গৌরবময় ঐতিহ্যের সিগন্যাল কোর, দশম ‘কর্নেল কমান্ড্যান্ট’ হিসেবে অভিষিক্ত সেনাপ্রধান
প্রকাশিতঃ 8:41 pm | March 08, 2022

বিশেষ সংবাদদাতা, কালের আলো :
বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর গৌরবময় ঐতিহ্য হিসেবেই বিবেচনা করা হয় সিগন্যাল কোরকে। যুদ্ধের ময়দানে যোগাযোগ ব্যবস্থার গুরুত্ব অপরিসীম হওয়ায় দেশপ্রেমিক এই বাহিনীটির একটি গুরুত্বপূর্ণ এবং অপরিহার্য অংশ হিসেবে কোর অব সিগন্যালস নিজেদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব প্রতিনিয়ত পালন করে চলেছেন সফলতা ও নিষ্ঠার সঙ্গেই। স্বাধীনতার পর দেশ গঠন এবং দেশমাতৃকার সেবাতেও তাদের অবদান উচ্চারিত হচ্ছে গুরুত্বের সঙ্গেই।
সর্বোচ্চ পেশাদারিত্বের সঙ্গে দক্ষতার অভূতপূর্ব সমন্বয়ের মাধ্যমে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে দায়িত্ব পালনের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলেও প্রশংসা অর্জনে সক্ষম হয়েছে এই কোরটি। নিজেদের ৫০ বছরের অদম্য অগ্রযাত্রায় বর্ণাঢ্য সামরিক রীতি ও ঐতিহ্য মেনেই কোর অব সিগন্যালস পেয়েছে নিজেদের নতুন অভিভাবক। ‘১০ম কর্নেল কমান্ড্যান্ট’ হিসেবে অভিষিক্ত হয়েছেন বাংলাদেশ সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ড.এস এম শফিউদ্দিন আহমেদ।
মঙ্গলবার (০৮ মার্চ) যশোর সেনানিবাসের সিগন্যাল ট্রেনিং সেন্টার অ্যান্ড স্কুলের প্যারেড গ্রাউন্ডে সিগন্যালস’র ১০ম ‘কর্নেল কমান্ড্যান্ট’ হিসেবে তিনি অভিষিক্ত হন। এদিন সকালে সামরিক রীতি ও ঐতিহ্য অনুযায়ী সেনাপ্রধানকে গৌরবমণ্ডিত কর্নেল র্যাঙ্ক ব্যাজ পরিয়ে দেন সিগন্যাল কোরের জ্যেষ্ঠতম অধিনায়ক ও মাস্টার ওয়ারেন্ট অফিসার। এর আগে সেনাবাহিনী প্রধান প্যারেড স্কয়ারে পৌঁছালে সিগন্যালস কোরের একটি চৌকস দল তাঁকে গার্ড অব অনার দেন।
সেনাপ্রধান আধুনিক যোগাযোগ, যোগাযোগ নিরাপত্তা, তথ্য প্রযুক্তির উন্নয়ন ও গবেষণার উপর গুরুত্বারোপ করে সিগন্যাল কোরের সকল সদস্যদের ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার লক্ষে নিরলস প্রচেষ্টা চালিয়ে যেতে দিকনির্দেশনা প্রদান করেছেন কোর অব সিগন্যালস’র সব সদস্যদের।
অনুষ্ঠানে আর্টডকের জিওসি লেফটেন্যান্ট জেনারেল এস এম মতিউর রহমান, ৫৫ পদাতিক ডিভিশনের জিওসি ও যশোর এরিয়ার এরিয়া কমান্ডার মেজর জেনারেল মো.নুরুল আনোয়ারসহ যশোর ক্যান্টনমেন্টের ঊর্ধ্বতন সামরিক ও অসামরিক কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
সামরিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, আধুনিক যুদ্ধে রণকৌশলগত বিষয়ে উপযুক্ত সিগন্যাল যোগাযোগ ও কম্পিউটার প্রযুক্তির প্রয়োগ যুদ্ধক্ষেত্রে এনেছে বৈপ্লবিক পরিবর্তন। এই পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে আধুনিক প্রযুক্তি ও উন্নত যোগাযোগ সরঞ্জামাদির সঠিক প্রয়োগের মাধ্যমে নিরাপদ এবং নিরবিচ্ছন্ন যোগাযোগ ব্যবস্থার প্রয়োগও বেশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটের মাধ্যমে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ইতোমধ্যে সাটেলাইট হাব স্টেশন স্থাপন করে পার্বত্য চট্টগ্রামসহ সারাদেশের যোগাযোগ ব্যবস্থার আধুনিকায়নে কাজ করছে। এটি পুরোপুরি বাস্তবায়িত হলে সেনাবাহিনীর সামগ্রিক যোগাযোগ ব্যবস্থার ক্ষেত্রে একটি অনন্য মাত্রা যোগ হবে বলেও মনে করা হচ্ছে।
