পুলিশে ‘মুগ্ধ’ ও ‘কৃতজ্ঞ’ প্রধানমন্ত্রী; দক্ষ-আধুনিক বাহিনীর পথযাত্রার নেতৃত্বে আইজিপি
প্রকাশিতঃ 4:08 pm | January 25, 2022

এম.আব্দুল্লাহ আল মামুন খান, অ্যাকটিং এডিটর :
ক্ষমতালোভী ঘৃণিত ঘাতকের তপ্ত বুলেট স্তব্ধ করে দিয়েছিল বাঙালির মুক্তি সংগ্রামের দ্ব্যর্থহীন বজ্রকণ্ঠ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে। মুক্তিযুদ্ধজয়ী বাঙালি জাতির গৌরবোজ্জ্বল ললাটে এক কলঙ্কতিলক ১৫ আগস্ট কালরাত্রির নৃশংসতা। সেই রাতে ঘাতকের বুলেটে আহত হয়েছিলেন বঙ্গবন্ধুর চাচাতো বোন হামিদা খানম রানু।
আরও পড়ুন: আরও একবার প্রধানমন্ত্রীর রাষ্ট্রনায়কোচিত প্রজ্ঞা দেখলো বিশ্ব, উদ্দীপ্ত-উজ্জীবিত পুলিশ-র্যাবও
আহত হয়েও ভাগ্যক্রমে বেঁচে যান রাজধানীর মিন্টু রোডের সরকারি বাসভবনে শহীদ আব্দুর রব সেরনিয়াবাতের ছেলে আবুল হাসনাত আব্দুল্লাহ ও তাঁর স্ত্রী সাহান আরা বেগম। বঙ্গবন্ধু পরিবারে লোমহর্ষক এই হত্যাকান্ডের পর প্রাণে বেঁচে যাওয়া এসব সদস্যদের উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে গিয়েছিলেন রমনা থানা পুলিশের সদস্যরা। মনের কোণে জমানো কষ্টগুলো আজও পাথরের মতো জমাট বেঁধে আছে বঙ্গবন্ধু কন্যা, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হৃদয়ে।
৪৭ বছর পরেও নিজ পরিবারের সদস্যদের হারানোর শোক উদ্বেলিত সুর তুলে তাঁর প্রাণে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবাহিত জনকের সোনার বাংলা বাস্তবায়ন ও পরিপূর্ণতা লাভের দৃঢ় অঙ্গীকারের যাত্রাপাথে বঙ্গবন্ধু কন্যার মনের শেঁউতিতে উজ্জ্বল নক্ষত্রের মতোই জ্বলজ্বল দেশপ্রেমিক পুলিশ বাহিনীর সদস্যরা।
সব হারানোর শোককে শক্তিতে রূপান্তর করে জাতির পিতার দেশপ্রেমের শক্তিতে বলীয়ান হওয়ার দৃপ্ত শপথে রোববার (২৩ জানুয়ারি) চলতি বছরের পুলিশ সপ্তাহে গণভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে তিনি নিজের জবানীতে তুলে এনেছেন ৭৫’র বিয়োগান্তক ঘটনা। কৃতজ্ঞচিত্তেই স্মরণ করেছেন তাঁর পরিবারের সদস্যদের জন্য পুলিশ বাহিনীর সাহসী সদস্যদের অনির্বাণ মানবিকতা।
বাষ্পরুদ্ধ হাহাকারে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য ছিল এমন-‘সেদিন গুলিতে আহত ছিলেন আমার ফুফু এবং আব্দুর রব সেরনিয়াবাত সাহেবের ছেলে, স্ত্রীসহ আমার ফুফাতো ভাই ও বোনেরা। যখন এই খুনীরা আক্রমণ করে চলে যায় তখন রমনা থানা থেকে পুলিশ বাহিনীর সদস্যরা তাঁদের বাড়িতে গিয়ে আহত-নিহতদের হাসপাতালে নিয়ে যান। শুধুমাত্র পুলিশের এই সাহসী ভূমিকায় আমার ফুফু বেঁচে ছিলেন।
