দুর্যোগেও ‘বন্ধু’ বাংলাদেশ-মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, টেকসই উন্নয়নের পরিকল্পনায় জোর পররাষ্ট্রমন্ত্রীর
প্রকাশিতঃ 9:03 pm | October 28, 2021

বিশেষ সংবাদদাতা, কালের আলো :
দুর্যোগ প্রস্তুতি ও মোকাবেলায় পরস্পরের ‘বন্ধু’ বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনী ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনী। ২০১০ সাল থেকে এই গভীর সম্পর্কের শুরু। প্রবল হৃদ্যতাপূর্ণ এই সম্পর্কের বয়সসীমা এক যুগ ছুঁই ছুঁই। তারই সূত্র ধরে বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনী ও মার্কিন সেনাবাহিনীর যৌথ উদ্যোগে ফের আয়োজন করা হয়েছে ভূমিকম্প পরবর্তী অনুসন্ধান ও উদ্ধার বিষয়ক তিন দিনব্যাপী অনুশীলন।
কোভিড প্রটোকল অনুসরণ করেই এবারের অনুষ্ঠিত অনুশীলনে অংশগ্রহণ করেছে ভারত, যুক্তরাজ্য, কানাডা, জাপানসহ ২৩টি দেশের ১৪৭টি সংস্থার ৩০০-এর অধিক প্রতিনিধি। দুর্যোগ প্রস্তুতি ও মোকাবেলায় একে অপরকে সহযোগিতা, অভিজ্ঞতা বিনিময় ও গবেষণা থেকে পাওয়া শিক্ষাও বিনিময় হয়েছে এই তিন দিনে। দুর্যোগ মোকাবেলায় বাংলাদেশ সরকার ও সশস্ত্র বাহিনীর ভূমিকার প্রশংসা করেছেন তারা।
গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা হয়েছে ভূমিকম্পসহ সব দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা আন্তর্জাতিক পদ্ধতির উপর বিস্তর ধারণা, দুর্যোগ মোকাবেলায় সমন্বিত প্রয়াস নিশ্চিতকরণের জন্য সব অংশীজনের মধ্যে সমন্বয় বৃদ্ধি, ভূমিকম্প মোকাবেলায় অনুসন্ধান ও উদ্ধার, যোগাযোগ, মেডিক্যাল শেল্টার ও ত্রাণ কার্যক্রমের আলোকে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা গাইড লাইন চূড়ান্তকরণ বিষয়েও।
এশিয়া প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের ভূমিকম্প দুর্যোগ মোকাবিলা সংক্রান্ত বৃহত্তম এই অনুশীলন বৃস্পতিবার (২৮ অক্টোবর) আনন্দঘন পরিবেশেই শেষ হয়েছে। রাজধানীর আর্মি গল্ফ ক্লাবে তিন দিনব্যাপী এই অনুশীলনের সমাপনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় টেকসই উন্নয়নের পরিকল্পনার ওপর জোর দিয়েছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন।
তিনি বলেন, এই অনুশীলন ভূমিকম্পের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলায় আমাদের সক্ষমতা বাড়াবে। এটি অবশ্যই আমাদের একসাথে কাজ করার আত্মবিশ্বাসকে সমৃদ্ধ করবে, বিশেষ করে কোভিড-১৯ মহামারীর চ্যালেঞ্জিং প্রেক্ষাপটে। আমি নিশ্চিত যে এই অনুশীলনটি অন্যান্য অংশগ্রহণকারী দেশগুলোর জন্যও সুফল বয়ে আনবে। বাংলাদেশ বিশ্বাস করে যে প্রাকৃতিক দুর্যোগের পাশাপাশি কোভিড-১৯ এর বৈশ্বিক হুমকি সম্মিলিতভাবে মোকাবেলার জন্য আন্তর্জাতিক সহযোগিতাই চূড়ান্ত উপায়।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ডা: মো এনামুর রহমান। এ সময় বক্তব্য রেখেছেন সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসার (পিএসও) লেফটেনান্ট জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব মো: মোহসীন ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত আর্ল আর মিলার।

