খুঁজুন
                               
, ,
           

৬৩৫ কোটি ডলারের বিনিয়োগ, বাংলাদেশের শিল্পের নতুন মানচিত্র আঁকছে জাপান

কূটনৈতিক প্রতিবেদক, কালের আলো
প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর, ২০২৬, ৩:৩১ অপরাহ্ণ
৬৩৫ কোটি ডলারের বিনিয়োগ, বাংলাদেশের শিল্পের নতুন মানচিত্র আঁকছে জাপান

মাত্র পাঁচ বছরে ৬৩৫ কোটি ডলার—বাংলাদেশের শিল্প অর্থনীতিতে জাপানের প্রস্তাবিত বিনিয়োগ পরিকল্পনার ব্যাপ্তি তুলে ধরছে এই অঙ্ক। জাপানি মুদ্রায় যার পরিমাণ প্রায় এক ট্রিলিয়ন ইয়েন। অটোমোবাইল, জ্বালানি, প্রযুক্তি, কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ ও শিল্প উৎপাদনসহ বিভিন্ন খাতে এ বেসরকারি বিনিয়োগের পরিকল্পনা ঘিরে প্রায় দুই লাখ কর্মসংস্থানের প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে। অর্থাৎ, উদ্যোগটি বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের উৎপাদন সক্ষমতা সম্প্রসারণের পাশাপাশি কর্মসংস্থান ও রপ্তানি বৃদ্ধিতেও বড় ভূমিকা রাখার সুযোগ তৈরি হবে।

  • দুই লাখ কর্মসংস্থানের প্রত্যাশা, অটোমোবাইল, প্রযুক্তি ও বন্দরকেন্দ্রিক শিল্পে অর্থনীতির নতুন সম্ভাবনা
  • দেশীয় উদ্যোক্তা, দক্ষ জনশক্তি ও রপ্তানিতে বাড়তে পারে নতুন গতি
  • বিশ্ববাজারে ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ প্রতিষ্ঠার হাতছানি

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের টোকিও সফরকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশ-জাপান অর্থনৈতিক সহযোগিতা নতুন গতি পেয়েছে। দীর্ঘদিনের অবকাঠামোগত অংশীদারত্বের সঙ্গে এবার যুক্ত হচ্ছে শিল্প উৎপাদন, আধুনিক প্রযুক্তি ও রপ্তানিমুখী বিনিয়োগের বিস্তৃত পরিকল্পনা। এর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের সামনে শুধু নতুন কারখানা স্থাপনের সুযোগ নয়, বরং আন্তর্জাতিক উৎপাদনব্যবস্থায় আরও শক্ত অবস্থান তৈরির সম্ভাবনাও দেখা দিয়েছে।

এই পরিকল্পনার বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে তিনটি ক্ষেত্রে—দেশে নতুন শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা, স্থানীয় উদ্যোক্তাদের আন্তর্জাতিক উৎপাদন ও সরবরাহব্যবস্থায় যুক্ত করা এবং দক্ষ জনশক্তির জন্য কর্মসংস্থানের পরিসর বাড়ানো। জাপানের প্রযুক্তি ও শিল্প ব্যবস্থাপনার অভিজ্ঞতার সঙ্গে বাংলাদেশের শ্রমশক্তি ও উদ্যোক্তা সক্ষমতার সমন্বয় ঘটানো গেলে বিনিয়োগের প্রভাব বিভিন্ন খাতে ছড়িয়ে পড়তে পারে।

শিল্প অর্থনীতিতে কী বদলাতে পারে?
আগামী পাঁচ বছরের ৬৩৫ কোটি ডলারের বিনিয়োগ পরিকল্পনা বাংলাদেশের জন্য বহুমুখী শিল্পায়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ। অটোমোবাইল উৎপাদন, জ্বালানি অবকাঠামো, প্রযুক্তি, রেল ও লজিস্টিকস এবং কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণে বিনিয়োগ সম্প্রসারিত হলে অর্থনীতির বিভিন্ন খাতে নতুন উৎপাদন ও ব্যবসায়িক কার্যক্রম গড়ে ওঠার সম্ভাবনা রয়েছে। এ বিনিয়োগের সম্ভাব্য প্রভাব কেবল সরাসরি কারখানা স্থাপনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত যন্ত্রাংশ উৎপাদন, কাঁচামাল সরবরাহ, পরিবহণ, গুদামজাতকরণ, রক্ষণাবেক্ষণ, প্রকৌশল সেবা ও বিপণনের মতো কার্যক্রমেও নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে।

পাশাপাশি স্থানীয় উদ্যোক্তারা আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের সরবরাহকারী হিসেবে যুক্ত হওয়ার সুযোগ পেতে পারেন। পরিকল্পনার সঙ্গে প্রায় দুই লাখ কর্মসংস্থানের প্রত্যাশা যুক্ত থাকায় দক্ষ জনশক্তি তৈরির বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। শিল্পভিত্তিক কারিগরি প্রশিক্ষণ, আধুনিক যন্ত্র পরিচালনা, মাননিয়ন্ত্রণ এবং প্রযুক্তিগত দক্ষতা বাড়ানো গেলে বাংলাদেশের তরুণেরা নতুন শিল্পপ্রতিষ্ঠানে কাজের জন্য আরও ভালোভাবে প্রস্তুত হতে পারবেন।

