প্যারেড স্কয়ারে বর্ণাঢ্য কুচকাওয়াজ, সার্বভৌমত্ব বজায় রাখার সংগ্রামের অনবদ্য উপস্থাপন
প্রকাশিতঃ 11:09 pm | December 16, 2021

বিশেষ সংবাদদাতা, কালের আলো :
বিজয়ের ৫০ বছর পূর্তির দিন। নতুন দিনের প্রভাতে গোটা জাতি মেতে উঠেছিল উৎসবে-আনন্দে। বর্ণিল ছটায় বর্ণাঢ্যভাবেই কুচকাওয়াজ হয়েছে জাতীয় প্যারেড স্কয়ারে। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী ও স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর আয়োজনের অনিন্দ্য উজ্জ্বল দিনটিতে প্যারেড গ্রাউন্ডের সাজসজ্জা এবং পোডিয়ামের উভয় পাশে নানা বিলবোর্ড ও ফেস্টুনে ফুটিয়ে তোলা হয় লাল-সবুজের পতাকার রঙ।
সুবর্ণজয়ন্তীর জমকালো এই উদযাপনে উচ্ছ্বসিত ছিলেন মহামান্য রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তারা পরিদর্শন করেন বিজয় দিবস কুচকাওয়াজ। বিজয়ের মাথা উঁচু করা ৫০ বছরের জাঁকালো আয়োজনে তাদের সঙ্গী ছিলেন ভারতের রাষ্ট্রপতি রাম নাথ কোবিন্দ।
এবারই প্রথম ভারত, ভূটান, যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো ও রাশিয়ার সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যরা বিজয় দিবসের কুচকাওয়াজে অংশগ্রহণ করেন। মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে বন্ধুপ্রতীম এই রাষ্ট্রসমূহ বাংলাদেশ গঠনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকারের আমন্ত্রণে স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর কুচকাওয়াজে এই ৫ টি দেশ কন্টিনজেন্ট ও পর্যবেক্ষক প্রেরণ করে। এসব দেশের সশস্ত্র বাহিনীর অংশগ্রহণ এবারের কুচকাওয়াজে যোগ করে নতুন মাত্রা।
বৃহস্পতিবার (১৬ ডিসেম্বর) সকাল ১০ টার পরপরই মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক, বাংলাদেশ সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ড.এস এম শফিউদ্দিন আহমেদসহ নৌ ও বিমান বাহিনীর প্রধানরা প্যারেড গ্রাউন্ডে এসে উপস্থিত হন।

সকাল ১০ টা ১২ মিনিটে বিজয় দিবস কুচকাওয়াজের উপ-অধিনায়ক, ৭১ মেকানাইজড ব্রিগেডের কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. নাজিম-উদ-দৌলা’র কাছ থেকে কুচকাওয়াজের অধিনায়ক নবম পদাতিক ডিভিশনের জিওসি ও সাভার এরিয়ার এরিয়া কমান্ডার মেজর জেনারেল মোহাম্মদ শাহীনুল হক আনুষ্ঠানিকভাবে কুচকাওয়াজের দায়িত্ব বুঝে নিলেন।
শুরুতেই ‘বিজয় দিবস প্যারেড অস্ত্র নামাবে, অস্ত্র নামাও’ উচ্চারণ তাঁর কন্ঠে। কুচকাওয়াজের অগ্রভাগেই ছিল সম্মিলিত পতাকাবাহী তিনটি কন্টিনজেন্ট। বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনীর সকল আর্মস এন্ড সার্ভিসেস এবং অন্যান্য বাহিনীর পতাকা নিয়ে গঠিত হয়েছে এই কন্টিনজেন্টসমূহ।
পর্যায়ক্রমে প্রেসিডেন্ট গার্ড রেজিমেন্ট, সাজোয়া কন্টিনজেন্ট, ইস্ট বেঙ্গল কন্টিনজেন্ট, বাংলাদেশ ইনফ্রেন্টি রেজিমেন্ট কন্টিনজেন্ট, আর্টিলারি কন্টিনজেন্ট, ইঞ্জিনিয়ার্স কন্টিনজেন্ট, সিগন্যালস কন্টিনজেন্ট, প্যারা কমান্ডো কন্টিনজেন্ট, সার্ভিসেস কন্টিনজেন্ট, জাতীয় পতাকাবাহী কন্টিনজেন্ট, সেনাবাহিনী নারী কন্টিনজেন্ট, বাংলাদেশ নৌবাহিনী কন্টিনজেন্ট, বাংলাদেশ বিমানবাহিনী কন্টিনজেন্ট, নারী পুলিশ ও ব্যাটালিয়ন আনসার বাহিনীর সম্মিলিত নারী কন্টিনজেন্ট, বাংলাদেশ ন্যাশনাল ক্যাডেট কোর কন্টিনজেন্ট, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ কন্টিনজেন্ট, বাংলাদেশ কোস্ট গার্ড কন্টিনজেন্ট, বাংলাদেশ পুলিশ কন্টিনজেন্ট, বাংলাদেশ আনসার কন্টিনজেন্ট, বাংলাদেশ জেল কন্টিনজেন্ট, মর্ডানাইজ ইনফ্রেন্টি কন্টিনজেন্ট। সবশেষ ডগস্কোয়াড ও অশ্বারোহী দল।

