জল জোছনার সুনামগঞ্জে স্মৃতিকাতরতায় আচ্ছন্ন আইজিপি, অন্যরকম অনুভূতি

প্রকাশিতঃ 10:07 pm | November 04, 2022

বিশেষ সংবাদদাতা, কালের আলো:

‘বালু, পাথর, মাছ, ধান ও গান-সুনামগঞ্জের প্রাণ’। জল জোছনার সেই সুনামগঞ্জে তিনি বেড়ে উঠেছেন। নিজের নাড়িপোতা ভিটা সেখানে। বর্ষায় চতুর্দিকে সমুদ্রের মতো অবারিত জলরাশি দেখেছেন। পুঁথিপাঠ, পালা গান, বাউল গান আর কবিয়াল লড়াইয়ের মোহময়তা হয়তো এখনও টানে ভীষণ! অপূর্ব এক জীবন।

হাওরের কাদা-জলে মাখামাখি করে বেড়ে উঠা খাঁটি মানুষ চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন। বাংলাদেশের ইন্সপেক্টর জেনারেল অব পুলিশ (আইজিপি)। পুলিশের গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন পদে দায়িত্ব পালনকালে কিংবা র‍্যাব ডিজি হিসেবে সফলতার মানদণ্ডে নিজেকে উত্তীর্ণ করার সময়ে ছুটে গেছেন সুনামগঞ্জে। কিন্তু এবারের নিজ জেলা সুনামগঞ্জ সফর, পুলিশপ্রধান হিসেবে প্রথমবারের মতোই। স্বভাবতই স্মৃতিকাতরতায় আচ্ছন্ন তিনি।

তাঁর জবানীতেই উচ্চারিত- ‘হাওরের মাটির সঙ্গে, পানির সঙ্গে মিলেমিশে আমি বড় হয়েছি। হাওরের ঢেউয়ে সাঁতার শিখেছি। হাওর এলাকার মানুষ সংগ্রামী। তাদের সঙ্গে আমি বড় হয়েছি। আইজিপি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর সুনামগঞ্জ জেলায় আমার প্রথম সফর। এখানে এলে মনে হয় আমি মায়ের কাছে এসেছি, মাটির কাছে এসেছি।’

আবেগ উদ্দীপ্ত বলিষ্ঠতার মায়াবী অবগাহনে তাঁর সরল স্বীকারোক্তি-‘আমি সুনামগঞ্জকে কখনো ভুলতে পারব না। এ জেলাবাসীর ভালোবাসায় হয়তো আজকে পুলিশের সর্বোচ্চ পদে আসীন হতে পেরেছি। এটা নিঃসন্দেহে একটা অন্যরকম অনুভূতি।’

শুক্রবার (৪ নভেম্বর) সকালে সুনামগঞ্জ শহরের ওয়েজখালী এলাকায় পুলিশের ক্রীড়া কমপ্লেক্স উদ্বোধনের পর সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে বৈচিত্র্যময় হাওরের অপরূপ সৌন্দর্যে বিমুগ্ধ-বিমোহিত হয়েই হৃদয়ের বন্ধনের অনুভবে স্মৃতির জানালায় সুনামগঞ্জ বা হাওরকে তুলে আনেন শৈশবের মনের মন্দিরে। পরে তিনি সুনামগঞ্জ সদর মডেল থানায় পুলিশ শপিং মলের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন।

স্মৃতি রোমন্থনের পাশাপাশি এদিন নিজ জেলার গণমাধ্যমের সঙ্গে সন্ত্রাস-জঙ্গিবাদ দমনে পুলিশের ঈর্ষণীয় সাফল্য, পেশাদারিত্বের সঙ্গে দায়িত্ব পালনসহ বিভিন্ন বিষয়ে কথা বলেন। সন্ত্রাস-জঙ্গিবাদ দমনে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতিতে উচ্চকন্ঠ হয়েই পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল মামুন বলে চলেন, ‘পুলিশ একটি পেশাদার বাহিনী। কখন কীভাবে দায়িত্ব পালন করতে হয় তারা জানে। জঙ্গি ও সন্ত্রাসবাদের প্রতি জিরো টলারেন্স নীতি ঘোষণা করেছেন প্রধানমন্ত্রী। বাংলাদেশ পুলিশ সেভাবেই দায়িত্ব পালন করছে।’

