ডি-থ্রি ট্রফি: নিলাম শেষে কোন দল কতটা শক্তিশালী?
নিলাম হয়েছে, উঠেছে ক্রিকেটারদের নাম, হয়েছে দরকষাকষিও—তবে কোথাও উচ্চারিত হয়নি টাকার অঙ্ক। বাংলাদেশের ঘরোয়া ক্রিকেটে নতুন সংযোজন ডমেস্টিক থ্রি (ডি-থ্রি) ট্রফির খেলোয়াড় নিলাম ছিল এমনই ব্যতিক্রমী। এখানে ক্রিকেটারদের দলে নিতে ছয়টি ফ্র্যাঞ্চাইজি লড়েছে টাকার বদলে পয়েন্ট নিয়ে। নিলাম শেষে দল গঠনের হিসাবে ফরচুন ও সিটিজেনস ব্যাংককে বেশ ভারসাম্যপূর্ণ মনে হলেও পিছিয়ে নেই ওয়ালটন ও একমিও।
রাজধানীর একটি পাঁচ তারকা হোটেলে অনুষ্ঠিত এই নিলামে সঞ্চালকের দায়িত্ব পালন করেন ভারতের পরিচিত নিলাম সঞ্চালক চারু শর্মা। প্রচলিত ফ্র্যাঞ্চাইজি নিলামের আবহ থাকলেও এখানে খেলোয়াড় কেনাবেচার জন্য ব্যবহৃত হয়েছে কাল্পনিক পয়েন্ট। প্রতিটি দলের জন্য বরাদ্দ ছিল ১০ কোটি পয়েন্ট।
১০ কোটি পয়েন্টে দল গড়ার চ্যালেঞ্জ
ডি-থ্রি ট্রফিতে খেলোয়াড়দের পারিশ্রমিক নির্ধারণের প্রচলিত পদ্ধতির বদলে দল গঠনের জন্য পয়েন্টভিত্তিক নিলামের আয়োজন করেছে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি)। খেলোয়াড়দের আয় হবে ম্যাচ ফি থেকে। এদিকে নিলামে প্রতিটি দলকে ২২ জন করে ক্রিকেটার নিতে হয়েছে। ছয়টি দলের জন্য মোট ১৩২ জন ক্রিকেটার নিলাম থেকে দল পেয়েছেন। এর বাইরে ছয়জন আইকন ক্রিকেটারকে আগেই দলে নিয়েছে ফ্র্যাঞ্চাইজিগুলো।
নিলামে ক্রিকেটারদের পাঁচটি শ্রেণিতে ভাগ করা হয়েছিল। ‘এ’ শ্রেণির ভিত্তিমূল্য ছিল ৪০ লাখ পয়েন্ট, ‘বি’ শ্রেণির ৩০ লাখ, ‘সি’ শ্রেণির ২০ লাখ, ‘ডি’ শ্রেণির ১০ লাখ এবং ‘ই’ শ্রেণির ৫ লাখ পয়েন্ট। তবে ভিত্তিমূল্যের চেয়ে বেশি পয়েন্টে ক্রিকেটারদের দলে নেওয়ার প্রতিযোগিতা নিলামকে জমিয়ে তোলে।
শরীফুল, তাসকিন ও তানজিদকে নিয়ে লড়াই
নিলামের সবচেয়ে আলোচিত নামগুলোর মধ্যে ছিলেন জাতীয় দলের পেসার শরীফুল ইসলাম, তাসকিন আহমেদ ও ব্যাটার তানজিদ হাসান। সর্বোচ্চ ২ কোটি ৩০ লাখ পয়েন্টে শরীফুলকে দলে নেয় সিটিজেনস ব্যাংক। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ২ কোটি ১০ লাখ পয়েন্টে তাসকিনকে নিয়েছে ওয়ালটন। আর ২ কোটি পয়েন্টে তানজিদকে দলে ভিড়িয়েছে ফরচুন।
এ ছাড়া ১ কোটি ৯৫ লাখ পয়েন্টে হাসান মাহমুদকে নিয়েছে ব্লুস্টার। একই পয়েন্টে সাইফ হাসানকে দলে নিয়েছে সেভেন রিংস সিমেন্ট। নিলামের এই দরগুলো থেকেই বোঝা গেছে, কোন ক্রিকেটারকে ঘিরে দলগুলোর আগ্রহ কতটা বেশি।
কোন দলের স্কোয়াড কেমন?
