ভিড়ের মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকতে কষ্ট হচ্ছিল ৬৪ বছর বয়সী শিক্ষক ড. নজীবুর রহমানের। অসুস্থ বোধ করায় সহযাত্রীদের কাছে বসার জায়গা চেয়েছিলেন তিনি। পরিবারের অভিযোগ, কেউ তাঁকে আসন ছেড়ে দেননি। এর এক থেকে দুই মিনিটের মধ্যে মেট্রোরেলের মেঝেতে পড়ে যান তিনি। পরে হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসকেরা তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।
চার দিন আগে ঘটে যাওয়া এই মৃত্যু এখন শুধু একটি পরিবারের শোকের ঘটনা নয়; গণপরিবহনে মানুষের মানবিকতা, পারস্পরিক দায়িত্ববোধ এবং জরুরি মুহূর্তে সহায়তার প্রস্তুতি নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে। প্রবীণ ও অসুস্থ যাত্রীর জন্য নির্ধারিত অগ্রাধিকার আসন কতটা নিয়ম মেনে ব্যবহার করা হচ্ছে, আর কেউ বিপদে পড়লে সহযাত্রীরা কতটা এগিয়ে আসছেন—ড. নজীবুরের মৃত্যুর পর সেই প্রশ্নগুলো নতুন করে সামনে এসেছে।
- ড. নজীবুর রহমানের মৃত্যুর পর অগ্রাধিকার আসনের ব্যবহার ও সহযাত্রীদের দায়িত্ববোধ নিয়ে প্রশ্ন
- জরুরি চিকিৎসা ও সহমর্মিতা বাড়ানোর তাগিদ
তাঁর ছেলে নাকিবুর রহমানের ভাষায়, বসার সুযোগ পেলে তাঁর বাবা অন্তত কিছুটা স্বস্তি পেতেন। তবে আসন না পাওয়াই তাঁর মৃত্যুর কারণ, এমন দাবি করেননি তিনি। এই আক্ষেপের মধ্যেই রয়েছে ঘটনাটির মানবিক তাৎপর্য—কোনো মানুষের অসুস্থতা চোখে পড়লে তাঁর পাশে দাঁড়ানোর দায়িত্ব কি কেবল নির্ধারিত নিয়মের, নাকি নাগরিক বিবেকেরও?
কয়েক মিনিটেই বদলে গেল সব
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. নজীবুর রহমান ঘটনার দিন সকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকদের একটি অনুষ্ঠানে অংশ নিতে গিয়েছিলেন। অনুষ্ঠান শেষে বিকেল তিনটার দিকে শাহবাগ মেট্রোস্টেশন থেকে উত্তরা যাওয়ার জন্য ট্রেনে ওঠেন তিনি। সঙ্গে ছিলেন বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষক, তাঁর সহকর্মী। পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, ট্রেনে আসন না পেয়ে দুজনই দাঁড়িয়ে যাত্রা শুরু করেন। ভিড়ের মধ্যে ধাক্কাধাক্কিতে তাঁরা একে অপরের কাছ থেকে কিছুটা দূরে সরে যান।
বিকেল সাড়ে তিনটার দিকে ট্রেনটি শেওড়াপাড়া এলাকায় পৌঁছালে ড. নজীবুর অসুস্থ বোধ করতে শুরু করেন। তাঁর ছেলে নাকিবুরের অভিযোগ, এ সময় বাবা আশপাশের যাত্রীদের কাছে কয়েকবার বসার জায়গা চান। কিন্তু কেউ তাঁকে আসন ছেড়ে দেননি। কিছুক্ষণ পর তিনি মেঝেতে পড়ে গেলে আশপাশের যাত্রীরা তাঁকে ধরে তোলার চেষ্টা করেন। হৈচৈ শুনে তাঁর সহকর্মীও সেখানে পৌঁছান। পরিস্থিতির গুরুত্ব বুঝতে পেরে তাঁকে সহায়তার উদ্যোগ নেওয়া হয়। পরে তাঁকে উত্তরার উত্তর স্টেশনে নেওয়া হয়।