আইজিপি বলেন, ‘হলি আর্টিজানের ঘটনার পর আর কোনও বড় ধরনের ঘটনা সংঘটিত হয়নি। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় পুলিশ বাহিনী ও র‌্যাপিড একশন ব্যাটালিয়নসহ সব গোয়েন্দা সংস্থা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী রক্ষাবাহিনী একযোগে কাজ করে যাচ্ছে। সবাই একযোগে কাজ করায় জঙ্গিবাদ নিয়ন্ত্রণে ঈর্ষণীয় সফলতা অর্জন করেছি এবং জঙ্গিবাদ পরিপূর্ণ নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। জঙ্গি ও সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলায় আমরা সব সময় এগিয়ে আছি। জঙ্গিদের বিরুদ্ধে গোয়েন্দা তথ্যের মাধ্যমে অপারেশন চালানো হচ্ছে। জঙ্গিদের যেকোনও অপারেশনের আগেই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তাদের গ্রেফতার করছে।’

দৃঢ়তার সঙ্গেই উচ্চারণ- ‘আমরা সব সময় জঙ্গিদের চেয়ে এক কদম এগিয়ে কাজ করে থাকি। তাদের আগে হাঁটি। এ জন্য সব সময়ই আমরা সফল হয়েছি। কাজেই জঙ্গিবাদ কখনো নিয়ন্ত্রণের বাইরে যেতে পারে না।’

তিনি আরও বলেন, ‘পুলিশ প্রশিক্ষণ মডিউল অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করে। পুলিশ আইন ও বিধির আলোকে ব্যবস্থা নিয়ে থাকে। বর্তমানে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি পুলিশের নিয়ন্ত্রণে আছে। আগামী দিনেও নিয়ন্ত্রণে থাকবে। পুলিশ বাহিনী কাজ করে আইনবিধি ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে। সেভাবেই দায়িত্ব পালন করেন প্রতিটি পুলিশ সদস্য। পার্বত্য এলাকায় অভিযান চলছে। অভিযানের স্বার্থে কৌশলগত কারণে এ বিষয়ে আমরা কোনও কিছু বলতে চাই না। অভিযান শেষ হলে জানানো হবে।’

ইন্সপেক্টর জেনারেল অব পুলিশ হিসেবে আস্থা ও বিশ্বাস রাখায় বঙ্গবন্ধুকন্যা, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল মামুন। এই প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আমার প্রতি আস্থা ও বিশ্বাস রেখে প্রধানমন্ত্রী আমাকে বাংলাদেশ পুলিশ বাহিনীর প্রধান নিযুক্ত করেছেন। আমি প্রধানমন্ত্রীর প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর প্রতিও আমি কৃতজ্ঞ।’

তিনি সুনামগঞ্জবাসীকে শুভেচ্ছা জানান এবং তাদের দোয়া কামনা করেন। এ ছাড়া পর্যটকদের নিরাপত্তায় সুনামগঞ্জে ট্যুরিস্ট পুলিশ স্থাপনে কাজ করা হবে বলেও জানান আইজিপি।

সুনামগঞ্জ পুলিশ লাইনসে সুনামগঞ্জ সিলেট রেঞ্জের ডিআইজি মফিজ উদ্দিন আহম্মেদের সভাপতিত্বে জেলার পুলিশ অফিসার ও ফোর্সের সঙ্গে এক বিশেষ কল্যাণ সভাতেও যোগ দেন আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন। এ সময় সুনামগঞ্জ জেলার পুলিশ সুপার মোহাম্মদ এহসান শাহসহ উর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

কালের আলো/এমএএএমকে