রাজধানীতে মাদকচক্রের শিকড় কত গভীরে?
রেললাইনের পাশের বস্তিতে যেমন মাদকের কেনাবেচার অভিযোগ, তেমনি অভিজাত এলাকার বিলাসবহুল ফ্ল্যাটেও বসছে নেশার আসর। কোথাও ইয়াবার হাতবদল, কোথাও ফেনসিডিল, হেরোইন কিংবা আইসের কারবার। মাদকের এই ছায়াজগতে একদিকে সক্রিয় খুচরা বিক্রেতারা, অন্যদিকে রয়েছে সরবরাহ ও নিয়ন্ত্রণের নেপথ্য নেটওয়ার্ক। মাঝেমধ্যে অভিযান চালিয়ে কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হলেও পুরো চক্রের নাগাল পাওয়া যাচ্ছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।
উদ্বেগ আরও গভীর হয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের বিরুদ্ধে মাদক-সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ ওঠায়। যাঁদের দায়িত্ব অপরাধ দমন, তাঁদের কারও বিরুদ্ধে যখন একই অপরাধে জড়িয়ে পড়ার অভিযোগ আসে, তখন মাদকবিরোধী তৎপরতার কার্যকারিতা নিয়েও সংশয় তৈরি হয়।
- ইয়াবা, হেরোইন, আইসের কারবারে উদ্বেগ
- ৮৪ জন আটক অভিজাত বাড়িতে, ইয়াবাসহ গ্রেপ্তার দুই পুলিশ সদস্য
- খুচরা বিক্রেতারা গ্রেপ্তার হলেও অধরা মূল হোতারা
- প্রশ্নের মুখে আইন প্রয়োগের কার্যকারিতা
রাজধানীর একটি অভিজাত এলাকায় পুলিশের এক অতিরিক্ত উপমহাপরিদর্শকের (ডিআইজি) ভাড়া দেওয়া বিলাসবহুল বাড়িতে মাদক সেবন ও পার্টির আয়োজনের অভিযোগে অভিযান সেই প্রশ্নকে আরও সামনে এনেছে। ঘটনাটি যেন চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে, মাদকের কারবারকে কেবল বস্তির গলি কিংবা চিহ্নিত কয়েকটি স্পটের সমস্যা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
অভিজাত ঠিকানায় মাদকের আসর, আটক ৮৪
রাজধানীর একটি অভিজাত এলাকায় পুলিশ সদর দপ্তরের অতিরিক্ত ডিআইজি আব্দুল্লাহ আল জহিরের ভাড়া দেওয়া বিলাসবহুল থ্রিপ্লেক্স বাড়িতে সোমবার রাতে অভিযান চালায় ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগ (ডিবি)। সেখান থেকে বিদেশি মদ, গাঁজা, ইয়াবা ও মাদক সেবনের বিভিন্ন সরঞ্জাম উদ্ধারের কথা জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট সূত্র। অভিযানে ৫৮ জন পুরুষ ও ২৬ জন নারীসহ মোট ৮৪ জনকে আটক করা হয়।
ডিবি সূত্রের ভাষ্য, অনলাইন প্ল্যাটফর্ম এয়ারবিএনবির মাধ্যমে বাড়িটি ভাড়া দেওয়া হলেও সেখানে নিয়মিত মাদকের আসর ও অবৈধ ডিজে পার্টির আয়োজন করা হতো।
একজন ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তার ভাড়া দেওয়া বাড়িতে এমন আয়োজন কীভাবে চলছিল, তা নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠেছে। বাড়িটি কীভাবে ব্যবহৃত হচ্ছিল, কারা এসব আয়োজনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা কী—তদন্তে এসব বিষয় স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন। বাড়ির মালিকের পদমর্যাদা নিজে থেকে অপরাধে সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ নয়; প্রত্যেকের দায় নির্ধারণ করতে হবে তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে।
এর আগে মাদকসহ পুলিশ সদস্যদের গ্রেপ্তারের ঘটনাও ঘটেছে। গত ২৩ আগস্ট ৫ হাজার ৩১০ পিস ইয়াবাসহ পল্লবী থানার সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) শফিকুল ইসলামকে গ্রেপ্তার করে দক্ষিণখান থানা পুলিশ। পরে ২৭ সেপ্টেম্বর ১ হাজার ৭৯০ পিস ইয়াবা ও মাদক বিক্রির নগদ অর্থসহ গ্রেপ্তার হন পুলিশ কনস্টেবল রেজাউল করিম।
পরপর এসব ঘটনায় প্রশ্ন উঠেছে, বাহিনীর অভ্যন্তরে নজরদারি কতটা কার্যকর এবং অপরাধে জড়িত সদস্যদের শনাক্ত করার ব্যবস্থা কতটা শক্তিশালী। কারণ, অপরাধ দমনের দায়িত্বে থাকা প্রতিষ্ঠানের ভেতরেই অনিয়মের অভিযোগ দেখা দিলে তা শুধু আইন প্রয়োগের সক্ষমতা নয়, জনআস্থার ওপরও প্রভাব ফেলে।
গলি থেকে টার্মিনাল—কারবারের বিস্তৃত বলয়
