বিজয়ের দুর্দমনীয় চেতনায় শাণিত করলেন মন্ত্রী, প্রত্যয় মাথা উঁচু করে চলার

প্রকাশিতঃ 9:07 pm | December 15, 2021

বিশেষ সংবাদদাতা, কালের আলো :

বিজয়ের ৫০ বছর পূর্তির আনন্দ উৎসবে উচ্ছ্বল মুহুর্তের মাত্র কয়েক ঘন্টা বাকী। বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী ও স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর এই সময়টিতে বিশ্বসভায় উজ্জ্বল বাংলাদেশ। নানা দিক থেকে অগ্রগতি বাঙালি জাতির চির আরাধ্য পুরুষ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে স্বাধীনতারই ফসল। বিজয়ের সেই দুর্দমনীয় চেতনায় সবাইকে শাণিত করলেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী মো.তাজুল ইসলাম এমপি।

সমুদ্র থেকে মহাকাশ পর্যন্ত বাংলাদেশের বিজয়ের চিহ্নই মোটাদাগে উপস্থাপন করলেন নিজের প্রাণবন্ত ও যুক্তিনির্ভর আলোচনায়। বাঙালি জাতির হাজার বছরের শৌর্যবীর্য ও বীরত্বের অবিস্মরণীয় মাহেন্দ্রক্ষণে দাঁড়িয়ে ধন্য সেই পুরুষ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের লড়াকু নেতৃত্বে বাঙালির ২৪ বছরের শোষণ-বঞ্চনার অবসানের সারি সারি চিত্রপট তুলে আনলেন নিজের জবানীতে।

যুদ্ধবিধ্বস্ত অবকাঠামো আর শূন্য ভাণ্ডার নিয়ে যাত্রা শুরু করা বাংলাদেশ এখন বঙ্গবন্ধু কন্যা, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে উন্নয়নের রোল মডেল, বিশ্বের বিস্ময়-সবকিছুই উচ্চারিত হলো মন্ত্রীর কন্ঠে। 

সব ষড়যন্ত্র ছিন্ন করে রক্তের দামে কেনা স্বাধীনতার মর্যাদা অক্ষুন্ন রাখা এবং মাথা উঁচু করে চলার দৃঢ় প্রত্যয়েরও ঘোষণা দিলেন ১৯৯৬ সালে প্রথমবার সংসদ সদস্য হওয়া সরকারের অভিজ্ঞ এই মন্ত্রী। কোন পরাক্রমশালীর রক্তচক্ষু নয়, মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ী জাতির মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনাই বড় শক্তি সেই কথাও দৃঢ়কন্ঠে জানান দিলেন তাজুল ইসলাম এমপি।

বুধবার (১৫ ডিসেম্বর) রাজধানীর আগারগাঁওয়ে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের অডিটোরিয়ামে স্থানীয় সরকার বিভাগ আয়োজিত মহান বিজয় দিবস-২০২১ উদযাপন উপলক্ষে ‘জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বপ্নের সোনার বাংলা বিনির্মাণে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ধারণ ও ডিজিটাল প্রযুক্তির সর্বোত্তম ব্যবহারের মাধ্যমে জাতীয় সমৃদ্ধি অর্জন’ শীর্ষক আলোচনা সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে সরল, সহজ ও প্রাঞ্জল ভাষায় তথ্যসমৃদ্ধ বক্তব্যই উপস্থাপন করেন স্থানীয় সরকার মন্ত্রী।

বঙ্গবন্ধু বাঙালির অধিকার আদায়ে আপোষ করেননি
স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী মো. তাজুল ইসলাম বলেন, ‘বঙ্গবন্ধু তাঁর সারা জীবনে জেল-জুলুম, অত্যাচার-নির্যাতন এবং লাঞ্ছনা সহ্য করেছেন। কিন্তু বাঙালির অধিকার আদায়ে অন্যায়ের সাথে কোনো আপোষ করেননি।

তিনি বলেন, ‘জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাঙালিকে পাকিস্তানের শাসন-শোষণ, জুলুম-অত্যাচার, নির্যাতন এবং সকল বৈষম্য থেকে মুক্তি দিয়ে তাদের অধিকার আদায়ে সারা জীবন ত্যাগ স্বীকার করেছেন। ৭ই মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণের মাধ্যমে পুরো জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করে দেশকে স্বাধীন করে দিয়ে গেছেন। তিনি নিজে অত্যাচারিত, নির্যাতিত ও লাঞ্চিত হয়েছেন কিন্তু মানুষের অধিকার আদায়ে মৃত্যুর মুখোমুখি হয়েও কোনো আপোষ করেননি।

