ঘরে ঘরে দুর্গের মাধ্যমে মৃত্যুর অমানিশাকে বিদায়ের প্রত্যয় আইজিপির
প্রকাশিতঃ 9:06 pm | July 08, 2021

বিশেষ সংবাদদাতা, কালের আলো :
দেশের স্বাধীনতার ৫০ বছরের মাথায় নতুন এক যুদ্ধে উপনীত হয়েছে বীর বাঙালি। বৈশ্বিক এ যুদ্ধে প্রতিপক্ষ ভয়ঙ্কর অদৃশ্য এক জীবাণু। ভারী কোন অস্ত্র, কামান বা গোলাবারুদে চোখে না দেখা এ শত্রুপক্ষকে কুপোকাত করার জো নেই। উল্টো নিজেরা সচেতন না হওয়ায় সংক্রমণ ও মৃত্যু লাফিয়ে বাড়ছে প্রতিদিনই। ইতোমধ্যেই একদিনে সর্বোচ্চ মৃত্যুর রেকর্ড ২০১ স্পর্শ করেছে।
গত ১ জুলাই থেকে দেশজুড়ে সর্বাত্নক লকডাউন চললেও আক্রান্ত ও মৃত্যুর ক্ষেত্রে এখনো দৃশ্যমান হয়নি এর প্রভাব। এমন সঙ্কটময় পরিস্থিতিতে দেশের সাধারণ মানুষকে সুরক্ষায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে জাতীয় ঐক্যের কথা বলেছেন পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) ড.বেনজীর আহমেদ, বিপিএম (বার)।
এ জাতীয় ঐক্যের মাধ্যমে তিনি মূলত দেশের মানুষকে নিজের ঘরে সুরক্ষিত থেকে অতিমারি করোনার সঙ্গে লড়াই করার আহ্বান জানিয়েছেন। মৃত্যুর মিছিল দীর্ঘায়িত না করে সবাইকে সচেতন ও সতর্ক হতে পরামর্শ দিয়েছেন। স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে উৎসাহিত করেছেন।
দেশকে নিরাপদ করতে প্রাণিত করেছেন। মানবিক মূল্যবোধের জাগরণের মাধ্যমে অসহায় ও দুস্থ মানুষকে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিতে বলেছেন। হাতে হাত ধরে কাজ করে দুর্যোগ অতিক্রমের অমোঘ মন্ত্রও গেঁথে দিয়েছেন।
বাস্তবতার নিরিখে পুলিশপ্রধান নিজের অবিনাশী, গভীর তাৎপর্যপূর্ণ ও দৃঢ় উচ্চারণের মাধ্যমে বিজয়ের গৌরবে গৌরবান্বিত জাতি বাঙালিকে অন্ধকার কাটিয়ে আলোয় আলোয় দেশকে ভরিয়ে তুলতে হাসি আনন্দে নিরুদ্বেগ ও নিরাপদ জীবনের স্বপ্নই যেন দেখিয়েছেন আরও একবার। প্রাণে প্রাণে বাজাতে চেয়েছেন আনন্দধ্বনি।
বৃহস্পতিবার (৮ জুলাই) দুপুরে রাজধানীর সিদ্ধেশ্বরী বালক উচ্চ বিদ্যালয়ের মাঠে বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতি আয়োজিত লকডাউনে ক্ষতিগ্রস্ত অতিদরিদ্রদের মধ্যে খাবার ও নগদ ৫০০ টাকা বিতরণ কর্মসূচির অনুষ্ঠানে উজ্জ্বল সূর্যোলোকে মহামারির বিস্তার ঠেকাতে সুরক্ষার বার্তা দিয়েছেন ড.বেনজীর আহমেদ।
ইন্সপেক্টর জেনারেল অব পুলিশ (আইজিপি) করোনাকালের দুর্যোগে পিতা মুজিবের সেই অমিয় বাণী ঘরে ঘরে থাকার দুর্গ নিশ্চিতের মাধ্যমে মৃত্যুর অমানিশাকে বিদায়ের মাধ্যমে জীবনের জলছবি আঁকার স্বস্তি-শান্তির সুবাতাসই বইয়ে দিয়েছেন দেশবাসীর মন-মননে।

প্রধানমন্ত্রীর প্রাজ্ঞ নেতৃত্বে অতিমারি মোকাবেলা
মারণভাইরাস করোনার কালো মেঘে আচ্ছন্ন বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশও। এই অতিমারি থেকে বেরিয়ে আসতে বাংলাদেশেও চলছে প্রাণপণ লড়াই। করোনাযুদ্ধে দেশের মানুষের ফিকে হওয়া হাসি আবার মুখে ফেরানোর পাশাপাশি মজবুত অর্থনীতিতেই নিজের দৃষ্টি রেখেছেন বঙ্গবন্ধু কন্যা, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
