মানবিকতার প্রদীপ্ত আলোর শিখায় লক্ষীপুরে ভূমিহীনদের করবস্থান-মসজিদ উপহার আইজিপির

প্রকাশিতঃ 7:42 pm | October 05, 2021

বিশেষ সংবাদদাতা, কালের আলো :

তাঁর জীবনটা মোটেও ছকে বাঁধা নয়। মানতে জানেন না পরাভব। মানুষের জন্য কাজ করাই তাঁর জীবনের মৌলিক দর্শন। সাধারণ মানুষকে ভালোবেসেই সমৃদ্ধ করেছেন নিজের জীবনকে, মানসলোকের উর্বর ভূমিকে। মানবিকতার পথে বিশাল এক যাত্রাপথে ছুটেছেন নিরন্তর। নিজস্ব সচেতনতাবোধই মূলত প্রদীপ্ত করেছে পুলিশপ্রধান ড.বেনজীর আহমেদের চলার পথ।

কী অদ্ভুত মিল তাঁর জীবনসঙ্গী জীশান মীর্জারও! বাংলাদেশ পুলিশ নারী কল্যাণ সমিতির (পুনাক) এই সভানেত্রীও সাধারণ জীবনের মাধুর্যে বেড়ে উঠেছেন বলেই কী না সাধারণের অসহায়ত্ব, প্রাণ-স্পন্দন অনুভব করেন গভীরভাবেই। অনেক জীবনে তাদের স্পর্শে কেটেছে মেঘ। ছড়িয়ে পড়েছে উজ্জ্বল রোদ্দুর। তাদের সহজ নিরাভরণ জীবন যাপন, অদম্য সাহস আর দৃঢ়তা অনেকের জন্যই সঞ্চার করে অনুপ্রেরণার।

মানবিক-আলোকিত এই দম্পতি এবার অবসান ঘটিয়েছেন নদীভাঙনে ভূমিহীন প্রায় দু’হাজার মানুষের দু:খপিড়ীত এক জীবনের আর্তনাদ-অসহায়ত্বের। মৃত্যুর পর দাফন-সৎকারের জন্য সুবন্দোবস্ত করে দিয়েছেন লক্ষীপুর সদর উপজেলার ভবানীগঞ্জ ইউনিয়নের পশ্চিম চরমনসা গ্রামের বাসিন্দাদের। সেখানে সাড়ে ২৯ শতাংশ জমির ওপর গড়ে দিয়েছেন কবরস্থান ও মসজিদ।

দেবদূতের মতোই ভাগ্যবিড়ম্বিত ভূমিহীনদের ভুবনে মঙ্গলবার (০৫ অক্টোবর) বিকেলে যেন এক অন্যরকম আবির্ভাবই ঘটে গেলো ড.বেনজীর-জীশান জুটির। তাদের হাতে তুলে দিয়েছেন জমির দলিল। উন্মোচন করেছেন কবরস্থানের ফলক। মতবিনিময় করেছেন স্থানীয়দের সঙ্গেও। এসবের মাধ্যমেই নিজেদের ভালোবাসার ছোঁয়ায় তাঁরা ভরিয়ে দিলেন পশ্চিম চরমনসা গ্রামের আবদুর রহমানদের মতো হাজারো নিপীড়িত জীবনের বঞ্চনাকে।

প্রধানমন্ত্রীর উপহার হিসেবে বিবেচনা ও দোয়া
সুখে-দুঃখে মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে তাদের ছায়া হয়ে থাকার আরও একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্তও স্থাপন করলেন পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) ড.বেনজীর আহমেদ ও তাঁর স্ত্রী পুনাক সভানেত্রী জীশান মীর্জা। উচ্চ পরিমন্ডলে নিজেদের বিশাল অবস্থানের পরেও মানুষের মাঝে নিজেদের বোধ নিবেদন করলেন অসাধারণ রূপকল্পে।

পুলিশপ্রধান ড.বেনজীর আহমেদ মানবিকবোধের সবচেয়ে বড় দিকদর্শন হিসেবে উপস্থাপন করলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে। তিনি বলেন, ‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে বাংলাদেশ আজ অনেক উন্নত হয়েছে। এখন মৃত্যুর পর করো দাফন-কাফন অথবা সৎকার হবে না, তা ভাবা যায় না। তিনি বলেন, এই কবরস্থানের উপকারভোগী শুধু ভূমিহীনরা নয়, এই গ্রামের সাধারণ মানুষও হবেন।’

তিনি কবরস্থান-মসজিদটিকে প্রধানমন্ত্রীর উপহার হিসেবে বিবেচনা করে তাঁর জন্য সবার কাছে দোয়াও চেয়েছেন।

আনন্দের ফল্গুধারা আবদুর রহমানদের ভুবনে, পেছনের ঘটনা
উপকূলীয় অধিবাসী আবদুর রহমানদের ভুবনে বয়ে যাচ্ছে অবারিত আনন্দের ফল্গুধারা। মেঘনা নদীর অব্যাহত ভাঙন তাদের সহায়-সম্বলহীন করেছে। ভাগ্যাহত এই মানুষেরা এখন ভূমিহীন। শুধু তাই নয়, মৃত্যুর পর আপনজনকে দাফন করার জন্যও ছিল না তাদের এক টুকরো জমি।

