প্রধানমন্ত্রীর মানবিকতার হীরন্ময় আভায় আশ্রয়ে অবারিত আনন্দের ফল্গুধারা

প্রকাশিতঃ 9:55 pm | July 21, 2022

এম.আব্দুল্লাহ আল মামুন খান, অ্যাকটিং এডিটর :

বাঙালি জাতির চির আরাধ্য পুরুষ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হাত ধরেই দেশকে চিনেছেন। গভীরভাবেই ভালোবেসেছেন দেশের প্রতি ইঞ্চি মাটিকে। বুকে আঁকড়ে ধরেছেন ৫৫ হাজার বর্গমাইলের সবুজ-শ্যামল বাংলা। মানুষের ভাগ্য ফেরাতেই রাজনীতি করেন, করছেনও। হয়ে উঠেছেন সতের কোটি মানুষের হৃদয়ের স্পন্দন, অফুরান প্রেরণাশক্তি। উদার আকাশের মতো বিস্তৃত তাঁর হৃদয়। মনের গহীনে প্রোজ্জ্বল মানবিকতার হীরন্ময় আভায় দেশের লক্ষ লক্ষ গৃহহীন ও ভূমিহীন মানুষকে তিনিই দিয়েছেন আপন ভূমি, নতুন ঘর। দেখিয়েছেন বেঁচে থাকার স্বপ্ন। ঠিক যেন-‘অমূল্য যে মাটির জমিন স্বাধীন করলেন পিতা/কন্যা জুড়লেন সোনারখণি, আশ্রয় দিলেন সেথা’। ঘর পাওয়া এসব মানুষের মুখের হাসিই তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।

পদ্মা-মেঘনা-যমুনা-কর্নফুলীর পলি-বিধৌত বদ্বীপ বাংলায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কার্যত হয়ে উঠেছেন এসব অসহায়, ছিন্নমূল মানুষের ভালবাসার শেষ ঠিকানা। আর সে কারণেই পঞ্চগড়ের কাজলদিঘী পাড়ের শিশু জান্নাত আশ্রয়ণের ঘরে টানিয়ে রাখেন তার ছবি। বিশাল হৃদয়ের ঔদার্য্যে প্রধানমন্ত্রী বলতে পারেন ‘আমি আমার জান্নাতের সঙ্গে কথা বলবো’।

সততা, পরিশ্রম আর প্রগাঢ় দেশপ্রেম আর সাধারণ মানুষের ভালোবাসাই তাঁর শক্তি; উন্নয়নের ম্যাজিক। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখ্য সচিব ড.আহমদ কায়কাউস’র ভাষ্যে-‘দেশের সকল ছিন্নমূল ও গৃহহীনের মাঝে জমিসহ গৃহ প্রদানের এই দৃষ্টান্ত সমগ্র পৃথিবীর মধ্যে কেবল বাংলাদেশেরই রয়েছে, যার রূপকার ও কারিগর মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।’

বৃহস্পতিবার (২১ জুলাই) সকালে গণভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে যুক্ত হয়ে ভূমিহীন-গৃহহীন আরও ২৬ হাজার ২২৯টি পরিবারকে পাঁচটি আশ্রয়ণ প্রকল্পের অধীনে ঘর হস্তান্তর করেন সরকারপ্রধান। সমাজ জীবনে অচ্ছুতের চোখে দেখে আসা মানুষেরা ঘর পেয়ে অনুষ্ঠানে যখন আনন্দ প্লাবিত অভিনন্দন জানাচ্ছিলেন প্রধানমন্ত্রীকে তখন আপ্লুত বঙ্গবন্ধুকন্যা। তাদের নয়নের স্বস্তির জলধারায় ভিজে যাচ্ছিল প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার চোখও। বাগেরহাটের ঋষি সম্প্রদায়ের অসহায় নিরোদ মন্ডল কিংবা ময়মনসিংহের স্বামী পরিত্যক্তা নাছিমারা দু’হাত তুলে দোয়া করেছেন সরকারপ্রধানের দীর্ঘ জীবনের জন্য। তাদের ভুবনে যেন দিনটি ছিল ঈদের মতোই আনন্দময়।

অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা উপকারভোগীদের কাছে ঘরগুলো হস্তান্তরে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও কর্মকর্তাদের অনুমতি দেন। ঘর হস্তান্তরের মাধ্যমে পঞ্চগড় ও মাগুরা জেলার সব উপজেলাসহ দেশের ৫২টি উপজেলা ভূমিহীন ও গৃহহীনমুক্ত হওয়ার ঘোষণাও দেন প্রধানমন্ত্রী। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখ্য সচিব ড.আহমদ কায়কাউস। আশ্রয়ণ প্রকল্পের আদ্যোপান্ত উপস্থাপন করেন প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক আবু সালেহ মো.ফেরদৌস খান।

এদিন প্রধানমন্ত্রী ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে সরাসরি যুক্ত হন ৫টি প্রকল্প এলাকার সঙ্গে। প্রকল্পগুলো হচ্ছে-লক্ষ্মীপুরের রামগতি উপজেলার চরকলাকোপা আশ্রয়ণ প্রকল্প, বাগেরহাটের রামপাল উপজেলার গৌরম্ভা আশ্রয়ণ প্রকল্প, ময়মনসিংহের নান্দাইল উপজেলার চর ভেলামারী আশ্রয়ণ প্রকল্প, পঞ্চগড় সদর উপজেলার মাহানপাড়া আশ্রয়ণ প্রকল্প এবং মাগুরা জেলার মহম্মদপুর উপজেলার জঙ্গালিয়া আশ্রয়ণ প্রকল্প।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘সর্বপ্রথম উদ্যোগ নিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু’
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ‘আশ্রয়ণ একটি মানুষের ঠিকানা। জীবন-জীবিকার একটি সুযোগ, বেঁচে থাকা, স্বপ্ন দেখা এবং তা বাস্তবায়ন করার। যে বাংলাদেশ জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীন করে দিয়ে গেছেন, সে বাংলাদেশের কোনও মানুষ যেন ঠিকানাবিহীন না থাকে, তাদের জীবনটা যেন অর্থহীন হয়ে না যায়, তাদের জীবনটা যেন সুন্দর হয়, সেই লক্ষ্য নিয়েই এই উদ্যোগটা সর্বপ্রথম বঙ্গবন্ধুই নিয়েছিলেন।

তিনি বলেন, ১৯৭০ সালের ১৪ নভেম্বর যখন ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড় হয় তখন নির্বাচনের প্রস্তুতি চলছিল। সে নির্বাচনের কাজ ছেড়ে দিয়ে জাতির পিতা পৌঁছে গিয়েছিলেন দুর্গত মানুষে পাশে। ভোলা, পটুয়াখালীসহ অনেক জায়গায় গিয়ে মানুষের পাশে দাঁড়ালেন, দেখেছেন মানুষের দুর্দশা। তারপর থেকেই দুর্যোগ মোকাবিলায় তাঁর চিন্তা-ভাবনা ছিল। একাত্তর সালে দেশ স্বাধীন হওয়ার পর তিনি সেই চিন্তার বাস্তবায়ন করেছিলেন।

ভূমিহীন মানুষের জন্য প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা নেন। সিদ্ধান্ত নেন খাস জমি ভূমিহীনদের মাঝে বিতরণ করার। ১০০ বিঘার উপর কেউ জমি রাখতে পারবে না ভূমি ব্যবস্থাপনায় এমন নীতি গ্রহণ করেন। তাদের বাড়তি জমি খাস জমি হয়ে যাবে। এসব জমি ভূমিহীনদের মাঝে বিতরণ করার সিদ্ধান্ত তিনি এবং তা বাস্তবায়ন শুরু করেন। দুর্ভাগ্য যে, সেটা তিনি শেষ করে যেতে পারেননি।

