একটি বীজেই ১ হাজার ৪৩১ কেজির কুমড়া, বিশ্বরেকর্ড কৃষকের
একটি ছোট্ট বীজ থেকে জন্ম নেওয়া কুমড়ার ওজন ১ হাজার ৪৩১ কেজি! শুনতে অবিশ্বাস্য মনে হলেও যুক্তরাষ্ট্রের কৃষক রন ওয়ালেসের হাত ধরে বাস্তবেই ঘটেছে এমন ঘটনা। প্রায় ছয় মাসের যত্ন, উন্নত বীজ আর নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে চাষ করে বিশালাকার কুমড়া ফলিয়েছেন তিনি। সেই কুমড়ার ওজন ছাড়িয়ে গেছে ৩ হাজার পাউন্ডের সীমাও। এর মধ্য দিয়ে সবচেয়ে ভারী কুমড়া ফলানোর বিশ্বরেকর্ড গড়েছেন এই কৃষক।
২০২৬ সালের ১০ অক্টোবর কুমড়াটির ওজন মাপা হয় ৩ হাজার ১৫৬ পাউন্ড, যা প্রায় ১ হাজার ৪৩১ কেজির সমান। এর আগে কোনো কুমড়ার ওজন ৩ হাজার পাউন্ডের সীমা অতিক্রম করেনি। গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসের স্বীকৃতিতে তাই নতুন ইতিহাসের অংশ হয়ে গেছেন রন ওয়ালেস।
ছয় মাসের পরিচর্যায় বীজ থেকে দানবাকৃতি কুমড়া
যুক্তরাষ্ট্রের রোড আইল্যান্ডের গ্রিন এলাকায় নিজের গ্রিনহাউসে গত ১৫ এপ্রিল কুমড়ার বীজ বুনেছিলেন ওয়ালেস। এরপর শুরু হয় নিয়মিত পরিচর্যা। পানি, তাপমাত্রা ও চাষের পরিবেশ নিয়ন্ত্রণ করে তিনি কুমড়াটিকে বড় করে তোলেন। প্রায় ছয় মাস পর সেই ছোট্ট বীজ থেকেই জন্ম নেয় রেকর্ড গড়া কুমড়া।
১০ অক্টোবর ওয়ারেন শহরের ফ্রেরিকস ফার্মে অনুষ্ঠিত সাউদার্ন নিউ ইংল্যান্ড জায়ান্ট পাম্পকিন গ্রোয়ার্স প্রতিযোগিতায় কুমড়াটির ওজন নির্ধারণ করা হয়। বিশালাকার কুমড়া চাষিদের এই প্রতিযোগিতায় ওয়ালেসের সাফল্য উপস্থিত দর্শকদেরও বিস্মিত করে।
এক সপ্তাহেই ভাঙল বিশ্বরেকর্ড
বিশাল কুমড়া চাষে বিশ্বরেকর্ডের লড়াইয়ে এবার সময়ের ব্যবধান ছিল খুবই কম। ৩ অক্টোবর যুক্তরাজ্যের কৃষক ইয়ান প্যাটন ২ হাজার ৮৫৭ পাউন্ড ওজনের কুমড়া ফলিয়ে বিশ্বরেকর্ড গড়েছিলেন। কিন্তু মাত্র এক সপ্তাহ পরই সেই রেকর্ড ছাড়িয়ে যান ওয়ালেস।
তার কুমড়াটি আগের রেকর্ডের চেয়ে প্রায় ৩০০ পাউন্ড বেশি ভারী। এত অল্প সময়ের ব্যবধানে দুবার বিশ্বরেকর্ড ভাঙার ঘটনা বিশালাকার কুমড়া চাষের প্রতিযোগিতায় নতুন উত্তেজনা তৈরি করেছে।
দিনে বাড়ছিল ২৭ কেজিরও বেশি ওজন
এত বিশাল কুমড়া ফলানো কেবল ভাগ্যের বিষয় নয়। এর পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা, উন্নত জিনগত বৈশিষ্ট্যের বীজ এবং বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে পরিচর্যা। এ বছর গ্রিনহাউসে চাষ করায় পানি ও তাপমাত্রার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো নিয়ন্ত্রণ করতে পেরেছিলেন ওয়ালেস।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, কুমড়াটির বৃদ্ধির সর্বোচ্চ পর্যায়ে প্রতিদিন প্রায় ৬০ পাউন্ড বা ২৭ কেজিরও বেশি ওজন বাড়ছিল। কোনো কোনো সপ্তাহে ওজন বেড়েছিল প্রায় ৫০০ পাউন্ড। অর্থাৎ, প্রতিদিনের সামান্য বৃদ্ধি জমতে জমতে একসময় কুমড়াটি পরিণত হয় বিশাল এক ফসলে।
