ফল নিয়ে বিতর্ক ঠেকাতে অ্যাথলেটিকসে প্রযুক্তির ছোঁয়া
দেশের অ্যাথলেটিকসে ফলাফল নিয়ে বিতর্ক, অভিযোগ ও অসন্তোষ নতুন কিছু নয়। বিশেষ করে ট্র্যাকের স্প্রিন্ট ইভেন্টে কে আগে ফিনিশিং লাইন অতিক্রম করেছেন, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে একাধিকবার। গত আসরে নারীদের ১০০ মিটার স্প্রিন্টের ফলাফল ঘিরেও তৈরি হয়েছিল বিতর্ক। এবার সেই পরিস্থিতি এড়াতে প্রযুক্তিনির্ভর ফলাফল ব্যবস্থার ওপর জোর দিচ্ছে বাংলাদেশ অ্যাথলেটিকস ফেডারেশন।
আরাফাত রহমান কোকো ১৮তম জাতীয় সামার অ্যাথলেটিকস প্রতিযোগিতায় ফটোফিনিশ প্রযুক্তির মাধ্যমে দ্রুত ও নির্ভুল ফলাফল প্রকাশের পরিকল্পনা নিয়েছে আয়োজক সংস্থা। প্রতিযোগিতায় ফলাফল নিয়ে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি দর্শকদের অপেক্ষার সময় কমিয়ে আনাও তাদের লক্ষ্য। আয়োজকদের প্রত্যাশা, প্রযুক্তির যথাযথ ব্যবহারে প্রতিযোগিতার ফলাফল নিয়ে অনাকাঙ্ক্ষিত বিতর্কের সুযোগ কমবে।
ফটোফিনিশে নির্ভুল ফলাফলের উদ্যোগ
গতকাল জাতীয় ক্রীড়া পরিষদে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে প্রতিযোগিতার বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন বাংলাদেশ অ্যাথলেটিকস ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক আলী ইমাম তপন। তিনি জানান, ফটোফিনিশের মাধ্যমে দ্রুত ও নির্ভুল ফলাফল নিশ্চিত করতে দায়িত্ব পালন করবেন সাতজন বিএসসি ইঞ্জিনিয়ার। পাশাপাশি দর্শকদের জন্য থাকবে তিন থেকে চারটি ডিসপ্লে বোর্ড।
আয়োজকদের পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রতিটি ইভেন্ট শেষ হওয়ার ১০ থেকে ১৫ মিনিটের মধ্যেই ফলাফল প্রকাশ করা হবে। এতে ফলাফল জানতে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হবে না দর্শক ও সংশ্লিষ্টদের। একই সঙ্গে প্রতিযোগীদের অবস্থান নির্ধারণের ক্ষেত্রে প্রযুক্তিনির্ভর পদ্ধতি ব্যবহারের ফলে স্বচ্ছতা বাড়বে বলে আশা করছে ফেডারেশন।
অ্যাথলেটিকসে স্প্রিন্টের মতো ইভেন্টে প্রতিযোগীদের মধ্যে ব্যবধান অনেক সময় খুবই সামান্য থাকে। এমন পরিস্থিতিতে হাতে সময় ধরে বা খালি চোখে ফলাফল নির্ধারণ নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে। ফটোফিনিশ প্রযুক্তি ব্যবহার করে ফিনিশিং লাইনে প্রতিযোগীদের অবস্থান বিশ্লেষণ করা সম্ভব। ফলে ফলাফল নিয়ে আপত্তি উঠলে তা যাচাই করার ক্ষেত্রেও প্রযুক্তি সহায়ক হতে পারে।
তিন দিনে ৪০ ইভেন্ট, পদকজয়ীদের আর্থিক পুরস্কার
তিন দিনব্যাপী এই প্রতিযোগিতায় নারী ও পুরুষ মিলিয়ে মোট ৪০টি ইভেন্ট অনুষ্ঠিত হবে। আয়োজন নির্বিঘ্ন রাখতে ভেন্যু ব্যবস্থাপনাতেও নেওয়া হয়েছে বিশেষ পরিকল্পনা। ফুটবল মাঠের ক্ষতি এড়াতে থ্রো ইভেন্টগুলো আয়োজন করা হবে আর্মি স্টেডিয়ামে।
প্রতিযোগিতায় পদকজয়ীদের জন্যও রাখা হয়েছে আর্থিক পুরস্কার। প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্থান অর্জনকারীরা যথাক্রমে ছয় হাজার, পাঁচ হাজার ও তিন হাজার টাকা পাবেন। আর প্রতিযোগিতায় রেকর্ড গড়তে পারলে সংশ্লিষ্ট অ্যাথলেটের জন্য রয়েছে ২০ হাজার টাকার পুরস্কার। আয়োজকদের আশা, এই পুরস্কার অ্যাথলেটদের ভালো পারফরম্যান্সে উৎসাহিত করবে। একই সঙ্গে প্রতিযোগিতার মাধ্যমে নতুন প্রতিভা খুঁজে বের করা এবং দেশের অ্যাথলেটিকসের মানোন্নয়নের সুযোগ তৈরি হবে।
পৃষ্ঠপোষকতায় একাধিক প্রতিষ্ঠান
প্রতিযোগিতার মূল পৃষ্ঠপোষক হিসেবে রয়েছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন। এ ছাড়া ওরিয়ন গ্রুপ, নোমান গ্রুপ, শেলটেক, টিকে গ্রুপসহ ২০টির বেশি প্রতিষ্ঠান এই আয়োজনের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে।
বাংলাদেশ অ্যাথলেটিকস ফেডারেশনের সভাপতি ও নোমান গ্রুপের কর্ণধার আব্দুল্লাহ জাবের অ্যাথলেটিকসের বিকাশে সবার সহযোগিতা কামনা করেছেন। তাঁর আহ্বান, ছোট পরিসরে হলেও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা যেন দেশের অ্যাথলেটিকসের পাশে থাকেন।