‘বঙ্গবন্ধুর সেই পদাঙ্ক অনুসরণ করেই আজকে আমরা কাজ করে যাচ্ছি। তৃতীয় বার সরকার গঠনের পর আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম, আমরা গৃহহীনদের সেমি-পাকা বাড়িঘর করে দেবো। এবং দুই কাঠা জমি সকলের নামে কিনে দেবো। এই জমি কেনার জন্য, কিছু জমি খাস জমি উদ্ধার করা, পাশাপাশি যেখানে খাস জমি পাওয়া যাচ্ছে না, সেখানে যেন জমি কিনে দেওয়া যায় তার জন্য একটি ফান্ড তৈরি করি। প্রয়োজনে আমরা জমি কিনে প্রকল্পের মাধ্যমে এখন ঘর তৈরি করে দিচ্ছি।’ এসময় প্রধানমন্ত্রী এই ফান্ডে যারা অনুদান দিয়েছেন তাদের ধন্যবাদ জানান।

তিনি বলেন, এবারে তৃতীয় পর্যায়ের দ্বিতীয় ধাপে আমরা ২৬ হাজার ২২৯টি ভূমিহীন-গৃহহীন পরিবারকে স্থায়ীভাবে মাথা গোঁজার ঠিকানা দিতে পারছি বলে আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় করি।’ এই কাজের সাথে যারা সম্পৃক্ত তাদের সকলকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানান প্রধানমন্ত্রী।

‘ইতোমধ্যে আমরা ৯ লাখ ২৫ হাজার ৬৪৫ জন ভূমিহীন-গৃহহীন মানুষকে তাদের নিজস্ব ঘরে বসবাস করার সুযোগ করে দিতে পেরেছি। আমরা চাই এই প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশের কোনও মানুষ যেন আর ছিন্নমূল না থাকে। সে ব্যবস্থাই আমরা নেব, সেটাই আমাদের লক্ষ্য। সে লক্ষ্য নিয়েই আমরা কাজ করে যাচ্ছি। আশ্রয়ণ প্রকল্প শুরু হওয়ার পর মোট ৫ লাখ ৯ হাজার ৩৭০টি পরিবারের পুনর্বাসন হয়েছে।

১৯৯৭ সালে আমরা পুনর্বাসনের যে কাজ শুরু করেছিলাম তা হিসাব করলে এ পর্যন্ত আমরা ৭ লাখ ১১ হাজার ২৬৩টি পরিবারকে ঘর তৈরি করে দিয়েছি। প্রতি পরিবারে ৫ জন হিসাবে ঘরগুলোতে মোট আশ্রয় পেয়েছেন ৩৫ লাখ ৫ হাজার ৩১৫ জন। এর পাশাপাশি আমাদের মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয়, ত্রাণ ও দুর্যোগ মন্ত্রণালয়, তাছাড়া সচিবরা উদ্যোগ নিয়ে দিয়েছে, পুলিশবাহিনী, সেনাবাহিনীসহ সমাজের অনেক মানুষ গৃহহীনদের ঘর বানিয়ে দেওয়ায় এগিয়ে এসেছেন। ফলে আমি বিশ্বাস করি, এ দেশে কোন মানুষ গৃহহীন থাকবে না।’

প্রধানমন্ত্রী তৈরি করেছেন এক অনন্য অসাধারণ মানবিক বাংলাদেশ
অনুষ্ঠান সঞ্চালনায় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখ্য সচিব ড.আহমদ কায়কাউস বলেন, ‘লক্ষ লক্ষ ভূমিহীন, গৃহহীন মানুষকে জমিসহ গৃহ প্রদানের মাধ্যমে পুনর্বাসন কাজটিও একটি অতি উজ্জ্বল মানবিক উদ্যোগের সাফল্য, যা বিশ্বের ইতিহাসেও বিরল দৃষ্টান্ত। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জাতির পিতার জন্মশতবার্ষিকী অর্থাৎ মুজিববর্ষ উদযাপনে বলেছিলেন, ভূমিহীন, গৃহহীন মানুষকে ঘর প্রদানই মুজিববর্ষের সবচেয়ে বড় উৎসব। সেই সময়ে কোভিড মহামারিতে সারা বিশ্বের অর্থনৈতিক কর্মকান্ড স্থবির হয়ে পড়েছিল তখন আশ্রয়ণ প্রকল্পের বিদ্যমান ঘরের ধরণ পরিবর্তন এনে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ভূমিহীন, গৃহহীন, ছিন্নমূল অসহায় মানুষের জন্য সেমিপাকা একক গৃহ নির্মাণের নির্দেশনা প্রদান করে মানবিক এই কাজে আবারও এক নতুন মাত্রা যোগ করেন।

