সশস্ত্র বাহিনীর প্রতি পূর্ণ আস্থা-বিশ্বাস, স্বাধীনতার চেতনায় একতাবদ্ধ থাকতে হবে দেশের সার্বভৌমত্ব-অখণ্ডতা রক্ষায়

প্রকাশিতঃ 4:23 am | March 26, 2025

এম.আব্দুল্লাহ আল মামুন খান, অ্যাকটিং এডিটর :

স্বাধীনতায় সোনালী চেতনা দেখেছিলেন কবি। সবার স্বাধীনতায় এই সোনালী চেতনা বর্তমান রয়েছে। সেই দুরন্ত শৈশবে বাবার কণ্ঠে কণ্ঠ মিলিয়ে গেয়েছি, শিখেছি ‘আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি।’ শৈশবেই আমার জাগ্রত চেতনার রঙ সোনালী। আমাদের এগিয়ে যাওয়ার প্রত্যয়ে সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা মহান মুক্তিযুদ্ধ। আমাদের জাতীয় জীবনে পরম সত্য কবির সেই পঙক্তি-‘বাংলাদেশের স্বাধীনতা লক্ষ প্রাণের দান।’ ৩০ লাখ শহীদের রক্তে রঞ্জিত এই স্বাধীনতা। উত্তর আধুনিক বাংলা কবিতার প্রাণ পুরুষ কবি শামসুর রহমানের ‘তুমি আসবে বলে, হে স্বাধীনতা/সাকিনা বিবির কপাল ভাঙলো/সিঁথির সিঁদুর মুছে গেল হরিদাসীর/তুমি আসবে বলে হে স্বাধীনতা/শহরের বুকে জলপাইয়ের রঙের ট্যাঙ্ক এলো, দানবের মত চিৎকার করতে করতে/তুমি আসবে বলে হে স্বাধীনতা’ প্রকৃত অর্থেই অর্থেই অশেষ প্রেরণা জুগিয়েছে দেশের মানুষকে। তিনি যখন লিখেছেন- ‘স্বাধীনতা তুমি/ রবিঠাকুরের অজর কবিতা, অবিনাশী গান’-কবিতার মতোই স্বাধীনতা ছড়িয়ে পড়েছিল সবখানে। প্রয়াত কবির এই অমর কবিতা আজও শাণিত করে আমাদের চেতনা, স্মরণ করিয়ে দেয় মহান মুক্তিযুদ্ধ, জেগে উঠে দেশকে ভালোবাসার প্রাণ।

ছাত্র-জনতার রক্তস্নাত গণঅভ্যুত্থানের পর প্রথম স্বাধীনতা দিবস আজ। স্বভাবতই গত বছরের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পর ছাত্র-জনতার আন্দোলনে শহীদরাও অঙ্গাঙ্গিভাবে থাকছেন এবারের স্বাধীনতা দিবসে। একটি গণতান্ত্রিক, মানবিক ও বৈষম্যহীন এক মাতৃভূমি গড়ার প্রত্যাশায় এবার মহান স্বাধীনতা দিবস উদযাপন করবে দেশের আপামর জনসাধারণ। চব্বিশের চেতনায় একটি বৈষম্যহীন দেশ গড়া ও মহান মুক্তিযুদ্ধের লক্ষ্য বাস্তবায়নে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে। পরিবর্তনের সম্ভাবনা জাগানিয়া এই মাহেন্দ্রক্ষণে আমাদের বৈষম্যমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার প্রতিজ্ঞা করতে হবে। এই দিনটিতে একাত্তরের চেতনার আলোয় নিজেদের আলোকিত করার পাশাপাশি আমাদের একাতবদ্ধ থাকতে হবে দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব রক্ষার শপথে। সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে নানা কারণে মত-পার্থক্য তৈরি হয়েছে। সংঘাত-সংঘর্ষ আর তির্যক বাক্যবাণে একে অপরকে ঘায়েল করার ঘটনাও কারও দৃষ্টি এড়ানোর সুযোগ নেই।

