অন্ধকার তাড়িয়ে শতভাগ বিদ্যুতের আলোয় দেশ

প্রকাশিতঃ 12:00 am | March 21, 2022

এম.আব্দুল্লাহ আল মামুন খান, অ্যাকটিং এডিটর :

দেশের সব মানুষের কাছে বিদ্যুৎ সেবা পৌঁছে দিয়েছে সরকার। অবিশ্বাস্য নয়, এটিই বাস্তবতা। বঙ্গবন্ধুকন্যা, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যখন ‘ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ’ পৌঁছে দেওয়ার দৃঢ় অঙ্গীকার করেছিলেন তখন সম্ভবত অনেকেই বিশ্বাস করেননি। স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী, মুজিববর্ষে একটি ঘরও বিদ্যুতের আলোহীন থাকবে না-বারবার উচ্চারণ করেছেন প্রধানমন্ত্রী। ‘কোন কিছুই ভালো লাগে না’ রোগে আক্রান্তদের মুখ হয়েছে মলিন।

আরও পড়ুনঃ দুর্বোধ্য স্বপ্নময় স্বপ্নের বাস্তবায়ন, ফুরফুরে মেজাজে বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী

নিজের আরও একটি বড় প্রতিশ্রুতি রক্ষার সফল এক উদাহরণই তৈরি করেছেন প্রধানমন্ত্রী। ঠিকই দেশের শতভাগ মানুষকে তিনি বিদ্যুতের আলোয় আলোকিত করেছেন। উদ্ভাসিত করেছেন পুরো দেশকে। শতভাগ বিদ্যুতের মাধ্যমে উন্নয়ন-অগ্রগতির অভূতপূর্ব স্মারকে নতুন মাত্রা যোগ করেছেন সরকারপ্রধান শেখ হাসিনা।

লাল-নীল আলোর ঝর্ণাধারায় ভাসিয়ে দিয়েছেন দেশের প্রতিটি প্রান্ত। চর কুকড়ি-মুকড়ি থেকে দুর্গম পাহাড়-আঁধার তাড়িয়েছেন সর্বত্র। সূর্যের আলো চলে যাওয়ার পর বিচ্ছিন্ন দ্বীপের গ্রামে সন্ধ্যার পর নেই ঘুটঘুটে অন্ধকার বা সুনসান নীরবতা। হারিকেন বা কুপিবাতি হয়েছে বিলীন! সবখানেই এখন আলোর ছোঁয়া।

জাতীয় গ্রিডের আওতায় থাকা সব গ্রাম ও পরিবার বিদ্যুৎসেবার আওতায় এসেছিল আগেই। বাকী ছিল শুধুমাত্র গ্রিড এলাকার বাইরে থাকা ৩ লাখ ৭ হাজার ২৪৬ পরিবার। এই পরিবারগুলোও এখন পাল্টে গেছে বিদ্যুতের আলোয়। দেশের সব নাগরিককে বিদ্যুৎসেবার আওতায় আনার ঐতিহাসিক মাইলফলক অর্জিত হয়েছে। বিদ্যুতের ছোঁয়ায় বদলাতে শুরু করেছে দেশের মানুষের জীবনযাত্রার মান।

অপেক্ষা ছিল কেবলমাত্র আনুষ্ঠানিক ঘোষণার। সেই প্রতীক্ষারও অবসান হতে যাচ্ছে। আজ সোমবার (২১ মার্চ) দক্ষিণ এশিয়ায় শতভাগ বিদ্যুতায়িত দেশের কাতারে যুক্ত হতে যাচ্ছে বাংলাদেশের নাম। বঙ্গবন্ধুকন্যা, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আজ শতভাগ বিদ্যুতায়নের ঘোষণা দেবেন।