‘সবুজ শ্যামল বনভূমি মাঠ, নদীতীরে বালুচর, সবখানে আছে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুরের ঘর’ কবির কন্ঠে কবিতায় জাঁকালো আয়োজনের উপস্থাপক। ‘স্বাধীন বাংলা ডাকবে, মুজিব আয়, ঘরে ফিরে আয়’-আকুতি তাঁর কন্ঠে। ঘড়ির কাঁটায় তখন ১০ টা ২২ মিনিট। মিলিটারি পুলিশের মোটর সাইকেল শোভাযাত্রা ও অশ্বারোহী প্রহরী পরিবেষ্টিত হয়ে অনুষ্ঠানস্থলে এসে পৌঁছেন বাঙালির আশার বাতিঘর, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
সবুজ শাড়িতে লাল চাদর মুড়িয়ে যখন প্রধানমন্ত্রী এসে পৌঁছেন তখন ‘জয় বাংলার ধ্বনিতে উঠেছিল জয় সূর্য, জয় পতাকা’-ছন্দময় উচ্চারণ হচ্ছিল ধ্বনিত। বঙ্গবন্ধু কন্যাকে অভ্যর্থনা জানান মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক, সেনাপ্রধান জেনারেল ড.এস এম শফিউদ্দিন আহমদ, নৌ বাহিনী প্রধান এডমিরাল শাহীন ইকবাল, বিমান বাহিনী প্রধান এয়ার মার্শাল শেখ আব্দুল হান্নান, সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসার (পিএসও) লেফটেন্যান্ট জেনারেল ওয়াকার উজ জামান ও মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব খাজা মিয়া।
এ সময় জাতীয় সংসদের স্পিকার ড. শিরিন শারমিন চৌধুরী, মন্ত্রী পরিষদের সদস্য, সংসদ সদস্য, উর্ধ্বতন সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তা এবং বৈদেশিক কূটনৈতিক ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন।
এরপর মহামান্য রাষ্ট্রপতির আগমনী বার্তা। মিলিটারি পুলিশের মোটর সাইকেল শোভাযাত্রা ও অশ্বারোহী প্রহরী পরিবেষ্টিত হয়ে ১০ টা ২৫ মিনিটে প্যারেড স্কয়ারে এলেন মহামান্য প্রেসিডেন্ট মো.আবদুল হামিদ। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক, সেনাপ্রধান জেনারেল এস এম শফিউদ্দিনসহ তিনবাহিনীর প্রধান তাকে অভ্যর্থনা জানান। রাষ্ট্রপতির কিছুক্ষণ পরই অনুষ্ঠানে আসেন ভারতের রাষ্ট্রপতি রাম নাথ কোবিন্দ। প্রধানমন্ত্রী, রাষ্ট্রপতিসহ অন্যরা তাকে স্বাগত জানান।

এ সময় ভারতের রাষ্ট্রপতিকে সশস্ত্র সালাম দেয় সম্মিলিত বাহিনীর সদস্যরা। এরপর বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ অভিবাদন মঞ্চে যান এবং ভারতের রাষ্ট্রপতিকে নিয়ে ভিভিআইপি গ্যালারিতে যান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
রাষ্ট্রপতি অভিবাদন মঞ্চে যাওয়ার পর রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদকে সশস্ত্র সালাম দেওয়া হয়। এ সময় জাতীয় সঙ্গীত পরিবেশন করা হয়। কুচকাওয়াজের অধিনায়ক এরপর বাংলাদেশের মহামান্য রাষ্ট্রপতিকে কুচকাওয়াজ পরিদর্শনের জন্য অনুরোধ জানালেন। ১০ টা ৩৬ মিনিটে কুচকাওয়াজ পরিদর্শনের জন্য খোলা জিপে চড়েন রাষ্ট্রপতি।
এ সময় অনুষ্ঠানের ভিভিআইপি গ্যালারিতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পাশেই বসেছিলেন সেনাপ্রধানের স্ত্রী ও ঢাকা লেডিস ক্লাবের প্রধান পৃষ্ঠপোষক বেগম নুরজাহান আহমেদ।