ফরচুন গ্রুপ: আইকন ক্রিকেটার তাওহীদ হৃদয়ের সঙ্গে দলটিতে রয়েছেন রিশাদ হোসেন, সৌম্য সরকার, নাজমুল হোসেন, তানজিদ হাসান, সাব্বির রহমান ও মোহাম্মদ সাইফউদ্দিনের মতো ক্রিকেটার। ব্যাটিং, স্পিন ও পেস—তিন বিভাগেই বিকল্প থাকায় দলটিকে ভারসাম্যপূর্ণ মনে হচ্ছে।
ওয়ালটন গ্রুপ: মেহেদী হাসান মিরাজের সঙ্গে রয়েছেন মুমিনুল হক, লিটন দাস, তাসকিন আহমেদ, নাসুম আহমেদ ও নাহিদুল ইসলামের মতো ক্রিকেটার। অভিজ্ঞ ব্যাটার, অলরাউন্ডার ও পেসারদের সমন্বয়ে দলটি প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হওয়ার সম্ভাবনা রাখে।
ব্লুস্টার: আইকন নুরুল হাসানের সঙ্গে দলটিতে আছেন শেখ মেহেদী হাসান, হাসান মাহমুদ, নাহিদ রানা, এনামুল হক বিজয় ও আফিফ হোসেন। বোলিং আক্রমণে গতি ও বৈচিত্র্য যোগ করার মতো ক্রিকেটার থাকায় দলটি নজর কাড়তে পারে।
সেভেন রিংস সিমেন্ট: মুশফিকুর রহিমের সঙ্গে তাইজুল ইসলাম, মোস্তাফিজুর রহমান, খালেদ আহমেদ, সাদমান ইসলাম, জাকির হাসান ও শামীম হোসেনের মতো ক্রিকেটার রয়েছেন। অভিজ্ঞতা ও বোলিংয়ের বৈচিত্র্য দলটির বড় শক্তি হতে পারে।
একমি গ্রুপ: আইকন মোসাদ্দেক হোসেনের সঙ্গে রয়েছেন নাঈম হাসান, আলিস আল ইসলাম, মাহমুদউল্লাহ, পারভেজ হোসেন, শাহাদাত হোসেন ও রাকিবুল হাসানের মতো ক্রিকেটার। অভিজ্ঞতার সঙ্গে তরুণদের সমন্বয় দলটির পারফরম্যান্সে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
সিটিজেনস ব্যাংক: আইকন মোহাম্মদ নাঈম শেখের সঙ্গে রয়েছেন শরীফুল ইসলাম, সাইফ হাসান, জাকের আলি, হাসান মুরাদ ও ইয়াসির আলীর মতো ক্রিকেটার। নিলামে সর্বোচ্চ পয়েন্টে শরীফুলকে নেওয়ার পাশাপাশি ব্যাটিং ও বোলিংয়ে একাধিক বিকল্প পেয়েছে দলটি।
ম্যাচ ফির নতুন কাঠামো
ডি-থ্রি ট্রফিকে ঘিরে ঘরোয়া ক্রিকেটে ক্রিকেটারদের আয় বাড়ানোর উদ্যোগও নিয়েছে বিসিবি। ঘোষিত নতুন কাঠামো অনুযায়ী, চার দিনের ম্যাচে ম্যাচ ফি ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা, ৫০ ওভারের ম্যাচে ১ লাখ টাকা এবং টি-টোয়েন্টিতে ৮০ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।
আইকন ক্রিকেটারসহ প্রতিটি দলে ২৩ জন থাকলেও বিসিবি স্কোয়াডের ১৫ জনের ম্যাচ ফি ও অন্যান্য খরচ বহন করবে। ১৫ জনের বেশি ক্রিকেটার রাখলে অতিরিক্ত সদস্যদের খরচ সংশ্লিষ্ট ফ্র্যাঞ্চাইজিকে বহন করতে হবে।
দল পেয়েছেন কারা, বাদ পড়েছেন কারা?
নিলামে ২৭৫ জন ক্রিকেটারকে তোলা হয়েছিল। তাঁদের মধ্যে ১৩২ জন ছয়টি দলের স্কোয়াডে জায়গা পেয়েছেন। আইকন হিসেবে আগেই দল পাওয়া ছয়জনকে যুক্ত করলে মোট ১৩৮ জন ক্রিকেটার দল পেয়েছেন।
অন্যদিকে, ‘ই’ শ্রেণির অনেক ক্রিকেটারই দল পাননি। উল্লেখযোগ্যদের মধ্যে রয়েছেন নাসির হোসেন, আলাউদ্দিন বাবু, আশিকুর রহমান শিবলী, সোহাগ গাজী ও সালাউদ্দিন শাকিল।
সব মিলিয়ে ডি-থ্রি ট্রফির নিলাম শুধু ক্রিকেটারদের দল পাওয়ার প্রতিযোগিতা ছিল না; বরং সীমিত পয়েন্টে কীভাবে কার্যকর স্কোয়াড গঠন করা যায়, সেটিও ছিল দলগুলোর জন্য বড় পরীক্ষা। কাগজে-কলমে ফরচুন, সিটিজেনস ব্যাংক ও ওয়ালটনকে শক্তিশালী মনে হলেও মাঠের পারফরম্যান্সই শেষ পর্যন্ত নির্ধারণ করবে কোন দল এগিয়ে থাকবে।
কালের আলো/এএএন/জেএন
আপনার মতামত লিখুন
[gs-fb-comments]