উন্নয়নের মহাযাত্রা অপ্রতিরোধ্য গতিতেই

প্রকাশিতঃ 10:41 am | April 23, 2022

এম.আব্দুল্লাহ আল মামুন খান, অ্যাকটিং এডিটর :

সব সূচকেই অভাবনীয় অগ্রগতি। সাফল্য আর উন্নয়নের ফানুস উড়িয়ে দুর্বার গতিতে এগিয়ে যাওয়া দেশটি বাংলাদেশ। বিশ্বে বাংলাদেশ এখন শুধু উন্নয়নের রোল মডেলই নয়, মানবিক রাষ্ট্র হিসেবেও প্রশংসিত। কথিত তলাবিহীন ঝুড়ির দেশ নিজের টাকায় স্রোতস্বিনী পদ্মায় স্বপ্নের বড় সেতু করার দেশ।

স্বল্পোন্নত থেকে উন্নয়নশীল দেশের কাতারে উত্তরণে জাতিসংঘের সনদ পেয়েছে বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশ। অর্থনীতি, যোগাযোগ, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও শতভাগ বিদ্যুৎসহ গত এক যুগে দেশের সবক্ষেত্রেই আমূল পরিবর্তন এসেছে। দারিদ্র্য বিমোচন, নারীশিক্ষা, মাতৃ ও শিশুমৃত্যুর হার কমানো, তথ্যপ্রযুক্তির বিকাশ, ডিজিটাল বাংলাদেশ, প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় বাংলাদেশের অগ্রগতি নজর কেড়েছে বিশ্ব কর্তাদেরও।

সমৃদ্ধির উন্নয়নের মহাযাত্রায় বাংলাদেশ আজ বিশ্বের বিস্ময়। একটি চমকের নাম। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা, গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও অর্থনীতিবিদদের মুখে এখন কেবলই বাংলাদেশের জয়গান। ৭৮৬ কোটি টাকার বাজেট নিয়ে যাত্রা শুরু করা বাংলাদেশের বাজেট এখন ৬ লাখ ৩ হাজার ৬৮১ কোটি টাকা। দেশটি এশিয়ার ‘টাইগার ইকনোমি’ হয়ে উঠেছে। চলতি অর্থবছরে মাথাপিছু জিডিপিতে প্রতিবেশী ভারতকেও পেছনে ফেলেছে।

অর্থনীতির এ উত্থানকে ‘ছাই থেকে জন্ম নেওয়া ফিনিক্স’ বলে আখ্যায়িত করেছেন প্রখ্যাত সাংবাদিক মার্ক টালি। দেশটি এখন যে ধরনের অর্থনৈতিক বিকাশের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে সেটি অব্যাহত থাকলে ২০৩৬ সালের মধ্যে বিশ্বের ২৪তম বড় অর্থনীতিতে পরিণত হবে বাংলাদেশ। এখন যেখানে বাংলাদেশের অবস্থান ৪২তম। সম্প্রতি যুক্তরাজ্যভিত্তিক অর্থনৈতিক গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর ইকোনোমিক্স এন্ড বিজনেস রিসার্চ (সিইবিআর) তাদের সর্বশেষ এক প্রতিবেদনে এই পূর্বাভাস দিয়েছে। আর এসবই সম্ভব হয়েছে বঙ্গবন্ধুকন্যা, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ম্যাজিক নেতৃত্বের দৌলতেই।

দেশের মানুষের ভাগ্যোন্নয়নেই সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। গত ১৩ বছরে তিনি দেশের অর্থনীতির আকার এবং মাথাপিছু আয় প্রায় তিনগুণ বাড়িয়েছেন। দেশের অর্থনীতিকে আরও গতিশীল করে, ২০৩১ সালের মধ্যে উচ্চ-মধ্যম আয়ের এবং ২০৪১ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে উন্নত বিশ্বের কাতারে পৌঁছানোর পরিকল্পনা গ্রহণ করেছেন সরকারপ্রধান।