টয়োটার গাড়ি উৎপাদন, দেশীয় শিল্পের বিস্তৃত নেটওয়ার্ক
জাপানি বিনিয়োগের সম্ভাব্য ক্ষেত্রগুলোর মধ্যে অটোমোবাইল শিল্প বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। বিশ্বখ্যাত গাড়ি নির্মাতা টয়োটা বাংলাদেশে উৎপাদন কার্যক্রম গড়ে তোলার পরিকল্পনার কথা সরকারকে জানিয়েছে। জাতীয় বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে হাইব্রিড ও বৈদ্যুতিক গাড়ি উৎপাদনকেন্দ্র স্থাপনের উদ্যোগ রয়েছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২৭ সালে উন্নয়নকাজ শুরু করে ২০২৯ সালের মধ্যে পূর্ণ উৎপাদনে যাওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে কারখানাটির চূড়ান্ত বিনিয়োগের পরিমাণ, উৎপাদনক্ষমতা ও নির্দিষ্ট মডেলের বিষয়ে বিস্তারিত এখনো পুরোপুরি নিশ্চিত হয়নি।

অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আবু আহমেদের মতে, টয়োটার মতো আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের বিনিয়োগ বাংলাদেশে গাড়ি উৎপাদনের পাশাপাশি সহযোগী শিল্প গড়ে ওঠার সুযোগ তৈরি করতে পারে। একটি গাড়ি তৈরিতে প্রায় ৩ হাজার ৩০০ ধরনের যন্ত্রাংশ প্রয়োজন হয়। এসব যন্ত্রাংশের একটি অংশ দেশে উৎপাদনের সক্ষমতা তৈরি হলে স্থানীয় উদ্যোক্তাদের জন্য নতুন বাজার সৃষ্টি হবে।

গাড়ি সংযোজনের পাশাপাশি যন্ত্রাংশ, ব্যাটারি, বৈদ্যুতিক মোটর, ইলেকট্রনিকস ও প্রকৌশল সেবায় দেশীয় প্রতিষ্ঠান যুক্ত হতে পারলে শিল্পটির অর্থনৈতিক প্রভাব আরও বিস্তৃত হবে। জাপানি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে কাজের মাধ্যমে বাংলাদেশের উদ্যোক্তা ও প্রকৌশলীরা উন্নত প্রযুক্তি এবং আন্তর্জাতিক মাননিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি সম্পর্কে অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগ পাবেন।

জাপানের বৈদেশিক বাণিজ্য সংস্থা জেট্রোর বাংলাদেশ প্রতিনিধি কাজুইকি কাতাওকার তথ্য অনুযায়ী, টয়োটা সুসো করপোরেশন ঢাকা ও চট্টগ্রামে বিক্রয়, সার্ভিস এবং খুচরা যন্ত্রাংশের দুটি কেন্দ্রে প্রায় চার কোটি ডলার বিনিয়োগের পরিকল্পনা করেছে। এসব কেন্দ্রের নির্মাণকাজ নভেম্বর মাসে শুরু হওয়ার কথা বলে সংশ্লিষ্ট তথ্যে উল্লেখ করা হয়েছে। গাড়ি উৎপাদন ও যন্ত্রাংশ তৈরিতে স্থানীয় সক্ষমতা বাড়ানো গেলে দীর্ঘ মেয়াদে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদা পূরণের পাশাপাশি রপ্তানির সুযোগও তৈরি হতে পারে। এতে ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ ব্র্যান্ডের আওতায় উচ্চমূল্য সংযোজনকারী শিল্পপণ্যের পরিসর বাড়ানোর সম্ভাবনা রয়েছে।

শিল্প বিনিয়োগের ভৌগোলিক বিস্তার মাতারবাড়ী থেকে আড়াইহাজার
জাপানি বিনিয়োগ পরিকল্পনার সঙ্গে বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ও অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোর সংযোগ রয়েছে। কক্সবাজারের মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর এবং নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজারে বাংলাদেশ স্পেশাল ইকোনমিক জোন এ ক্ষেত্রে বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে।

জাপানের উন্নয়ন সহযোগিতা সংস্থা জাইকার সহায়তায় এগিয়ে চলা মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর চালু হলে বড় জাহাজে পণ্য পরিবহণ, আমদানি-রপ্তানি সক্ষমতা এবং শিল্পের কাঁচামাল সরবরাহে সুযোগ বাড়তে পারে। বন্দরের সঙ্গে সড়ক ও রেল যোগাযোগ, জ্বালানি সরবরাহ এবং শিল্পাঞ্চলের কার্যকর সংযোগ নিশ্চিত করা গেলে সেখানে বন্দরকেন্দ্রিক শিল্প, গুদামজাতকরণ ও লজিস্টিকস কার্যক্রম বিকাশের সুযোগ তৈরি হবে।