এদিন পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলার ধানখালীতে নির্মিত ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন দেশের সবচেয়ে বড় পায়রা তাপবিদ্যুৎকেন্দ্র সশরীরে গিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করার মাধ্যমে ঐতিহাসিক এই মাইলফলক অর্জনের কথাও উচ্চারণ করবেন। এই বিদ্যুৎকেন্দ্রের মাধ্যমে ১৩ আল্ট্রা সুপারক্রিটিক্যাল প্রযুক্তি ব্যবহারের তালিকাতেও নাম পোক্ত করেছে বাংলাদেশ।

এই ধাঁচের বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে বাংলাদেশ বিশ্বের ১৩তম দেশ। এশিয়ায় সপ্তম ও দক্ষিণ এশিয়াতে বাংলাদেশ ছাড়া শুধু ভারতে এ রকমের একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র রয়েছে। এশিয়ার চীন, তাইওয়ান, জাপান ও মালয়েশিয়াতে আলট্রা সুপার ক্রিটিক্যাল প্রযুক্তির বিদ্যুৎকেন্দ্র রয়েছে। খবর সংশ্লিষ্ট সূত্রের।

বিদ্যুৎখাতে প্রবৃদ্ধির কারণে দেশব্যাপী কর্মচঞ্চলতা তৈরি হয়েছে বলে মনে করেন বিদ্যুৎ জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বিপু। এখন তাঁর সামনে দু’টি চ্যালেঞ্জ। নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিতের পাশাপাশি সহনীয় দামে মানুষের কাছে বিদ্যুৎসেবা পৌঁছে দেওয়া। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার এই বিশ্বস্ত ‘রানিংমেট’ কঠিন এসব চ্যালেঞ্জেও উত্তীর্ণ হবেন। শতভাগ বিদ্যুতায়নের পরিপূর্ণ ব্যবহার নিশ্চিতে বিতরণ ব্যবস্থার দূর্বলতা দূর করতেও সক্ষম হবেন, এমন প্রত্যাশা বিশ্লেষকদের।

বিদ্যুৎ জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ গণমাধ্যমের সঙ্গে আলাপে জানিয়েছেন, দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা পাঁচগুণ বেড়েছে। ক্যাপটিভ ও নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎসহ দেশে এখন সক্ষমতা ২২ হাজার ৫১৪ মেগাওয়াট। আরো ১৩ হাজার মেগাওয়াট ক্ষমতার বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণাধীন অবস্থায় রয়েছে। সারাদেশে এখন আমাদের গ্রাহক সংখ্যা প্রায় সাড়ে ৩ কোটি।

দক্ষিণ এশিয়ায় শতভাগ বিদ্যুতায়িত দেশের কাতারে বাংলাদেশ প্রবেশ করলেও বহুদূর পেছনে রয়েছে একাত্তরের পরাজিত শক্তি পাকিস্তান। দেশটিতে বিদ্যুতের আওতায় এসেছে মাত্র ৭৩ দশমিক ৯ শতাংশ মানুষ। এগিয়ে রয়েছে মহান মুক্তিযুদ্ধে অকৃত্রিম বন্ধু ভারত থেকেও। ভারতে এই হার ৯৭ দশমিক ৮ শতাংশ। দক্ষিণ এশিয়ায় শতভাগ মানুষকে বিদ্যুতের আওতায় আনা দেশগুলোর তালিকায় বাংলাদেশের সঙ্গী শ্রীলংকা, মালদ্বীপ আর ভুটান।

সংশ্লিষ্ট বিদ্যুৎ বিভাগ সূত্র জানায়, ২০০৮ সালের প্রথম মেয়াদে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ সরকার গঠনের পর ২০০৯ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত বিদ্যুৎ সুবিধার আওতায় ছিলেন দেশের মাত্র ৪৭ শতাংশ মানুষ। এরপর গত এক যুগে বাকি ৫৩ শতাংশ মানুষ বিদ্যুৎ সংযোগের আওতায় আসেন। ২০০৯ সালে গ্রাহক সংখ্যা ছিল এক কোটি আট লাখ। গত ১৩ বছরে তিন কোটি ১৩ লাখ বেড়ে বর্তমানে বিদ্যুতের গ্রাহক সংখ্যা চার কোটি ২১ লাখ।