অপ্রতিরোধ্য গতিতে এই উন্নয়ন অভিযাত্রার সূচনা হয়েছিল ২০০৯ সালে। তখন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করে আওয়ামী লীগ। ক্ষমতায় এসেই কয়েকটি মেগা প্রকল্পের কাজ শুরু করে এবং শেষ পর্যন্ত সরকারের অগ্রাধিকারমূলক প্রকল্প হিসেবে এগুলো বাস্তবায়নে বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। পদ্মা বহুমুখী সেতু প্রকল্প, ঢাকায় মেট্রোরেল প্রকল্প, পদ্মা সেতুতে ও এই সেতুতে রেল সংযোগ প্রকল্প, দোহাজারী থেকে রামু হয়ে কক্সবাজার এবং রামু হয়ে ঘুমধুম পর্যন্ত রেল লাইন নির্মাণ প্রকল্প, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্প, মাতারবাড়ি কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্প, এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণ প্রকল্প, কয়লাভিত্তিক রামপাল থার্মাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্প, পায়রা বন্দর নির্মাণ প্রকল্প এবং সোনাদিয়া গভীর সমুদ্র বন্দর নির্মাণ প্রকল্প ও বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ উৎক্ষেপণ। বেশ কিছু প্রকল্পই বাস্তবায়িত হয়েছে, হচ্ছে। কোন কোন মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নের পথে রয়েছে।

শুধু তাই নয়, সর্বশেষ এক দশকে প্রায় সব সূচকেই অভূতপূর্ব উন্নয়ন ঘটেছে বাংলাদেশের। রপ্তানি, রিজার্ভ, জিডিপি থেকে শুরু করে বাজেটের আকার, সরকারি-বেসরকারি বিনিয়োগ, রাজস্ব, রেমিট্যান্স, দারিদ্র্য নিরসন, খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, অবকাঠামো তৈরি ও উন্নয়ন, বিদ্যুৎ, মানবসম্পদ উন্নয়ন, ডিজিটাল বাংলাদেশ বিনির্মাণসহ বিভিন্ন খাতে এসেছে প্রত্যাশিত সফলতা।

উন্নয়নের এই দীর্ঘ পথ মসৃণ ছিল না। হোঁচট খেতে হয়েছে অনেকবার। রাজনৈতিক উত্থান-পতনই ছিল বড় অন্তরায়। মোকাবিলা করতে হয়েছে অনেক ঘূর্ণিঝড়-জলোচ্ছ্বাস। তবু পদ্মাসেতুর মতো অনেক বড় বড় প্রকল্প বৈদেশিক সহায়তা ছাড়াই বাস্তবায়ন করছে বাংলাদেশ। বাংলাদেশের অগ্রগতি নিয়ে নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক অমর্ত্য সেন বেশ আগেই বলেছেন, যারা এক সময় বাংলাদেশকে ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’ বলেছিল তারা আজ এ দেশকে ‘উন্নয়নের মডেল’ মনে করছে। এইচবিএসসির প্রক্ষেপণ বলছে, ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশ বিশ্বের ২৬তম বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ হবে।

১৯৭২ সালে বাংলাদেশের মানুষের গড় আয়ু ছিল সাড়ে ৪৬ বছর। ৫০ বছরে ধাপে ধাপে মানুষের গড় আয়ু বেড়ে ৭২.৮ বছরে পৌঁছেছে। ৫০ বছরে গড় আয়ু বেড়েছে ২৪ বছর। ১৯৭১ সালে দেশে সাক্ষরতার হার ছিল ১৬ দশমিক ৮ শতাংশ। বছরে গড়ে এক শতাংশের বেশি হারে বেড়ে এই হার এখন পৌঁছেছে ৭৫ দশমিক ৬ শতাংশে। গত বছর এ হার ছিল ৭৪ দশমিক ৭ শতাংশ।

স্বাধীনতার বছর দেশের ৮০ ভাগ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করত। সর্বশেষ হিসাবে ২০ দশমিক ৫ শতাংশ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করছে। করোনা সংক্রন না হলে দারিদ্র সীমায় বসবাসকারী জনসংখ্যা আরো কমতো। স্বাধীনতার পর পর দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা ছিল ৫০০ মেগাওয়াট। এখন শতভাগ মানুষ বিদ্যুৎ পাচ্ছে।

স্বাধীনতার চার দশকেরও বেশি সময় পর মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার করে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে বাংলাদেশ। বিচার করেছে সপরিবারে জাতির পিতাকে হত্যাকাণ্ডের ঘটনারও। মানিলন্ডারিং বন্ধে কঠোর আইন করেছে। মাদকের বিরুদ্ধে ঘোষণা হয়েছে জিরো টলারেন্স নীতি। এক কথায়, আর্থ-সামাজিক সব সূচকেই বাংলাদেশ তার অপ্রতিরোধ্য সক্ষমতার স্বাক্ষর রেখেছে।

কালের আলো/এসবি/এমএম