তিনি পঙ্গু অবস্থায় বাকি জীবন কাটান। আমার দুই ফুফাতো বোন এবং ভাই বেঁচে যান। বঙ্গবন্ধুর বাসভবনে হামলায় বাধা দিতে যেয়ে গুলিতে নিহত হন পুলিশের বিশেষ শাখার এএসপি সিদ্দিকুর রহমান। আমি তাকেও শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করি।’
রাজারবাগ পুলিশ লাইনস প্রান্তে তখন ছলছল চোখ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল, পুলিশপ্রধান ড.বেনজীর আহমেদ ও জননিরাপত্তা বিভাগের জ্যেষ্ঠ সচিব মো.আখতার হোসেনসহ অন্যদের।

বাঙালি জাতির ইতিহাসের মহানায়ক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭১ সালে ২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে স্বাধীনতার ডাক দেন। বঙ্গবন্ধুর আহ্বানে রাজারবাগে পাকিদের বিরুদ্ধে প্রথম প্রতিরোধ গড়ে তুলেন পুলিশ বাহিনীর সদস্যরা। মহান মুক্তিযুদ্ধ থেকে শুরু করে গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের অগ্রযাত্রা অব্যাহত রাখতে পুলিশ বাহিনীর ত্যাগ ও অবদানে নিজের মুগ্ধতার কথাও উচ্চারণ করেন বঙ্গবন্ধু কন্যা, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
একই সঙ্গে দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষার পাশাপাশি স্বাধীনতা রক্ষা এবং গণতন্ত্র সমুন্নত রাখতে কাজ করার জন্যও পুলিশ সদস্যদের প্রতি তিনি আহ্বান জানিয়েছেন। জনবান্ধব পুলিশিং’র মাধ্যমে দেশের অভ্যন্তরীণ শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখা, গণতন্ত্র সমুন্বত রাখতে প্রতিটি পুলিশ সদস্যকে পেশাদারিত্বের সঙ্গে দায়িত্ব পালনের নির্দেশ দিয়েছেন ‘মানবতার জননী’। দেশের শান্তির সংস্কৃতি বিকাশের লক্ষে নব উদ্যমে কাজ করতেও পিতা মুজিবের কন্যা জুগিয়েছেন অনুপ্রেরণা।
বিএনপি-জামায়াত চক্রের অগ্নিসন্ত্রাস মোকাবেলায় পুলিশের বীরোচিত ভূমিকা, করোনাকালীন সময়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে পুলিশ সদস্যদের আর্তমানবতার সেবায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো, মিয়ানমার থেকে আসা রোহিঙ্গাদের নিরাপত্তা, ৯৯৯ সেবার মাধ্যমে দ্রুত সেবা নিশ্চিতের মাধ্যমে মানুষের আস্থা ও বিশ্বাস তৈরি করার বিষয়সমূহ দৃঢ়কন্ঠে তুলে এনেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। গর্ব করেছেন জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী বাহিনীতে পুলিশ বাহিনীর গৌরবদীপ্ত অংশগ্রহণ বিশেষ করে নারী সদস্যদের দায়িত্ব পালনেরও। পুলিশকে তিনি উন্নীত করেছেন প্রযুক্তি জ্ঞানসম্পন্ন এক বাহিনীতে।