অনুষ্ঠানে বেদনার্ত কন্ঠে আবদুর রহমান বলেন, ‘আপনজনকে শেষবারের মতো শায়িত করতে ঘন্টার পর ঘন্টা লাশ নিয়ে বসে থাকতে হতো। আজ আমাদের অপেক্ষার প্রহর কাটলো। আমরা আইজিপি স্যারের বদান্যতায় একটি স্থায়ী কবরস্থান পেলাম।’

স্থানীয়রা জানায়, মেঘনা নদীর অব্যাহত ভাঙনে গত ২০ বছরে কমলনগর ও রামগতি উপজেলার প্রায় অর্ধেক তলিয়ে গেছে। নদীতে ভিটেমাটি হারানো অন্তত দুই হাজার পরিবারের ১০ হাজার অসহায় মানুষ রামগতি-লক্ষ্মীপুর সড়কের দু’পাশে বসবাস করে।

ভবানীগঞ্জ থেকে তোরাবগঞ্জ এলাকা পর্যন্ত আট কিলোমিটার এলাকায় সড়কের দু’পাশে কোনোমতে অস্থায়ী ঘর তুলে তারা বেঁচে থাকার স্বপ্ন বুনছে। তাদের পরিবারের কেউ মারা গেলে কবর দেয়ার জন্য কোনো কবরস্থান ছিল না। বাধ্য হয়েই যেখানে-সেখানে মরদেহ দাফন করতে হয়েছে দিনের পর দিন। অনেক সময় মরদেহ নিয়ে ৬-৭ ঘণ্টা বসে থাকতে হয়। কিন্তু মঙ্গলবার (০৫ অক্টোবর) আনুষ্ঠানিকভাবেই তাদের সেই শোকাতাপের যবনিকাপাত ঘটলো।

অবশ্য এই উজ্জ্বল মানবিকতার জন্মবৃত্তান্তের নেপথ্য অনুঘটক আইজিপি পত্নী জীশান মীর্জার প্রতিও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন এই গ্রামের বাসিন্দারা। গত বছরের সেপ্টেম্বরে একটি অনলাইন নিউজপোর্টালে এখানকার মানুষের দাফনের জন্য কোন কবরস্থান না থাকার বিষয়টি নিয়ে একটি সংবাদ প্রকাশিত হয়।

সেই সংবাদটি নজরে আসে পুনাক সভানেত্রী জীশান মীর্জার। তিনি তাৎক্ষণিক বিষয়টি তাঁর স্বামী, পুলিশপ্রধান ড.বেনজীর আহমেদের সামনে বিষয়টি উপস্থাপন করেন। দেশ মানুষের মঙ্গল-চিন্তায় আর সজীব চেতনায় প্রদীপ্ত ইন্সপেক্টর জেনারেল অব পুলিশ ড.বেনজীর আহমেদ নিজের উদ্যোগে সদর উপজেলার লাহারকান্দি ইউনিয়নের কুতুবপুর গ্রামের আবদুর কুদ্দুসের কাছ থেকে কবরস্থান গড়ে তোলার জন্য জমি কিনেন।

ভবানীগঞ্জ ইউনিয়নের পশ্চিম চরমনসা গ্রামের জমিটি ওই বছরের ১ ডিসেম্বর রেজিস্ট্রি হয়। এরপর থেকে জমির চারপাশে সীমানা প্রাচীর তুলে কবরস্থান ও মসজিদ নির্মাণ করা হয়। সেখানে গভীর নলকূপ, মরদেহ ধোঁয়ারঘর ও বাথরুম রয়েছে। প্রধান সড়ক থেকে কবরে যাওয়ার জন্য সড়কও সংস্কার করা হয়েছে। সেখানে চার শতাধিক মানুষকে কবর দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে।

অনুষ্ঠানে আইজিপি বলেন, ‘লক্ষ্মীপুরের এই এলাকায় বিভিন্ন স্থানে বসবাসরত ভূমিহীনদের জন্য কোন কবরস্থান নেই সংক্রান্ত রিপোর্ট একটি নিউজ পোর্টালে প্রকাশিত হয়। রিপোর্টটি দেখে আমার স্ত্রী এই বিষয়ে ব্যবস্থা নেয়ার অনুরোধ জানান। মূলত তাঁরই প্রেরণায় আমরা নিজস্ব উদ্যোগে জমি কিনে এখানে কবরস্থান এবং একটি মসজিদ স্থাপন করেছি।’

