সেনাপ্রধানের ‘ম্যাসেজিং স্পিচ’ লাউড অ্যান্ড ক্লিয়ার

প্রকাশিতঃ 11:06 pm | February 26, 2025

কালের আলো রিপোর্ট:

গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী নানা ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ। অন্তর্বর্তী সরকার বেশ কিছু ক্ষেত্রে সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছে। সংস্কার বাস্তবায়নে অনিবার্য হয়ে ওঠেছে জাতীয় ঐকমত্য। স্বভাবতই গণতন্ত্রের শক্তি সামষ্টিকতায় আর সৌন্দর্য ভিন্নমতে। সামষ্টিকতা ও ভিন্নমতের ভারসাম্যের মাধ্যমেই গণতন্ত্র জয়ী হয়। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে সংস্কার ও নির্বাচন নিয়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে তীব্র মতানৈক্য তৈরি হয়েছে। ছাত্র সংগঠনগুলো বিশৃঙ্খলা, সংঘাত ও সংঘর্ষে জড়িয়েছে। অনেকটাই ভেঙে পড়েছে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি। দেশকে অস্থির করে তোলার জন্য ষড়যন্ত্রে লিপ্ত রয়েছে বিভিন্ন সুযোগ সন্ধানী গোষ্ঠী। পরিকল্পিতভাবেই তাঁরা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে গুজব ও বিভ্রান্তি ছড়ানোর মাধ্যমে দুরভিসন্ধি ও অপচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। কারও কারও বিশেষ উদ্দেশ্য বা এজেন্ডা রয়েছে। অধ্যাপক ড.মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার জনগণের ইচ্ছা বা অভিপ্রায়ের সরকার হিসেবে নিজেদের ভাবমূর্তি গড়ার প্রাণান্তকর প্রচেষ্টা চালালেও বিভিন্ন স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী ও অশুভ শক্তি নিজের স্বার্থ হাসিলে অপতৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে। সবমিলিয়ে জনমনে হতাশা ও উৎকণ্ঠা কাজ করছে।

দেশের এমন পরিস্থিতিতে গুরুত্বপূর্ণ ‘ম্যাসেজিং স্পিচ’ দিয়েছেন বাংলাদেশ সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান। মঙ্গলবার (২৫ ফেব্রুয়ারি) রাজধানীর রাওয়া কনভেনশন হলে ‘জাতীয় শহীদ সেনা দিবসের’ অনুষ্ঠানে ঐক্য, সংহতি, গণতন্ত্র, সংস্কার এবং নির্বাচনের পক্ষে নিজের অবস্থান খোলাসা করেছেন আরও একবার। আসছে ডিসেম্বরের মধ্যে নির্বাচনের প্রত্যাশা ব্যক্ত করেছেন। দেশবাসীকে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানিয়েছেন। মারামারি-কাটাকাটি আর কাদা ছোড়াছুড়ি বন্ধ করতে সব পক্ষের প্রতি সতর্কবার্তা দিয়েছেন। স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন এমনটি না হলে দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব বিপন্ন হবে। পিলখানার বর্বরতা বিডিআর সদস্যরাই সংঘটিত করেছে জানিয়ে তিনি বলেছেন- ‘ফুল স্টপ। এখানে কোনো ইফ বা  বাট নাই।’ কোনো বাহিনীকে অবমূল্যায়ন না করার আহ্বান জানিয়েছেন। হৃদয়ের অতলান্তিক গভীরতায় বলেছেন, ‘সেনাবাহিনীকে আক্রমণ করবেন না। উপদেশ দেন। তা আমরা গ্রহণ করবো।’ দেশের মানুষের আস্থা ও বিশ্বাসের শেষ ভরসা সেনাবাহিনী প্রধানের এমন তাৎপর্যপূর্ণ বক্তব্যে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের মাঝে চলছে তুমুল আলোচনা ও চূলচেরা বিশ্লেষণ।

রাজনৈতিক ও সামরিক বিশ্লেষকরা বলছেন, দেশে বিরাজমান কঠিন পরিস্থিতিতে নিজের এই বক্তব্যের মাধ্যমে সেনাপ্রধান সবাইকে যেমন উপদেশ দিয়েছেন, তেমনি যারা বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে জড়িয়েছেন, তাদের সমালোচনা করে সতর্কও করেছেন। চলমান সঙ্কট দূর করতে এর মাধ্যমে তিনি স্পষ্ট একাধিক বার্তা দিয়েছেন। বিশেষ করে গত বছরের আগস্টে ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে দেশের মানুষের পাশে এসে দাঁড়ায় সেনাবাহিনী। অভ্যুত্থান সফলে পালন করে নিয়ামকের ভূমিকা। সেনাপ্রধানের একটি ঘোষণায় পাল্টে যায় দৃশ্যপট। তিনি সাফ সাফ জানিয়ে দিয়েছিলেন- জনগণের বুকে গুলি নয়। তিনি অক্ষরে অক্ষরে নিজের কথা রেখেছেন। লাশের সারি দীর্ঘ না করে দেশকে একটি শাসরুদ্ধকর পরিস্থিতি থেকে তিনি মুক্ত করেন। জেনারেল ওয়াকার অন্যদের মতো ক্ষমতার মোহে আচ্ছন্ন হননি। তিনি জরুরি অবস্থা জারি করে সাধারণ মানুষের মৌলিক অধিকার খর্ব না করে দেশবাসীর প্রত্যাশিত ড.ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারকে সফল করতে সর্বাত্মক উদ্যোগ গ্রহণ করেন। সেনাপ্রধান ও তাঁর বাহিনীর সর্বোচ্চ পেশাদারিত্ব ও দেশপ্রেম আজ সব মহলেই প্রশংসিত।’

