আইপিএএমএস আয়োজনে বাংলাদেশের সক্ষমতা দেখলো বিশ্ব, জেনারেল চার্লস ফ্লিন’র প্রশংসা
প্রকাশিতঃ 10:44 pm | September 16, 2022

বিশেষ সংবাদদাতা, কালের আলো:
চারদিনব্যাপী ইন্দো-প্যাসিফিক আর্মিস ম্যানেজমেন্ট সেমিনার (আইপিএএমএস)। স্বার্থক ও সাফল্যমন্ডিত অনিন্দ্য সুন্দর এক আয়োজনে রীতিমতো মুন্সীয়ানা দেখালো বাংলাদেশ সেনাবাহিনী। আরও একবার তাদের সামর্থ্য ও সক্ষমতা দেখলো বিশ্ব। ২৪ টি দেশের নীতি নির্ধারক সেনা কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণে এখান থেকেই বার্তা মিলেছে আঞ্চলিক, বৈশ্বিক শান্তি এবং স্থিতিশীলতা বজায় রাখার ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার দৃঢ় অঙ্গীকার।
গুরুত্বপূর্ণ এই সেমিনারে স্বয়ং ইউএস আর্মি প্যাসিফিক কমান্ড জেনারেল চার্লস ফ্লিন উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেছেন আয়োজক বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর। বাংলাদেশ সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ড.এস এম শফিউদ্দিন আহমেদ প্রগাঢ় বন্ধুত্বের নির্মল আনন্দের বারতা ছড়িয়ে দিয়েছেন প্রত্যেকের প্রাণে প্রাণে, যা সামরিক কূটনীতির অনন্যতায় পারস্পরিক আস্থা ও বিশ্বাসের নতুন পটভূমি রচনা করেছে।
নিজ মুখেই তিনি বলেছেন, ‘এই সেমিনারের কল্যাণে ২৪ দেশের সেনা কর্মকর্তারা নিজেদেরকে এখন বন্ধু বলতে পারে। যা এ অঞ্চলে শান্তি ও স্থিতিশীলতা রক্ষায় সহায়তা করবে।’
গত বৃহস্পতিবার (১৫ সেপ্টেম্বর) ঢাকার একটি হোটেলে চলতি বছরের বাংলাদেশ সেনাবাহিনী এবং ইউএস আর্মি প্যাসিফিক’র যৌথ আয়োজনে ৪৬তম ইন্দো-প্যাসিফিক আর্মিস ম্যানেজমেন্ট সেমিনার (আইপিএএমএস) এর সমাপনী অনুষ্ঠানে পৃথক পৃথক বিদায়ী বক্তব্যে জেনারেল শফিউদ্দিন এবং জেনারেল ফ্লিন সুখময় দৃশ্যকল্পের আলোকময় উচ্চারণে বন্ধুত্বের বন্ধন আরও সুদৃঢ় করার প্রত্যয়দীপ্ত উচ্চারণ করেছেন।
রাজধানী ঢাকায় এর আগে গত সোমবার (১২ সেপ্টেম্বর) থেকে শুরু হয় ৪৬ তম ইন্দো-প্যাসিফিক আর্মিজ ম্যানেজমেন্ট সেমিনার। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এই সেমিনারের উদ্বোধন করেন। যেখানে ২৪টি দেশের উচ্চপদস্থ সেনা কর্মকর্তারা অংশগ্রহণ করেন। গুরুত্ববহ এই সেমিনারে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসার (পিএসও) লেফটেন্যান্ট জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান, চীফ অব জেনারেল স্টাফ (সিজিএস) লেফটেন্যান্ট জেনারেল আতাউল হাকিম সারওয়ার হাসান, কোয়ার্টার মাস্টার জেনারেল (কিউএমজি) লেফটেন্যান্ট জেনারেল সাইফুল আলম, ন্যাশনাল ডিফেন্স কলেজ (এনডিসি) কমান্ড্যান্ট লেফটেন্যান্ট জেনারেল আকবর হোসেন, রাষ্ট্রদূত লেফটেন্যান্ট জেনারেল এস এম মতিউর রহমানসহ উর্ধ্বতন সেনা কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। আঞ্চলিক নিরাপত্তা স্থিতিশীলতা বাড়াতে গত চারদিনে সবাই নিজেদের ভাবনা পরিকল্পনা বিনিময় করেন।