কাওরান বাজার রেললাইন বস্তি, মোহাম্মদপুরের জেনেভা ক্যাম্প, মহাখালী বাস টার্মিনাল, গাবতলী ও যাত্রাবাড়ী—রাজধানীর এসব এলাকায় মাদক কেনাবেচার অভিযোগ রয়েছে। সাভারের বিভিন্ন স্থানেও চলছে মাদক কারবার।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, এসব এলাকায় খুচরা বিক্রির পাশাপাশি বিভিন্ন পথে মাদক রাজধানীতে প্রবেশ করছে। অর্থাৎ, কোনো একটি বিক্রয়কেন্দ্রে অভিযান চালিয়ে মাদক কারবারের পুরো চিত্র পাওয়া সম্ভব নয়। এর পেছনে রয়েছে সরবরাহের পথ, মজুত, পরিবহন এবং অর্থের লেনদেনের মতো একাধিক স্তর।
জেনেভা ক্যাম্পে মাদক ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিভিন্ন গোষ্ঠীর মধ্যে সংঘর্ষ ও গোলাগুলির ঘটনাও ঘটেছে। এতে স্পষ্ট হয়, কোনো কোনো এলাকায় মাদককে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে আধিপত্য বিস্তারের সংঘাত। অবৈধ এই ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিরোধ শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের নিরাপত্তাকেও ঝুঁকিতে ফেলছে।
এখানে মূল প্রশ্ন শুধু কোথায় মাদক বিক্রি হচ্ছে, তা নয়; কারা সরবরাহ করছে, কারা ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখেছে এবং অভিযান শেষে কেন একই ধরনের কারবার আবার মাথাচাড়া দেওয়ার সুযোগ পাচ্ছে—সেসব বিষয়ও অনুসন্ধানের দাবি রাখে।
অভিযানেও বাধা, গুলিবিদ্ধ ডিএনসি পরিদর্শক
মাদক কারবারের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করতে গিয়ে নিরাপত্তাঝুঁকিতেও পড়ছেন দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা। সম্প্রতি গেন্ডারিয়া এলাকায় মাদকবিরোধী অভিযান চালানোর সময় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের (ডিএনসি) এক পরিদর্শক গুলিবিদ্ধ হন।
এরপর ঘুণ্টিঘর রেলস্টেশন ও মুন্সিরটেক এলাকায় ডিএনসি এবং স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়নের (এসআরবি-১০) যৌথ অভিযান পরিচালিত হয়। এ সময় কয়েকজন মাদক কারবারিকে আটক করা হয়। পরে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে তাঁদের বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেওয়া হয়। পাশাপাশি বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয় মাদক সেবনের কাজে ব্যবহৃত একাধিক অবৈধ ঝুপড়ি ও আস্তানা।
এসব পদক্ষেপে নির্দিষ্ট কিছু স্থানে মাদক সেবন ও কারবারের সুযোগ সাময়িকভাবে বন্ধ হতে পারে। কিন্তু আস্তানা উচ্ছেদের পর সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা অন্যত্র গিয়ে একই কার্যক্রম চালাচ্ছেন কি না, তা নজরদারিতে রাখা জরুরি। নইলে উচ্ছেদ হওয়া স্থানের জায়গায় নতুন আস্তানা গড়ে ওঠার ঝুঁকি থেকে যায়।
অস্ত্র উঁচিয়ে অভিযান, তারপর পদত্যাগ
গেন্ডারিয়ায় গত শনিবার বিকেলে প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেনের নেতৃত্বে পরিচালিত মাদকবিরোধী অভিযান ঘিরেও তৈরি হয় বিতর্ক। অস্ত্র উঁচিয়ে অভিযান চালানোর ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর শুরু হয় ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা। এর জেরে সোমবার মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করেন ইশরাক হোসেন।
ঘটনাটি মাদকবিরোধী তৎপরতার পাশাপাশি অভিযান পরিচালনার পদ্ধতি ও ক্ষমতার প্রয়োগ নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে। অপরাধ দমনে দৃঢ় অবস্থান প্রয়োজন, তবে সেই তৎপরতা হতে হবে আইনসম্মত ও জবাবদিহিমূলক। অন্যথায় অপরাধ দমনের উদ্দেশ্য ছাপিয়ে অভিযানের ধরনই বিতর্কের কেন্দ্রে চলে আসতে পারে।
‘চুনোপুঁটি’ নয়, নজর দিতে হবে নেপথ্যের নিয়ন্ত্রকদের দিকে
অপরাধ বিশ্লেষক ড. তৌহিদুল হকের মতে, মাঝেমধ্যে সাঁড়াশি অভিযান কিংবা বিচ্ছিন্নভাবে কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করে মাদক নির্মূল করা সম্ভব নয়। তাঁর ভাষ্য, এ অবৈধ ব্যবসার পেছনে শক্তিশালী সিন্ডিকেট সক্রিয় রয়েছে। রাজনৈতিক ছত্রছায়া এবং কিছু অসাধু কর্মকর্তার প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সহযোগিতায় মাদক কারবার টিকে থাকার অভিযোগও রয়েছে।