বাবা বাঙালি জাতির চির আরাধ্য পুরুষ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হাতেগড়া বাংলাদেশ পুলিশ বাহিনীর প্রতি নিজের অকৃত্রিম ভালোবাসার নানা উদাহরণও তৈরি করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। মূলত বঙ্গবন্ধুর কাছ থেকেই এমন গুণাবলী পেয়েছেন তিনি। পুলিশ পরিবারেরও পরম আপন তিনি।
প্রধানমন্ত্রী স্বাধীনতার ইতিহাসের সঙ্গে রাজারবাগ পুলিশ লাইন্সের নাম আজীবন জড়িত থাকবে উল্লেখ করে এর আগেও বলেছেন, ‘দেশে পুলিশের অবদান ইতিহাসে সবসময় স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। পুলিশ বাহিনী প্রত্যেকটি ক্ষেত্রে সাহসিকতা ও দক্ষতার পরিচয় দিচ্ছে। সড়ক নিরাপত্তায় তাঁরা পালন করছে বিশেষ ভূমিকা।’
বৈশ্বিক সমস্যা সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ প্রতিরোধ ও নির্মূলে সব সময় দেশের পুলিশ বাহিনী বীরত্বের সঙ্গে কাজ করায় জাতি চিরদিন তাদের স্মরণ করবে বলেও মনে করেন শেখ হাসিনা। পুলিশ সদর দপ্তর সূত্র বলছে, ২০২০ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২১ সালের আগস্ট পর্যন্ত গত দেড় বছরে ৩১৭ জন ব্যক্তিকে জঙ্গিবাদে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রীর স্বপ্নপূরণে যুগান্তকারী যতো উদ্যোগ আইজিপির
বরাবরই প্রধানমন্ত্রীর প্রগাঢ় স্নেহের ছোঁয়াও পেয়েছে বাংলাদেশ পুলিশ। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দূরদর্শী চিন্তা-ভাবনা, কার্যকর উদ্যোগ এবং অভিভাবকত্ব প্রতিনিয়ত বদলে দিচ্ছে পুলিশকে। আইজিপি ড.বেনজীর আহমেদ, বিপিএম (বার) সরল স্বীকারোক্তি-‘প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খানের তত্ত্বাবধানে আত্মমর্যাদাশীল পুলিশ বাহিনী গড়তে আমরা দুর্বার গতিতে কাজ করে যাচ্ছি।’
‘এসেছি অনেক দূর, যেতে হবে বহুদূর’- এই মন্ত্রে শাণিত এই পুলিশপ্রধান একটি আধুনিক, দক্ষ ও যুগোপযোগী পুলিশ বাহিনী গড়তে ২০ বছর মেয়াদী মহাপরিকল্পনার প্রস্তাবনার কথাও জানিয়েছেন সর্বোচ্চ গুরুত্বের সঙ্গেই। আত্মমর্যাদাশীল পুলিশ বাহিনী গড়তে নিজেদের অবিরাম সংগ্রাম ও সংকল্পের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার স্বপ্নপূরণেরও দৃঢ় অঙ্গীকার করেছেন তিনি।
২০৪১ সালের উন্নত ও ধনী দেশের উপযোগী পুলিশ বাহিনী গড়তে ২০ বছর মেয়াদী এক মহাপরিকল্পনার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন আইজিপি ড.বেনজীর আহমেদ। তিনি নিজ বাহিনীর ব্যাপক সংস্কারের বিষয়েও জোর দিয়েছেন। সময়ের চেয়েও প্রাগ্রসর ও বিজ্ঞানমনষ্ক পুলিশের এই সর্বোচ্চ কর্মকর্তা পুলিশকে সময়োপযোগী করে গড়ে তুলতে ব্যাপক সংস্কারের উদ্যোগ গ্রহণ করেও সফলতার মুখ দেখেছেন।