উন্নত বীজের পাশাপাশি গ্রিনহাউসের পরিবেশ নিয়ন্ত্রণকেও গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন ওয়ালেস। বিশালাকার কুমড়া চাষের প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়া কৃষকেরা নিজেদের অভিজ্ঞতা ও কৌশল পরস্পরের সঙ্গে ভাগ করে নেন। ওয়ালেসের সঙ্গে তার প্রতিদ্বন্দ্বী ইয়ান প্যাটনেরও নিয়মিত যোগাযোগ রয়েছে। মজার বিষয় হলো, গ্রিনহাউসে কুমড়া চাষের পরামর্শ প্রথম প্যাটনই তাকে দিয়েছিলেন।
কুমড়া পরিবহনেও ছিল বিশেষ আয়োজন
এত ওজনের কুমড়া চাষ করাই যেমন কঠিন, তেমনি সেটিকে নিরাপদে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় নেওয়াও বড় চ্যালেঞ্জ। মাটি থেকে তুলতে ব্যবহার করা হয় বিশেষ হারনেস ও শক্ত দড়ি। পরিবহনের সময় যাতে কুমড়ার গায়ে আঘাত না লাগে, সে জন্য ভেজা চাদর, কম্বল ও প্লাস্টিকের আবরণে মুড়িয়ে বিশেষ প্যালেটে রাখা হয়। পরে ফ্ল্যাটবেড ট্রাকে করে সেটি প্রতিযোগিতাস্থলে নেওয়া হয়।
প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়েছিল প্রায় ২০টি বিশালাকার কুমড়া। নিজের কুমড়াটিকে অন্যগুলোর তুলনায় অনেক বড় দেখে ওয়ালেসের ধারণা হয়েছিল, এর ওজন ৩ হাজার পাউন্ড ছাড়াতে পারে। তবে ওজন মাপার আগে সঠিক পরিমাণটি তারও জানা ছিল না। যন্ত্রে ওজন ওঠার পর রেকর্ড নিশ্চিত হলে প্রতিযোগিতাস্থলে উপস্থিত দর্শকদের মধ্যে উচ্ছ্বাস ছড়িয়ে পড়ে।
এর আগেও একাধিকবার ইতিহাস গড়েছেন ওয়ালেস
বিশালাকার কুমড়া চাষে ওয়ালেসের সাফল্য এবারই প্রথম নয়। ২০০৬ সালে তিনি ১ হাজার ৫০২ পাউন্ড ওজনের কুমড়া ফলিয়ে প্রথমবারের মতো ১ হাজার ৫০০ পাউন্ডের সীমা অতিক্রম করেন। ২০১২ সালে তার ফলানো ২ হাজার ৯ পাউন্ডের কুমড়াও নতুন ইতিহাস গড়েছিল। এবার ৩ হাজার পাউন্ডের গণ্ডি পেরিয়ে নিজের সাফল্যকে নিয়ে গেলেন আরও উঁচুতে।
রেকর্ড গড়া কুমড়াটিকে বিভিন্ন উৎসবে প্রদর্শনের পরিকল্পনা রয়েছে। পরে সেটিকে বিশালাকার জ্যাক-ও-ল্যান্টার্নে রূপ দেওয়ার কথাও ভাবা হচ্ছে। প্রদর্শনী শেষে কুমড়াটি কম্পোস্ট হিসেবে ব্যবহার করা হতে পারে। তবে এর বীজ সংরক্ষণ করবেন ওয়ালেস। বিশ্বের বিভিন্ন কুমড়া চাষিদের সংগঠনকে সেই বীজ দেওয়া হবে, যাতে নিলামের মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহ করা যায়।
আগামী বছর বিরতিতে থাকতে পারেন
একটি কুমড়া কতটা বড় হতে পারে, তার কোনো নির্দিষ্ট সীমা আছে কি না, তা নিয়ে নিশ্চিত নন ওয়ালেস। আপাতত আগামী বছর প্রতিযোগিতা থেকে বিরতি নেওয়ার পরিকল্পনা করেছেন তিনি। এ সময় অন্য কৃষকেরা তার রেকর্ড ভাঙার চেষ্টা করবেন। কেউ সফল হলে আবার প্রতিযোগিতায় ফেরার কথা ভাববেন এই কৃষক।
ছোট্ট একটি বীজ থেকে দেড় টনের কাছাকাছি ওজনের কুমড়া—ওয়ালেসের এই অর্জন কৃষিতে ধৈর্য, অভিজ্ঞতা ও প্রযুক্তির সম্ভাবনাকেই তুলে ধরে। এখন দেখার বিষয়, ৩ হাজার ১৫৬ পাউন্ডের এই রেকর্ড কত দিন অক্ষত থাকে, আর ভবিষ্যতে কোনো কৃষক কি না কুমড়ার ওজনকে আরও নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে পারেন।
কালের আলো/এমএসআইপি/জেএন

আপনার মতামত লিখুন
[gs-fb-comments]