তিনি মনে করেন, অভিযানে খুচরা বিক্রেতারা গ্রেপ্তার হলেও মূল হোতাদের অনেকে ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যান। আবার জামিনে মুক্ত হয়ে কেউ কেউ একই অপরাধে জড়িয়ে পড়েন। ফলে দৃশ্যমান অপরাধীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হলেও নেপথ্যের নেটওয়ার্ক অক্ষত থাকার আশঙ্কা থাকে।
এ পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসতে গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানোর পাশাপাশি মাদকের উৎস, সরবরাহপথ, আর্থিক লেনদেন এবং নেপথ্যের নিয়ন্ত্রকদের শনাক্ত করা জরুরি। একই সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কোনো সদস্যের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে তা নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে প্রমাণিত অপরাধের ক্ষেত্রে যথাযথ ব্যবস্থা নিতে হবে।
পুলিশের ‘জিরো টলারেন্স’—পরীক্ষা বাস্তব প্রয়োগে
ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনার মোসলেহ উদ্দিন আহমদ জানিয়েছেন, রাজধানীতে মাদকের বিরুদ্ধে পুলিশের অবস্থান ‘জিরো টলারেন্স’। তাঁর বক্তব্য, মাদকসংক্রান্ত অপরাধে যে-ই জড়িত থাকুক, কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। কোনো পুলিশ সদস্য বা কর্মকর্তা অপরাধে জড়ালে তাঁর বিরুদ্ধেও আইন অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে এবং ভবিষ্যতেও হবে।
ডিএমপি কমিশনারের ভাষ্য, অভিযান কেবল খুচরা বিক্রেতা বা ভাসমান মাদক কারবারিদের গ্রেপ্তারে সীমাবদ্ধ থাকবে না। মাদকের মূল গডফাদার ও নেপথ্যের কুশীলবদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনতে পুলিশ সর্বশক্তি দিয়ে কাজ করছে।
তবে কঠোর অবস্থানের ঘোষণা কতটা ফলপ্রসূ হচ্ছে, তার প্রমাণ মিলবে তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়ার অগ্রগতিতে। বিশেষ করে প্রভাবশালী ব্যক্তি কিংবা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের ক্ষেত্রেও সমানভাবে আইন প্রয়োগ করা হচ্ছে কি না, সেটিই হবে জবাবদিহির গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা।
আস্তানা ভাঙলেই কি ভাঙবে মাদকের সাম্রাজ্য?
রাজধানীর মাদক পরিস্থিতি মোকাবিলায় সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো দৃশ্যমান বিক্রয়কেন্দ্রের বাইরে থাকা অপরাধী নেটওয়ার্ককে শনাক্ত করা। কয়েকজনকে গ্রেপ্তার, কিছু মাদক উদ্ধার কিংবা অবৈধ আস্তানা গুঁড়িয়ে দেওয়ার মাধ্যমে তাৎক্ষণিক ফল পাওয়া যেতে পারে। কিন্তু সরবরাহব্যবস্থা, আর্থিক লেনদেন ও নেপথ্যের নিয়ন্ত্রকদের বিরুদ্ধে কার্যকর পদক্ষেপ না থাকলে পুরো ব্যবসা বন্ধ করা কঠিন।
এ জন্য প্রয়োজন সমন্বিত গোয়েন্দা তৎপরতা, ধারাবাহিক অভিযান, নিরপেক্ষ তদন্ত এবং অপরাধীদের বিরুদ্ধে কার্যকর আইনি ব্যবস্থা। পাশাপাশি মাদকাসক্ত ব্যক্তিদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসন এবং তরুণদের মাদক থেকে দূরে রাখতে প্রতিরোধমূলক উদ্যোগও জোরদার করতে হবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, মাদকবিরোধী লড়াইয়ে আইনের প্রয়োগ হতে হবে পরিচয় ও প্রভাবনির্বিশেষে। অপরাধে সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ পাওয়া গেলে কাউকে ছাড় দেওয়া যাবে না; আবার অভিযোগের ভিত্তিতে কাউকে আগেভাগে অপরাধী হিসেবেও চিহ্নিত করা যাবে না। রাজধানীর মাদক কারবারের বিরুদ্ধে প্রকৃত সাফল্য আসবে তখনই, যখন শুধু আস্তানার ঠিকানা বদলাবে না—ভেঙে পড়বে সেই কারবার টিকিয়ে রাখার নেটওয়ার্কও।
কালের আলো/এমএসএএকে/এমকে


আপনার মতামত লিখুন
[gs-fb-comments]