আইজিপি বলেছেন, ‘২০৪১ সালে আমরা ধনী রাষ্ট্র হওয়ার স্বপ্ন দেখছি। সেই রাষ্ট্রের জন্য পুলিশকেও প্রস্তুত হতে হবে। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ হিসেবে আমরা ইতোমধ্যে স্ট্রেটেজিক প্ল্যান করছি।’

বাংলাদেশ পুলিশের ৪০ বছরের ইতিহাসে পরিবর্তন এনেছেন পুলিশ সদস্য (কনস্টেবল), এসআই, সার্জেন্ট ও টিএসআই পদে নিয়োগের প্রক্রিয়ায়। আইন সংশোধন করে নতুন প্রবিধানেই সারাদেশে নিয়োগ হয়েছে পুলিশ সদস্য। পুলিশ সদস্য নিয়োগে শতভাগ স্বচ্ছতা নিশ্চিত এবং হয়রানি দূর করতেই আইনে পরিবর্তন এনেছেন। দক্ষ, পেশাদার এবং যোগ্য পুলিশ সদস্য নির্বাচনের মাধ্যমে রীতিমতো অসম্ভবকে সম্ভব করেছেন আইজিপি।
কোন রকম তদবির বা ঘুষ ছাড়াই পুলিশে চাকরি হওয়ার নতুন সংস্কৃতি চালু করে উজ্জ্বল করেছেন সরকারের ভাবমূর্তি। সরকারপ্রধান শেখ হাসিনা পুলিশ নিয়োগের প্রশংসা করে রোববার (২৩ জানুয়ারি) বলেছেন, ‘সংশোধিত নিয়োগ বিধিমালার আলোকে স্বচ্ছতার সঙ্গে সম্প্রতি ৩ হাজারের অধিক কনস্টেবল নিয়োগ করেছি।’
পুলিশপ্রধানও বারবার মনে করিয়ে দিয়েছেন পুলিশে চাকরি ‘পেশা’ নয় ‘সেবা’। তিনি সেবার পাশাপাশি নির্ধারণ করে দিয়েছেন সৎ, দেশপ্রেমিক ও সাহসী তিনটি গুণের কথা। সোমবার (২৪ জানুয়ারি) চলতি বছরের পুলিশ সপ্তাহের দ্বিতীয় দিনে রাজারবাগ পুলিশ লাইনস মাঠে আয়োজিত পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে পুলিশে বেছে বেছে সেরাদের মধ্যে সেরা অফিসারদের নিয়োগ দেওয়ার কথাও দৃঢ়তার সঙ্গেই উচ্চারণ করেছেন আইজিপি।
তিনি বলেছেন, ‘কনস্টেবল ও এসআই নিয়োগের নিয়ম প্রায় ৪০ বছর পর পরিবর্তন করা হয়েছে। ইতোমধ্যে কনস্টেবল নিয়োগ সম্পন্ন হয়েছে। এসআই নিয়োগ চলছে। নিয়োগ পদ্ধতি অত্যাধুনিক করা হয়েছে। অত্যাধুনিক এই নিয়োগ পদ্ধতির মাধ্যমে আমরা জব মার্কেট থেকে সেরাদের মধ্যে সেরাদের নিয়োগ দিতে সক্ষম হবো।’

২০২০ সালের ১৫ এপ্রিল বাংলাদেশ পুলিশের ১৫ তম আইজিপি হিসেবে দায়িত্বভার গ্রহণ করে ড.বেনজীর আহমেদ স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক পুলিশি ব্যবস্থা গড়ার লক্ষে পাঁচ মূলনীতি ঘোষণা করেন। দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স, মাদক নির্মূল, অমানবিক ও অপেশাদার আচরণ বন্ধ করা ও পুলিশের সার্বিক কল্যাণ নিশ্চিতে পুলিশের সব কর্মকর্তা ও ফোর্সদের কঠোর নির্দেশনা প্রদান করেন।
সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে ড. বেনজীর আহমেদ বলেন, ‘পুলিশ জনগণকে নিয়ে কাজ করে। জনগণ নিয়ে কাজ করতে গেলে পুলিশে আচরণগত পরিবর্তন আনতে হবে। পুলিশের এই জায়গায় পরিবর্তন আনার জন্য গুণগত কাজ করে যাচ্ছি। পরিবর্তন অনেক সময় ও কষ্টসাধ্য বিষয়, তবে পরিবর্তনের সেই প্রয়াস আমরা শুরু করেছি।’