দেশের সকল ছিন্নমূল ও গৃহহীনের মাঝে জমিসহ গৃহ প্রদানের এই দৃষ্টান্ত সমগ্র পৃথিবীর মধ্যে কেবল বাংলাদেশেরই রয়েছে যার রূপকার ও কারিগর মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। মানবাধিকার রক্ষা ও জনগণের ক্ষমতায়নের এর চেয়ে বড় উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত আর কী হতে পারে তা আমরা জানি না। আজ মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর উপহার হিসেবে বাংলাদেশের ২৬ হাজার ২২৯ টি আশ্রয়হীন, গৃহহীন পরিবারকে জমিসহ গৃহ হস্তান্তর করা হবে। এর মাধ্যমে ১ লক্ষ ৩১ হাজার ১৪৫ জন ছিন্নমূল, গৃহহীন মানুষ জীবনে প্রথমবারের মতো নিজ গৃহে আশ্রয় লাভ করবে। ১৯৯৭ সাল থেকে অদ্যাবধি বিশেষ করে মুজিববর্ষ উপলক্ষে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ আগ্রহ ও নির্দেশনার ফলে আজ দেশের গ্রাম, জেলা ও উপজেলা সম্পূর্ণরূপে ভূমিহীন ও গৃহহীন মুক্ত হয়েছে। এই মহতি উদ্যোগের ফলে আজ একদিকে যেমনি লক্ষাধিক মানুষকে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আপন ভূমি, আপন গৃহের ঠিকানা দিতে যাচ্ছেন তেমনি দেশের দু’টি জেলার সকল উপজেলাসহ দেশের ৫২ টি উপজেলাকেও ভূমিহীন ও গৃহহীন মুক্ত ঘোষণা করতে যাচ্ছেন। ফলে তৈরি হচ্ছে এক অনন্য অসাধারণ মানবিক বাংলাদেশ, যাকে আমরা হৃদয়ে ধারণ করি ‘সোনার বাংলা’ হিসেবে।’

মানবিক বাংলাদেশ বিনির্মাণের পথযাত্রায় আশ্রয়ণ প্রকল্প
মানবিক বাংলাদেশ বিনির্মাণের পথযাত্রায় আশ্রয়ণ প্রকল্পের সার্বিক অগ্রগতির বিষয়ে প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক আবু সালেহ মো.ফেরদৌস খান একটি সংক্ষিপ্ত উপস্থাপনা করেন। এ সময় তিনি বলেন, ‘আমাদের সকল প্রেরণার বাতিঘর মহান জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তিনি লক্ষীপুর জেলায় ১৯৭২ সালে এই কাজটি শুরু করেন ছিন্নমূল মানুষকে পুনর্বাসনের মাধ্যমে। এই পথ পরিক্রমায় পরবর্তীতে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আপনি এটিকে ভিন্ন মাত্রা দিয়েছেন।

আশ্রয়ণ প্রকল্প কীভাবে শুরু হলো এবং এটি কীভাবে দারিদ্র্য বিমোচনে একটি বিশেষ মডেল হিসেবে যেটি ইতোমধ্যেই শেখ হাসিনা মডেল হিসেবে পরিচিত হয়েছে সেটি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর মুজিববর্ষে বিশেষ নির্দেশনার ফলে কী ব্রেক থ্রো এসেছে, বিশেষত্ব কী, সামগ্রিকভাবে কী অর্জন হয়েছে এসবের আদ্যোপান্ত তুলে ধরেন তিনি।

