গরমে অসুস্থ শ্রমিক, ঝুঁকিতে পোশাকশিল্পের উৎপাদন
তীব্র গরমে চাপে পড়েছে বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্প। কারখানার ভেতরে অতিরিক্ত তাপমাত্রায় শ্রমিকদের স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ার পাশাপাশি কমছে কর্মক্ষমতা এবং বাড়ছে পরিচালন ব্যয়। কার্যকর শীতলীকরণ ব্যবস্থা না থাকলে তাপজনিত চাপে শ্রমিকদের উৎপাদনশীলতা ১২ থেকে ১৫ শতাংশ পর্যন্ত কমতে পারে বলে এক গবেষণায় উঠে এসেছে।
দেশের রফতানি আয়ের অন্যতম প্রধান খাত তৈরি পোশাকশিল্পে প্রায় ৪০ লাখ শ্রমিক কাজ করেন। গ্রীষ্মকালে অনেক কারখানার ভেতরের তাপমাত্রা ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়ে যায়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে তা ৪০ ডিগ্রি পর্যন্ত পৌঁছায়। এতে শ্রমিকদের শারীরিক অসুস্থতা, ক্লান্তি ও মনোযোগের ঘাটতির ঝুঁকি বাড়ছে।
২০২৫ সালে দ্য ল্যানসেট প্ল্যানেটারি হেলথ সাময়িকীতে প্রকাশিত এক গবেষণায় বাংলাদেশের পোশাক কারখানার পরিবেশ অনুকরণ করে তীব্র গরমে শ্রমিকদের শারীরিক চাপ ও উৎপাদনশীলতার ওপর প্রভাব পরীক্ষা করা হয়। সিডনি বিশ্ববিদ্যালয়ের নেতৃত্বে পরিচালিত ওই গবেষণায় ৪২ জন অংশগ্রহণকারীকে নিয়ে ২৪৭টি পরীক্ষা করা হয়। পরীক্ষাগারে ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা ও ৩৮ শতাংশ আপেক্ষিক আর্দ্রতার পরিবেশ তৈরি করা হয়েছিল।
গবেষণায় দেখা যায়, অতিরিক্ত গরমে শ্রমিকদের কর্মক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তবে সব কারখানার বাস্তব উৎপাদন পরিস্থিতির সঙ্গে পরীক্ষাগারের ফলাফল সরাসরি মেলে না।
গরমে বাড়ছে শ্রমিকদের স্বাস্থ্যঝুঁকি
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজের (বিলস) এক জরিপে অংশ নেওয়া ২১৫ জন পোশাকশ্রমিকের ৭৮ শতাংশ জানিয়েছেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে গ্রীষ্মের গরম বেড়েছে। জরিপে প্রায় অর্ধেক শ্রমিক গরমের কারণে দুর্বলতা বা অসুস্থতায় ভোগার কথাও জানিয়েছেন।
বাংলাদেশ সেন্টার ফর ওয়ার্কার সলিডারিটির নির্বাহী পরিচালক কল্পনা আক্তারের ভাষ্য অনুযায়ী, তীব্র গরমে অনেক শ্রমিক অতিরিক্ত ঘাম, মাথা ঘোরা, বমি বমি ভাব, পেশিতে টান ও অজ্ঞান হওয়ার মতো সমস্যায় ভুগছেন।
অতিরিক্ত তাপমাত্রায় শারীরিক ক্লান্তি, মাথাব্যথা ও মনোযোগের ঘাটতি দেখা দিতে পারে। এতে কাজে ভুল এবং পোশাকের ত্রুটি বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। পাশাপাশি গরম রাতে ঘুমের ব্যাঘাত, আবাসিক এলাকায় বিদ্যুৎ বিভ্রাট ও দীর্ঘ যাতায়াতের ক্লান্তিও শ্রমিকদের কর্মক্ষমতায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
বাংলাদেশ গার্মেন্ট শ্রমিক সংহতির সভাপ্রধান তাসলিমা আখতার বলেন, কারখানায় ফ্যান বা শীতলীকরণ যন্ত্রের সুবিধা থাকলেও কর্মস্থল থেকে বের হওয়ার পর শ্রমিকদের আবার তীব্র গরমের মুখোমুখি হতে হয়। বাসায় ফিরে অনেক সময় বিদ্যুৎ পাওয়া যায় না, গ্যাসের সংকটও থাকে। অথচ বিদ্যুৎ, গ্যাস ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বেড়েছে, কিন্তু সেই তুলনায় শ্রমিকদের মজুরি বাড়েনি। শ্রমিকদের সুস্থ রাখা ও জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে মজুরি বাড়ানো প্রয়োজন বলেও তিনি মত দেন।
বাড়ছে কারখানার পরিচালন ব্যয়
তাপপ্রবাহ মোকাবিলায় অনেক কারখানায় ফ্যানের ব্যবহার বাড়ানো, বায়ু চলাচল উন্নত করা, নিরাপদ পানীয় জল ও খাবার স্যালাইন সরবরাহ এবং প্রাথমিক চিকিৎসার ব্যবস্থা জোরদারের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। কোথাও কোথাও পানি পানের জন্য নির্দিষ্ট বিরতি এবং তীব্র গরমে কাজের সূচিতেও পরিবর্তন আনা হচ্ছে।