২০০৯ সালে দেশে মোট বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা ছিল চার হাজার ৯৪২ মেগাওয়াট। বর্তমানে এ ক্ষমতা ২৫ হাজার ৫১৪ মেগাওয়াট (ক্যাপটিভ ও নবায়নযোগ্যসহ)। দেশের সব অফগ্রিড এলাকায় বিদ্যুৎ পৌঁছে দেওয়ার মধ্যে দিয়ে অর্জিত হয়েছে শতভাগ বিদ্যুতের মাইলফলক। সম্ভব সব এলাকায় সঞ্চালন লাইন স্থাপনের মাধ্যমে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হচ্ছে। একেবারে দুর্গম এলাকাগুলোতে সোলার প্যানেল স্থাপনের মাধ্যমে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হচ্ছে।

একই সূত্র জানায়, এখন জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হয়েছে মোট ১৯ হাজার ৬২৬ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ। নির্মাণাধীন রয়েছে ১৩ হাজার ২১৯ মেগাওয়াট ক্ষমতার ৩৩টি বিদ্যুৎ কেন্দ্র। আমদানি করা হচ্ছে ভারত থেকেও। বর্তমানে দেশটি থেকে আমদানি হচ্ছে ১ হাজার ১৬০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ। স্থাপন করা হয়েছে ৫ হাজার ২১৩ সার্কিট কিলোমিটার সঞ্চালন লাইন। এছাড়া মোট ৩ লাখ ৬১ হাজার কিলোমিটার বিতরণ লাইন নির্মাণ করা হয়েছে। মাথাপিছু বিদ্যুৎ উৎপাদন ২২০ কিলোওয়াট আওয়ার থেকে ৫৬০ কিলোওয়াট আওয়ারে উন্নীত হয়েছে। সিস্টেম লস কমেছে ৫ দশমিক ৮৫ শতাংশ। স্থাপন করা হয়েছে ৪৬ লাখ ৭৭ হাজার প্রি-পেইড/স্মার্ট মিটার।

কী বলছেন বিদ্যুৎ জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী?
গত সোমবার (১৪ মার্চ) বিদ্যুৎ ভবনে পায়রা তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র এবং শতভাগ বিদ্যুতায়নের ঘোষণা সংক্রান্ত বিষয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে বিদ্যুৎ জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বিপু উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেন দেশের বিদ্যুৎ খাতের ধারাবাহিক উন্নয়নে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দক্ষ নেতৃত্বের। সেদিন তিনি বলেন, ‘আমরা শীত মৌসুমে এবং অফ পিক আওয়ারে উদ্বৃত্ত বিদ্যুৎ রফতানির পরিকল্পনা নিয়েছি। ই-টেন্ডারিং, ই-ফাইলিং ও সমন্বয় সভার জন্য অনলাইন ভিত্তিক সফটওয়্যার চালুর মাধ্যমে বিদ্যুৎ খাতে ডিজিটাল পদ্ধতির প্রবর্তন করছি। টেকসই উন্নয়ন এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অব্যাহতভাবে এগিয়ে নিতে বিদ্যুৎ খাত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে চলেছে। বিদ্যুৎ খাতের পরিকল্পনাগুলো সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে প্রধানমন্ত্রীর ঘোষিত ভিশন বাস্তবায়ন করে ২০৪১ সালের মধ্যে বাংলাদেশ একটি উন্নত সমৃদ্ধ দেশে পরিণত হবে বলে আমরা বিশ্বাস করি।’

