আইজিপির জার্মানি সফর : ‘ভুল’ জিওতেই বিভ্রান্তি; রহস্য ফাঁস অপতৎপরতার!

প্রকাশিতঃ 12:20 am | February 12, 2022

বিশেষ ভাষ্যকার, কালের আলো :

বাংলাদেশ পুলিশের সদস্যদের জন্য স্থানীয়ভাবে এক লাখ বিছানার চাদর ও বালিশের কভার কেনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রতি বছরই এটি কেনা হয়। চুক্তি অনুযায়ী ডাই (রং) হতে হবে ইউরোপীয় দেশের। পাবলিক প্রকিউরমেন্ট রুল (পিপিআর) অনুযায়ী এই ধরণের গণ ক্রয়ের ক্ষেত্রে উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন আইন মোতাবেক অপরিহার্য। স্বভাবতই ক্রয়কারী প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা এই পরিদর্শন করে থাকেন।

এই পরিদর্শনেই জার্মানি যাওয়ার কথা ছিল পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) ড.বেনজীর আহমেদ’র। অথচ এই সফরের মধ্যে জার্মানি থেকে চাদর-বালিশ কেনার কোনো বিষয়ই নেই।

বিষয়টি খোলাসা করে পুলিশ সদর দপ্তরের একজন কর্মকর্তা বলেছেন, অনেকেই বিষয়টিকে সরকারি বাসা-বাড়ির চাদর-বালিশ কেনার মতো বলে মনে করে থাকতে পারেন। অর্থাৎ, দোকানে গেলাম আর দু’ থেকে চারটি চাদর বালিশ কিনে নিয়ে আসলাম। অথবা পাইকারী আড়তে গেলাম আর ৫০০ থেকে ৭০০ চাদর-বালিশ কিনে নিয়ে আসলাম। কথিত উর্বর মস্তিষ্ক সম্ভবত এখানেই হিসাব-নিকাশে ভুল করে বসেছেন।’

আবার, গোল বেঁধেছে সরকারি আদেশে লেখা জিও’র ভুল তথ্যেও। সেখানে লেখার ধরণে মনে হবে আইজিপি এক লাখ চাদর কিনতে ফ্যাক্টরি পরিদর্শন ও সেখান থেকে আমদানীতব্য চাদর প্রাক জাহাজীকরণ পরিদর্শনের জন্য জার্মানি যাচ্ছেন! উপস্থাপনের এই গড়মিলের কারণেই কী না এই নিয়ে শুরু হয়েছে বিভ্রান্তি। অনলাইনে-অফলাইনে রীতিমতো শুরু হয়েছে তুঘলকি কারবার।

এই সফরের সঙ্গে শিপমেন্টের কোন বিষয় জড়িত না থাকলেও জিওতে উপস্থাপিত হওয়ায় সন্দিগ্ধদের মনে তৈরি হয়েছে সংশয়। সফরের লক্ষ্য, উদ্দেশ্য সম্পর্কে পুরোমাত্রায় ওয়াকিবহাল না হয়েই কেউ কেউ নিজেদের মতোন করে যাচ্ছেতাই বলাবলির মাধ্যমে আইজিপির সফরকে ঘিরে জলঘোলা করার অপতৎপরতা শুরু করে দিয়েছেন।

আরও একধাপ এগিয়ে কেউ কেউ পুলিশপ্রধানের সাদা জামায় ‘কালো দাগ’ লাগাতেই যেন মরিয়া হয়ে উঠেছেন। ইতোমধ্যেই বিষয়টি পরিস্কার করে গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলেছেন পুলিশ সদর দপ্তরের দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা। অথচ এরপরেও থামেনি মহল বিশেষের লাফালাফি, দাপাদাপি। ফলশ্রুতিতে দায়িত্বশীলদের সঙ্গে আলাপের মাধ্যমে পুরো বিষয়টির সুলুক সন্ধান করেছে কালের আলো।

জানা যায়, ২০২১ সালের ৮ অক্টোবর বিছানার চাদর ও বালিশের ডাবল কভার সরবরাহের জন্য পুলিশ সদর দপ্তর থেকে দরপত্র আহ্বান করে পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দেয়া হয়। সব নিয়ম কানুন মেনে দেশীয় একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে এই কার্যাদেশ দেওয়া হয়। আগামী ২৮ এপ্রিলের মধ্যে তাদের বালিশের ডাবল কভারসহ বিছানার চাদর সরবরাহ করতে বলা হয়েছে।

পুলিশের চাদর এবং বালিশের কাভারে একটি বিশেষ রঙ রয়েছে। কিন্তু দেশের বাজারে বিছানার চাদরের সমস্যা হচ্ছে এখানে রঙ ঠিকমত আসে না। কিন্তু ওই সময়েই ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানটিকে বলা হয়েছিল, ডাই (রং) হিসেবে তারা ইউরোপিয়ান স্ট্যান্ডার্ড কেমিকেল ব্যবহার করতে হবে। দেশীয় সেই কোম্পানি জার্মান একটি কোম্পানি থেকে ডাই (রং) সংগ্রহ করবে।

