শ্রীলঙ্কা হওয়ার আশঙ্কা নেই বাংলাদেশের; মুখ্য সচিবের বক্তব্যের সঙ্গে একমত চার সচিব
প্রকাশিতঃ 11:00 pm | April 12, 2022

বিশেষ সংবাদদাতা, কালের আলো:
অর্থনীতিতে এক মরণদশায় রয়েছে শ্রীলঙ্কা। ধসে পড়েছে দেশটির অর্থনীতি। এমন বাস্তবতায় বাংলাদেশে রাজনীতির বক্তৃতাবাজিতে আর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আশঙ্কা করা হচ্ছে বাংলাদেশের পরিণতিও না কী শ্রীলঙ্কার মতোই হতে যাচ্ছে। অথচ ভারত মহাসাগরীয় এই দ্বীপরাষ্ট্রটি যেসব ভুল করেছে তাঁর একটিও করেনি বাংলাদেশ। প্রধানমন্ত্রী সংসদে এই আশঙ্কাকে দৃঢ়তার সঙ্গেই উড়িয়ে দিয়েছেন ক’দিন আগেও।
তিন ঘন্টা সময় ব্যয় করে চূলচেরা বিশ্লেষণের মাধ্যমে মঙ্গলবারও (১২ এপ্রিল) প্রধানমন্ত্রী নিশ্চিত হয়ে বলেছেন বাংলাদেশ শ্রীলঙ্কা হওয়ার কোন আশঙ্কা নেই। এদিন গণভবনে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড ও অর্থ বিভাগ ‘offshore Tax Amnesty’ এবং ‘শ্রীলঙ্কার অর্থনৈতিক সঙ্কটের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের সামস্টিক অর্থনীতি পর্যালোচনা’ শীর্ষক উপস্থাপনা অবলোকন করেন প্রধানমন্ত্রী।
বাংলাদেশের বৈদেশিক ঋণ পরিশোধে বড় কোনও ঝুঁকির আশঙ্কা নেই বলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত এই পর্যালোচনা সভায় অভিমত ব্যক্ত করেন সবাই। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় বিষয়টি সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে বিষয়টি জানিয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে শ্রীলঙ্কার সঙ্গে বাংলাদেশকে তুলনা করাকে দুঃখজনক উল্লেখ করেছেন প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব ড. আহমদ কায়কাউস।
তিনি অমিত দৃঢ়তায় বলেছেন, ‘বাংলাদেশ শ্রীলঙ্কা থেকে অনেক দূরে আছে। বাংলাদেশকে শ্রীলঙ্কার সঙ্গে তুলনা করার চেয়ে লজ্জাকর আর কিছু হতে পারে না। এই সরকার, বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রী প্রতিটি পদক্ষেপ নিয়েছেন বিচার বিশ্লেষণ করে।’
বাংলাদেশের সঙ্গে শ্রীলঙ্কার বর্তমান পরিস্থিতি পর্যালোচনার জন্য প্রধানমন্ত্রী তিন ঘণ্টা সময় ব্যয় করেছেন উল্লেখ করে ড.কায়কাউস আরও বলেছেন, ‘প্রধানমন্ত্রী প্রতিটি তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করেছেন। তিনি প্রতিটি তথ্য-উপাত্ত ঘেঁটে নিশ্চিত হয়েছেন যে বাংলাদেশ শ্রীলঙ্কা হওয়ার আশঙ্কা নেই।’
দেশের সার্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে মঙ্গলবার (১২ এপ্রিল) প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় আয়োজিত এই সংবাদ সম্মেলনকে বেশ তাৎপর্যপূর্ণ ও গুরুত্ববহ বলেই মনে করা হচ্ছে। বিশেষ করে বাংলাদেশের পরিণতিও শ্রীলঙ্কার মতো হবে কি না, তা নিয়ে নানা লেখা ঘুরছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। বিরোধী দলের নেতারাও বক্তৃতায় প্রসঙ্গটি তুলে ধরে মুখে ফেনা তুলছেন।