সংবাদ সম্মেলনে বিদ্যুৎ জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বিপু আরও বলেন, ‘১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্রেটির প্রকল্প বাস্তবায়নে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জন্য পুনর্বাসন প্রকল্প ‘স্বপ্নের ঠিকানা’ বাস্তবায়ন করার মাধ্যমে আমরা ভূমি অধিগ্রহণের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত মোট ১৩০টি পরিবারের কাছে চাবি ও দলিলাদি হস্তান্তর করেছি। এছাড়া প্রকল্প এলাকায় এলাকার জনগণের কারিগরি শিক্ষা উন্নয়নে স্থাপিত মাধ্যমিক স্তরের (ভোকেশনাল) ইন্সটিটিউট ২০২০ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারিতে শিক্ষা কার্যক্রম শুরু করেছে। তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি পুনর্বাসন প্রকল্পে কমিউনিটি ক্লিনিক, মসজিদ, কমিউনিটি সেন্টার, ঘূর্ণিঝড়, আশ্রয়কেন্দ্র, খেলার মাঠ ইত্যাদি স্থাপন করা হয়েছে। বিদ্যুৎ কেন্দ্র এলাকায় সবুজ বনায়ন কর্মসূচিও গ্রহণ করা হয়েছে।

২০৪১ সালের মধ্যে ৬০ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা
পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডও (বিআরইবি) বলছে, বিদ্যুতের সেবা পৌঁছে গিয়েছে জাতীয় গ্রিডের আওতায় থাকা সব গ্রাম ও পরিবার। গ্রিড এলাকার বাইরে থাকা সব দুর্গম এলাকার বাসিন্দারাও পেয়েছেন বিদ্যুতের আলো। ‘শেখ হাসিনার উদ্যোগ, ঘরে ঘরে বিদ্যুত’ এই স্লোগানকে সামনে রেখে সবার জন্য নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ সুবিধা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ইতোমধ্যে ২৪ হাজার মেগাওয়াট উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হয়েছে এবং ২০৩০ সালের মধ্যে ৪০ হাজার মেগাওয়াট ও ২০৪১ সালের মধ্যে ৬০ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা পূরণকল্পে বিভিন্ন পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে, যার সুফল মানুষ ইতোমধ্যে পেতে শুরু করেছে। ফলে আর নতুন তৈরি হওয়া কিছু ঘর-বাড়ি ছাড়া দেশের সব জায়গাই বিদ্যুতায়িত হয়েছে বলে জানিয়েছেন বিদ্যুৎ, জ¦ালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বিপু।

রোববার (২০ মার্চ) বিকেলে পায়রা তাপবিদ্যুৎকেন্দ্র পরিদর্শনকালে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বিপু গণমাধ্যমকে বলেছেন, ‘সময়ের আগেই কাজ শেষ হয়ে গেছে। করোনা বাস্তবতার কারণে প্রধানমন্ত্রী এখন উদ্বোধন করছেন।’

প্রধানমন্ত্রী শতভাগ বিদ্যুতায়নের ঘোষণা দেবেন জানিয়ে তিনি বলেন, ‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রী মুজিববর্ষে সবাইকে বিদ্যুৎ দিতে চেয়েছিলেন, দিয়ে ফেলেছি।’ এ বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণসহ এ অঞ্চলের উন্নয়নে নেওয়া সরকারের অন্যান্য প্রকল্পগুলো বাস্তবায়ন হলে এখানকার অর্থনীতি আরও শক্তিশালী হবে এবং কর্মচাঞ্চল্য ফিরে আসবে বলে আশা প্রকাশ করেন বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী।

রোববার পায়রা তাপবিদ্যুৎকেন্দ্রে বিসিপিসিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী এ এম খোরশেদুল আলম সাংবাদিকদের বলেন, ‘পায়রা তাপবিদ্যুৎকেন্দ্র উদ্বোধন উপলক্ষে সব ধরনের প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে। উদ্বোধনের পরই প্রধানমন্ত্রী দেশে শতভাগ বিদ্যুতায়নের ঘোষণা দেবেন।’

কালের আলো/বিএস/এমএন