বাংলাদেশ ও জাপান বঙ্গোপসাগরীয় শিল্প প্রবৃদ্ধি বলয় বা বিগ-বি উদ্যোগকে ‘বিগ-বি ফর শেয়ার্ড প্রসপারিটি’ হিসেবে সম্প্রসারণের বিষয়ে একমত হয়েছে। মাতারবাড়ী-মহেশখালী এলাকাকে বন্দর, জ্বালানি, শিল্প ও পণ্য পরিবহণের সমন্বিত কেন্দ্রে পরিণত করার লক্ষ্য এ উদ্যোগের অর্থনৈতিক গুরুত্ব বাড়িয়েছে।

অন্যদিকে, জাপানের সুমিতোমো করপোরেশনের উদ্যোগে নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজারে গড়ে উঠছে বাংলাদেশ স্পেশাল ইকোনমিক জোন। এখানে অটোমোবাইলের পাশাপাশি ইলেকট্রনিকস, হালকা প্রকৌশল, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ ও অন্যান্য উৎপাদনশিল্প স্থাপনের সুযোগ রয়েছে। একাধিক শিল্পপ্রতিষ্ঠান একই অর্থনৈতিক অঞ্চলে কার্যক্রম শুরু করলে স্থানীয় সরবরাহকারী, পরিবহণ সেবা ও সহায়ক শিল্পের বিকাশ ঘটতে পারে।

পাঁচ খাতে বিনিয়োগে বহুমুখী উৎপাদনের সুযোগ
বাংলাদেশ-জাপান অর্থনৈতিক ফোরামে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান পাঁচটি অগ্রাধিকার খাতে বিনিয়োগের আহ্বান জানিয়েছেন। এগুলো হলো অটোমোবাইল ও উৎপাদনশিল্প, জ্বালানি, প্রযুক্তি, রেল ও লজিস্টিকস এবং কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ।

অটোমোবাইল খাতে গাড়ি, যন্ত্রাংশ, ইলেকট্রনিকস ও হালকা প্রকৌশল; জ্বালানি খাতে এলএনজি অবকাঠামো, গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি; প্রযুক্তি খাতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ক্লাউড কম্পিউটিং, রোবোটিকস, ইলেকট্রনিকস ও মহাকাশ প্রযুক্তিতে বিনিয়োগের সুযোগ রয়েছে। আধুনিক রেল যোগাযোগ ও সমন্বিত লজিস্টিকস ব্যবস্থা পণ্য পরিবহণকে আরও কার্যকর করতে পারে। কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণে বিনিয়োগ বাড়লে ফলমূল, শাকসবজি ও অন্যান্য কৃষিপণ্যের মূল্য সংযোজন এবং রপ্তানির সুযোগ সম্প্রসারিত হতে পারে।

প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশ-জাপান প্রযুক্তি পার্ক প্রতিষ্ঠার প্রস্তাবও দিয়েছেন। এ উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে জাপানি প্রতিষ্ঠান, বিশ্ববিদ্যালয় ও বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে বাংলাদেশের তরুণ প্রযুক্তিবিদদের কাজের সুযোগ তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে গবেষণা, উদ্ভাবন ও প্রযুক্তিগত দক্ষতা বৃদ্ধির ক্ষেত্রও সম্প্রসারিত হবে।

ইপিএ চুক্তিতে রপ্তানি সম্প্রসারণের সুযোগ
বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যে ২০২৬ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি স্বাক্ষরিত অর্থনৈতিক অংশীদারি চুক্তি বা ইপিএ দুই দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্ক সম্প্রসারণের নতুন সুযোগ তৈরি করেছে। বাংলাদেশের প্রথম এ ধরনের চুক্তির আওতায় ৭ হাজার ৩৭৯টি পণ্যের জাপানের বাজারে শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকারের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। পাশাপাশি বিনিয়োগ, সেবা বাণিজ্য, ই-কমার্স, মেধাস্বত্ব ও বাণিজ্য সহজীকরণ নিয়েও বিধান রয়েছে।

গত অর্থবছরে বাংলাদেশ জাপানে প্রায় ১৩৬ কোটি ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছে। একই সময়ে জাপান থেকে আমদানি হয়েছে প্রায় ২১৬ কোটি ডলারের পণ্য। উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানো এবং ইপিএর সুবিধা কাজে লাগানোর মাধ্যমে বাংলাদেশের রপ্তানি সম্প্রসারণের সুযোগ রয়েছে।

তৈরি পোশাকের পাশাপাশি চামড়াজাত পণ্য, ওষুধ, কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, হালকা প্রকৌশল ও ইলেকট্রনিকস পণ্যের রপ্তানি বাড়ানো গেলে জাপানের বাজারে বাংলাদেশের উপস্থিতি আরও বিস্তৃত হতে পারে। এ ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখা, পণ্যের বৈচিত্র্য বাড়ানো এবং নিয়মিত সরবরাহ নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ।