ক্ষমতার বিষয়ে কোন আকাঙ্ক্ষা নেই বলে ‘জাতীয় শহীদ সেনা দিবসের’ অনুষ্ঠানে নিজের দৃঢ় অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছেন জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান। দেশ ও জাতিকে সুন্দর জায়গায় রেখে সেনানিবাসে ফেরত যাওয়ার কথা বলেছেন। তাঁর পুরো বক্তব্যে আশান্বিত হয়েছেন দেশের মানুষ। তাঁরা তাঁর ওপর আস্থা রাখছেন। তাদের ভাষ্যে-সেনাপ্রধানের ম্যাসেজ ছিল অনেকটাই লাউড অ্যান্ড ক্লিয়ার। এটি দেশের রাজনীতিকদের জন্য যেমন বার্তা, তেমনি অন্যদের জন্যও বিশেষ এক সতর্কতা। তাঁর এমন স্পষ্ট ও নির্ভীক উচ্চারণ দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও স্থিতিশীলতা রক্ষায় ক্ষেত্রে দিকনির্দেশনা হিসেবে সবাইকে বিবেচনা করতে হবে। এতে দেশের মঙ্গল ও শান্তি নিশ্চিত হবে।’

বিশ্লেষকরা আরও মনে করেন, দেশের রাজনৈতিক দলগুলো যখন পারস্পরিক দ্বন্দ্ব ও সংঘাতে লিপ্ত, তখন এই বিভেদ ও অস্থিরতা বিদেশী শক্তির হস্তক্ষেপের সুযোগ তৈরি করতে পারে। সুতরাং তাঁর এই বক্তব্য কেবল দেশপ্রেমিক সেনাবাহিনীর প্রধান হিসেবেই নয় বরং দেশের একজন সচেতন নাগরিক ও রাষ্ট্রীয় দায়িত্বশীল ব্যক্তি হিসেবে জাতিকে একীভূত হওয়ার সুস্পষ্ট ইঙ্গিত দিয়েছে। তাঁর এই বক্তব্য মারফত সংঘাত এড়িয়ে চলার পরিকল্পনা গ্রহণ করলে দেশের চলমান সঙ্কট বা অনিশ্চয়তার কালো মেঘ দূর করা সম্ভব। তাঁর সতর্কবার্তা গুরুত্বের সঙ্গে গ্রহণ করলে দেশকে হানাহানি, রক্তারক্তি ও সংঘাতের পথ থেকে উত্তরণ সম্ভব।’

পিলখানা হত্যাকাণ্ডের পর গত ১৬ বছরে অভিযুক্ত বিডিআর সদস্যদের বিচার হয়েছে। অনেকের সাজা হয়েছে। অনেকে খালাস পেয়েছেন। ৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার পতনের পর ওই হত্যাযজ্ঞ নতুন করে তদন্তের দাবি ওঠে। সেই মোতাবেক অন্তর্বর্তী সরকার জাতীয় স্বাধীন তদন্ত কমিশন গঠন করা হয়েছে। এই বিষয়েও ঢালাও অভিযোগের চর্চা থেকে বেরিয়ে তদন্তের ওপর আস্থা রাখার আহ্বান ছিল সেনাপ্রধানের কণ্ঠে। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেছেন, ‘বটমলাইন হচ্ছে যে এই সমস্ত, আমাদের এই চৌকস সেনাসদস্য, যাঁরা প্রাণ হারিয়েছেন, তাঁরা প্রাণ হারিয়েছেন তদানীন্তন বিডিআর সদস্যদের গুলিতে। আমরা নিজেরা এসব জিনিস নিয়ে অনেক ভিন্নমত পোষণ করছি কেউ কেউ। এই জিনিসটাকে ভিন্নখাতে প্রবাহিত করার চেষ্টা করছি। সেটা আমাদের জন্য মঙ্গলজনক হবে না।’

