দীর্ঘ ১৬ বছর ধরে বন্ধ রয়েছে জয়পুরহাটের আক্কেলপুর উপজেলার জামালগঞ্জ রেলস্টেশনের যাত্রীসেবা। এই পথে নিয়মিত ট্রেন চলাচল করলেও স্টেশনটিতে স্বাভাবিক কার্যক্রম না থাকায় যাত্রীদের দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। বিশেষ করে নারী, শিশু ও বয়স্কদের ঝুঁকি নিয়ে ট্রেনে ওঠানামা করতে হয়। দীর্ঘদিনের এই ভোগান্তি কমাতে অবশেষে স্টেশনটি চালুর উদ্যোগ নিয়েছে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ। রেলওয়ের পাকশী বিভাগের উদ্যোগে স্টেশনটির কার্যক্রম পুনরায় চালুর জন্য প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। তবে কবে নাগাদ পুরোপুরি স্বাভাবিক হবে স্টেশনের কার্যক্রম, তা এখনো নিশ্চিত নয়। ফলে দীর্ঘদিনের দুর্ভোগ থেকে মুক্তির অপেক্ষায় রয়েছেন স্থানীয় যাত্রীরা।
জনবল সংকটে ১৬ বছর ধরে বন্ধ
রেলওয়ের পাকশী বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, স্টেশনমাস্টার ও পয়েন্টসম্যানের অভাবে ২০১০ সালের ২৫ নভেম্বর থেকে জামালগঞ্জ রেলস্টেশনের অপারেটিং কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। গত ২৬ অক্টোবর জারি করা এক চিঠিতে স্টেশনটির কার্যক্রম চালুর জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে সংশ্লিষ্ট প্রকৌশল বিভাগগুলোকে অনুরোধ জানানো হয়েছে। চিঠিতে স্টেশনমাস্টার ও পয়েন্টসম্যান পদায়নের প্রক্রিয়া চলার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। পাকশী বিভাগের অতিরিক্ত বিভাগীয় পরিবহন কর্মকর্তা মো. সাইফুল ইসলামের সই করা ওই চিঠিতে বলা হয়েছে, দীর্ঘদিন বন্ধ থাকায় স্টেশনের অবকাঠামো, সিগন্যালিং ব্যবস্থা ও পরিচালন সরঞ্জাম সচল করা প্রয়োজন। একই চিঠিতে পাকশী বিভাগের ৫৬টি স্টেশনের কার্যক্রম বন্ধ থাকার তথ্যও তুলে ধরা হয়েছে।
ট্রেন থামে, তবু যাত্রীদের দুর্ভোগ
স্টেশনটির কার্যক্রম বন্ধ থাকলেও এই রেলপথে ট্রেন চলাচল অব্যাহত রয়েছে। কিন্তু যাত্রী ওঠানামার জন্য উপযুক্ত ব্যবস্থা না থাকায় প্রতিনিয়ত ভোগান্তিতে পড়ছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। তাঁদের অভিযোগ, গত তিন থেকে চার বছর ধরে স্টেশনের ১ নম্বর প্ল্যাটফর্মে ট্রেন থামানো হয় না। এর পরিবর্তে প্ল্যাটফর্মবিহীন ২ নম্বর লাইনে ট্রেন থামানো হচ্ছে। ফলে যাত্রীদের উঁচু-নিচু পথ পেরিয়ে ঝুঁকি নিয়ে ট্রেনে উঠতে ও নামতে হয়। এতে সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়েন নারী, শিশু ও বয়স্ক ব্যক্তিরা। কখনো কখনো নির্ধারিত স্টেশনে নামতে না পেরে পরের স্টেশনে গিয়ে নামতে হয় যাত্রীদের। এতে তাঁদের সময় ও অর্থ—দুটিই অতিরিক্ত ব্যয় হচ্ছে।
পর্যটকদের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ স্টেশন
স্থানীয়দের মতে, জামালগঞ্জ রেলস্টেশন শুধু আশপাশের এলাকার মানুষের যাতায়াতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ নয়, পর্যটকদের জন্যও এর বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। ঐতিহাসিক পাহাড়পুর বৌদ্ধবিহারের কাছাকাছি হওয়ায় পর্যটকদের যাতায়াতেও স্টেশনটি সুবিধা দিতে পারে। তাই স্টেশনটি চালু হলে স্থানীয় বাসিন্দাদের পাশাপাশি পর্যটকদেরও যাতায়াত সহজ হবে বলে মনে করছেন তাঁরা।
জনবল সংকটে বাড়ছে রেলকর্মীদের চাপ
স্টেশন বন্ধ থাকার কারণে শুধু যাত্রীরাই নন, রেলওয়ের কর্মীরাও নানা সমস্যার মুখে পড়ছেন। প্রয়োজনীয় জনবল না থাকায় কর্মরত রেলকর্মীদের ওপর বাড়তি দায়িত্বের চাপ তৈরি হচ্ছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে রেলওয়ের এক স্টেশনমাস্টার জানান, প্রায় ১০ বছর ধরে একই পদে দায়িত্ব পালন করছেন তিনি। নিয়মিত দায়িত্বের পাশাপাশি মাঠপর্যায়ের কাজও সামলাতে হয় তাঁকে। তাঁর মতে, বন্ধ স্টেশনগুলো চালুর পাশাপাশি প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ করা জরুরি। এতে যাত্রীসেবা উন্নত হওয়ার পাশাপাশি কর্মরত কর্মীদের অতিরিক্ত কাজের চাপও কমবে।
সিগন্যাল ও অবকাঠামো সচলের নির্দেশনা
রেলওয়ের চিঠিতে জামালগঞ্জ স্টেশনের লুপ লাইন ফিটকরণ, সিগন্যালিং সরঞ্জাম কার্যকর করা এবং বৈদ্যুতিক ফিটিংস সচল করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এ জন্য পাকশী বিভাগের বিভাগীয় প্রকৌশলী-২, বিভাগীয় সংকেত ও টেলিযোগাযোগ প্রকৌশলী এবং বিভাগীয় বৈদ্যুতিক প্রকৌশলীকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে। পাশাপাশি স্টেশনমাস্টার ও পয়েন্টসম্যান পদায়নের প্রক্রিয়াও চলছে।
জামালগঞ্জ রেলওয়ে স্টেশনমাস্টার মো. হাসিবুল হাসান জানান, স্টেশনটি চালুর বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের চিঠি তিনি দেখেছেন। এতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশনা রয়েছে। উদ্যোগটি বাস্তবায়িত হলে যাত্রীদের দীর্ঘদিনের দুর্ভোগ কমবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি। দীর্ঘ ১৬ বছর পর জামালগঞ্জ রেলস্টেশন চালুর উদ্যোগে স্থানীয়দের মধ্যে আশার সঞ্চার হয়েছে। তবে কেবল নির্দেশনা বা প্রস্তুতি নয়, দ্রুত প্রয়োজনীয় কাজ শেষ করে স্টেশনটিতে নিয়মিত যাত্রীসেবা চালু হোক—এটাই এখন তাঁদের প্রত্যাশা।
কালের আলো/এএইচ/এমএসআইপি
আপনার মতামত লিখুন
[gs-fb-comments]