প্রকল্প পরিচালক আবু সালেহ মো.ফেরদৌস খান বলেন, ‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আপনি ১৯৯৬ সালে দায়িত্ব গ্রহণের পর জাতির পিতার অসমাপ্ত কাজগুলোকে বিশেষ করে জনবান্ধব কাজগুলোকে নতুন করে আবার গ্রহণ করেছেন। সেই জনবান্ধব কাজগুলোর একটি বিশেষ দিক ছিল আশ্রয়হীন, ছিন্নমূল মানুষদের পুনর্বাসন। আপনি সেটি ১৯৯৭ সালে শুরু করেছিলেন। আজ পর্যন্ত সেই কাজটি বিরতিহীন ছিল। মুজিববর্ষে আপনি বিশেষ ব্রেক থ্রো দিয়েছেন, বাংলাদেশের একজন মানুষও গৃহহীন থাকবে না। তখনই এই কাজটি বিশেষ মাত্রা পায়।

যার ফলে আজকে ২০২২ সালে এসে দেখছি ৫ লক্ষ ৯ হাজার ৩৭০ টি পরিবার এখানে পুনর্বাসিত হয়েছে, যেখানে ২৫ লক্ষেরও বেশি মানুষ যাদের ঠিকানা ছিল না, ঘর ছিল না তারা আশ্রয় পেলো। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর উন্নয়ন দর্শন দেশের জন্য ও জনগণের জন্য। বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর হাত ধরে বাস্তবায়িত হচ্ছে। ফলে তৈরি হচ্ছে এক মানবিক বাংলাদেশ।’

তিনি জানান, যাদের একেবারে ঘর বা জমি কিছু নেই মাঠ পর্যায়ে এমন মানুষের সংখ্যা ২ লক্ষ ৩৯ হাজার ৬১১ জন। এর মধ্যে ২০২১ সালের জানুয়ারিতে ৬৩ হাজার ৯৯৯ জনকে ঘর দিয়েছেন। একই বছরের জুনে ৫৩ হাজার ৩৩০ জন, চলতি বছরের ২৬ এপ্রিল ৩২ হাজার ৯০৪ জন এবং চলতি বছরের ২১ জুলাই ২৬ হাজার ২২৯ জনকে ঘর দিয়েছেন। সব মিলিয়ে শুধুমাত্র মুজিববর্ষেই আপনি ১ লক্ষ ৮৫ হাজার ১২৯ জনকে জমিসহ গৃহ প্রদান করেছেন।

সরকারি খাস জমি উদ্ধার করে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা মেনে ৫ হাজার ৫১২ একর জমি উদ্ধার করা হয়েছে। যার বাজার মূল্য ২ হাজার ৯৬৭ কোটি টাকা। একই সঙ্গে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জমি কেনার জন্য মাঠ পর্যায়ে একটি ফান্ড গঠন করে দিয়েছেন। ১৯১ একর জমি ক্রয় করা হয়েছে ১৩৪ কোটি টাকায়।

প্রকল্প পরিচালক বলেন, ‘মুজিববর্ষ উপলক্ষে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আপনার বিশেষ নির্দেশনার একটি বিশেষ লক্ষণীয় বিষয় এই প্রকল্পে দেখছি। আপনি এক্ষেত্রে ৫ হাজার ৯২ কোটি টাকা বরাদ্দ করেছেন। ২০১৯-২০ অর্থ বছরে এটি ছিল ৫৫১ কোটি টাকা। আপনার নির্দেশনার পর মুজিববর্ষ উপলক্ষে এটি ৫ গুণ বেড়ে ২৪৬০ কোটিতে রূপান্তরিত হয়। ৫ হাজার ৯২ কোটি টাকা বরাদ্দের টাকা কোভিডের সময় যখন অর্থনীতি স্থবির তখন বাংলাদেশের কোন উপজেলায় একদিনের জন্যও কাজ বন্ধ ছিল না।