এসব উদ্যোগের ফলে বিদ্যুৎ, বিকল্প জ্বালানি, পানি ও রক্ষণাবেক্ষণ খাতে ব্যয় বাড়তে পারে। তবে এপ্রিল থেকে জুন পর্যন্ত গ্রীষ্মকালীন সময়ে কারখানার পরিচালন বাজেট ২ থেকে ৫ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ার যে হিসাব উল্লেখ করা হচ্ছে, তার নির্দিষ্ট উৎস ও হিসাবপদ্ধতি নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।
বিজিএমইএর সাবেক পরিচালক ও বাংলাদেশ অ্যাপারেল ভয়েসের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মহিউদ্দিন রুবেল বলেন, তীব্র গরম এখন শুধু শ্রমিকের স্বাস্থ্যের বিষয় নয়; এটি উৎপাদনশীলতা, পরিচালন ব্যয় ও আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা সক্ষমতার সঙ্গেও যুক্ত।
তার মতে, শুধু ফ্যান বা শীতলীকরণ যন্ত্র বাড়ালেই হবে না। কারখানার নকশা, বায়ু চলাচল, যন্ত্রপাতির বিন্যাস ও বিদ্যুৎ ব্যবহারের দক্ষতার দিকেও নজর দিতে হবে। কোথায় তাপের চাপ বেশি, তা চিহ্নিত করে পরিকল্পিত বিনিয়োগ জরুরি।
ক্রেতাদের যৌথ বিনিয়োগের তাগিদ
তাপজনিত ঝুঁকি মোকাবিলার বাড়তি ব্যয় শুধু উৎপাদকদের বহন করা উচিত নয় বলে মনে করেন মহিউদ্দিন রুবেল। তার মতে, আন্তর্জাতিক ক্রেতাদেরও দীর্ঘমেয়াদি ক্রয়াদেশ, যৌক্তিক পণ্যমূল্য এবং কারখানার কর্মপরিবেশ উন্নয়নে যৌথ বিনিয়োগের মাধ্যমে দায়িত্ব নিতে হবে। এ জন্য সরকার, পোশাকশিল্পের উদ্যোক্তা ও আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
বিশেষজ্ঞ ও শ্রমিক অধিকারকর্মীদের মতে, কারখানায় পর্যাপ্ত বায়ু চলাচল, নিরাপদ পানীয় জল, বিশ্রামের সুযোগ, তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ এবং তাপজনিত অসুস্থতায় দ্রুত চিকিৎসা নিশ্চিত করা জরুরি। পাশাপাশি শ্রমিকদের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় কার্যকর কর্মপরিকল্পনা ও নিয়মিত তদারকি প্রয়োজন।
অর্থনীতিতেও পড়ছে তাপের প্রভাব
ল্যানসেট কাউন্টডাউনের ২০২৫ সালের বাংলাদেশ তথ্যপত্র অনুযায়ী, ২০২৪ সালে অতিরিক্ত তাপের কারণে দেশে সম্ভাব্য ২৯ বিলিয়ন কর্মঘণ্টা হারিয়েছে, যা ১৯৯০-৯৯ সালের গড়ের তুলনায় ৯২ শতাংশ বেশি। সম্ভাব্য আয়ক্ষতির পরিমাণ ২৪ বিলিয়ন ডলার, যা দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় ৫ শতাংশের সমান।
এই হিসাব কৃষি, নির্মাণ, উৎপাদন ও সেবাসহ বিভিন্ন অর্থনৈতিক খাতের সম্মিলিত ক্ষতির চিত্র তুলে ধরে। ফলে পুরো ক্ষতিকে শুধু তৈরি পোশাকশিল্পের ক্ষতি হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
অন্যদিকে, কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্লোবাল লেবার ইনস্টিটিউট ও বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান শ্রোডার্সের ২০২৩ সালের এক গবেষণায় বলা হয়েছে, তীব্র গরম ও বন্যার প্রভাবে বাংলাদেশ, কম্বোডিয়া, পাকিস্তান ও ভিয়েতনামের পোশাক ও জুতা উৎপাদন খাত ২০৩০ সালের মধ্যে সম্মিলিতভাবে ৬৫ বিলিয়ন ডলারের সম্ভাব্য রফতানি আয় হারানোর ঝুঁকিতে রয়েছে। একই সময়ে কর্মসংস্থান সৃষ্টির সম্ভাবনা প্রায় ১০ লাখ কমে যেতে পারে।
গবেষণাটি চার দেশের সম্মিলিত পোশাক ও জুতা উৎপাদন খাতের ঝুঁকি নিয়ে করা হয়েছে। এতে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় বিনিয়োগ না বাড়ালে উৎপাদন, কর্মসংস্থান ও আন্তর্জাতিক সরবরাহব্যবস্থায় ক্ষতির আশঙ্কা তুলে ধরা হয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্পের উৎপাদন সক্ষমতা ধরে রাখতে তাপঝুঁকি মোকাবিলায় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, শ্রমিকবান্ধব কর্মপরিবেশ, অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের অংশগ্রহণ বাড়ানো জরুরি। শ্রমিকদের স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করার পাশাপাশি এসব উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা গেলে উৎপাদনশীলতা ও আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা ধরে রাখা সহজ হবে।
কালের আলো/এএইচ/এমএসআইপি

আপনার মতামত লিখুন
[gs-fb-comments]