আইজিপি হিসেবে নিজের পৌনে দু’বছরের অভিযাত্রায় পুলিশের সেবা পৌঁছে দিয়েছেন সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায়। গোটা দেশকে ৬ হাজার ৯১২টি বিটে ভাগ করে প্রতি বিটে একজন কর্মকর্তা পদায়নের মাধ্যমে চালু করেছেন বিট পুলিশিং প্রথা। কার্যকর বিট পুলিশিং’র ফলে কমেছে বড় ধরণের অপরাধ। কমেছে মামলার সংখ্যাও। ২০১৯ সালে যেখানে মামলার সংখ্যা ছিল ২ লক্ষ ২৫ হাজার ৬৮৪ টি। ২০২০ সালে সেটি কমে গিয়ে দাঁড়ায় ১ লক্ষ ৮৭ হাজার ৯২৬’এ।
উন্নত পুলিশি সেবা প্রদানে হ্যান্ডস ফ্রি পুলিশিং’র জন্য মাঠ পর্যায়ের পুলিশ সদস্যদের জন্য আইজিপি টেকটিক্যাল বেল্ট চালু করেছেন।

কনস্টেবল থেকে অতিরিক্ত আইজি পর্যন্ত সব পর্যায়ের পুলিশ সদস্যদের জন্য বছরে অন্তত একবারের জন্য হলেও বাধ্যতামূলক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থারও প্রবর্তন করেছেন বর্তমান এই পুলিশপ্রধান। প্রশিক্ষণের ওপর গুরুত্বারোপ করে প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানের আধুনিকায়ন, যুগোপযোগী সিলেবাস প্রণয়ন, মডিউল তৈরিসহ ইত্যাকার কার্যক্রম গ্রহণ করেছেন। এসব উদ্যোগের উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেছেন প্রধানমন্ত্রী নিজেও।
রোববার (২৩ জানুয়ারি) চলতি বছরের পুলিশ সপ্তাহে ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে তিনি বলেছেন, ‘এখন পুলিশ বাহিনী প্রযুক্তি জ্ঞানসম্পন্ন পুলিশ বাহিনীতে উন্নীত হয়েছে। সকল র্যাঙ্কের পুলিশ সদস্যদের দক্ষতা উন্নয়নে বাধ্যতামূলকভাবে প্রতি বছর ইন-সার্ভিস প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। নতুন যুগোপযোগী ট্রেনিং মডিউল প্রণয়ন, ট্রেনিং মডিউলের মধ্যে মানবাধিকার সংরক্ষণের উপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।’
করোনাকালীন সময়ে দুর্দিনের ঘূর্ণিপাকে বিপদগ্রস্ত ও অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে অনন্য মানবিকতার নজির স্থাপন করেন পুলিশপ্রধান। করোনায় ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীর পাশাপাশি বন্যাদুর্গতদের পাশেও ছিল পুলিশ। আইজিপির নির্দেশে করোনার প্রথম ও সেকেন্ড ওয়েবে সাধারণ মানুষকে সুরক্ষার পাশাপাশি দেওয়া হয়েছে খাদ্যসামগ্রী। একইভাবে বন্যাকবলিত এলাকার অসহায় মানুষেরও পাশে নিজেদের নিবেদন করেন পুলিশ সদস্যরা। পুলিশের বহুমাত্রিক মানবিকতার এমন সব গল্পগাঁথা সাধারণ মানুষের মুখে মুখে।