নাকিবুরের ভাষ্য অনুযায়ী, আনসার সদস্যদের সহায়তায় জরুরি সেবা নম্বর ৯৯৯-এ যোগাযোগ করা হয়। পরে অ্যাম্বুলেন্সে করে তাঁকে ক্রিসেন্ট হাসপাতালে নেওয়া হয়। বিকেল পাঁচটার দিকে চিকিৎসকেরা জানান, তিনি আর বেঁচে নেই। ড. নজীবুরের উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিস ছিল বলে জানিয়েছেন তাঁর ছেলে। তবে তাঁর মৃত্যুর সুনির্দিষ্ট চিকিৎসাগত কারণ সম্পর্কে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
‘বাবাকে বসতে দিলে অন্তত একটু স্বস্তি পেতেন’
বাবার মৃত্যুর ঘটনা নিয়ে কথা বলতে গিয়ে নাকিবুর রহমান আক্ষেপের সুরে বলেন, ‘আমি বলছি না বাবাকে বসতে দিলে তিনি মারা যেতেন না। তবুও কেউ যদি আমার বাবাকে বসার সুযোগ দিতেন, তিনি একটু হলেও স্বস্তি পেতেন। হয়তো এভাবে নিচে পড়ে যেতেন না।’ নাকিবুর জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সদস্য। পাশাপাশি তিনি একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন। তাঁর বক্তব্যে একটি বিষয় স্পষ্ট—তিনি কাউকে সরাসরি দায়ী করতে চান না; বরং অসুস্থ একজন মানুষের অনুরোধে সাড়া দেওয়ার মতো মানবিক আচরণের গুরুত্ব তুলে ধরতে চান।
তিনি বলেন, ‘বাবার মৃত্যুর ঘটনায় কাউকে দোষারোপ করছি না। সেখানে যাত্রীরা তাঁকে ধরে তোলার চেষ্টা করেছেন। আনসার সদস্যরাও সহযোগিতা করেছেন।’ তবে অসুস্থ হওয়ার আগেই কেউ পাশে দাঁড়ালে তাঁর বাবা কিছুটা স্বস্তি পেতে পারতেন—এমনটাই মনে করেন তিনি।
নাকিবুরের মতে, গণপরিবহন সবার জন্য। সেখানে প্রবীণ, শিশু, অন্তঃসত্ত্বা নারী ও অসুস্থ মানুষও চলাচল করেন। সব সময় কাউকে আসন ছেড়ে দিতেই হবে, বিষয়টি এমন নয়; কিন্তু কারও শারীরিক কষ্ট চোখে পড়লে তাঁর প্রয়োজনকে গুরুত্ব দেওয়া উচিত।
পরিবারের কাছে খবর পৌঁছাতেও ছিল জটিলতা
ড. নজীবুরের স্ত্রী ও ছোট ছেলে তখন ওমরাহ পালনের জন্য সৌদি আরবে ছিলেন। তাঁর ফোন লকড থাকায় সেটি থেকে পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি বলে জানান নাকিবুর। বাবার সহকর্মীদের কাছ থেকে খবর পেয়ে তিনি হাসপাতালে পৌঁছান। পরিবারের সদস্যদের অনুপস্থিতিতে শেষকৃত্যের আয়োজনও করতে হয়। উত্তরার ৫ নম্বর সেক্টরের আইইএস মসজিদ প্রাঙ্গণে এশার নামাজের পর তাঁর জানাজা হয়। পরে গৌরনদী উপজেলায় তাঁকে দাফন করা হয়। তাঁর অপর দুই সন্তান নিউজিল্যান্ডে থাকেন।
অগ্রাধিকার আসন আছে, প্রয়োগে ঘাটতি কোথায়?
