কারিগরি শিক্ষায় সরকারের মহাপরিকল্পনা, মাইন্ড সেট চেঞ্জে গুরুত্ব শিক্ষামন্ত্রীর

প্রকাশিতঃ 8:51 pm | August 16, 2022

এম.আব্দুল্লাহ আল মামুন খান, অ্যাকটিং এডিটর :

দেশের কারিগরি শিক্ষায় বিশেষ নজর দিয়েছে সরকার। প্রযুক্তি নির্ভর সোনার বাংলা গড়তেই কারিগরি দক্ষতার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। প্রচলিত ধারণা ভেঙ্গে কারিগরি শিক্ষা থাকলে চাকরি আর সোনার হরিণ নয়-এই কনসেপ্টও হয়ে উঠেছে বাস্তব। প্রযুক্তি দক্ষতা কিংবা কারিগরি দক্ষতার সঙ্গে প্রচলিত শিক্ষার সমন্বয় করা হচ্ছে। কারিগরি শিক্ষার প্রসারের ওপরই বিশেষ জোর দিয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী ডা: দীপু মনি এমপি। অমিত দৃঢ়তায় তিনি উচ্চারণ করেছেন ‘কারিগরি শিক্ষায় শিক্ষিত কেউ বেকার থাকে না।’

কারিগরি শিক্ষা নিয়ে যে ট্যাবু আছে সেটি থেকে বেরিয়ে আসতে বলেছেন বারবার। শিক্ষার সবস্তরেই কারিগরি শিক্ষা চালুর উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন। দেশের উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রেও কারিগরি শিক্ষার বিভিন্ন বিষয় কোর্স হিসেবে সংযুক্ত করার সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করছেন। মাইন্ডসেট চেঞ্জ করে কারিগরি শিক্ষায় শিক্ষার্থীদের আগ্রহী করে তুলতে প্রচারণা চালানো হচ্ছে।

একজন শিক্ষার্থীকে কর্মক্ষেত্রে যোগ্য হিসেবে গড়ে তুলতেই সময়োপযোগী দক্ষ জনবল তৈরিতে গভীর মনোযোগ দিয়েছেন দেশের প্রথম এই নারী শিক্ষামন্ত্রী। সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়েই কারিগরি শিক্ষার মানোন্নয়ন করছেন। সাধারণ শিক্ষা ও মাদ্রাসা শিক্ষাতেও বাধ্যতামূলক করা হয়েছে কারিগরি শিক্ষা। মন্ত্রী সময়ে সময়ে স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন শিক্ষার্থীদের মানবিক, সৃজনশীল মানুষ হিসেবে গড়ে ওঠার জন্য যেসব দিকে নজর দেওয়া দরকার, শেখ হাসিনা সরকার সেদিকেই নজর দিয়েছে।

কারিগরি শিক্ষায় শিক্ষক নিয়োগের দীর্ঘদিনের জটিলতাও নিরসন করেছেন মন্ত্রী। সম্প্রতি ৫ হাজার কারিগরি শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। প্রতিটি উপজেলায় একটি করে কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র প্রকল্প নিয়েও ভাবছে সরকার। ইতোমধ্যেই ল্যাব ও আনুষঙ্গিক কাজের জন্য ৫০টি প্রতিষ্ঠানকে ৭০ কোটি দেওয়া হয়েছে। খবর সংশ্লিষ্ট সূত্রের।

রোবট, ভার্চুয়াল রিয়েলিটি এবং ইন্টারনেট অব থিংসের মতো প্রযুক্তির সাহায্যে চতুর্থ শিল্পবিপ্লব ঘটার সম্ভাবনা জোরালো হওয়ায় সেই সময় বেকার হবে প্রযুক্তি জ্ঞানহীন অদক্ষ জনশক্তি। এই বিষয়টি মাথায় রেখেই ২০৩০ সালের মধ্যে ৩০ শতাংশ এবং ২০৪০ সালের মধ্যে ৫০ শতাংশ শিক্ষার্থীকে কারিগরি শিক্ষায় শিক্ষিত করার লক্ষ্যে একাগ্রচিত্তেই কাজ করে চলেছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। প্রতিবছর ২৩ থেকে ২৮ লাখ লোক শ্রমবাজারে যুক্ত হচ্ছে। শিল্পপ্রতিষ্ঠানের চাহিদা অনুযায়ী এই জনশক্তিকে কারিগরি শিক্ষায় দক্ষ করে তুলতেই কারিগরি শিক্ষার মানের দিকে বাড়তি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

দেশের শিক্ষিত ডিগ্রিধারীদের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করতে সরকার কারিগরি শিক্ষায় দেশের ৫০ শতাংশ শিক্ষার্থী ভর্তি (এনরোলমেন্ট) নিশ্চিত করার পদক্ষেপ নিয়েছে। সরকারের এই মহাপরিকল্পনার উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেছেন ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত চার্লস হোয়াইটলিও। চলতি বছরের বৃহস্পতিবার (১৩ জানুয়ারি) শিক্ষামন্ত্রী ডা: দীপু মনির সঙ্গে ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের প্রতিনিধিদের বৈঠকে তিনি এই ভূয়সী প্রশংসা করেন।