সমাপনী অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ড.এস এম শফিউদ্দিন আহমেদ ও ইউএস আর্মি প্যাসিফিক কমান্ড জেনারেল চার্লস ফ্লিন চলতি বছরের আইপিএএমএস’এ অংশগ্রহণকারী সব দেশের প্রতিনিধিদের হাতে সার্টিফিকেট তুলে দেন। এছাড়াও পরবর্তী আয়োজক হিসেবে ভারতীয় সেনাবাহিনীর প্রতিনিধির কাছে আইপিএএমএস’র পতাকা হস্তান্তর করা হয়। বাদ্যযন্ত্রে যুক্তরাষ্ট্র এবং বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গীত বাজিয়ে সমাপনী অনুষ্ঠানের দাঁড়ি টানা হয়।
সমাপনী বক্তব্যে যুক্তরাষ্ট্রের প্যাসিফিক কমান্ডের জেনারেল ফ্লিন বলেন, ‘ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের নিরাপত্তা তৈরি প্রশিক্ষণ ও কঠিন সময়ে এক সঙ্গে লড়াই করার মনোভাব গড়ে তুলাই এই সেমিনারের লক্ষ্য। আয়োজক হিসাবে বাংলাদেশের সেনাবাহিনী দারুন কাজ করেছে।’
তিনি বলেন, ‘নিজেদের আইডিয়া বিনিময়, সম্পর্ক তৈরি এমনকি নিরাপত্তার বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করতে। পৃথিবীর সবথেকে সম্ভাবনাময় এ অঞ্চলের ২৪ দেশের সেনাবাহিনী সমবেত হয়েছে। যা পুরো বিশ্বকে বার্তা দেয় আমরা সংঘবদ্ধ এবং আমাদের একত্রিত প্রতিজ্ঞা রয়েছে।’
বাংলাদেশ সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ড.এস এম শফিউদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘এই সেমিনারের কল্যাণে ২৪ দেশের সেনা কর্মকর্তারা নিজেদেরকে এখন বন্ধু বলতে পারে। যা এ অঞ্চলে শান্তি ও স্থিতিশীলতা রক্ষায় সহায়তা করবে।’