বিনিয়োগের সুফল ছড়িয়ে পড়বে দেশীয় শিল্পে
বাংলাদেশে বর্তমানে প্রায় ৩৫০টি জাপানি প্রতিষ্ঠান কার্যক্রম পরিচালনা করছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, দেশে জাপানের প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগের পরিমাণ এখনো ৫০ কোটি ডলারের নিচে। ফলে উৎপাদন, প্রযুক্তি ও রপ্তানিমুখী শিল্পে বিনিয়োগ সম্প্রসারণের যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে।

জাতীয় অধ্যাপক ও অর্থনীতিবিদ ড. মাহবুব উল্লাহর মতে, জাপান ও চীনের মতো গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক অংশীদারদের সঙ্গে সহযোগিতা বাড়ানোর ক্ষেত্রে বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। বিদেশি বিনিয়োগ ও ঋণের ক্ষেত্রে অর্থায়নের পাশাপাশি তার অর্থনৈতিক সুফল নিশ্চিত করাও জরুরি।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো ড. মুস্তাফিজুর রহমানের মতে, বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে সুশাসন, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা, নীতির ধারাবাহিকতা এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

সহজ অনুমোদনপ্রক্রিয়া, পূর্বানুমানযোগ্য শুল্ক ও করনীতি, নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ এবং কার্যকর বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনা বিনিয়োগকারীদের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় সহায়ক হতে পারে। একই সঙ্গে স্থানীয় প্রতিষ্ঠানকে সরবরাহব্যবস্থায় যুক্ত করা, দেশীয় কর্মীদের প্রশিক্ষণ এবং প্রযুক্তি বিনিময়ের সুযোগ বাড়ানো গেলে বিনিয়োগের সুফল দেশের শিল্প অর্থনীতিতে আরও বিস্তৃত হবে।

লক্ষ্য শুধু বিনিয়োগ নয়, উৎপাদন সক্ষমতার বিস্তার
পাঁচ বছরে ৬৩৫ কোটি ডলারের বিনিয়োগ পরিকল্পনা বাংলাদেশের সামনে উৎপাদনভিত্তিক অর্থনীতি সম্প্রসারণের একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ তুলে ধরেছে। এর সঙ্গে যুক্ত প্রায় দুই লাখ কর্মসংস্থানের প্রত্যাশা শিল্পায়ন ও দক্ষ জনশক্তি তৈরির গুরুত্ব আরও বাড়িয়েছে।

গাড়ি উৎপাদন থেকে শুরু করে যন্ত্রাংশ, ইলেকট্রনিকস, জ্বালানি, প্রযুক্তি ও কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ—প্রতিটি খাতে স্থানীয় উদ্যোক্তাদের অংশগ্রহণ বাড়ানো গেলে বিনিয়োগের প্রভাব আরও বিস্তৃত হতে পারে। জাপানি প্রযুক্তি ও বাংলাদেশের জনশক্তির সমন্বয় দেশীয় শিল্পকে আধুনিক উৎপাদনব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করার সুযোগ তৈরি করবে। এই উদ্যোগের দীর্ঘমেয়াদি তাৎপর্য হবে ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ পরিচয়ে আরও বেশি পণ্য উৎপাদন, দেশীয় সরবরাহব্যবস্থার সম্প্রসারণ এবং আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান শক্তিশালী করা। বিনিয়োগের পরিকল্পনাকে উৎপাদন, প্রযুক্তি ও কর্মসংস্থানের বাস্তব সুযোগে রূপ দিতে পারলে জাপানের সঙ্গে অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব বাংলাদেশের শিল্পায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

কালের আলো/এমএসএএকে/এমকে

লিবিয়ায় অপহরণ-নির্যাতনের শিকার, ফিরলেন ১৭২ জন

নিজস্ব প্রতিবেদক, কালের আলো
প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর, ২০২৬, ৩:৩০ অপরাহ্ণ
লিবিয়ায় অপহরণ-নির্যাতনের শিকার, ফিরলেন ১৭২ জন

লিবিয়ায় আটকে পড়া ১৭২ বাংলাদেশিকে দেশে ফিরিয়ে আনা হয়েছে। স্বেচ্ছায় প্রত্যাবাসনে আগ্রহী এসব বাংলাদেশিকে লিবিয়া সরকার, আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (আইওএম) এবং বাংলাদেশ সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর সহযোগিতায় দেশে ফেরানো হয়। তাঁদের অধিকাংশই সমুদ্রপথে অবৈধভাবে ইউরোপে যাওয়ার উদ্দেশ্যে মানবপাচারকারীদের প্ররোচনা ও সহযোগিতায় লিবিয়ায় প্রবেশ করেছিলেন বলে জানা গেছে।

বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, লিবিয়ার মিসরাতা থেকে বুরাক এয়ারের একটি ফ্লাইটে ১৭২ জন অনিয়মিত বাংলাদেশি নাগরিককে দেশে ফিরিয়ে আনা হয়েছে। প্রত্যাবাসিত ব্যক্তিদের বিমানবন্দরে অভ্যর্থনা জানান পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় এবং আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার কর্মকর্তারা।