সেই তথ্যই নিজের জবানীতে তুলে এনে পুলিশ মহাপরিদর্শক ড.বেনজীর আহমেদ বলেছেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রাজ্ঞ ও গতিশীল নেতৃত্বে আমরা করোনা দুর্যোগ মোকাবেলা করতে সক্ষম হবো। তিনি স্মরণ করেছেন, ইতিহাসের মহান নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের দৃঢ়চেতা, একাগ্রতা, একনিষ্ঠ নেতৃত্বগুণের মাধ্যমেই কাঙ্খিত স্বাধীনতা পেয়েছে দেশ।
৯ মাসের বীরত্বব্যঞ্জক মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে পরাধীনতার গ্লানি থেকে মুক্তি পেয়েছিল প্রিয় স্বদেশ। ড.বেনজীর বলেছেন, ‘একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে আমরা স্বাধীনতা অর্জন করতে সক্ষম হয়েছি। সেসময় খালি হাতে দুধর্ষ পাকিস্তানি বাহিনীকে পরাজিত করেছি আমরা। কারণ আমাদের জাতিগত ঐক্য ছিল।
এই করোনা দুর্যোগও আমরা মোকাবিলা করতে পারব। প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে এবং আমাদের জাতীয় ঐক্যের মাধ্যমে। যে যেখানে আছি, সেখান থেকে কাজ করতে হবে। প্রধানমন্ত্রী চেষ্টা করছেন এই লকডাউনে যেন কোনো পরিবার কষ্টে না থাকে। এছাড়াও আমরা আশা করব যারা সচ্ছল আছেন, তারা নিজেদের সাধ্যমত মানুষের পাশে দাঁড়াবেন।’
প্রত্যেকে জরুরি কাজের কথা বলে রাস্তায় বের হলে রাষ্ট্র অসহায়
স্বাস্থ্যবিধি না মেনে চলমান লকডাউনে প্রত্যেকে জরুরি কাজের কথা বলে রাস্তায় বের হলে পুলিশ ও রাষ্ট্র অসহায় হয়ে পড়ে বলে মন্তব্য করেন এই পুলিশ মহাপরিদর্শক। তিনি বলেন, ‘আজকে গুলশানে অনেক ট্রাফিক। প্রত্যেকে জরুরি কাজের কথা বলে বের হচ্ছে।
প্রত্যেকের জরুরি কাজ। প্রত্যেকে জরুরি কাজের কথা বলে যদি ১৬-১৮ কোটি মানুষ রাস্তায় বের হয়, তাহলে আমরা (পুলিশ) ও রাষ্ট্র অসহায় হয়ে পড়ে। এক্ষেত্রে আপনাকে সতর্ক হতে হবে। আমরা সবাই মিলে কিন্তু রাষ্ট্র। দয়া করে কেউ বিনা প্রয়োজনে ঘর থেকে বের হবেন না।

তিনি বলেন, অনেকের বাসায় থাকতে ভালো লাগে না, বিরক্ত লাগে। বাসায় বিরক্ত লাগে বলে বাহিরে বের হচ্ছেন। অনেকে আবার লকডাউন কেমন হচ্ছে তা দেখার জন্য বের হচ্ছেন। দয়া করে এই কাজগুলো করবেন না। আসেন আমরা সবাই মিলে দেশটাকে নিরাপদ করি। আমরা নিজেরা বের হব আক্রান্ত হব এবং স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে আক্রমণ করব এটা ঠিক নয়।
প্রত্যেকের আচরণের ওপর সেকেন্ড ওয়েভের স্থায়ীত্ব
ড. বেনজীর আহমেদ বলেন, করোনার সেকেন্ড ওয়েভের স্থায়ীত্ব নির্ভর করে আমাদের প্রত্যেকের আচরণের ওপর। দুই সপ্তাহ বাসায় বসে থাকা খুব বেশিকিছু না, যদি এর জন্য আমরা আগামী ৫০ বছর পর্যন্ত ভালো থাকতে পারি। দয়া করে রাস্তাঘাটে ভিড় করবেন না। জরুরি কাজ একটু কমান। এই মৃত্যুর মিছিল দীর্ঘায়িত করব কি না সেই সিদ্ধান্ত আমাদের।
আইসিউ বানালেই কিন্তু আইসিউ চালানো যায় না
পুলিশপ্রধান আরও বলেন, ‘আইসিউ এর জন্য বিশেষায়িত ডাক্তার নার্স দরকার। বিশেষায়িত মেডিকেল স্টাফ দরকার। আপনি চাইলে আইসিউ বেড কিনতে পারবেন। কিন্তু আপনি চাইলেই সঙ্গে সঙ্গে স্টাফ বানাতে পারবেন না। সম্ভব হলে হসপিটালগুলোতে অক্সিজেন ট্যাংক বসিয়ে লাইন করে দেওয়া উচিত।