সশ্রদ্ধচিত্তে বঙ্গবন্ধুকে স্মরণ সেনাপ্রধানের; প্রধানমন্ত্রীর সুদক্ষ নেতৃত্বের প্রশংসা
‘কর্নেল কমান্ড্যান্ট’ হিসেবে অভিষিক্ত হওয়ার পর নিজের বক্তব্যের শুরুতে সেনাপ্রধান জেনারেল ড.এস এম শফিউদ্দিন আহমেদ সশ্রদ্ধচিত্তে স্মরণ করেন ইতিহাসের মহান নেতা, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে।
এ সময় তিনি বলেন, ‘আমি সশ্রদ্ধচিত্তে স্মরণ করছি বাংলাদেশের স্বপ্নদ্রষ্টা ও স্থপতি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে। যার আহবানে সাড়া দিয়ে ‘কোর অব সিগন্যালস’র সদস্যরা আমাদের মহান স্বাধীনতাযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন। আমি শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করছি মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে ৩০ লক্ষ শহীদদের।
আমি গভীর শ্রদ্ধা ও বিনয়ের সাথে স্মরণ করছি যাদের আত্মত্যাগে অর্জিত হয়েছে আমাদের কাক্সিক্ষত স্বাধীনতা। আমি আরও স্মরণ করছি, বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনীর ১ হাজার ৫৩৩ জন শহীদ বীর সেনানীদেরকে, যারা মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে অকাতরে নিজেদের জীবন বিলিয়ে দিয়েছেন।’
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সুদক্ষ ও গতিশীল নেতৃত্বে সেনাবাহিনীর দুর্বার অগ্রযাত্রার বিষয়ও উপস্থাপন করেন জেনারেল এস এম শফিউদ্দিন আহমেদ। তিনি বলেন, ‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দিক নির্দেশনায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনী অভূতপূর্ব আধুনিকায়নের মাধ্যমে দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে। একবিংশ শতাব্দীর চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ‘ফোর্সেস গোল-২০৩০’ বাস্তবায়নে সেনাবাহিনীর সাংগঠনিক কাঠামো পরিবর্তন হচ্ছে।’

‘ভবিষ্যৎ যুদ্ধক্ষেত্র নিয়ন্ত্রণ করবে সাইবার স্পেস’
বাংলাদেশ সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ড.এস এম শফিউদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘যুদ্ধের প্রচলিত মাত্রা জল, স্থল ও আকাশ ছাড়িয়ে এখন প্রসারিত হয়েছে ইলেক্ট্রনিক ও সাইবার স্পেসে। এসব কিছুর ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার দক্ষতাই আগামীতে যুদ্ধক্ষেত্রে কোনো প্রশিক্ষিত বাহিনীর সাফল্য নির্ভর করবে।’
আধুনিক যোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি সম্পর্কে সঠিক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে সিগন্যালস কোর আরও সামনে এগিয়ে যাবে বলে আশা প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘আধুনিক যুদ্ধে উপযুক্ত সিগন্যাল যোগাযোগ ও কম্পিউটার প্রযুক্তির প্রয়োগ বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছে।’
তিনি বলেন, ‘সিগন্যাল যোগাযোগ, তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার, তথ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, সাইবার ও ইলেক্ট্রনিক যুদ্ধে শত্রুর ওপর আধিপত্য বিস্তারের মাধ্যমে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর বিজয় অর্জনে সহায়তা করাই সিগন্যালস কোরের মূল লক্ষ্য।’