অনেক বিদ্যাজীবী, বুদ্ধিজীবীরা আগাম সতর্ক সংকেত দিচ্ছেন। এমন সময়ে প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব ড.আহমদ কায়কাউসের বক্তব্যের সঙ্গে একমত হয়ে লঙ্কান পরিস্থিতির আশঙ্কাকে ফুৎকারেই উড়িয়ে দিয়েছেন অর্থ মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব আব্দুর রউফ তালুকদার, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যান ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগের সিনিয়র সচিব আবু হেনা মো. রহমাতুল মুনিম, অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের সচিব ফাতিমা ইয়াসমিন, আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব শেখ মোহাম্মদ সলীম উল্লাহ।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় আয়োজিত এই সংবাদ সম্মেলন দেশবাসীকে আশ্বস্ত করেছে। মনগড়া কোন বক্তব্য নয়, প্রয়োজনীয় তথ্য-উপাত্তের অনুপুঙ্খ বিশ্লেষণের মাধ্যমে বাংলাদেশ ও শ্রীলঙ্কার পরিস্থিতি যে আলাদা তার তুলনামূলক চিত্র উপস্থাপন করে তাঁরা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছেন। উল্টো এমন তুলনাকে লজ্জাকর ও দু:খজনক বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখ্য সচিব ড.আহমদ কায়কাউস।

এর আগে প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতিতে পর্যালোচনা সভায় শ্রীলঙ্কার চলমান সঙ্কটের কারণ ও এর প্রতিক্রিয়া নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের অর্থনীতির বিভিন্ন সূচক পর্যালোচনা করে দেখা হয়, প্রায় সব সূচকেই বাংলাদেশের অর্থনীতি তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল অবস্থায় আছে। তবে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি, খাদ্যপণ্য ইত্যাদির অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে আমদানিকৃত মূল্যস্ফীতি হিসেবে সৃষ্ট অভ্যন্তরীণ বাজারে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ রাখতে একটি সমন্বিত রাজস্ব নীতি ও মুদ্রানীতি বাস্তবায়নের ওপর জোর দেওয়া হয়।
অর্থনীতির বিভিন্ন সূচক বিশ্লেষণ করে দেখা যায় যে মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদে বাংলাদেশের বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের বড় কোনও ঝুঁকির আশঙ্কা নেই। বাংলাদেশের বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ এখনও ঝুঁকিসীমার অনেক নিচে রয়েছে এবং এই ধারা সামনের সময়ে অব্যাহত রাখতে সংশ্লিষ্ট সবাইকে প্রধানমন্ত্রী নির্দেশ প্রদান করেন।
প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিবের প্রশ্ন তাঁরা কতটা লজ্জিত হবেন?
সংবাদ সম্মেলনে পদ্মা সেতু, বাজেট বাস্তবায়নসহ নানা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার প্রসঙ্গ টেনে আনেন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখ্য সচিব ড.আহমদ কায়কাউস। তিনি বলেন, ‘আমার আজকে খুব উষ্মার সঙ্গে বলতে হচ্ছেÑআমরা এতবার প্রমাণ করেছি আমরা পারি এবং এরপরেও এই আশঙ্কা প্রকাশ করছেন, তারা যে ভুল প্রমাণিত হয়েছেন, এ জন্য তারা কতটুকু লজ্জিত হবেন? আমার শুধুমাত্র সেই প্রশ্নটা থাকা উচিত।’
আহমদ কায়কাউস বলেন, ‘আমরা প্রধানমন্ত্রীকে আগেও বলেছি বাংলাদেশের শ্রীলঙ্কা হওয়ার সুযোগ নেই। কিন্তু তিনি নিজে প্রতিটি তথ্য-উপাত্ত ঘেঁটে নিশ্চিত হয়েছেন যে হ্যাঁ, ঠিকই বলেছো। তার আগে কিন্তু বলেননি। এটিই আমাদের প্রধানমন্ত্রীর বৈশিষ্ট্য।’