দেশের অন্যান্য জনপ্রিয় খেলার তুলনায় অ্যাথলেটিকসে পৃষ্ঠপোষকতা ও বাণিজ্যিক আগ্রহ বাড়ানো এখনো বড় চ্যালেঞ্জ। এ অবস্থায় একাধিক প্রতিষ্ঠানের সহযোগিতা প্রতিযোগিতা আয়োজনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। তবে দীর্ঘমেয়াদে খেলাটির উন্নয়নে নিয়মিত বিনিয়োগ ও পরিকল্পিত পৃষ্ঠপোষকতা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
৪০ থেকে ৫০ লাখ টাকা ব্যয়ে সামার অ্যাথলেটিকস
পৃষ্ঠপোষকদের সহযোগিতা থাকলেও প্রতিযোগিতা আয়োজনের ব্যয় নিয়ে চাপ রয়েছে ফেডারেশনের ওপর। সরকারি ছুটির কারণে কিছু অর্থসংক্রান্ত কার্যক্রম সম্পন্ন করতে না পারায় আপাতত নিজেদের অর্থ দিয়েই ব্যয় সামলাচ্ছেন ফেডারেশনের কর্মকর্তারা।
সাধারণ সম্পাদক আলী ইমাম তপনের হিসাব অনুযায়ী, জাতীয় সামার অ্যাথলেটিকস আয়োজন করতে প্রায় ৪০ থেকে ৫০ লাখ টাকা খরচ হয়। এবার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রপতির উপস্থিতিকে কেন্দ্র করে কিছু অতিরিক্ত ব্যয় থাকলেও আয়োজনের পরিসর বাড়িয়ে বাড়তি খরচ করা হচ্ছে না বলে জানিয়েছেন তিনি।
প্রতিযোগিতার আয়োজন, অ্যাথলেটদের সুযোগ-সুবিধা এবং প্রযুক্তিনির্ভর ফলাফল ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে অর্থের প্রয়োজন রয়েছে। ফলে পৃষ্ঠপোষক প্রতিষ্ঠানগুলোর সহায়তা অব্যাহত রাখা এবং অ্যাথলেটিকসের জন্য দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের ব্যবস্থা গড়ে তোলা ফেডারেশনের সামনে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
পাকিস্তান এসএ গেমসেও পদকের লক্ষ্য
জাতীয় সামার অ্যাথলেটিকসের পাশাপাশি সামনের আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা নিয়েও পরিকল্পনা করছে ফেডারেশন। পাকিস্তানে অনুষ্ঠেয় এসএ গেমসকে সামনে রেখে নবগঠিত অ্যাডহক কমিটি স্বর্ণ, রুপা ও ব্রোঞ্জ মিলিয়ে মোট ১০টি পদক জয়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে।
এই লক্ষ্য পূরণে অ্যাথলেটদের প্রস্তুতি, নিয়মিত অনুশীলন এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সুযোগ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। শুধু প্রতিযোগিতার আগে অল্প সময়ের প্রস্তুতি নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি প্রশিক্ষণ ও পরিকল্পিত পরিচর্যার প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরছে ফেডারেশন।
এ জন্য অ্যাথলেটিকসের জন্য আলাদা ভেন্যু এবং দীর্ঘমেয়াদি অনুশীলনের উপযোগী স্থায়ী আবাসন ক্যাম্পের দাবি জানানো হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, প্রশিক্ষণের জন্য নির্দিষ্ট অবকাঠামো ও আবাসিক সুবিধা নিশ্চিত করা গেলে অ্যাথলেটদের নিয়মিত অনুশীলন এবং পারফরম্যান্সের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা সহজ হবে।
হারানো জনপ্রিয়তা ফেরানোর চ্যালেঞ্জ
অ্যাথলেটিকসকে বলা হয় সব খেলার জননী। আশির ও নব্বইয়ের দশকে বাংলাদেশে খেলাটির জনপ্রিয়তা এবং দক্ষিণ এশীয় পর্যায়ে অর্জন ছিল উল্লেখযোগ্য। সময়ের সঙ্গে সেই অবস্থান ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে। অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা, পর্যাপ্ত অনুশীলনের সুযোগ এবং ধারাবাহিক পৃষ্ঠপোষকতার প্রয়োজনীয়তা এখনো আলোচনায় রয়েছে।
এবার জাতীয় সামার অ্যাথলেটিকসে প্রযুক্তিনির্ভর ফলাফল ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ প্রতিযোগিতার স্বচ্ছতা বাড়ানোর একটি পদক্ষেপ। তবে শুধু ফটোফিনিশ প্রযুক্তি ব্যবহার করলেই দেশের অ্যাথলেটিকসের সব সমস্যা দূর হবে না। এর পাশাপাশি উন্নত প্রশিক্ষণ, উপযুক্ত ভেন্যু, আর্থিক সহায়তা এবং আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণের সুযোগ বাড়ানো জরুরি।
প্রযুক্তির এই উদ্যোগ ফলাফল নিয়ে বিতর্ক কমাতে কতটা কার্যকর হয়, তা দেখা যাবে প্রতিযোগিতার ট্র্যাকে। আর দীর্ঘমেয়াদে অ্যাথলেটিকসের হারানো জনপ্রিয়তা ও সাফল্য ফিরিয়ে আনতে হলে এই আয়োজনের পাশাপাশি প্রয়োজন ধারাবাহিক উন্নয়ন পরিকল্পনা এবং তার বাস্তবায়ন।
কালের আলো/এসএ/এমএএইচ

আপনার মতামত লিখুন
[gs-fb-comments]