বেসামরিক চাকরির নামে রুশ সেনাবাহিনীতে বাংলাদেশিরা
বেসামরিক চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে বাংলাদেশি শ্রমিকদের রাশিয়ায় নিয়ে গিয়ে ইউক্রেন যুদ্ধে অংশ নিতে বাধ্য করার অভিযোগ উঠেছে। যুদ্ধে যেতে অস্বীকৃতি জানালে নির্যাতন, কারাদণ্ড এমনকি মৃত্যুর হুমকিও দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন রুশ সেনাবাহিনী থেকে পালিয়ে আসা বাংলাদেশিরা। মার্কিন বার্তা সংস্থা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের (এপি) এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চাকরির আশায় রাশিয়ায় যাওয়া কয়েকজন বাংলাদেশিকে সামরিক চুক্তিতে স্বাক্ষর করিয়ে প্রশিক্ষণ শিবিরে নিয়ে যাওয়া হয়। পরে তাঁদের যুদ্ধক্ষেত্রে বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ দায়িত্ব পালনে বাধ্য করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
এপির প্রতিবেদনে রুশ সেনাবাহিনী থেকে পালিয়ে আসা তিন বাংলাদেশির সাক্ষাৎকারের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁদের একজন লক্ষ্মীপুরের মাকসুদুর রহমান। মাকসুদুরের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি পরিচ্ছন্নতাকর্মীর চাকরির আশায় রাশিয়ায় গিয়েছিলেন। কিন্তু মস্কোতে পৌঁছানোর পর তাঁকে এবং তাঁর সঙ্গে থাকা একদল বাংলাদেশি শ্রমিককে কিছু নথিতে স্বাক্ষর করানো হয়। পরে তাঁরা জানতে পারেন, নথিগুলো ছিল সামরিক চুক্তি। এরপর তাঁদের একটি সামরিক প্রশিক্ষণ শিবিরে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে ড্রোন পরিচালনা, আহত ব্যক্তিদের সরিয়ে নেওয়া এবং ভারী অস্ত্র ব্যবহারের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয় বলে জানান মাকসুদুর।
তিনি অভিযোগ করেন, শুরুতে সামরিক কাজে যোগ দিতে রাজি হননি। তখন এক রুশ কমান্ডার অনুবাদ অ্যাপ ব্যবহার করে তাঁদের বলেন, ‘তোমাদের এজেন্টই এখানে পাঠিয়েছে। আমরা তোমাদের কিনেছি।’ মাকসুদুর রহমানের অভিযোগ, সামরিক দায়িত্ব পালনে অস্বীকৃতি জানালে তাঁকে এবং তাঁর দলের অন্য কর্মীদের মারধর ও ১০ বছরের কারাদণ্ডের হুমকি দেওয়া হয়েছিল। তিনি জানান, রুশ সেনারা তাঁদের কাজ করতে চাপ দিতেন। কাজ করতে না চাইলে গালাগাল ও শারীরিক নির্যাতনের শিকার হতে হতো। প্রায় সাত মাস পর তিনি পালিয়ে দেশে ফিরতে সক্ষম হন। এপিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে রুশ সেনাবাহিনী থেকে পালিয়ে আসা অন্য দুই বাংলাদেশিও তাঁদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে যুদ্ধসংক্রান্ত দায়িত্ব পালনে বাধ্য করার অভিযোগ করেছেন। প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশিদের রুশ বাহিনীর সম্মুখসারিতে এগিয়ে যেতে বলা হতো বলে অভিযোগ করেছেন সাক্ষাৎকারদাতারা। এ ছাড়া রসদ পরিবহন, আহত সেনাদের সরিয়ে নেওয়া এবং নিহতদের মরদেহ উদ্ধারের মতো ঝুঁকিপূর্ণ কাজও তাঁদের করতে হতো বলে তাঁরা জানিয়েছেন।
যুদ্ধক্ষেত্রে এসব দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে তাঁদের জীবন ঝুঁকির মধ্যে পড়েছিল বলে বর্ণনা দিয়েছেন ভুক্তভোগীরা। এদিকে, নিখোঁজ আরও তিন বাংলাদেশির পরিবারের সদস্যরাও একই ধরনের পরিস্থিতির কথা জানিয়েছেন বলে এপির প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে ঠিক কতজন বাংলাদেশিকে এভাবে রাশিয়ার হয়ে যুদ্ধে অংশ নিতে বাধ্য করা হয়েছে, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
সাক্ষাৎকার দেওয়া তিন বাংলাদেশি এপিকে জানিয়েছেন, ইউক্রেনে রুশ বাহিনীর সঙ্গে তাঁরা শত শত বাংলাদেশিকে দেখেছেন। তাঁদের বক্তব্য অনুযায়ী, শুধু বাংলাদেশি নয়, ভারত ও নেপালসহ দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশ এবং আফ্রিকার কয়েকটি দেশের নাগরিকদেরও একইভাবে যুদ্ধে যুক্ত করা হয়েছে। তবে যুদ্ধক্ষেত্রে বাংলাদেশিদের প্রকৃত সংখ্যা এবং তাঁদের কতজনকে প্রতারণার মাধ্যমে নিয়োগ করা হয়েছে, সে বিষয়ে প্রতিবেদনে নিশ্চিত কোনো পরিসংখ্যান দেওয়া হয়নি।
এপি জানিয়েছে, ভুক্তভোগীদের বক্তব্য যাচাইয়ের জন্য তারা ভ্রমণসংক্রান্ত নথি, রুশ সামরিক চুক্তি, চিকিৎসা ও পুলিশ প্রতিবেদন এবং যুদ্ধক্ষেত্রের ছবি সংগ্রহ করেছে। এসব উপাদানের ভিত্তিতে বাংলাদেশি শ্রমিকদের কীভাবে সামরিক কার্যক্রমে যুক্ত করা হয়েছে, সে বিষয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে সংবাদ সংস্থাটি।
তবে প্রতিবেদনে উত্থাপিত অভিযোগের বিষয়ে রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কিংবা বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছে এপি। চাকরির আশায় বিদেশে যাওয়া বাংলাদেশিদের সামরিক কাজে যুক্ত করার এমন অভিযোগ অভিবাসনপ্রত্যাশীদের নিরাপত্তা ও বিদেশে কর্মসংস্থানের নামে প্রতারণার ঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগ তৈরি করেছে। বিশেষ করে বিদেশে চাকরির প্রস্তাব গ্রহণের আগে নিয়োগদাতা, কাজের ধরন, চুক্তিপত্র এবং ভিসার বৈধতা যাচাইয়ের গুরুত্ব আবারও সামনে এসেছে।
সূত্র; অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস (এপি), সরবরাহ করা প্রতিবেদনের ভিত্তিতে
কালের আলো/এএইচ/এমএসআইপি
আপনার মতামত লিখুন
[gs-fb-comments]