেছে, এআই এজেন্ট প্রম্পট ইনজেকশনের মতো কৌশল ব্যবহার করে অন্য এজেন্টকে বিভ্রান্ত করতে পারে। এমনকি অন্য এজেন্টের কাছ থেকে ব্যক্তিগত তথ্য বের করে নেওয়ার চেষ্টাও করতে পারে। প্রম্পট ইনজেকশন হলো এমন একটি কৌশল, যার মাধ্যমে বিশেষ নির্দেশনা দিয়ে এআই ব্যবস্থাকে তার নির্ধারিত কাজের বাইরে অনাকাঙ্ক্ষিত কিছু করতে প্রভাবিত করার চেষ্টা করা হয়। দর–কষাকষির সময় এ ধরনের কৌশল ব্যবহার করা হলে ব্যবহারকারীর গোপনীয়তা ও স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হতে পারে।
এআইয়ের সুবিধা কি সবাই সমানভাবে পাবে?
এআই এজেন্টের সহায়তায় সাধারণ মানুষও পেশাদার পরামর্শকের সাহায্য ছাড়াই নিজেদের জন্য ভালো চুক্তি আদায়ের সুযোগ পেতে পারেন। চাকরির বেতন নিয়ে আলোচনা, বাড়িভাড়ার শর্ত নির্ধারণ কিংবা পণ্যের দাম কমানোর মতো কাজে এটি বিশেষভাবে সহায়ক হতে পারে। তবে এ সুবিধা সবার জন্য সমানভাবে সহজলভ্য হবে কি না, তা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। সবচেয়ে শক্তিশালী এআই মডেলগুলো যদি মূলত ধনী ব্যক্তি ও বড় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের নাগালে থাকে, তাহলে দর–কষাকষিতে তারাই বাড়তি সুবিধা পেতে পারে। বিপরীতে আর্থিকভাবে পিছিয়ে থাকা মানুষ ও ছোট ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান প্রতিযোগিতায় আরও অসুবিধায় পড়তে পারে। এ কারণে এআই এজেন্টের বিস্তার একদিকে দর–কষাকষির সুযোগ বাড়ালেও অন্যদিকে বিদ্যমান অর্থনৈতিক বৈষম্য আরও বাড়িয়ে দিতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।
এআই এজেন্টের জন্য প্রয়োজন আইনি কাঠামো
বর্তমানে মানুষের হয়ে দর–কষাকষি ও লেনদেন পরিচালনাকারী এআই এজেন্টের কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণে সুস্পষ্ট আইনি ও নীতিগত কাঠামো গড়ে ওঠেনি। ফলে এ ধরনের এজেন্টের ক্ষমতা ও দায়িত্বের সীমা নির্ধারণ জরুরি হয়ে উঠছে। কোন পরিস্থিতিতে এআই এজেন্ট নিজে সিদ্ধান্ত নিতে পারবে, কখন সমঝোতায় পৌঁছাবে এবং কখন ব্যবহারকারীর অনুমতি বা সহায়তা চাইবে—এসব বিষয়ে স্পষ্ট নির্দেশনা প্রয়োজন। একই সঙ্গে এআই এজেন্ট ভুল তথ্য দিলে, গোপনীয়তা লঙ্ঘন করলে কিংবা ব্যবহারকারীর স্বার্থবিরোধী চুক্তি করলে দায় কার ওপর বর্তাবে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। এআই প্রযুক্তি মানুষের দৈনন্দিন লেনদেন ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়াকে সহজ করতে পারে। তবে প্রযুক্তিটির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা যেন নতুন ধরনের প্রতারণা, বৈষম্য কিংবা আইনি জটিলতা তৈরি না করে, তা নিশ্চিত করাও জরুরি। ভবিষ্যতে এআই এজেন্টের ব্যবহার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রযুক্তিগত সক্ষমতার পাশাপাশি জবাবদিহি, স্বচ্ছতা ও ব্যবহারকারীর সুরক্ষার বিষয়গুলোও সমান গুরুত্ব পাবে। সূত্র: ইন্ডিয়া টুডে
কালের আলো/জেএন/এসএ

আপনার মতামত লিখুন
[gs-fb-comments]