সিন্যালস কোরে তিনটি সিগন্যাল ব্যাটালিয়ন
বঙ্গবন্ধু কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকার প্রযুক্তি নির্ভর আধুনিক বাংলাদেশ গড়তে নিবিড়ভাবে কাজ করছেন। বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ উৎক্ষেপনের মধ্যদিয়ে বাংলাদেশ অভিজাত স্যাটেলাইট ক্লাবের সদস্য হওয়ার বিরল গৌরব অর্জন করেছে। বিদেশী স্যাটেলাইট নির্ভরতা থেকে বেরিয়ে এসে ‘বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট’ বিভিন্ন যোগাযোগ মাধ্যমে অত্যন্ত কার্যকরভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। যার সুফল ভোগ করছে দেশের সাধারণ মানুষও।
বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সমরশক্তি ও যোগাযোগ সক্ষমতা বাড়াতে সরকারের গৃহীত বিভিন্ন দিক উপস্থাপন করেন সেনাপ্রধান। জেনারেল এস এম শফিউদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘বর্তমান সরকার প্রযুক্তি নির্ভর আধুনিক বাংলাদেশ গড়ার লক্ষে তথ্যপ্রযুক্তি ও টেলিযোগাযোগ খাতকে অগ্রাধিকার দিচ্ছেন। ভিশন-২০৩০’কে সামনে রেখে ইতোমধ্যে সিন্যালস কোরে তিনটি সিগন্যাল ব্যাটালিয়ন ও তিনটি স্ট্যাটিক সিগন্যাল কোম্পানি প্রতিষ্ঠিত করা হয়েছে। এছাড়া সংযোজন করা হয়েছে নতুন রেডিও রিলে সরঞ্জাম, ডিজিটাল এক্সচেঞ্জসহ অত্যাধুনিক সরঞ্জামাদি।’
তিনি বলেন, ‘বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১’ মাধ্যমে অপারেশনাল যোগাযোগের উন্নয়নে ভিস্যাট স্টেশন স্থাপনের কাজও শেষ হয়েছে। আমাদের এসব কার্যক্রম সমগ্র দেশের তথ্য ও প্রযুক্তি উন্নয়ন ও সাইবার নিরাপত্তা উন্নয়নে ব্যাপক ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবে।’

একুশ শতকের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় প্রস্তুত থাকার আহ্বান
আন্ত:বাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) জানিয়েছে, পরে সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল এস এম শফিউদ্দিন আহমেদ ‘কোর অব সিগন্যালস’র বাৎসরিক অধিনায়ক সম্মেলনেও যোগ দেন। তিনি সম্মেলনে উপস্থিত সব সিগন্যাল ইউনিটের অধিনায়ক এবং অন্যান্য কর্মকর্তাদের উদ্দেশ্যে গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য রাখেন।
একই সঙ্গে কোর অব সিগন্যালস’র উন্নয়ন, পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধি ও দেশে-বিদেশে পরিচালিত কার্যক্রম বিষয়েও মতবিনিময় করেন। এ সময় সেনাপ্রধান কোর অব সিগন্যালস’র গৌরবোজ্জ্বল ঐতিহ্য এবং দেশমাতৃকার সেবায় এই কোরের অবদানের কথা স্মরণ করেন।
তিনি পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধি ও দেশ-বিদেশে পরিচালিত কার্যক্রম গতিশীল করার পাশাপাশি আধুনিক ও যুগোপযোগী প্রশিক্ষণের মাধ্যমে একুশ শতকের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় সদা প্রস্তুত থাকতে কোর অব সিগন্যালস’র সব সদস্যের প্রতি আহ্বান জানান।
আইএসপিআর মনে করছে, সেনাবাহিনী প্রধান কোর অব সিগন্যালস’র ‘কর্নেল কমান্ড্যান্ট’ হিসেবে দায়িত্বভার গ্রহণের মাধ্যমে এই কোরের সদস্যদের মাঝে নতুন উদ্দীপনা সৃষ্টি এবং কোরের প্রতিটি সদস্যের মাঝে আগামী দিনে দেশসেবার অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপনের প্রত্যয় পুর্নব্যক্ত হয়েছে।
কালের আলো/এমএএএমকে