সূত্র জানায়, দেশীয় ওই ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান নিজেদের উদ্যোগে চাদর-কভার সরবরাহ করলেও কটন এবং সুতার আন্তর্জাতিক মান ঠিক রয়েছে কীনা সেটা আইনের বিধান মোতাবেক মুল সরবরাহকারী কিংবা প্রস্তুতকারী পরিদর্শন ও পর্যবেক্ষণ করতেই জার্মানি সফর চূড়ান্ত হয় আইজিপির। প্রতিটি চাদরের দাম যদি গড়ে দেড়শ থেকে দুইশ’ টাকা হয় তাহলে এক লক্ষ চাদরের দাম দাঁড়ায় ২০ কোটি টাকা বা ২.৫ মিলিয়ন ডলার।

যেহেতু বাংলাদেশ ডাইং (রং) নিজেরা উৎপাদন করে না তাই এসব যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্যসহ কয়েকটি দেশ থেকেই আমদানি করতে হয়। মূলত পশ্চিমা দেশগুলোই এসব তৈরি করে। তাই এতো বিশাল অঙ্কের কেনাকাটার পর যদি ক’দিন বাদেই যদি রং উঠে যায় তাহলে পুরো টাকাই জলে যাবে। এতে করে সরকারের পুরো অর্থের অপচয় হবে। ফের এসব পণ্য কিনতে হলে সরকারকে সমপরিমাণ টাকা গচ্ছা দিতে হবে।

ফলশ্রুতিতে এসব কারনে পুলিশপ্রধান ড.বেনজীর আহমেদ’র জার্মানি সফরের দিনক্ষণ নির্ধারিত হয়। আয়েশি ভ্রমণ বা ব্যক্তি স্বার্থের জন্য নয়, গোটা বাহিনীর সদস্যদের স্বার্থ সুরক্ষিত করতেই ছিল তাঁর এই সফর।

পুলিশ সদর দপ্তরের একটি দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, জার্মানি যে ফ্যাক্টরি থেকে ডাই (রং) কেনা হবে সেটি কী আন্তর্জাতিকমানের কোন প্রতিষ্ঠান কীনা এই বিষয়টি সরেজমিনে গিয়ে দেখা অবশ্যই একটি বড় বিষয়। পাশাপাশি পুলিশপ্রধান তাঁর এই ভিজিটের ফলে তিনি জানতে পারতেন ওই প্রতিষ্ঠানের জার্মান বা ইউরোপীয় ইউনিয়নের সার্টিফিকেশন রয়েছে কীনা? সরবরাহ কারখানা দোলাইখাল বা জিনজিরা মার্কা কোন ফ্যাক্টরি কীনা এর মাধ্যমে নিশ্চিত হবে স্বচ্ছতা।

সাধারণত সরকারি অর্থের অপচয় রোধ বা কারসাজি ঠেকাতেই জার্মানী সফর আইজিপির একটি বলিষ্ঠ পদক্ষেপ হিসেবেই বিবেচিত হওয়ার কথা ছিল। হাল সময়কার ধান্ধাবাজির উল্টো স্রোতে হাঁটা এই পুলিশপ্রধানের যেখানে দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিয়ে ‘নন্দিত’ হওয়ার কথা সেখানে কোন কিছু না বুঝেই ‘ঘর কাঁটা ইঁদুর’ আর বিশেষ মহল গত দু’দিন যাবত ঢালাও মিথ্যাচারের মাধ্যমে ঘোলা পানিতে মাছ শিকারের অপচেষ্টা চালাচ্ছে।

সূত্র মতে, সরকারি দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা নিজের দপ্তরের কেনাকাটার প্রয়োজনেই বিদেশ সফর করেন। সরকারি নিয়ম মোতাবেকই এমন ঘটনা ঘটে। কিন্তু জিও’র ভুলের কারণেই পুলিশপ্রধানের জার্মানি সফর নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে। এর পেছনে বড় কোন রহস্য আছে কীনা এই বিষয়টিও খতিয়ে দেখার শোরগোল তৈরি হয়েছে।

বারবার ‘টার্গেট’ আইজিপি
পুলিশ সদর দপ্তর সূত্র বলছে, পুলিশপ্রধান হিসেবে ড.বেনজীর আহমেদ’র বিদেশ সফরের বাতিক নেই। এখন পর্যন্ত শুধুমাত্র একবার তিনি রাষ্ট্রীয় সফরে বিদেশ গেছেন। গত বছরের নভেম্বরের শেষ দিকে তুরস্কে ৮৯ তম ইন্টারপোল জেনারেল অ্যাসেম্বলিতে অংশগ্রহণ করতে ওই সময় তিনি দেশটি সফর করেন। সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন তুরস্কের পুলিশ প্রধান মেহমেত আকতাসের সঙ্গে।