সিটিজেন জার্নালিজমে উপকৃত হবে সমাজ ও দেশ
আইজিপি বলেন, ‘সাংবাদিকরা কোটি কোটি মানুষকে মোটিভেট করতে পারে। আপনি ওপেনিয়ন বিল্ডার, ওপেনিয়ন বিল্ড করা অনেক কঠিন কাজ। সবাই তা করতে পারেন না। সাংবাদিকরা ওপেনিয়ন বিল্ড করেন। যেহেতু আপনারা মুহুর্তের মধ্যে কোটি কোটি মানুষের হৃদয়ে প্রবেশ করতে পারেন। সেজন্য আপনাদের কলমের যে শক্তি সেই শক্তি সম্পর্কে পুরোপুরি সচেতন থাকবেন এটাই আমরা প্রত্যাশা করি।’

সোশ্যাল মিডিয়ার ইতিবাচক দিক তুলে ধরে পুলিশপ্রধান বলেন, ‘স্যোশাল মিডিয়া যখন প্রথম এসেছে তখন পশ্চিম বিশ্বের মিডিয়ার মাতব্বররা বলেছিলেন স্যোশাল মিডিয়া নাগরিকের অধিকারের দরজা খুলে দিবে। সেই স্যোসাল মিডিয়াতেই দেখা প্রতিবেদনের ভিত্তিতে ভূমিহীনরা কবরস্থান ও মসজিদ পেয়েছে। এটিই স্যোশাল মিডিয়ার শক্তি। সোশ্যাল মিডিয়ায় এ ধরনের বেশী বেশী সিটিজেন রিপোর্টিং হলে সমাজ ও দেশ উপকৃত হবে।’

‘করোনাকালীন এর মাধ্যমে বহু মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছি আমরা। ভালো কাজে স্যোশাল মিডিয়ার শক্তি আমরা প্রশংসা করি। প্রত্যাশা করি স্যোশাল মিডিয়া বেশি বেশি করে সিটিজেন রিপোর্টিংয়ের দ্বার উন্মোচন করবে।’

আবার গুজব ছড়ানোর জন্যও সোশ্যাল মিডিয়াকে ব্যবহার করা হচ্ছে অভিযোগ করে তিনি বলেন, ‘সোশ্যাল মিডিয়ায় গুজব রোধ করতে হবে। সিটিজেন রিপোর্টিংয়ের মাধ্যমে নাগরিকরা তাদের সমস্যাগুলো সামনে নিয়ে আসবেন। এতে সরকার ও জনপ্রতিনিধিরা সেসব সমস্যার সমাধান করবেন।

আহ্বান জঙ্গিবাদ থেকে দূরে থাকার
ধর্মীয় রীতি-নীতি ও অনুশাসন মেনে চলতে এবং জঙ্গিবাদ থেকে দূরে থাকার আহ্বান জানান পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি)। তিনি বলেন, ‘শুধু আরবি পড়লে হবে না, মসজিদে নামাজ পড়তে হবে। যে নামাজ পড়বে সে চুরি, ডাকাতি, বেইমানি করতে পারে না। জঙ্গিবাদ ইসলামের শত্রু। জঙ্গিবাদ থেকে দূরে থাকতে ইসলামকে জানতে হবে।’

ড.বেনজীর কোরআন তেলাওয়াত করলে যেনো অর্থ সহকারে পড়া হয়, সেজন্য মাদ্রাসা-মক্তবের শিক্ষকদের প্রতি আহ্বান জানান। আইজিপি বলেন, ‘সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ মুক্ত বাংলাদেশ গড়তে এবং দেশের মানুষের সার্বিক নিরাপত্তায় মানুষের কল্যাণে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে বাংলাদেশ পুলিশ বাহিনী।

ধর্মীয় সঠিক শিক্ষা পেলে কখনো কোন মানুষ গোমরাহির দিকে যেতে পারেনা। আমাদের দেশে ধর্মীয় শিক্ষার নামে শুধু আলিফ বা তা শিখানো হয়। ধর্মীয় শিক্ষা মানে শুধু আরবি শিক্ষা না, সবাইকে বাংলা আরবি ও ইংরেজি শিক্ষা দিতে হবে। তাহলে শিশুরা সঠিক শিক্ষা পাবে, তাদের মধ্যে গোমরাহি তৈরি হবে না।’

জেলা পুলিশ সুপার (এসপি) ড. এ এইচ এম কামরুজ্জামানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন পুলিশ নারী কল্যাণ সমিতির (পুনাক) সভানেত্রী জীশান মির্জা। এ সময় চট্টগ্রাম রেঞ্জের উপ-মহাপরিদর্শক (ডিআইজি) আনোয়ার হোসেন ও অতিরিক্ত ডিআইজি মো. সাইফুল ইসলামসহ পুলিশের উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

পরে পুলিশপ্রধান জেলা পুলিশ লাইন্সের ড্রিল শেডে রেঞ্জ এবং জেলার পুলিশ কর্মকর্তা ও সদস্যদের সাথে আইন-শৃঙ্খলা সংক্রান্ত সভায় মিলিত হন। তিনি দাশের হাট পুলিশ ফাঁড়ি এবং নারী ব্যারাকেরও উদ্বোধন করেন।

কালের আলো/এমএএএমকে