মানবপাচারকারীদের প্ররোচনায় লিবিয়ায় প্রবেশ
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, দেশে ফেরা বাংলাদেশিদের বেশির ভাগই সমুদ্রপথে অবৈধভাবে ইউরোপে পৌঁছানোর আশায় মানবপাচারকারীদের প্ররোচনা ও সহযোগিতায় লিবিয়ায় গিয়েছিলেন। উন্নত জীবনের প্রত্যাশায় বিদেশে যাওয়ার এই প্রচেষ্টা তাঁদের অনেকের জন্য দুর্ভোগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। প্রত্যাবাসিত ব্যক্তিদের অনেকে লিবিয়ায় বিভিন্ন সময়ে অপহরণ ও নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। তাঁদের অভিজ্ঞতা অনিয়মিত অভিবাসন ও মানবপাচারের ঝুঁকির বিষয়টি আবারও সামনে এনেছে।

ফেরত আসা ব্যক্তিদের অভিজ্ঞতা জানাতে অনুরোধ
মানবপাচার ও অনিয়মিত অভিবাসন সম্পর্কে জনসচেতনতা বাড়াতে দেশে ফেরা ব্যক্তিদের তাঁদের দুর্বিষহ অভিজ্ঞতা অন্যদের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়ার অনুরোধ জানিয়েছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। বিদেশে যাওয়ার ক্ষেত্রে মানবপাচারকারীদের প্রলোভন ও অবৈধ পথে ইউরোপে প্রবেশের ঝুঁকি সম্পর্কে মানুষকে সচেতন করতে তাঁদের অভিজ্ঞতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট উদ্যোগের লক্ষ্য।

ফেরত আসাদের সহায়তা দিচ্ছে আইওএম
প্রত্যাবাসিত ১৭২ জনের প্রত্যেককে সহায়তা দেওয়ার ব্যবস্থা করেছে আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা। সংস্থাটির পক্ষ থেকে তাঁদের যাতায়াত খরচ, কিছু খাদ্যসামগ্রী ও প্রাথমিক চিকিৎসাসেবা দেওয়া হয়েছে। প্রয়োজন অনুযায়ী অস্থায়ী আবাসনের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। দেশে ফেরার পর জরুরি প্রয়োজন মেটাতে এ সহায়তা তাঁদের কাজে আসবে বলে আশা করা হচ্ছে।

লিবিয়ায় আটক অন্য বাংলাদেশিদের ফেরাতে উদ্যোগ
লিবিয়ার বিভিন্ন ডিটেনশন সেন্টারে আটক বাংলাদেশি নাগরিকদের নিরাপদে দেশে ফিরিয়ে আনতে সমন্বিতভাবে কাজ করছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, লিবিয়ায় বাংলাদেশ দূতাবাস, প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় এবং আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা। সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সহযোগিতায় আটক ব্যক্তিদের নিরাপদ প্রত্যাবাসনের উদ্যোগ অব্যাহত রয়েছে। লিবিয়ায় আটকে পড়া বাংলাদেশিদের দেশে ফেরানোর পাশাপাশি মানবপাচার ও অনিয়মিত অভিবাসনের ঝুঁকি সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানোও এ উদ্যোগের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

কালের আলো/এসকে/এমএসআইপি

তাহসিফের মৃত্যু নিয়ে এখনই মুখ খুলছেন না স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

নিজস্ব প্রতিবেদক, কালের আলো
প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর, ২০২৬, ৩:২৩ অপরাহ্ণ
তাহসিফের মৃত্যু নিয়ে এখনই মুখ খুলছেন না স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

ঢাকার তুরাগ নদ থেকে বিমানবাহিনীর সাবেক কর্মকর্তা কে এম তাহসিফ সাউরির (২৮) মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় তদন্ত শেষ হওয়ার আগে কোনো মন্তব্য করতে চান না স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি জানিয়েছেন, প্রাথমিক তদন্ত ও ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পাওয়ার পর বিস্তারিত জেনে এ বিষয়ে কথা বলবেন।

বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) সকালে রাজশাহীর সারদায় বাংলাদেশ পুলিশ অ্যাকাডেমির ঐতিহাসিক প্যারেড গ্রাউন্ডে প্রশিক্ষণ সমাপনী কুচকাওয়াজ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে তাহসিফের মৃত্যুর প্রসঙ্গ উঠে আসে। এ ঘটনায় তদন্তের আগে কোনো সিদ্ধান্তে না পৌঁছানোর অবস্থান জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।

তদন্ত ও ময়নাতদন্তের পর বক্তব্য দেবেন মন্ত্রী
সাবেক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট কে এম তাহসিফ সাউরির মৃত্যুর কারণ নিয়ে নানা প্রশ্নের মধ্যে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, প্রাথমিক তদন্ত ও ময়নাতদন্তের পর বিস্তারিত তথ্য জেনে তিনি এ বিষয়ে কথা বলবেন। তাহসিফের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ জানতে তদন্তের ফলাফল গুরুত্বপূর্ণ। মরদেহ উদ্ধারের ঘটনা ঘিরে কোনো অনুমান বা অপ্রমাণিত তথ্যের ভিত্তিতে সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর পরিবর্তে তদন্তের তথ্য সামনে আসার অপেক্ষায় রয়েছেন তিনি।