মেট্রোরেলের প্রতিটি বগিতে অগ্রাধিকার আসনের ওপর স্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে। প্রবীণ নাগরিক, গর্ভবতী নারী, শিশুসহ অভিভাবক এবং শারীরিক বা মানসিক প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের আসন ছেড়ে দেওয়ার অনুরোধ করা হয়েছে সেখানে। কিন্তু নির্দেশনা থাকলেই যে তার যথাযথ প্রয়োগ হচ্ছে, বাস্তব চিত্রে সব সময় তা দেখা যায় না।
এমআরটি-৬ লাইনের কয়েকটি স্টেশনে যাত্রীদের চলাচল পর্যবেক্ষণ করে দেখা যায়, অগ্রাধিকার আসনে প্রবীণদের পাশাপাশি তরুণ ও মধ্যবয়সী পুরুষেরাও বসে আছেন। কোনো স্টেশনে প্রবীণ যাত্রী উঠলে কেউ কেউ আসন ছেড়ে দেন, আবার কেউ বসেই থাকেন।
কয়েকজন যাত্রীর ভাষ্য, মতিঝিল থেকে উত্তরা যাওয়ার পথে ভিড় বাড়তে থাকায় আসন পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। কেউ কেউ দীর্ঘ পথ দাঁড়িয়ে যাওয়ার পরিবর্তে আসন খালি হওয়ার অপেক্ষা করেন। তবে অগ্রাধিকার আসন ব্যবহারের ক্ষেত্রে নির্ধারিত নির্দেশনা অনুসরণ করা হচ্ছে কি না, সেই প্রশ্ন থেকেই যায়।
শাহবাগ স্টেশনে এক প্রবীণ যাত্রীকে দেখে নিজের আসন ছেড়ে দেন শিক্ষার্থী মেহেদি হাসান। তাঁর মতে, তরুণদের জন্য কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকা যতটা সহজ, প্রবীণদের জন্য তা ততটা নয়। মেহেদি বলেন, ‘মেট্রোতে আমাদের যেতে সময় লাগে কয়েক মিনিট। এই সময় দাঁড়িয়ে থাকলে আমাদের কিছু হবে না। কিন্তু প্রবীণদের দাঁড়িয়ে যেতে কষ্ট হয়। এমনিতেই ঠেলাঠেলিতে তারা অসুস্থ হয়ে যেতে পারেন।’
ফার্মগেট থেকে মতিঝিল যাওয়ার পথে কথা হয় ৬৮ বছর বয়সী শাখাওয়াত হোসেনের সঙ্গে। তাঁর অভিজ্ঞতা, অনেক সময় কম বয়সী যাত্রীরা তাঁকে বসার সুযোগ করে দেন। তবে সব সময় আসন পাওয়া যায় না। তাঁর মতে, গণপরিবহনে প্রবীণদের অগ্রাধিকার দেওয়ার শিক্ষা পরিবার থেকেই শুরু হওয়া উচিত।
স্টেশনে প্রাথমিক চিকিৎসার ব্যবস্থা কতটা জরুরি?
মেট্রোরেলে প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক মানুষ যাতায়াত করেন। এই বিপুল যাত্রীসমাগমের মধ্যে কেউ হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়লে দ্রুত কীভাবে সহায়তা দেওয়া হবে, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক সাইদুর রহমান জানান, মেট্রোরেলে যাতায়াতের সময় তিনি কখনো খালি আসন পাননি। তাঁর পর্যবেক্ষণ, অনেক ক্ষেত্রে কম বয়সী যাত্রীরা আসনে বসে থাকেন, যা প্রবীণ ও অসুস্থ যাত্রীদের ভোগান্তি বাড়াতে পারে।
তিনি মনে করেন, অগ্রাধিকার আসন ব্যবহারের বিষয়ে সচেতনতা তৈরির পাশাপাশি গণপরিবহনে জরুরি সহায়তার ব্যবস্থাও জোরদার করা প্রয়োজন। এ জন্য স্কুল-কলেজ, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও গণমাধ্যমে প্রচারের পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।
সাইদুর রহমান বলেন, ‘প্রতিটি স্টেশনে নির্ধারিত একটি প্রাথমিক চিকিৎসার ব্যবস্থা রাখা উচিত। যাতে কেউ হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়লে প্রাথমিক চিকিৎসা পেতে পারেন।’ প্রবীণ ও অসুস্থ যাত্রীর জন্য আসন নিশ্চিত করা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি কেউ অসুস্থ হয়ে পড়লে দ্রুত পরিস্থিতি বুঝে কর্মীদের জানানো, প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সহায়তা ডেকে দেওয়া এবং তাঁকে নিরাপদে সহায়তা করাও জরুরি। এ ক্ষেত্রে মেট্রোরেল কর্তৃপক্ষের জরুরি সাড়াদানের প্রস্তুতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
মানবিকতা কি শুধু নিয়ম মেনে চলার বিষয়?