ড.বেনজীর পুলিশের পদোন্নতিকে আরও আধুনিক করতেও সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। পদোন্নতির ক্ষেত্রে চিরায়ত জট কাটিয়ে নিজ বাহিনীর নায়েক থেকে অতিরিক্ত আইজিপি পর্যন্ত কর্মীদের মাঝে ফুরফুরা মেজাজ ফিরিয়ে আনতে কাঙ্খিত সময়ে পদোন্নতিতে জোর দিয়েছেন। অগ্রাধিকার দিয়েছেন সৎ ও যোগ্যদের পদোন্নতিতে। ফলে কেন্দ্র থেকে প্রান্ত উজ্জীবিত হয়ে উঠছেন বাহিনীটির বিভিন্ন পদের কর্মকর্তারা।
২০২০ সালের ১৬ নভেম্বর রাজারবাগ পুলিশ লাইনস অডিটোরিয়াম থেকে পুলিশ সাইবার সাপোর্ট ফর উইমেনের (পিসিএসডব্লিউ) গোড়াপত্তন করেছিলেন আইজিপি ড.বেনজীর আহমেদ। মাত্র ১৪ মাসেই বিস্ময়জাগানিয়া সাফল্য অর্জন করেছেন এই অল-উইমেন ইউনিট।
এখান থেকে সব রকমের সহযোগিতা নিচ্ছেন সাইবার ওয়ার্ল্ডের ভুক্তভোগী নারীরা। পাচ্ছেন আইনী সহায়তার পাশাপাশি মানসিক শক্তি-সাহসও। স্বল্প সময়েই নারী সেবা প্রার্থীদের ভরসাস্থলে পরিণত হয়েছে বাংলাদেশ পুলিশের এই ব্যতিক্রমী প্ল্যাটফর্ম। দ্রুত সেবা আর সমস্যার সমাধান হওয়ায় তাঁরা হৃদয়ের অতল থেকে কৃতজ্ঞতাও প্রকাশ করেছেন পুলিশপ্রধানের প্রতি।
পুলিশ সদর দপ্তরের পরিসংখ্যান বলছে, এই সার্ভিসে গত বছরের অক্টোবর পর্যন্ত ১৭ হাজার ২৮০ জন ভুক্তভোগী নারী যোগাযোগ করেছেন। যার মধ্যে ১২ হাজার ৬৪১ জন নারী ভুক্তভোগী হয়রানির শিকার হয়ে যোগাযোগ করেছেন। এর মধ্যে ৮ হাজার ২২১ জনের অভিযোগের বিষয়ে প্রযুক্তিগত ও আইনি সহায়তা প্রদান করা হয়েছে।

যেভাবে ‘পুলিশবান্ধব’ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা
কেবল লোকবল বাড়ানোই নয়, একই সঙ্গে আধুনিকায়ন হচ্ছে পুলিশেরও। সময়ের প্রয়োজনেই পুলিশ আধুনিক প্রযুক্তির সঙ্গে পরিচিত হচ্ছে। বদলে যাওয়া অপরাধের ধরণের সঙ্গে মাঠ পর্যায়েও পুলিশের হাতে পৌঁছে যাচ্ছে প্রযুক্তির সর্বাধুনিক সেবা।
বাড়ছে পুলিশের সক্ষমতাও। এসবের নেপথ্যে রয়েছেন একজন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এই সরকারপ্রধান নিজেই উদ্যোগী হয়ে পুলিশের সমস্যা সনাক্ত; চাওয়া-পাওয়া পূরণ করেন। ‘পুলিশবান্ধব’ একজন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে যারপরেনাই তিনি গোটা বাহিনীতেই তুঙ্গস্পর্শী জনপ্রিয়তার অধিকারী হয়েছেন।
চলতি বছরের পুলিশ সপ্তাহের উদ্বোধন করতে গিয়ে নিজের জবানীতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ‘১৯৯৬ সালের প্রথম মেয়াদেই আমার সরকার ৫ কোটি টাকা সিড মানি প্রদান করে পুলিশ কল্যাণ ট্রাস্ট গঠন করে। বিভিন্ন স্থানে থানা, তদন্ত কেন্দ্র, হাইওয়ে ফাঁড়ি, পুলিশ ক্যাম্প এবং পুলিশ ফাঁড়ি নির্মাণ করে। পাশাপাশি ৮০৩ জন এসআই, ৫০৭ জন সার্জেন্ট এবং ১৪ হাজার ৬৮০ জন কনস্টেবল নিয়োগ করে ও আইন শৃঙ্খলার উন্নয়নে কমিউনিটি পুলিশ গঠনের উদ্যোগ গ্রহণ করে।