তিনি বলেন, ‘প্রথমত আমরা সারা বিশ্বকে দেখাতে সক্ষম হয়েছি, যে আমাদের এই ধরনের ইভেন্ট আয়োজন করার সক্ষমতা কত। আপনারা শুনে খুব খুশি হবেন যে, এখানে অনেককে আমি বলতে শোনেছি যে- তারা বলছে যে, বাংলাদেশে যেভাবে করেছে এটাই স্ট্যান্ডার্ড ভবিষ্যতে এটাকে সবাই অনুকরণ করবে।দুই নম্বর বাংলাদেশ আজকে অনেকভাবে আন্তর্জাতিকভাবে তাদের বন্ধুসংখ্যা বাড়িয়েছে বলে আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করছি। যেটা আমাদের অনুকূলে যাবে বলে আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি।’
আন্ত:বাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) এক প্রেস নোটে জানিয়েছে, বিদায়ী বক্তব্যে জেনারেল ফ্লিন বলেন, বিশ্বের সবচেয়ে সম্ভাবনাময় এই অঞ্চলের নিরাপত্তা ও সমৃদ্ধির ক্ষেত্রে ঐক্য ও সম্মিলিত প্রচেষ্টার দৃঢ় বার্তা পাঠাতে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের ২৪টি দেশের স্থল বাহিনীর নেতৃবৃন্দ এই সম্মেলনে একত্রিত হয়েছে। সেই সাথে এই সম্মেলন আয়োজনে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী একটি আন্তর্জাতিক মানদন্ড স্থাপন করেছে বলে তিনি মন্তব্য করেন। অন্যদিকে, এই সম্মেলনের মধ্য দিয়ে আন্তর্জাতিকভাবে বাংলাদেশের বন্ধুর সংখ্যা বেড়েছে বলে মনে করেন সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল এস এম শফিউদ্দিন আহমেদ।
আইএসপিআর আরও জানায়, গত ১২-১৫ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত চারদিনব্যাপী এই সম্মেলনে ‘ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে শান্তি ও নিরাপত্তা বজায় রাখার ক্ষেত্রে সম্ভাবনা এবং চ্যালেঞ্জসমূহ’ নিয়ে আলোচনা ও মতবিনিময় করেন সম্মেলনে অংশগ্রহণকারী ২৪টি দেশের সিনিয়র সামরিক নেতৃবৃন্দ। এবারের সম্মেলনে ‘বলিষ্ঠ শান্তিরক্ষা’, ‘নারীর ক্ষমতায়ন’ এবং ‘ইন্দো প্যাসিফিক অঞ্চলের শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখার ক্ষেত্রে স্থল বাহিনীর ভূমিকা’ বিষয়ে ৩টি প্লেনারি সেশন অনুষ্ঠিত হয়।

সম্মেলনের একটি পর্ব কক্সবাজারে অনুষ্ঠিত হয় যেখানে ‘ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে সহযোগিতা বাড়াতে সামরিক কূটনীতি’ বিষয়ে একটি গোল টেবিল বৈঠকে মিলিত হন অংশগ্রহণকারী সামরিক নেতৃবৃন্দ। এছাড়াও জুনিয়র নেতৃবৃন্দ পেশাদারিত্বের উপর পৃথক পৃথক আলোচনায় অংশ গ্রহণ করেন। সম্মেলন শেষে প্রতিনিধি দলটি উখিয়ায় বলপূর্বক বাস্তুচ্যুত মায়ানমার নাগরিকদের (এফডিএমএন) কুতুপালং ক্যাম্প পরিদর্শনের মাধ্যমে ক্যাম্পের বাস্তব চিত্র স্বচক্ষে অবলোকন করেন।
সম্মেলনের তৃতীয় দিনে শিক্ষামন্ত্রী ডা: দীপু মনি এমপি বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে নারীর ক্ষমতায়নে সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ বিষয়ে বক্তব্য রাখেন। এরপর সম্মেলনে অংশগ্রহণকারী প্রতিনিধিরা ছোট ছোট দলে বিভক্ত হয়ে ‘বলিষ্ঠ শান্তিরক্ষা’, ‘নারীর ক্ষমতায়ন’, এবং ‘আঞ্চলিক সমস্যা সমাধানে স্থল বাহিনীর ভূমিকা’ শীর্ষক বিষয়ে ব্রেক আউট সেশনে অংশগ্রহণ করেন।
এসব কর্মকাণ্ড ছাড়াও বর্ণাঢ্য সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এবং প্রদর্শনী আয়োজনের মাধ্যমে আগত অতিথিদের কাছে বাংলাদেশের সংস্কৃতি এবং ঐতিহ্যকে তুলে ধরা হয়।
এই সম্মেলনের মাধ্যমে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের অংশগ্রহণকারী দেশসমূহের মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক ও পারস্পরিক সহযোগিতা আরও বেগবান হবে এবং এই অঞ্চল তথা বিশ্বে বাংলাদেশের সক্ষমতার প্রকাশ ও সুনাম আরো বৃদ্ধি পাবে বলে আশা প্রকাশ করার কথা জানিয়েছে আইএসপিআর।

কালের আলো/এমএএএমকে