সূত্র জানায়, ড.বেনজীর আহমেদের প্রসঙ্গ এলেই সব সময় কোন না কোন পক্ষ বিষয়টিকে আলাদা রঙের প্রলেপ মেখে ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে উপস্থাপনের কারসাজি করে। কিন্তু দীর্ঘ ৩৪ বছরের বর্ণাঢ্য চাকরি জীবনে দেশ ও জনগণের স্বার্থে নিজেকে নিবেদন করা দেশপ্রেমিক এই সর্বোচ্চ পুলিশ কর্মকর্তা সবক্ষেত্রেই নিজেকে প্রমাণ করেছেন। বাংলাদেশ পুলিশের ইতিহাসে তাঁর দূরদর্শী ও প্রাজ্ঞ নেতৃত্ব রচনা করেছে ইতিহাসের অমর অব্যয়।

ডিএমপি কমিশনার এবং র‌্যাব ডিজি হিসেবে সন্ত্রাস ও উগ্রবাদকে নির্মূলে ড.বেনজীর আহমেদের জিরো টলারেন্স নীতি দেশের গন্ডি ছাপিয়ে বিদেশেও প্রশংসা কুড়িয়েছে। ওই সময় সশস্ত্র হেফাজতকে রক্তপাতহীন কায়দায় খেদিয়ে নগরবাসীকে ‘স্বস্তি’ উপহার দিয়ে নায়কের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছিলেন।

বিএনপি-জামায়াতের অগ্নিসন্ত্রাস মোকাবেলায় তাঁর বীরোচিত ভূমিকা এখনও মানুষের মুখে মুখে ফিরে। করোনাকালে পুলিশপ্রধান হিসেবে দায়িত্ব নিয়ে মানবিক পুলিশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করেছেন। আধুনিক, দক্ষ ও যুগোপযোগী পুলিশ বাহিনী গড়ে তুলতে খোলনলচে পাল্টে দিয়েছেন।

বাংলাদেশ পুলিশের ৪০ বছরের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো পরিবর্তন এনেছেন পুলিশ সদস্য (কনস্টেবল), এসআই, সার্জেন্ট ও টিএসআই পদে নিয়োগের প্রক্রিয়ায়। আইন সংশোধন করে নতুন প্রবিধানেই সারাদেশে দিয়েছেন পুলিশ সদস্য নিয়োগ। কোন রকম তদবির বা ঘুষ ছাড়াই পুলিশে চাকরি হওয়ার নতুন নজির স্থাপন করেছেন। স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী নিজেও এই নিয়োগ প্রক্রিয়ার উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেছেন।

কেউ কেউ বলছেন, স্বাধীনতা বিরোধী পক্ষের বরাবরই ‘টার্গেট’ হয়েছেন ড.বেনজীর আহমেদ। তাঁর দীর্ঘ চাকরি জীবনে তিনি ধর্মান্ধ জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে বুক চিতিয়ে লড়াই করেছেন। জঙ্গিবাদের আশ্রয়ে রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলে ব্যর্থ পক্ষটির বিষমাখা তীরে একাধিকবার যারপরেনাই বিদ্ধ হয়েছেন তিনি। যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্টের নিষেধাজ্ঞার পর একটি টেলিভিশন চ্যানেলের সঙ্গে দীর্ঘ সাক্ষাতে এসব বিষয়াদি নিয়ে অকপটে কথা বলেছেন ড.বেনজীর।

দেশের সাধারণ মানুষ প্রত্যাশা করেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার টিমের একেবারেই পুরনো, নন্দিত ফাইটার পুলিশপ্রধান ড.বেনজীর আহমেদ নিজের স্বকীয়তা, ব্যক্তিত্ব ও মহিমান্বিত গুণাবলী দিয়ে দেশ ও মানুষের প্রতি নিজের অঙ্গীকার রক্ষার জন্য ক্লান্তিহীন পরিশ্রম করে দেশপ্রেমিক পুলিশ বাহিনীকে একটি অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যাচ্ছেন। ঘৃণ্য অপপ্রচার চালিয়ে তাকে আঘাত করা মানে মহান মুক্তিযুদ্ধে প্রথম প্রতিরোধ গড়া পুলিশ বাহিনীকে আঘাত করার অপচেষ্টা।

ব্যক্তি স্বার্থের দ্বন্দ্বে না জড়িয়ে এবং কারসাজির বৃত্ত থেকে বেরিয়ে দেশপ্রেমের মন্ত্রে দীক্ষিত হয়ে দেশের স্বার্থকে মোটা দাগে উপস্থাপনে এবং পুলিশ বাহিনীকে উজ্জীবিত করার কর্মে এসব সমালোচকরা মনোনিবেশ করবেন এমন প্রত্যাশা সবার।

কালের আলো/এনএল/ইএস