২০০৯ সালে সরকার গঠনের পর থেকে গত ১৩ বছরে পুলিশের উন্নয়নে নানাবিধ কর্মকান্ড গ্রহণ ও বাস্তবায়নের উল্লেখযোগ্য পরিসংখ্যান তুলে ধরে হ্যাটট্রিক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ‘পুলিশের সাংগঠনিক কাঠামোতে মোট ৮২ হাজার ৫৮৩টি নতুন পদ সৃজন করা হয়েছে। পুলিশের নতুন ইউনিট যেমন ইন্ডাস্ট্রিয়াল-ট্যুরিস্ট-নৌ, পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন, এন্টি টেররিজম ও কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিট, রংপুর ও ময়মনসিংহে রেঞ্জ, রংপুর এবং গাজীপুরে মেট্রোপলিটন পুলিশ ইউনিট, রংপুরে আরআরএফ এবং সিআইডি’তে সাইবার পুলিশ সেন্টার গঠন করা হয়েছে।

দু’টি সিকিউরিটি অ্যান্ড প্রটেকশন ব্যাটালিয়ন, এয়ারপোর্টে একটি ও কক্সবাজারে দু’টি আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন এবং র্যাবের জন্য ৩টি ব্যাটালিয়ন, ৩০টি ইন-সার্ভিস ট্রেনিং সেন্টার, ৬২টি থানা, ৯৫টি তদন্ত কেন্দ্র এবং ১টি ফাঁড়ি এবং জাতীয় জরুরি সেবায় ৯৯৯ ইউনিট গঠন করা হয়েছে। জরাজীর্ণ থানাগুলো পুননির্মাণ করা হয়েছে।’
সরকারপ্রধান বলেন, আমরা আইজিপি’র র্যাংক ব্যাজ পুন:প্রবর্তন করেছি। গ্রেড-১ এর ২টি, গ্রেড-২ এর ১১টি, ডিআইজি এর ৫২টি, অতিরিক্ত ডিআইজির ১৫৯টি, পুলিশ সুপারের ৪০২টি এবং অতিরিক্ত পুলিশ সুপারের ৮০০টি পদ সৃজন করেছি। ২১৫টি অতিরিক্ত পুলিশ সুপার পদকে পুলিশ সুপার (এসপি) পদে, ২৫৩টি সিনিয়র এএসপি পদকে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার পদে, এসআই/সার্জেন্ট পদকে তৃতীয় শ্রেণী থেকে দ্বিতীয় শ্রেণীতে এবং ইন্সপেক্টর পদকে দ্বিতীয় শ্রেণী হতে প্রথম শ্রেণীর নন-ক্যাডার পদে উন্নীত করেছি। আকাশ পথে সক্ষমতা অর্জনের লক্ষ্যে দু’টি হেলিকপ্টার কেনার প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।
অপরাধ তদন্তে অত্যাধুনিক প্রযুক্তির সন্নিবেশ ঘটানো হয়েছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী এদিন আরও বলেন, ‘পুলিশে ২২টি নতুন ব্যারাক, ১০টি একাডেমিক ভবন, বিভিন্ন ইউনিটের জন্য ১০৪টি আবাসিক ফ্ল্যাট নির্মাণ, ৬০টি প্রশাসনিক ভবন নির্মাণ ও সম্প্রসারণ, রাজস্ব বাজেট থেকে ২৭টি থানা নির্মাণ, ২৮টি ফাঁড়ি, ১৫টি তদন্ত কেন্দ্র, ৩৩৭টি থানার হেল্প ডেস্ক, ৪৫টি হাইওয়ে আউটপোষ্ট ভবন সম্প্রসারণ এবং উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় ২১১টি আধুনিক থানা ভবন নির্মাণ, ৯৫টি থানাকে মডেল থানায় উন্নীতকরণ, ২১টি ব্যারাক ভবন ও ৬০টি তদন্ত কেন্দ্র নির্মাণ করা হয়েছে।’

কালের আলো/এমএএএমকে