বঙ্গবন্ধু বেঁচে থাকলে ২০০০ সালেই উন্নত হতো দেশ
স্থানীয় সরকার মন্ত্রী বলেন, ‘বঙ্গবন্ধু বেঁচে থাকলে দেশ ২০০০ সালের মধ্যেই উন্নত দেশে পরিণত হতো। কিন্তু ১৫ই আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে হত্যার মাধ্যমে মূলত বাংলাদেশের স্বপ্নকেই ধ্বংস করা হয়েছে। পাকিস্তানের প্রেতাত্মা এবং যারা ২৫ বছরের শাসন শোষণ করেছে তারা আবার দেশকে নিয়ে ষড়যন্ত্র শুরু করেছে। যত ষড়যন্ত্রই করা হোক না কেন ২০৪১ সালের মধ্যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে দেশ উন্নত-সমৃদ্ধ বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলায় পরিণত হবে।

অভূতপূর্ব উন্নয়নের রূপকার প্রধানমন্ত্রী
১৯৭১ সালে বিশ্বের মানচিত্রে যখন নতুন দেশ হিসেবে বাংলাদেশের অভ্যুদয় হয়, তখন অর্থনৈতিকভাবে এটির টিকে থাকা নিয়ে অনেকেই সংশয় প্রকাশ করেছিলেন। অথচ সেই দেশটিই অর্থনৈতিক ও সামাজিক এমন কোন সূচক নেই যে, অগ্রগতি লাভ করেনি। সবচেয়ে বড় নিন্দুকেরাও এখন বাংলাদেশের ভূয়সী প্রশংসা করেন। ৫০ বছরে বাংলাদেশের অর্জন অবিশ্বাস্য রকমের। বিশ্ববাসী যা ভাবতে পারেনি, তাই করে দেখিয়েছে বাংলাদেশ।

বৃদ্ধির সঙ্গে যুক্তির যুগপৎ সম্মিলন ঘটিয়েই বলছিলেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী মো.তাজুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘পাকিস্তান, ভারত, নেপালসহ পার্শবতী অনেক দেশের তুলনায় আমাদের মাথাপিছু আয় বেশি উল্লেখ করে মোঃ তাজুল ইসলাম বলেন, বিদ্যুৎ-গ্যাস, যোগাযোগ ব্যবস্থা, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য, কৃষিসহ সকল খাতে অভূতপূর্ব উন্নয়ন করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বাঙালি এখন আর ফকির-মিসকিনের জাতি নয়। সারা বিশ্বে বাংলাদেশ আজ মর্যাদাশীল জাতি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত এবং উন্নয়নের রোল মডেলে পরিণত হয়েছে।’

মন্ত্রী বলেন, ‘পদ্মা সেতু চালু হলে ওই অঞ্চলে অনেক শিল্প-কলকারখানা সৃষ্টি হবে। সারা দেশে অর্থনৈতিক জোন করা হচ্ছে। এসব চালু হলে তৈরি হবে লক্ষ লক্ষ কর্মসংস্থান। বদলে যাবে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড। দেশ পৌঁছে যাবে কাঙ্খিত লক্ষ্যে।’

কনসোর্টিয়ামের সভায় সাইফুর রহমানরা বসে থাকতেন বাজেটের জন্য
নিজের বক্তব্যে একটি উদাহরণ টানেন মন্ত্রী তাজুল ইসলাম। তিনি ফিরে যান অতীত ইতিহাসে। বলতে থাকেন, ‘বিএনপি ক্ষমতায় থাকাকালে বিশ্ব কনসোর্টিয়াম সভায় সাইফুর রহমানরা গিয়ে বসে থাকতেন জুন মাসের বাজেটের জন্য। কিসের বাজেট, কিসের টাকা? আমাদের দেশের মানুষকে বাঁচানোর জন্য। সেই সময় তাঁরা উন্নয়ন সহযোগীর দ্বারে দ্বারে ঘুরতো দেশের বাজেটের টাকার জন্য।

আর এখন দেশের নিজস্ব টাকায় বাজেট প্রণয়ন করা হচ্ছে। বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে উন্নয়ন সহযোগীরা অর্থায়ন যাচাই-বাছাই করে দেশের স্বার্থ বিবেচনা করে গ্রহণ করা হচ্ছে। আমাদের এখন তাদের কাছে টাকার জন্য যেতে হয় না। কোন কাজটি হবে, কোনটি করবো না আর কিসের জন্য জ্ঞান দিবেন এই সিদ্ধান্ত আমাদের।