এই অনুষ্ঠানে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের মেয়র মো.আতিকুল ইসলাম, সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ড.এস এম শফিউদ্দিন আহমেদ, ভারপ্রাপ্ত নৌবাহিনী প্রধান রিয়ার এডমিরাল এম আশরাফুল হক, ভারপ্রাপ্ত বিমান বাহিনী প্রধান এয়ার ভাইস মার্শাল শফিকুল আলম উপস্থিত ছিলেন।
আবহাওয়াজনিত দুর্যোগের ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় বিশ্বে ‘রোড মডেল’ বাংলাদেশ
বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তন, অপরিকল্পিত নগরায়ন ও ভুমি ব্যবহার, ভবিষ্যত বিপদের কথা না ভেবে ঢালাও অবকাঠামো উন্নয়ন ও জনসচেতনতার অভাবে দুর্যোগ ঝুঁকি বিশ্বব্যাপী ক্রমশ বেড়ে চলছে। এরপরও বাংলাদেশ আবহাওয়াজনিত দুর্যোগের ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় বিশ্বে রোল মডেল। নানা পরিকল্পনার বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রাজ্ঞ ও দূরদর্শী সিদ্ধান্তে সরকার দেশে একটি কার্যকর ও শক্তিশালী দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কাঠামো গড়ে তোলার লক্ষ্যে প্রতিনিয়ত সময়োপযোগী আইন, বিধি ও কর্মপরিকল্পনা প্রণয়নের কার্যক্রম গ্রহণ করেছে। সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় যেকোনও দুর্যোগ মোকাবিলা ও ঝুঁকি কমানোর কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণে সরকার সক্ষমতার পরিচয় দিয়েছে।
ভূমিকম্প পরবর্তী অনুসন্ধান ও উদ্ধার বিষয়ক তিন দিনব্যাপী অনুশীলনের সমাপনী অনুষ্ঠানে এমন তথ্যই উপস্থাপিত হয়েছে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ডা: মো. এনামুর রহমান, সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসার (পিএসও) লেফটেনান্ট জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব মো: মোহসীনের কন্ঠে।
বঙ্গবন্ধু দুর্যোগ প্রশমনের ওপর জোর দিয়েছিলেন
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন বলেন, যেকোন প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় বাংলাদেশ রোল মডেল। সাম্প্রতিক সময়ের সকল দুর্যোগই যথাযথভাবে মোকাবিলা করেছে বাংলাদেশ। গতবছরও আম্ফান মোকাবিলায় দক্ষতা দেখিয়েছে বাংলাদেশ।

মন্ত্রী বলেন, আমাদের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বপ্ন ছিল একটি সমৃদ্ধ দেশ সোনার বাংলা গড়ার। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকার টেকসই উন্নয়নে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। যেখানে কেউ পিছিয়ে থাকবে না। সফলভাবে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের জন্য আমাদের দুর্যোগ ঝুঁকি স্থিতিস্থাপকতার দিকটিও বিবেচনায় নিতে হবে।
তিনি বলেন, দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাসের জন্য সেন্ডাই ফ্রেমওয়ার্কের পাশাপাশি SDG এবং জলবায়ু পরিবর্তন এজেন্ডার সাথে আমাদের নীতির সমন্বয় নিশ্চিত করতে আমরা বিশেষভাবে মনোযোগী রয়েছি। একটি মাল্টি-হ্যাজার্ড রিস্ক ভালনারেবিলিটি অ্যাসেসমেন্ট (MRVA) মডেলিং এবং ম্যাপিং সেল এবং একটি ড্যামেজ অ্যান্ড নিড অ্যাসেসমেন্ট (DNA) সেল প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