পরে রাষ্ট্রপতি ১০ টা ৪৮ মিনিটে প্যারেড পরিদর্শন শেষ করেন। এ সময় রাষ্ট্রপতি গাড়ি থেকে নামতেই এগিয়ে আসেন সেনাপ্রধান জেনারেল এস এম শফিউদ্দিন ও নৌবাহিনী প্রধান এডমিরাল শাহীন ইকবাল।
সার্বভৌমত্ব বজায় রাখার সংগ্রামের অনন্য নিদর্শন
কুচাকাওয়াজে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সুযোগ্য নেতৃত্বে সশস্ত্র বাহিনীর আধুনিকায়ন ও দুর্বার অগ্রযাত্রার বিষয়টি মোটা দাগে উপস্থাপন করা হয়। এই প্রদর্শনীর অংশ হয় সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ও। আর্মি এভিয়েশন, নেভাল এভিয়েশন ও র্যাব ফোর্সেসের ফ্লাইপাস্ট, দুঃসাহসিক প্যারা কমান্ডো সদস্যদের ফ্রিফল জাম্প, অপারেশনের অ্যাকশন জানান দেয় দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব বজায় রাখার সংগ্রামের সংগ্রামে তাঁরা অপ্রতিরোধ্য, দুর্বার এবং দুরন্ত। প্রস্তুত জীবনবাজিতেও।
আন্ত:বাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) জানিয়েছে, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনায় সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের তত্ত্বাবধানে এবং বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ৯ পদাতিক ডিভিশনের ব্যবস্থাপনায় অনুষ্ঠিত কুচকাওয়াজের শুরুতেই জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ম্যুরাল ও সাতজন বীরশ্রেষ্ঠর প্রতিকৃতি প্রদর্শনীর পরই সুসজ্জিত বাহনে মুক্তিযোদ্ধা কন্টিনজেন্ট রাষ্ট্রপতিকে সালাম জানান। চিত্তাকর্ষক যান্ত্রিক বহরে সশস্ত্র বাহিনীর পাশাপাশি সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রমের আকর্ষণীয় ও সুসজ্জিত গাড়িবহর অংশগ্রহণ করে।

যান্ত্রিক বহরের প্রদর্শনীর পরপরই শুরু হয় বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর এক মনোজ্ঞ ফ্লাইপাস্ট ও অ্যারোবেটিক ডিসপ্লে। বিমানবাহিনীর ফ্লাইপাস্টের নেতৃত্ব দেন এয়ার ভাইস মার্শাল হাসান মাহমুদ খান।
কুচকাওয়াজ অনুষ্ঠানটি বাংলাদেশ টেলিভিশন, বাংলাদেশ বেতারসহ অন্যান্য বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলে সরাসরি সম্প্রচার করা হয়। নতুন প্রজন্মের কাছে মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস তুলে ধরার লক্ষ্যে জাতীয় প্যারেড স্কয়ারসহ প্যারেড গ্রাউন্ডে আসার পথে ঢাকা শহরের সার্ক ফোয়ারা থেকে জাহাঙ্গীর গেট, বিজয় সরণি, বিজয় চত্বর, গণভবন থেকে রোকেয়া সরণি হয়ে আগারগাঁও এবং রাসেল চত্বর হয়ে আমিন বাজার পর্যন্ত সড়কগুলোতে মহান স্বাধীনতাযুদ্ধ ও বিজয় দিবসের চেতনা–সংবলিত ব্যানার ও বিলবোর্ড স্থাপন করা হয়।
প্যারেড গ্রাউন্ডে বর্তমান সরকারের বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড ছাড়াও কুচকাওয়াজে অংশগ্রহণকারী সব বাহিনীর উল্লেখযোগ্য কর্মকাণ্ডের ছবি প্রদর্শন করা হয়। প্যারেড গ্রাউন্ডের সাজসজ্জা এবং পোডিয়ামের উভয় পাশে স্থাপিত বিভিন্ন বিলবোর্ড ও ফেস্টুনে ফুটিয়ে তোলা হয় আমাদের স্বাধীনতার প্রতীক জাতীয় পতাকার লাল ও সবুজ রঙ।

কালের আলো/এমএএএমকে