পুলিশকে জনবান্ধব হওয়ার আহ্বান
সারদায় পুলিশ অ্যাকাডেমির প্রশিক্ষণ সমাপনী কুচকাওয়াজে বক্তব্যে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, পুলিশের কাছে জনগণের প্রত্যাশা অনেক। সেবা নিতে আসা সব শ্রেণি-পেশার মানুষের প্রতি পুলিশকে আরও আন্তরিক হতে হবে। তিনি বলেন, ভয়ভীতি ও পক্ষপাতিত্ব উপেক্ষা করে জনগণকে আইনি সেবা ও সুরক্ষা দিতে হবে। মানুষের পাশে থেকে সেবা দেওয়ার মাধ্যমে জনগণের আস্থা অর্জন করে পুলিশকে সত্যিকার অর্থে ‘জনগণের পুলিশ’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে হবে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ভাষ্য, মানুষের জন্য কাজ করেই মানুষের হৃদয় জয় করতে হবে। পুলিশের আচরণ, দায়িত্ব পালন ও সেবার মানের মধ্য দিয়ে জনগণের আস্থা অর্জন করা জরুরি।

আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন সরকারের অগ্রাধিকার
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ এবং জনমনে স্বস্তি ফিরিয়ে আনা বর্তমান সরকারের প্রধান অগ্রাধিকার বলে পুনর্ব্যক্ত করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি বলেন, অতীতের সরকারের আমলে ক্ষতিগ্রস্ত ও ভঙ্গুর পুলিশ বাহিনীকে পুনর্গঠিত করে দক্ষ, আধুনিক, মানবিক ও সেবামুখী বাহিনীতে রূপান্তরের জন্য সরকার বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে।এ লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় আইন প্রণয়ন, জনবল বৃদ্ধি, যানবাহন কেনা, উপযুক্ত প্রশিক্ষণ, অবকাঠামো নির্মাণ এবং প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম সরবরাহের কাজ চলছে বলেও জানান তিনি।

বুধবার তুরাগ নদ থেকে উদ্ধার হয় মরদেহ
নৌপুলিশ সূত্রে জানা গেছে, বুধবার (২৮ অক্টোবর) বিকেলে ঢাকার তুরাগ নদ থেকে তাহসিফ সাউরির মরদেহ উদ্ধার করা হয়। তিনি বিমানবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট ছিলেন। বৃহস্পতিবার সকালে তাঁর মৃত্যুর খবরের সত্যতা নিশ্চিত করেন নৌপুলিশের ঢাকা অঞ্চলের টঙ্গী ফাঁড়ির পরিদর্শক ফিরোজ উদ্দিন। তবে কীভাবে তাঁর মৃত্যু হয়েছে, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়নি। মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে নিশ্চিত হতে তদন্ত ও ময়নাতদন্তের ফলাফল গুরুত্বপূর্ণ বলে সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য থেকে বোঝা যায়।

কালের আলো/এসকে/এমএসআইপি

সংস্কৃতি ও মতাদর্শে দলীয় কর্তৃত্ব জোরদার করছে চীন

আন্তর্জাতিক ডেস্ক,কালের আলো
প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর, ২০২৬, ৩:১৮ অপরাহ্ণ
সংস্কৃতি ও মতাদর্শে দলীয় কর্তৃত্ব জোরদার করছে চীন

সংস্কৃতি, গণমাধ্যম, সাহিত্য, শিল্পকলা, ধর্ম ও ইন্টারনেটের ওপর কমিউনিস্ট পার্টির কর্তৃত্ব আরও সুসংহত করতে উদ্যোগী হয়েছে চীন। দেশটির প্রেসিডেন্ট শি চিনপিংয়ের সাংস্কৃতিক চিন্তাধারাকে সামনে রেখে রাজনৈতিক ও মতাদর্শিক নিয়ন্ত্রণকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার প্রচেষ্টা জোরদার হচ্ছে। চীনের সরকারি ভাষ্যে এর লক্ষ্য জাতীয় ঐক্য, সাংস্কৃতিক আত্মবিশ্বাস ও দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা। তবে সমালোচকদের দৃষ্টিতে, এ ধরনের নীতির ফলে স্বাধীন চিন্তা ও সৃজনশীলতার পরিসর সংকুচিত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।