প্রায় একযুগ ধরে দেশে হায় হায় রব তৈরির একটি প্রবণতা সৃষ্টি হয়েছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এই সর্বোচ্চ কর্মকর্তা বলেন, ‘যখন আমরা অর্থনীতির দিক থেকে উল্লাসিত, সেই সময় এসব কথা বলে জাতীয় অর্জনটাকে নিয়ে হাসি-তামাশা করি, এর থেকে দুঃখজনক কিছু হতে পারে না।’
এক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব ড. আহমদ কায়কাউস বলেন, ‘বর্তমানে যে পরিস্থিতি আছে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে যে মূল্য বৃদ্ধি পেয়েছে, তাতে এমন কোনও চাপ আসবে না যে বাংলাদেশ ভেঙে পড়বে। তারপরও প্রধানমন্ত্রী আমাদের সতর্ক করেছেন, যাতে এটাকে আমরা মাথায় রাখি।’
আন্তর্জাতিক বাজার বা যুদ্ধের কারণে অনিশ্চয়তা দেখা দিলে কী হবে, সেটার জন্যই প্রধানমন্ত্রী বিস্তারিতভাবে বসেছেন, জেনেছেন এবং আমাদের কিছু দিকনির্দেশনা দিয়েছেন। আমরা এসব বিষয়ে প্রয়োজনীয় যেসব কার্যক্রম গ্রহণ করা দরকার, তা গ্রহণ করেছি এবং পর্যায়ক্রমে করবো।’
কিছু ভোগ্যপণ্যের দাম বাড়লেও সরকারের পদক্ষেপে তা মোটামুটি সহনীয় পর্যায়ে এসেছে বলে তিনি জানান। আন্তর্জাতিক বাজারে ক্রমান্বয়ে মূল্যস্ফীতি হলে কিছু পণ্যের দাম বাড়াতে হবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আমাদের অ্যাডজাস্ট করার জন্য হয়তো এটা করতে হবে। এক্ষেত্রে কোনও ম্যাজিকও নেই। আবার লুকানোরও কিছু নেই।’
আন্তর্জাতিক বাজারে বাড়লেও এখন পর্যন্ত সরকার জ্বালানির মূল্য বৃদ্ধির কথা চিন্তা করছে না উল্লেখ করে ড. আহমদ কায়কাউস বলেন, ‘তবে এই মূল্য বৃদ্ধির কারণে বাজেটের ওপরে চাপ পড়ছে। আর এটাকে কীভাবে অ্যাডজাস্ট করা যায়, সেটা এক্সসারসাইজ করছি।’
অপর এক প্রশ্নের জবাবে মুখ্য সচিব বলেন, ‘সব প্রজেক্টে সরকার এমনভাবে অর্থায়ন করেছে, যাতে আমাদের বিপদগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা নেই। আমরা এমন কোনও বড় প্রকল্প নেইনি, যেটাতে ইনকাম সোর্স নেই।’
শ্রীলঙ্কা ও পাকিস্তানের তৈরি পোশাকের রফতানি বাজার বাংলাদেশ ধরার উদ্যোগ নেবে কিনা, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আমাদের তৈরি পোশাক রফতানি বেড়েছে। এর অর্থ আমরা অন্যদের বাজারে ঢুকতে পেরেছি। তবে কারও দুর্দশাকে নিজেদের জন্য পুঁজি করতে চাই না।
আমরা নিজেরা সক্ষমতা নিয়ে এগোতে চাই। সক্ষমতা থাকলে অনেকেই এগিয়ে আসবে। আমরা চাই শ্রীলঙ্কা-পাকিস্তান ভালো থাকুক। আমরাও ভালো থাকি। আর আমাদের লক্ষ্য শ্রীলঙ্কা কিংবা পাকিস্তান নয়। আমাদের লক্ষ্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ ও চীন। তাদের সঙ্গে আমরা কমপিট করছি। ইনশাআল্লাহ, আমরা তা করতে পারবো। দুর্বলের সঙ্গে কমপিট করার কিছু নেই।’
অপর এক প্রশ্নের জবাবে ড. কায়কাউস বলেন, ‘বৈদেশিক ঋণের বিষয়ে বাংলাদেশ কখনও কোনও ট্রাপে পড়েনি। বাংলাদেশ কোনও সিঙ্গেল দেশের ওপর নির্ভর করেনি। আমাদের টোটাল বৈদেশিক ঋণের ৭.৮ ভাগ হচ্ছে চীনের। অর্থাৎ কখনোই আমরা চীনের ওপর নির্ভর করিনি। এখনও করছি না।’