ইট, বালু ও রড কেনায় এসব অর্থ খরচ হয়েছে। গ্রামীণ অর্থনীতির গতি সঞ্চারই কেবল নয় জাতীয়ভাবেও এর গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব রয়েছে। একটি বিষয় যদি লক্ষ্য করি ১ লক্ষ ৮৫ হাজার ১২৯ টি ঘরের মধ্যে যারা কাজ করেছেন নির্মাণ শ্রমিক প্রতি ঘরে যদি গড়ে ৩ জন করে কাজ করেন, তাদের যদি ৩০ দিন সময় লাগে সেই হিসেবে আমরা দেখেছি ১৩ কোটি ৩২ লক্ষ ৯২ হাজার ৮৮০ শ্রম ঘন্টা শ্রমিকরা কাজ করেছেন। যার ফলে তাদেরকে মজুরি হিসেবে প্রদান করা হয়েছে ১ হাজার ৮৩ কোটি টাকা। এই টাকা প্রজেক্টের মোট বরাদ্দ ৫ হাজার ১৮ কোটি টাকা তাঁর এক পঞ্চমাংশের বেশি। এই কাজের ফলে তাদের জীবনমান পরিবর্তন হয়েছে, সংসার স্বচ্ছল হয়েছে।’

ওরা আর অচ্ছুত নয়, আনন্দের ফল্গুধারা উচ্ছ্বাস
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভিডিও কনফারেন্সে ৫টি প্রকল্প এলাকার সঙ্গে যুক্ত হন। সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসকদের (ডিসি) সঞ্চালনায় ওইসব এলাকার উপকারভোগীরা প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলেন এবং তাদের আনন্দ পরিপ্লুত অভিনন্দন এবং কৃতজ্ঞতা জানান সরকারপ্রধানকে। এদিন তাদের ভুবনে যেন আনন্দ বাঁধ ভাঙে। এই তালিকায় রয়েছেন বাগেরহাটের ঋষি পাড়ার নিরোদ মন্ডল। অসহায় এই বৃদ্ধ ক’দিন আগেও সড়কের পাশে ঝুপড়ি ঘরে বসবাস করতেন। দিন কাটতো পথে পথে। নতুন ঘর পেয়ে অঝোরে কেঁদেছেন।

প্রধানমন্ত্রীকে উদ্দেশ্য করে নিরোদ বলছিলেন, ‘আমি ছিলাম অসহায়, ভূমিহীন। পথে পথে কাটাতাম। আজ আপনার দেওয়া ঘর পেয়েছি। আমরা আজ খুবই আনন্দিত। আমার বয়স ৬৯ বছর। যতোদিন পৃথিবী থাকবে ততদিন বঙ্গবন্ধু থাকবে’ বলেই কাঁদছিলেন। এ সময় অশ্রুসিক্ত হয়ে উঠেন প্রধানমন্ত্রীও।

এ সময় প্রধানমন্ত্রী সুন্দরবনে আত্নসমর্পণ করা সুন্দরবনের জলদস্যুদের একজনও যেন ভূমিহীন ও গৃহহীন না থাকে এজন্য বাগেরহাটের জেলা প্রশাসক (ডিসি) আজিজুর রহমানকে নির্দেশ দেন। এ সময় ডিসি আজিজুর রহমান বলেন, ‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আমরা এই পর্বে ১৩ জন জলদস্যু, বনদস্যুকে ঘর দিচ্ছি।’

প্রধানমন্ত্রীর আশ্রয়ণ প্রকল্পের সঙ্গে সম্পৃক্ত হতে পারাকে নিজের ২০ বছরের দীর্ঘ চাকরি জীবনের সবচেয়ে উত্তম কাজ বলে মনে করেন ময়মনসিংহের জেলা প্রশাসক (ডিসি) এনামুল হক। তিনি বলেন, ‘ঘর পাওয়া এই পরিবারগুলো আপনার ছায়াতলে আশ্রয় পেয়ে অত্যন্ত আনন্দিত, গর্বিত। এই মানুষগুলো শুধুমাত্র বাড়ি ও জমিই পায়নি আপনি তাদেরকে দিয়েছেন একটি ঠিকানা, আত্মপরিচয়, সামাজিক মর্যাদা ও একটি সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়ার অনুপ্রেরণা।’