ড. মোমেন আরও বলেন, ১০০ বছর মেয়াদী বাংলাদেশ ডেল্টা প্ল্যান-২১০০ দেশকে দুর্যোগ স্তরের উপর ভিত্তি করে ছয়টি দুর্যোগ এবং জলবায়ু হটস্পটে বিভক্ত করেছে। ব-দ্বীপ পরিকল্পনার প্রথম ধাপে ৮০টি প্রকল্প প্রস্তাব করা হয়েছে।
তিনি বলেন, বঙ্গবন্ধু সব সময় দুর্যোগ প্রশমনের ওপর জোর দিয়েছিলেন। তারই কন্যার নেতৃত্বাধীন সরকার দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার সক্ষমতা বাড়াতে একাধিক পদক্ষেপও অন্তর্ভুক্ত করেছে। বাংলাদেশে বর্তমানে ৭৬ হাজারেরও বেশি সাইক্লোন প্রিপারডনেস প্রোগ্রাম (CPP) স্বেচ্ছাসেবক রয়েছে, যার ৫০% মহিলা রয়েছে। সম্প্রতি, ১০০টি সাইক্লোন শেল্টার এবং ১১ হাজার ৬০৪টি দুর্যোগ প্রতিরোধী ঘর নির্মাণের প্রকল্প চালু করা হয়েছে। জনসচেতনতা বাড়াতে বিভিন্ন সেমিনার, সিম্পোজিয়াম এবং অনুশীলনের আয়োজন করা হয়।
২০২১ দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার একটি মাইলফলক
আন্ত:বাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে, এই ধরনের অনুশীলন ভূমিকম্প পরবর্তী দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পারস্পরিক সহযোগিতা বৃদ্ধিতে সহায়ক হবে। এবারের এই অনুশীলনের মূল প্রতিপাদ্য ছিল ‘Resilience Through Preparedness’।

এই মূল প্রতিপাদ্য সামনে রেখে DREE BANGLADESH 2021 দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার একটি মাইলফলক হয়ে থাকবে বলে সকলে আশা প্রকাশ করেন। অনুশীলনটির উদ্বোধনী দিনে সাবজেক্ট ম্যাটার এক্সপার্ট এক্সচেইঞ্জ (Subject Matter Expert Exchange – SMEE) অনুষ্ঠিত হয়। যেখানে Subject Matter Expert কতৃক ধারাবাহিক আলোচনা করা হয়। অনুশীলনের দ্বিতীয় দিন SMEE এবং Table Top Exercise – TTX অনুষ্ঠিত হয় যেখানে ভূমিকম্প আঘাত হানার পরবর্তী পরিস্থিতির আলোকে অংশগ্রহণকারীদের বিভিন্ন ভাংশনাল গ্রুপে বিভক্ত করা হয়। TTX এর মাধ্যমে Disaster Incident Management Team –DIMT এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার অন্যান্য ফ্রেমওয়ার্ক সমূহকে আরো শক্তিশালী করার সকল চ্যালেঞ্জ এবং তা মোকাবেলার উপায়সমূহ চিহ্নিত করণের প্রয়াস নেয়া হয়েছে।
এছাড়াও কোভিড-১৯ এর মতো মহামারীকালীন সময়ে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার চ্যালেঞ্জসমূহ এবং তা মোকাবেলার করণীয় বিষয়ের উপরেও আলোকপাত করা হয়। তৃতীয় দিন অনুশীলনটির After Action Review এবং সমাপনী অনুষ্ঠান এর মাধ্যমে শেষ হয়। এবছর কভিড প্রোটোকল নিশ্চিতের জন্য অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা সীমিত করা হয়েছে। এছাড়া, এবারই প্রথম ফিজিক্যাল এবং ভার্চুয়াল পার্টিসিপেশন এর মাধ্যমে দেশ এবং দেশের বাইরে থেকে এই অনুশীলনে অংশগ্রহণের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।
কালের আলো/জিকেএম/এমএএএমকে