সেই বৈঠকে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ক্ষমতা নেওয়ার আগে ২০০৯ সালে কারিগরিতে এনরোলমেন্ট ছিল ১ শতাংশ। ক্ষমতায় আসার পর টার্গেট নেওয়া হয়েছিল ২০২০ সালের ২০ শতাংশ নিশ্চিত করার। তখন এটাকে উচ্চাভিলাসী মনে করেছিলেন অনেকেই। কিন্তু নির্ধারিত সময়ে এনরোলমেন্ট হয়েছে ১৭ শতাংশের বেশি। আমরা চাই ২০৪১ সালের মধ্যে কারিগরিত ৫০ শতাংশ এনরোলমেন্ট করতে।’

সূত্র জানায়, সরকার দেশের প্রতিটি উপজেলায় কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান করছে। উপজেলা পর্যায়ে ৩২৯টি টেকনিক্যাল স্কুল অ্যান্ড কলেজ প্রতিষ্ঠা নামে একটি প্রল্প ২০২০ সালের জানুয়ারিতে শুরু হয়েছে। এই প্রকল্পের উদ্দেশ্য হচ্ছে ষষ্ঠ থেকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত একটি প্রযুক্তিগত বিষয়, এসএসসি (ভোকেশনাল) এবং সংক্ষিপ্ত প্রশিক্ষণ কোর্স চালু করার সুবিধা তৈরি করা এবং এভাবে বৃত্তিমূলক শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের প্রসার ঘটানো।

একই সঙ্গে প্রথম ধাপে ১০০ উপজেলায় ১০০টি টেকনিক্যাল স্কুল ও কলেজ প্রতিষ্ঠার জন্য প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। এখন পর্যন্ত ৭০টি প্রতিষ্ঠান খোলা হয়েছে। ২৩টি জেলায় পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠার কাজও চলমান রয়েছে। ‘বিদ্যমান ৬৪টি টেকনিক্যাল স্কুল ও কলেজের জন্য সক্ষমতা বৃদ্ধি’ প্রকল্পের কাজও এগিয়ে চলেছে।

শুধু তাই নয়, দেশের ১৬টি শতবর্ষী অনার্স কলেজে অনার্স-মাস্টার্স চালু রেখে অন্যান্য কলেজগুলোতে ডিগ্রি কোর্সের পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের কারিগরি ট্রেড পড়ানো হবে বলেও জানিয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী। তিনি বলেন, কর্মরত শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ দিয়ে শিক্ষার্থীদের ট্রেড কোর্স পাড়ানো হবে।

শিক্ষামন্ত্রী মনে করেন, ‘কারিগরি শিক্ষা ও দক্ষতাই হবে পরিবর্তিত কর্মজগতে টিকে থাকার হাতিয়ার।’ তিনি বিশ্বাস করেন গতানুগতিক ডিগ্রি বা সনদের পরিবর্তে অর্জিত জ্ঞান ও দক্ষতা কাজে লাগানোর মধ্যেই রয়েছে সৃজনশীলতা। তাঁর সময়ে ‘কারিগরি শিক্ষা বিস্তারে এই খাতে নতুন পদ সৃষ্টি করে নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে। মানসম্পন্ন বৃত্তিমূলক শিক্ষা প্রদান করতে সংশ্লিষ্ট পেশাজীবীদের দ্বারা শ্রেণিকক্ষে শিক্ষণের বিষয়টি বিবেচনা করছেন।

সপ্তাহখানেক আগে ঢাকা পলিটেকনিক ইন্সটিটিউট মিলনায়তনে জাতীয় পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট শিক্ষক সমিতির জাতীয় সম্মেলনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠান ও জাতীয় শোক দিবস উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে শিক্ষামন্ত্রী ডা: দীপু মনি বলেন, ‘ভবিষ্যতে বর্তমান কর্মজগতের আমূল পরিবর্তন হবে। দেশে পর্যাপ্ত শ্রমশক্তি তৈরি করতে এবং শিক্ষার্থীদের পরিবারকে বাড়তি শিক্ষাব্যয় থেকে রক্ষা করতে ডিপ্লোমা ডিগ্রি ৩ বছরের হওয়া শ্রেয়।’

এক্ষেত্রে তাঁর অকাট্য যুক্তি হচ্ছে- ডিপ্লোমা কোর্স তিন বছর হলে সময় সাশ্রয়ের পাশাপাশি মানেরও উন্নতি হবে। বিশ্বের অনেক উন্নত দেশে অনার্স কোর্স আছে ৩ বছরের। সেখানে আমাদের দেশে ডিপ্লোমা কোর্স ৪ বছরের হওয়ার কোনো মানে নেই’-যোগ করেন মন্ত্রী।

একই দিনে বাংলাদেশ পলিটেকনিক শিক্ষক সমিতির ১৭তম জাতীয় সম্মেলন ও জাতীয় শোক দিবস উপলক্ষে আয়োজিত এক সেমিনারে মন্ত্রী বলেন, ‘কারিগরি দক্ষতা অর্জনকে আমরা বিরাট গুরুত্ব দিচ্ছি। আমাদের শিক্ষার্থীরা দক্ষ হয়ে গড়ে উঠেছে কিনা সেটি নিশ্চিত করতে চাই।’

কালের আলো/ডিএস/এএএমকে