ড. আহমদ কায়কাউস বলেন, ‘আমাদের জিডিপির মাত্র ১২ শতাংশ বৈদেশিক ঋণ রয়েছে এবং শ্রীলঙ্কায় এর পরিমাণ দেশটির জিডিপির প্রায় ৪৮ শতাংশ। শ্রীলঙ্কার বৈদেশিক ঋণের সুদের হার ৭ দশমিক ৫ শতাংশ। আর আমাদের সেখানে সুদের হার মাত্র ১ দশমিক ৪ শতাংশ। কাজেই সামষ্টিক অর্থনীতি নিয়ে আমরা শ্রীলঙ্কা কেন, পাকিস্তান বা কারও সঙ্গে তুলনা করতে চাই না। আমরা মনে করি, আমরা নিজস্ব গতিতে চলছি। বাংলাদেশ তার নিজস্ব গতিতে এগিয়ে যাচ্ছে। প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে গত ১৩ বছরে দেশ যেভাবে এগিয়ে গেছে, এভাবে আগামীতেও যাবে।’
তিনি বলেন, ‘একটি দেশ যখন ঋণ শোধ করতে পারে না, তখন দেউলিয়া হয়। কিন্তু আমাদের যে ঋণ আছে, তা আগামী ৫ থেকে ১০ বছরও যদি ধরি, তাহলে ঋণ পরিশোধের কোনও একটি কিস্তি ফেল করার কোনও ধরনের আশঙ্কা নেই।’
‘যারা শ্রীলঙ্কার সঙ্গে বাংলাদেশকে তুলনা করেন, তারা দেশকে হেয় করেন’
প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিবের সঙ্গে একমত প্রকাশ করে অর্থ মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব আব্দুর রউফ তালুকদার বলেন, ‘যারা শ্রীলঙ্কার সঙ্গে বাংলাদেশকে তুলনা করে তারা বাংলাদেশকে হেয় করে। কোনোভাবেই এটা তুলনা করার কোনো কারণ নাই। ’
বাংলাদেশ ও শ্রীলঙ্কার পরিস্থিতি ভিন্ন এ বিষয়ে তথ্য-উপাত্ত তুলে ধরে অর্থ সচিব বলেন, ‘আমাদের বৈদেশিক যে ঋণ আছে তা জিডিপির মাত্র ১২ শতাংশ। যেটা শ্রীলঙ্কার হলো প্রায় ৪৮ শতাংশ। শ্রীলঙ্কা যে ঋণটা করেছে বিদেশ থেকে তার সুদের হার হলো গড়ে ৭.৫ শতাংশ। আর আমরা যে বিদেশ থেকে ঋণ এনেছি তার সুদের হার হলো ১.৪ শতাংশ। ’
‘এই সব তথ্য-উপাত্ত থেকে আমরা বলতে চাচ্ছি, আমাদের দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির যে অবস্থা, তার সঙ্গে বা পাকিস্তান কারো তুলনা করতে চাই না। আমরা আমাদের নিজস্ব গতিতে এগিয়ে চলছি। ’
অর্থ সচিব বলেন, ‘একটা দেশ দেউলিয়া হয় কখন, যখন সে তার ঋণ শোধ করতে পারে না। আমাদের যে ঋণ আছে আগামী ৫-১০ বছরও যদি ধরি তাহলে ঋণ পরিশোধে কোনো একটা ইনস্টলমেন্ট ফেইল করার সম্ভাবনা নেই। ’
আব্দুর রউফ তালুকদার বলেন, ‘আমাদের দক্ষিণ এশিয়াতে চারটা বড় ইকোনমি। শ্রীলঙ্কা, পাকিস্তান, ভারত ও বাংলাদেশ। চারটার তথ্য-উপাত্ত যদি আপনারা দেখেন, এখানে জিডিপিতে ভারত আমাদের চেয়েও বড়। দ্বিতীয় আমরা, তৃতীয় পাকিস্তান ও চতুর্থ শ্রীলঙ্কা। পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কার জিডিপির চেয়ে বাংলাদেশের ডিজিপি বড়। বাংলাদেশ যে এক্সপোর্ট করে, শ্রীলঙ্কা ও পাকিস্তান যে এক্সপোর্ট করে- এ দুটোর যোগফলের চেয়ে বেশি বাংলাদেশ এক্সপোর্ট করে। আপনি যদি বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভ দেখেন, সেখানেও এই দুই দেশের দ্বিগুণ রিজার্ভ আমাদের কাছে আছে। ’
বাংলাদেশের অগ্রসরমান অর্থনৈতিক অবস্থার চিত্র তুলে ধরে অর্থ সচিব বলেন, ‘আমাদের গত অর্থবছরে প্রায় ৬.৯৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে। আগামী অর্থবছরে এটা ৭.২ এর ওপরে থাকবে বলে আমরা আশাবাদী। ’
‘সরকার যুক্তিসঙ্গতভাবে কর সমন্বয় করে থাকে’