তিনি বলেন, ‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আপনি ময়মনসিংহের নান্দাইল, ভালুকা, ফুলবাড়িয়া এবং ফুলপুর উপজেলাকে ভূমিহীন ও গৃহহীন মুক্ত ঘোষণা করেছেন। এই বছরের মধ্যে আপনার নির্দেশের মধ্যে পুরো ময়মনসিংহ জেলাকে ভূমিহীন ও গৃহহীন মুক্ত করতে পারবো। আমার দীর্ঘ ২০ বছরের চাকরি জীবনে আমাকে যদি কেউ প্রশ্ন করে, আপনার সবচেয়ে উত্তম কাজ কোনটি? আমি বলবো, মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর আশ্রয়ণ প্রকল্পের সঙ্গে নিজেকে সম্পৃক্ত রাখতে পারা।’

পরে ১২ বছর আগে স্বামী পরিত্যক্তা হওয়া চার সন্তানের মা গৃহকর্মী নাছিমা খাতুন আবেগাপ্লুত কন্ঠে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলেন। বলতে থাকেন, ‘আপনার দেওয়া ঘর পেয়েছি, সেই ঘরে উঠেছি। এখানে সব ব্যবস্থা আছে। আপনাকে আমি কী দিয়ে খুশি করবো? আপনাকে দোয়া করি। আপনি বেঁচে থাকুন। আপনি দয়া করে আমাদের কাছে একবার আসবেন। আমাদেরকে আপনি এতো কিছু করে দিয়েছেন, আপনি কী নিজ চোখে আমাদের দেখে যাবেন না? আমাদের বাসায় এসে ডাল-ভাত খেয়ে যাবেন।’ প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমি নিশ্চয়ই চেষ্টা করবো। আপনারা ভালো থাকুন, সেটিই আমরা চাই।’

‘আমি আমার জান্নাতের সঙ্গে কথা বলবো, কোথায় সে?’
পঞ্চগড় সদর উপজেলার কাজলদিঘী পাড়ের বাসিন্দা রবিউল ইসলামের কন্যা জান্নাত। কাজলদিঘী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভক্ত। একজন ভক্তের মতোই প্রধানমন্ত্রীর ছবি আশ্রয়ণের ঘরে জান্নাত টানিয়ে রেখেছে। এলাকাবাসী তাকে শেখ হাসিনার জান্নাত বলেই চেনে বলে জানান পঞ্চগড়ের জেলা প্রশাসক জহুরুল ইসলাম।

বৃহস্পতিবার (২১ জুলাই) আরও ২৬ হাজার ২২৯টি পরিবারকে ঘর হস্তান্তর অনুষ্ঠানে গণভবন প্রান্ত থেকে প্রধানমন্ত্রী জান্নাতের কথা শুনেই বলে উঠেন, ‘আমি আমার জান্নাতের সঙ্গে কথা বলবো, কোথায় সে?’

এ সময় জান্নাত কথা বলতে শুরু করেন। ক্ষুদে জান্নাত
বলেন, ‘আমার ঘরে আপনার ছবি আছে। আমি প্রত্যেকদিন সকালে আপনার ছবি নিজে পরিষ্কার করি। তারপর পড়তে বসি। আমি আপনাকে অনেক ভালোবাসি, পছন্দ করি। আপনার দেওয়া ঘরে আমরা থাকতেসি, পড়াশুনা করতেসি।

আমি বড় হয়ে চিকিৎসক হতে চাই, গরিব অসহায় মানুষের সেবা করতে চাই। গরিব দুঃখী মানুষের পাশে দাঁড়াতে চাই, বাবামা’র মুখে হাসি ফোটাতে চাই। আমার জন্য দোয়া করবেন।’

প্রধানমন্ত্রীকে জান্নাত পঞ্চগড়ে আসার অনুরোধ জানিয়ে বলেন, ‘আপনি আসলে আমরা খুশি হব। আপনাকে শুধু টিভিতে, ছবিতে দেখি। সামনাসামনি কখনো দেখিনি।’

প্রধানমন্ত্রী এই শিশুর আবেগমথিত কন্ঠে উচ্চারণ শুনে বলেন, ‘খুব খুশি হলাম তোমার সঙ্গে কথা বলে। মনোযোগ দিয়ে লেখাপড়া করবা, অবশ্যই অসহায় মানুষকে সাহায্য করবে।’

কালের আলো/এসবি/এএএ