সেনাপ্রধান নিজের দীর্ঘ বক্তব্যে সাম্প্রতিক সময়ে পুলিশ, র‌্যাব, বিজিবি, ডিজিএফআই ও এনএসআই-এর ভূমিকা নিয়ে আলোচনা করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘এই সংস্থাগুলো দেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কাজ করেছে। খারাপ কাজের পাশাপাশি অসংখ্য ভালো কাজও করেছে। আজ যে দেশের স্থিতিশীলতা, দেশটাকে যে এত বছর ধরে স্থিতিশীল রাখা হয়েছে, এর পেছনে এই সশস্ত্রবাহিনীর বহু সদস্য, সিভিলিয়ান সবাই মিলে এই সংস্থাগুলোকে কার্যকর রেখেছে।’ তিনি সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী ও বিমান বাহিনীর বহুমাত্রিক কর্মযজ্ঞের উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেছেন। শৃঙ্খলার জন্যই এখনও এই তিনটি বাহিনী স্বগৌরবে টিকে আছে। তিনি উদাহরণ টেনেছেন এই বিষয়ে। বলেছেন, ‘আজকে এই দেশের ক্রান্তিলগ্নে সমস্ত বাহিনী, সমস্ত অর্গানাইজেশন (প্রতিষ্ঠান) বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। খালি সেনাবাহিনী টিকে আছে। বিমানবাহিনী টিকে আছে। নৌবাহিনী টিকে আছে। কেন? বিকজ অব ডিসিপ্লিন (শৃঙ্খলার জন্য)।’ তাঁর এই গুরুত্বপূর্ণ ভাষ্য সব বাহিনী ও সংস্থাগুলোতে মনোবল ও শৃঙ্খলার রসদ জোগাবে বলেও মনে করেন বিশ্লেষকরা।

জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান নিজের বক্তব্যে দৃশ্যত জাতীয় নির্বাচনের একটি পথরেখা উপস্থাপন করেছেন। জানিয়েছেন, ডিসেম্বর বা তাঁর কাছাকাছি সময়ের মধ্যে অবাধ, স্বচ্ছ ও ইনক্লুসিভ নির্বাচনের ব্যাপারে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস সম্পূর্ণ একমত। সেনাপ্রধানের বক্তব্যে নির্বাচনের বিষয়ে একটি স্পষ্ট সময়সীমা মিলেছে। ড.ইউনূস দেশকে ঐক্যবদ্ধ রাখার আপ্রাণ প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন এমন কথাও দৃঢ়তার সঙ্গে উপস্থাপন করেছেন। এর মাধ্যমে নির্বাচনের বিষয়ে অঙ্ক কষা অনেকটাই সহজ হয়ে গেছে। তিনি এই প্রসঙ্গে বলেছেন, ‘আমরা দেশে একটা ফ্রি ফেয়ার অ্যান্ড ইনক্লুসিভ ইলেকশনের জন্য দিকে ধাবিত হচ্ছি। তার আগে যে সমস্ত সংস্কার করা প্রয়োজন অবশ্যই সরকার সেদিকে হেল্প করবেন।

আমি যতবারই ড. ইউনূসের সঙ্গে কথা বলেছি, হি কমপ্লিটলি অ্যাগ্রিড উইথ মি। দেয়ার শুড বি ফ্রি ফেয়ার অ্যান্ড ইনক্লুসিভ ইলেকশন অ্যান্ড দ্যাট ইলেকশন শুড বি উইথইন ডিসেম্বর, অর ক্লোজ টু দ্যাট। যেটা আমি প্রথমেই বলেছিলাম যে ১৮ মাসের মধ্যে একটা ইলেকশন। আমার মনে হয় যে সরকার সেদিকেই ধাবিত হচ্ছে। ড. ইউনূস যথাসাধ্য চেষ্টা করে যাচ্ছেন, এ দেশটাকে ইউনাইটেড রাখতে কাজ করে যাচ্ছেন উনি। ওনাকে আমাদের সাহায্য করতে হবে। উনি যেন সফল হতে পারেন। সেদিকে আমরা সবাই চেষ্টা করবো। আমরা একসঙ্গে ইনশাআল্লাহ কাজ করে যাবো।’

সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান এর সাহসী, নির্ভীক ও দৃঢ়চেতা এমন সব উচ্চারণ দেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটে একটি ‘সহায়ক কোর্স’ হিসেবে কাজ করতে পারে বলে অভিমত বিশ্লেষকদের। তাঁরা মনে করেন, সেনাপ্রধান বুঝিয়ে দিয়েছেন সবার আগে দেশ। দেশের স্বার্থ ও নাগরিকদের অধিকারকেই তিনি প্রাধান্য দিয়েছেন। সব সংকীর্ণতার উর্ধ্বে ওঠে দেশের উন্নয়ন ও স্থিতিশীলতার বিষয়টি সর্বাগ্রে গুরুত্ব দিয়েছেন। বাংলাদেশের ইতিহাস অবশ্যই তাকে স্মরণ করবে শ্রদ্ধায়-ভালোবাসায়।

কালের আলো/এমএএএমকে