গত ১২ অক্টোবর চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম *পিপলস ডেইলি*তে প্রকাশিত একটি তাত্ত্বিক নিবন্ধে শি চিনপিংয়ের সাংস্কৃতিক চিন্তাধারাকে দলীয় নেতৃত্ব ও নিয়ন্ত্রণ শক্তিশালী করার পূর্ণাঙ্গ কাঠামো হিসেবে তুলে ধরা হয়। পিকিং বিশ্ববিদ্যালয়ের মার্ক্সবাদ স্কুলের অধ্যাপক সান লাইবিনের লেখা নিবন্ধে সম্প্রতি প্রকাশিত *শি চিনপিং কালচারাল অ্যান্থলজি*র প্রথম ও দ্বিতীয় খণ্ডের বিষয়বস্তু আলোচনা করা হয়েছে। নিবন্ধে সংকলনটিকে কেবল তাত্ত্বিক বক্তব্যের সমষ্টি হিসেবে নয়, বরং প্রচার, মতাদর্শ ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্ব কার্যকর করার নির্দেশিকা হিসেবেও উপস্থাপন করা হয়েছে।

সংস্কৃতির প্রতিটি ক্ষেত্রে দলীয় নেতৃত্ব
চীনের কমিউনিস্ট পার্টির কাছে মতাদর্শিক নিয়ন্ত্রণ নতুন কোনো ধারণা নয়। লেনিনবাদী রাজনৈতিক ঐতিহ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে দলটি দীর্ঘদিন ধরেই রাষ্ট্র পরিচালনা ও রাজনৈতিক ক্ষমতা ধরে রাখার ক্ষেত্রে মতাদর্শকে গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচনা করে আসছে। তবে শি চিনপিংয়ের নেতৃত্বে এই ধারণাকে আরও বিস্তৃত ও সুসংহত কাঠামোয় রূপ দেওয়ার প্রচেষ্টা দেখা যাচ্ছে। সান লাইবিনের নিবন্ধে দলীয় নেতৃত্বকে ‘সামগ্রিক ও সর্বব্যাপী’ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। এ ধারণার আওতায় কেবল সংবাদমাধ্যম বা রাজনৈতিক প্রচার নয়, সাহিত্য, শিল্পকলা, ধর্মীয় কর্মকাণ্ড এবং ইন্টারনেটের মতো ক্ষেত্রও অন্তর্ভুক্ত।

নিবন্ধে মার্ক্সবাদী তত্ত্বের আলোকে সমাজের প্রভাবশালী চিন্তা ও বস্তুগত সম্পর্কের মধ্যে যোগসূত্র তুলে ধরা হয়েছে। চীনা কমিউনিস্ট পার্টির এই ব্যাখ্যায় অর্থনীতি ও রাষ্ট্রের ওপর রাজনৈতিক নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি জনমত ও মানুষের চিন্তাজগতের ওপরও নেতৃত্ব বজায় রাখার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা হয়। এর অর্থ, সাংস্কৃতিক নীতির লক্ষ্য শুধু সরকারি বক্তব্য প্রচারেই সীমাবদ্ধ নয়। কোন ধারণা গ্রহণযোগ্য হবে, জাতীয় পরিচয় কীভাবে সংজ্ঞায়িত হবে এবং সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড কোন রাজনৈতিক লক্ষ্যকে সমর্থন করবে—এসব ক্ষেত্রেও পার্টির কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে।

গণমাধ্যম ও ইন্টারনেটে নিয়ন্ত্রণের দর্শন
শি চিনপিংয়ের সাংস্কৃতিক নীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ গণমাধ্যম ও ডিজিটাল পরিসর। সান লাইবিনের নিবন্ধে ‘সঠিক জনমত পরিচালনা’কে পার্টি ও জনগণের স্বার্থের সহায়ক হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। বিপরীতে, ভুল জনমত পরিচালনাকে উভয়ের জন্য ক্ষতিকর বলে বর্ণনা করা হয়েছে।

ইন্টারনেটের ক্ষেত্রেও সেটিকে ‘সঠিকভাবে পরিচালনা ও ব্যবহার’ করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে তথ্যপ্রবাহ ও জনমত গঠনের প্রক্রিয়ায় রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ব বজায় রাখার দর্শন প্রতিফলিত হয়েছে। এই দৃষ্টিভঙ্গিতে তথ্য নিয়ন্ত্রণকে কেবল কোনো সংকট বা বিশেষ পরিস্থিতি মোকাবিলার ব্যবস্থা হিসেবে দেখা হচ্ছে না; বরং রাজনৈতিক শাসনব্যবস্থার দীর্ঘমেয়াদি অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।

নিবন্ধে পার্টির শৃঙ্খলা ও জনগণের অংশগ্রহণের মধ্যে সামঞ্জস্যের কথাও বলা হয়েছে। সেখানে পার্টির বৈশিষ্ট্য ও জনগণের বৈশিষ্ট্যকে অভিন্ন এবং পরস্পরবিরোধী নয় বলে উপস্থাপন করা হয়েছে। এর মাধ্যমে দলীয় রাজনৈতিক লক্ষ্য ও জনগণের স্বার্থ একই জায়গায় মিলিত হয়—এমন ধারণা প্রতিষ্ঠার চেষ্টা দেখা যায়। তবে বাস্তবে নাগরিকদের দাবি, সাংস্কৃতিক পছন্দ কিংবা রাজনৈতিক মতামত সব সময় সরকারের অগ্রাধিকারের সঙ্গে এক নাও হতে পারে। ফলে ভিন্নমত প্রকাশের সুযোগ এবং রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণের সীমা নিয়ে প্রশ্ন ওঠার অবকাশ রয়েছে।