গণমাধ্যমকর্মী নাজমুস সাকিব রহমানের মতে, ড. নজীবুরের মৃত্যুর ঘটনা মানুষের সাধারণ বিবেচনাবোধের ঘাটতি নিয়ে ভাবার সুযোগ তৈরি করেছে। তিনি বলেন, ‘ড. নজীবুরের মৃত্যুর ঘটনা আমাদের কাণ্ডজ্ঞান বা কমনসেন্সের সংকট সামনে নিয়ে এসেছে। আমরা অনেক সময় নিয়মকানুন জানি, কিন্তু কখন কোথায় মানবিক আচরণ করতে হবে, সেই বোধটুকু হারিয়ে ফেলি।’ তাঁর বক্তব্য, গণপরিবহনে সহানুভূতি দেখানো কেবল ভালো আচরণ নয়, পারস্পরিক দায়িত্ববোধেরও অংশ। তিনি আরও বলেন, ‘গণপরিবহনে সহানুভূতি পারস্পরিক দায়িত্ববোধের অংশ। আজ একজন অন্যের সহযোগিতা চাইছেন, কাল সেই পরিস্থিতিতে আমরাও পড়তে পারি। তাই পরিস্থিতি বুঝে স্বতঃস্ফূর্তভাবে পাশে দাঁড়ানো সবচেয়ে জরুরি।’
যে প্রশ্নগুলো থেকে যায়
ড. নজীবুর রহমানের মৃত্যুর সঙ্গে অগ্রাধিকার আসন না পাওয়ার অভিযোগ সামনে এলেও আসন পেলে তাঁর মৃত্যু ঠেকানো যেত কি না, তা নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়। মৃত্যুর সুনির্দিষ্ট চিকিৎসাগত কারণও এখানে নিশ্চিত নয়। তাই ঘটনাটিকে কোনো একক যাত্রী বা একটি আচরণের ফল হিসেবে চিহ্নিত করার পরিবর্তে, অসুস্থ যাত্রীর প্রতি সহায়তার সুযোগ এবং জরুরি চিকিৎসাব্যবস্থা কতটা কার্যকর, তা গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন। এই ঘটনা অন্তত তিনটি বিষয়ে নতুন করে মনোযোগ দাবি করে।
প্রথমত, অগ্রাধিকার আসনের নির্দেশনা শুধু বগিতে লিখে রাখলেই হবে না; যাত্রীদের তা মানতে উৎসাহিত করতে হবে। দ্বিতীয়ত, মেট্রোরেল স্টেশন ও ট্রেনে জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত সহায়তা পাওয়ার ব্যবস্থা সম্পর্কে যাত্রীদের স্পষ্ট ধারণা থাকা দরকার। তৃতীয়ত, প্রবীণ, অসুস্থ ও বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন মানুষের প্রতি সহমর্মিতা তৈরিতে পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও গণপরিবহন কর্তৃপক্ষকে ভূমিকা রাখতে হবে।
ড. নজীবুরের ছেলে নাকিবুর রহমান নিজেই বলেছেন, তিনি কাউকে দোষারোপ করতে চান না। তাঁর এই অবস্থান শোকের মধ্যেও একটি বৃহত্তর সামাজিক বার্তা দেয়—মানুষের চলাচলকে নিরাপদ ও স্বস্তিদায়ক করতে নিয়মের পাশাপাশি মানবিক আচরণও অপরিহার্য। একটি আসন হয়তো জীবন বাঁচানোর নিশ্চয়তা নয়। কিন্তু অসুস্থ মানুষের কষ্ট বুঝতে পারা, তাঁর পাশে দাঁড়ানো এবং দ্রুত সহায়তার ব্যবস্থা করা আমাদের নাগরিক দায়িত্ব। ড. নজীবুর রহমানের মৃত্যু তাই শুধু অগ্রাধিকার আসনের ব্যবহার নয়, গণপরিবহনে আমরা একে অন্যের প্রতি কতটা দায়িত্বশীল—সেই প্রশ্নও সামনে এনেছে।
কালের আলো/এমএসএএকে/এমকে
আপনার মতামত লিখুন
[gs-fb-comments]