সরকার যুক্তিসঙ্গতভাবে কর সমন্বয় করে থাকে উল্লেখ করে অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগের সিনিয়র সচিব ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যান আবু হেনা মো. রহমাতুল মুনিম বলেন, ‘বলা হচ্ছে, রাজস্ব নীতির ভুল পলিসির জন্য শ্রীলঙ্কার আজকের পরিণতি। আমরাও অনেক কিছুকে রাজস্ব পলিসিতে ছাড় দিচ্ছি। করভার লাঘবের চেষ্টা করছি। কিন্তু আমাদের এটা কর ছাড় নয়, সমন্বয় বলতে পারেন। আর এক্ষেত্রে আমরা পজিটিভ ইমপ্যাক্ট পেয়েছি। এখনও কোনও নেগেটিভ ইমপ্যাক্টে পাইনি। আমরা অর্থনীতির ইতিবাচক প্রভাব, কর্মসংস্থান ইত্যাদি বিষয় দেখে করের বোঝা কমাচ্ছি। এতে আমাদের ওভার অল রেভিনিউ বেড়েছে।’
‘এই ঋণ ঝুঁকিমুক্ত, সহজ শর্ত এবং নমনীয়’
শ্রীলঙ্কা ও বাংলাদেশের বৈদেশিক ঋণের তুলনামূলক বিশ্লেষণ করে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের সচিব ফাতিমা ইয়ামমিন বলেন, ‘আমরা দ্বিপাক্ষিক, বহুপাক্ষিক ও সরকারি সংস্থা থেকে বৈদেশিক ঋণ নিয়ে থাকি। এই ঋণ ঝুঁকিমুক্ত, সহজ শর্ত এবং নমনীয়। এই ঋণের গ্রেস পিরিয়ড ও পরিশোধকাল দীর্ঘ। শ্রীলঙ্কার বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ ৩৫ বিলিয়ন ডলার। প্রতি বছর তাদের সাড়ে সাত বিলিয়ন পরিশোধ করতে হয়। আর আমাদের ঋণের পরিমাণ ৫০ বিলিয়ন ডলার। কিন্তু আমাদের শোধ করতে হয় আড়াই বিলিয়ন ডলার। আমাদের সুদের হার গড়ে এক দশমিক ৪ শতাংশ, পরিশোধ কাল তিন বছর।
আমরা ঋণ ব্যবহারও সচেতনভাবে করে থাকি। তুলনামূলকভাবে বেশি নমনীয় ঋণ থেকে আমরা সোশাল প্রজেক্ট করি এবং যে ঋণ তুলনামূলকভাবে কম নমনীয়, সেটা অবকাঠামো বা যেসব প্রজেক্টে রিটার্ন আছে, সেখানে খরচ করি। শ্রীলঙ্কা দ্বিপাক্ষিক, বহুপাক্ষিক, বাণিজ্যিক ও সভরেন বন্ডের জন্য ঋণ পরিশোধ করছে। সভরেন বন্ড ও বাণিজ্যিক ঋণের সুদের হার ৭ শতাংশ এবং ৫ বছরের মধ্যে ফেরত দিতে হয়। আমাদের কোনও সভরেন বন্ড ও বাণিজ্যিক ঋণ নেই।’ আইএমএফ বলেছে, বাংলাদেশের বর্তমানে ও অদূর ভবিষ্যতে ঋণ পরিশোধ নিয়ে কোনও ঝুঁকি নেই বলে এই সচিব উল্লেখ করেন।
‘আগে বাংলাদেশ নিয়ে কেউ কোনও প্রশ্ন উত্থাপন করেননি’
আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব শেখ মুহম্মদ সলীম উল্লাহ বলেন, ‘আমাদের অর্থনীতির ইন্ডিকেটরগুলো সবসময়ই ভালো ছিল। কখনোই খারাপ ছিল না। গত ১৩ বছরে এই ইনডিকেটর উন্নয়নের দিকেই গেছে। আমাদের কোভিডের সময়ও উন্নয়নের গতি ধীর হয়নি।’
তিনি বলেন, ‘হঠাৎ করে শ্রীলঙ্কার বিষয়টি সামনে আসায় অনেকে আশঙ্কা করছেনÑবাংলাদেশ শ্রীলঙ্কা হয়ে যাচ্ছে কিনা? কিন্তু শ্রীলঙ্কার অবস্থা জানার আগ পর্যন্ত বাংলাদেশে এ নিয়ে কেউ কোনও প্রশ্ন উত্থাপন করেননি। করার কোনও যুক্তিও ছিল না, কারণও ছিল না। আমার মনে হয় না, কোনও অর্থনীতিবিদ বা কারও আমাদের চালকগুলো দেখে বলতে পারবেনÑআমরা শ্রীলঙ্কার দিকে যাচ্ছি, বা আমরা বিপদের মধ্যে আছি।’
এক প্রশ্নের জবাবে এই সচিব বলেন, ‘সরকারের আমদানি বন্ধ হবে না, তবে এক্ষেত্রে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসগুলোই আমরা অগ্রাধিকার দেবো। অযথা অপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র আমদানি কম করতে হবে। সেই বিষয়ে আমাদের সতর্ক দৃষ্টি থাকতে হবে।’
কালের আলো/এসবি/এনএল