জাতীয় নিরাপত্তা ও সাংস্কৃতিক আত্মবিশ্বাসের যুক্তি
চীনের সাংস্কৃতিক নীতির পেছনে জাতীয় নিরাপত্তা ও কৌশলগত বিবেচনাও রয়েছে। ডিজিটাল প্রযুক্তির দ্রুত পরিবর্তন, বিদেশি সমালোচনা এবং ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতার প্রেক্ষাপটে বেইজিং অভ্যন্তরীণ জনমত ও জাতীয় বয়ানের ওপর নিয়ন্ত্রণকে দেশের স্থিতিশীলতা রক্ষার অংশ হিসেবে দেখছে।

সরকারি দৃষ্টিভঙ্গিতে সাংস্কৃতিক আত্মবিশ্বাস, জাতীয় সংহতি ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা পরস্পরের সঙ্গে সম্পর্কিত। এই কাঠামোয় সংস্কৃতিকে জাতীয় পরিচয় শক্তিশালী করা এবং দেশের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন ও পুনর্জাগরণের লক্ষ্য এগিয়ে নেওয়ার মাধ্যম হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। অন্যদিকে, রাজনৈতিক আনুগত্যকে সাংস্কৃতিক ঐক্যের সঙ্গে যুক্ত করা হলে মতাদর্শিক ভিন্নমতকে সামাজিক সংহতির জন্য হুমকি হিসেবে দেখার প্রবণতা তৈরি হতে পারে। এর ফলে স্বাধীন মতপ্রকাশ ও বিকল্প চিন্তার জায়গা সীমিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

সৃজনশীলতা ও স্বাধীন চিন্তা নিয়ে প্রশ্ন
চীনের এই সাংস্কৃতিক কাঠামোর সামনে একটি মৌলিক প্রশ্ন রয়েছে—জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠার প্রয়াস কীভাবে স্বাধীন চিন্তা ও সৃজনশীলতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ থাকবে? একদিকে উদ্ভাবন, সাংস্কৃতিক বিকাশ ও সৃজনশীল কর্মকাণ্ডকে উৎসাহিত করার কথা বলা হচ্ছে। অন্যদিকে, এসব কর্মকাণ্ডের জন্য রাজনৈতিকভাবে নির্ধারিত সীমারেখা থাকলে সৃজনশীলতার স্বাধীনতা কতটা বজায় থাকবে, তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়।

সমালোচনা ও বিতর্কের সুযোগ থাকলেও কোন বক্তব্য গ্রহণযোগ্য এবং কোনটি মতাদর্শিক বিচ্যুতি হিসেবে বিবেচিত হবে, তা নির্ধারণের কর্তৃত্ব যদি মূলত পার্টির হাতে থাকে, তাহলে স্বাধীন বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার ক্ষেত্র সীমিত হতে পারে। বিশেষ করে সাহিত্য, শিল্পকলা ও ডিজিটাল মাধ্যমে নতুন ধারণা প্রকাশের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক সীমাবদ্ধতা সৃজনশীল পরীক্ষানিরীক্ষার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। তবে এ নীতির দীর্ঘমেয়াদি সাংস্কৃতিক ও সামাজিক প্রভাব কতটা বিস্তৃত হবে, তা নির্ভর করবে বাস্তব প্রয়োগ এবং ভিন্নমত প্রকাশের সুযোগের ওপর।

দীর্ঘমেয়াদি শাসনব্যবস্থার অংশ সাংস্কৃতিক নীতি
সান লাইবিনের নিবন্ধে আলোচিত *শি চিনপিং কালচারাল অ্যান্থলজি*তে ৭৮টি লেখা রয়েছে। নিবন্ধে এসব লেখাকে শি চিনপিংয়ের তাত্ত্বিক কর্তৃত্ব এবং চীনের ‘সাংস্কৃতিক আত্মবিশ্বাসের’ প্রতিফলন হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। সব মিলিয়ে, সংকলনটি শি চিনপিংয়ের সাংস্কৃতিক বক্তব্যের সংকলনের পাশাপাশি মতাদর্শিক নেতৃত্বকে দীর্ঘমেয়াদি শাসনব্যবস্থার অংশ হিসেবে প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টার ইঙ্গিত দেয়। বেইজিংয়ের দৃষ্টিতে সাংস্কৃতিক ঐক্য জাতীয় শক্তির উৎস। তবে দলীয় নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে গড়ে তোলা ঐক্য স্বাধীন চিন্তা ও সৃজনশীলতার বিকাশে কতটা সহায়ক হবে, তা নিয়ে বিতর্ক থেকেই যাচ্ছে।

সূত্র: ডেইলি মিরর, ২৩ অক্টোবর ২০২৬

কালের আলো/এএইচ/এমএসআইপি