তাতে করে একটা ট্যাংক থেকে অনেক রোগী অক্সিজেন নিতে পারবে। আমরা আমাদের হসপিটালে সেটা করেছি। এক সময় আমাদের আইসিউ ছিল ১০টি। যেটি এখন ৫০-এ উন্নীত করেছি। তার বাইরেও আমরা প্রত্যেক ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে লাইন দিয়ে অক্সিজেন দিয়েছি। যেটাতে অনেক কম খরচ হয়। আপদকালীন সময়ে সাশ্রয় হয়।
তিনি বলেন, ঢাকা বাংলাদেশের প্রাণকেন্দ্র। এই শহরে কয়েক কোটি লোকের বাস। এর বাইরেও ঢাকার বাইরের আশেপাশের এলাকা থেকে কাজের জন্য অনেকেই ঢাকায় আসেন। এই শহরে বৈশ্বিক ধনী লোক থেকে শুরু করে বস্তিবাসী রয়েছেন। সবাই মিলেই আমরা করোনা অতিমারির দুর্যোগ মোকাবিলা করছি।
করোনা দুর্যোগে সবাইকে এগিয়ে আসার আহ্বান
করোনা দুর্যোগে সবাইকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়ে আইজিপি বলেন, ঢাকা শহরে প্রতিটি পরিবারে পাঁচ জন করে সদস্য থাকলে সারা ঢাকায় ৪০ লাখ পরিবার বসবাস করে। যদি ৪০ লাখ পরিবার এক প্লেট করে ভাত দেন তাহলে আপনারা ৪০ লাখ মানুষের মুখে খাবার তুলে দিতে পারবেন। এক প্লেট ভাত দেওয়া তেমন সমস্যা না। প্রত্যেকটা পরিবার চাইলেই তা পারে।

তিনি আরও বলেন, দুর্যোগের দিনে অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো আমাদের রাষ্ট্রীয় কর্তব্য, ধর্মীয় কর্তব্য। এই ধরনের কাজে যদি সহযোগিতা লাগে তাহলে বাংলাদেশ পুলিশ বাহিনী আপনাদের সঙ্গে আছে। যদি আপনি সাহায্য করতে চান কিন্তু আপনার সাহায্য পৌঁছে দেওয়ার ক্ষমতা না থাকে, আমাদের বলবেন আমরা পৌঁছে দেব আপনার পক্ষ থেকে। আসুন আমরা হাতে হাত ধরে কাজ করি এবং এই দুর্যোগ অতিক্রম করি।
অন্যরা কে কী বলেছেন?
অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির সভাপতি মো.হেলাল উদ্দিনের সভাপতিত্বে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে এফবিসিসিআইয়ের সভাপতি জসিম উদ্দিন ও ডিএমপি কমিশনার মোহা. শফিকুল ইসলাম।
এফবিসিসিআইয়ের সভাপতি জসিম উদ্দিন বলেন, ‘সবাই মিলে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। তাহলেই আমরা করোনা মোকাবিলা করতে পারব। প্রধানমন্ত্রী এক কোটি লোকের জন্য সাহায্যের উদ্যোগ নিয়েছেন। দোকান মালিক সমিতি এক হাজার লোকের দায়িত্ব নিয়েছে। এভাবে আমাদের সকলকে এগিয়ে আসতে হবে।’
ডিএমপি কমিশনার মোহাঃ শফিকুল ইসলাম বলেন, নিজেকে নিজে বাঁচাতে হবে, কেউ আপনাকে বাঁচাবে না। নিজেকে রক্ষা করতে হবে, নিজের পরিবারকে রক্ষা করতে হবে। এজন্য মাস্ক পরতে হবে, স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে হবে। তাহলে আমরা বাঁচতে পারবো।’
বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির সভাপতি মোঃ হেলাল উদ্দিন বলেন, বিশ্ব এখন বিপদের মুখে। বাংলাদেশও এর বাইরে নয়। এ যুদ্ধে ধৈর্য ধরে সবাইকে পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে হবে।
কালের আলো/আরআই/এমএএএমকে