এটি অনেকের ভালো লাগে না। আমাদের দেশের উন্নয়নের জন্য সিদ্ধান্ত আমরা দেবো। এই জাতি অধম, মিসকিনের জাতি নয়। আজ ১৭ কোটি মানুষ খায়। আমরা টাকা রোজগার করি, নিজেদের সমস্যা আমরা নিজেরা সমাধান করি। আজ দেশের শতভাগ মানুষ বিদ্যুৎ পেয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের সিদ্ধান্তের সমালোচনা, মাথা উঁচু করে চলার দৃঢ় প্রত্যয়ের ঘোষণা
সম্প্রতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র র‌্যাবের বর্তমান ও সাবেক ৭ কর্মকর্তাকে তাদের দেশে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছেন। এই সিদ্ধান্তের কঠোর সমালোচনাও করেন স্থানীয় সরকার মন্ত্রী। এ সময় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নাম উচ্চারণ না করলেও কয়েকটি বিষয়ে সবাইকে স্মরণ করিয়ে দেন তিনি।

মন্ত্রী বলেন, ‘কোন দেশে কতজন মানুষকে গুলি করে মারা হয় ইতিহাস আমাদের জানা আছে। ১৯৭৪ সালে যখন বন্যায় সারা দেশ ভেসে গেছে, মানুষের জন্য খাদ্য সরবরাহ করা যাচ্ছে না তখন কারা জাহাজ ফেরত দিয়েছিল, আমরা ভুলিনি। স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় সপ্তম নৌবিহার কারা পাঠিয়েছিল, এগুলো আমরা ভুলে যাইনি।

আমাদের শক্তি আমাদের দেশের মানুষ। পদ্মাসেতু বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন ছিল। অনেকেই অনেক নাটক করেছেন। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দূরদর্শী নেতৃত্বে পদ্মাসেতু এখন বাস্তবতা। এখন বাংলাদেশ কারো কাছে ভিক্ষা চায় না। এখন বাংলাদেশকে কেউ টাকা দিতে চাইলে তারা বলেন, কোনটা দেবেন, কোনটা নেবো আমরা ঠিক করবো।

ক’দিন আগে গণতন্ত্রের সামিট হলো। সেখানে ১০০ দেশকে দাওয়াত দিয়েছে? কে ক্ষমতা দিয়েছে? এই কথাগুলো আমাদের বুঝতে হবে। আমি পৃথিবীর বহু দেশ ঘুরেছি। আমাদের অগ্রযাত্রায় অনেকেই বাঁধা দিয়েছেন। কেউ এগিয়ে দেননি। নিজের এই বক্তব্যের সময় গ্রাম্য এক প্রবাদ উচ্চারণ করেন মন্ত্রী- ‘লগের ভাই রাজা হয়, সেই দু:খ কী শরীরে সয়?’

মূলত এসব ঘটনা প্রবাহের আলোকে মার্কিন সিদ্ধান্তের তীব্র সমালোচনা করেন স্থানীয় সরকার মন্ত্রী। একই সঙ্গে আত্নমর্যাদাশীল জাতি হিসেবে বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশ বিশ্বের বুকে মাথা উঁচু করে চলবে বলেও দৃঢ়কন্ঠে উচ্চারণ মন্ত্রীর।

স্থানীয় সরকার বিভাগের জ্যেষ্ঠ সচিব হেলালুদ্দীন আহমদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে ঢাকা ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) তাকসিম এ খান, এলজিইডির প্রধান প্রকৌশলী আব্দুর রশিদ খান, অতিরিক্ত সচিব কাজী আশরাফ উদ্দীন, জাতীয় স্থানীয় সরকার ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক সালেহ আহমদ মোজাফফর অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন।

এর আগে মন্ত্রী মো. তাজুল ইসলাম এলজিইডি’র বিভিন্ন প্রকল্পের উদ্যোগে আয়োজিত বিজয় মেলার উদ্বোধন করে বিভিন্ন স্টল পরিদর্শন করেন। একেই সঙ্গে মহান বিজয় দিবস, বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী এবং স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উপলক্ষে আয়োজিত সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানও উপভোগ করেন তিনি।

কালের আলো/জিকেএম/এমএএএমকে