বর্তমান বাস্তবতায় সম্প্রতি বাংলাদেশ সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান এই অবস্থার উন্নতি না ঘটলে দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব বিপন্ন হওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘নিজেরা কাদা-ছোড়াছুড়ি, মারামারি ও কাটাকাটি করলে দেশ ও জাতির স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব বিপন্ন হবে।’ তাঁর কথাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। গণঅভ্যুত্থানের পক্ষের শক্তিকে ইস্পাত-দৃঢ় ঐক্য ধরে রাখতে হবে। কোন অবস্থাতেই এই সুবর্ণ সুযোগকে হাতছাড়া করা যাবে না। ‘ইতিহাসের এটাই শিক্ষা যে, কেউ ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেয় না’-এই বিখ্যাত বাণীকে ভুল প্রমাণ করতে হবে। ভারতীয় গণমাধ্যমে বাংলাদেশ বিরোধী আগ্রাসন মোকাবিলায় সবার সম্মিলিত পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। দেশের সার্বভৌমত্বের প্রতীক বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে সব অপপ্রচার রুখে দিতে হবে। দেশের সার্বভৌমত্ব-অখণ্ডতা রক্ষায় প্রত্যেক সচেতন নাগরিককে অপরিসীম ভূমিকা পালন করতে হবে। অস্তিত্ব ও মর্যাদার এই প্রশ্নে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে। দেশপ্রেমিক সেনাবাহিনী তথা সশস্ত্র বাহিনীকে সব বিতর্কের উর্ধ্বে রাখতে হবে। কোনভাবেই তাদের প্রতিপক্ষ ভাবা যাবে না, প্রশ্নের মুখে ঠেলে দেওয়া যাবে না। কোন রকম চক্রান্ত-ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে দেশের মানুষকে বিভ্রান্ত করা যাবে না।

সেনাপ্রধান অযাচিতভাবে সেনাবাহিনীকে আক্রমণ না করারও আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ‘আমরা হচ্ছি একমাত্র ফোর্স, যেটা আপনাদের জন্য কাজ করে যাচ্ছি, দাঁড়িয়ে আছি প্ল্যাটফর্মে। অবকোর্স নেভি অ্যান্ড এয়ারফোর্স। নেভি, এয়ারফোর্স উই অল। আমাদের সাহায্য করেন, আমাদের আক্রমণ করবেন না। আমাদের অনুপ্রাণিত করেন, আমাদের উপদেশ দেন। আমাদের প্রতি আক্রমণ করবেন না। উপদেশ দেন, আমরা অবশ্যই ভালো উপদেশ গ্রহণ করব। আমরা একসঙ্গে থাকতে চাই এবং দেশ ও জাতিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে চাই।’

স্পর্শকাতর ও গুরুত্বপূর্ণ বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনীকে জড়িয়ে জুলাই অভ্যুত্থানের অনেকেই একতরফা ও একপক্ষীয় অভিযোগ এনে উত্তাপ ছড়াচ্ছেন। কল্প-কাহিনী ফাঁদার এজেন্ডা বাস্তবায়নের তোড়জোড় চলছে। চটুল গল্পে নিষ্কলুষ জীবনে কলঙ্ক লেপনের অপচেষ্টা চলছে। কথা বলার জিহ্বাকে সম্বরণ করতে পারছে না। একবার ভেবে দেখুন-দেশপ্রেমিক সশস্ত্র বাহিনীকে নিয়ে জনআস্থায় চিড় ধরালে আখেরে ক্ষতি হবে দেশের ও দেশের মানুষের। চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানে এই সশস্ত্র বাহিনীই জনগণের বুকে গুলি চালাতে অপারগতা প্রকাশের পরই অভ্যুত্থান স্বার্থক ও কাক্সিক্ষত সাফল্যের বন্দরে নোঙর করেছে। এখন সশস্ত্রবাহিনীকে জনগণের মুখোমুখি দাঁড় করানোর অপপ্রয়াস দেশের সার্বভৌমত্ব, নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতাকে বিনষ্ট করতে পারে।

সোমবার (২৪ মার্চ) বিকেলে রাজধানীর লেডিস ক্লাবে সাংবাদিকদের সম্মানে বিএনপি মিডিয়া সেল আয়োজিত ইফতার মাহফিলে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানও বলেছেন, ‘সেনাবাহিনীকে জনগণের মুখোমুখি করার চেষ্টা করা হচ্ছে, এর পেছনে ষড়যন্ত্র আছে। তিনি বলেছেন, দেশে একটি অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। মানুষ চায় দেশে স্থিরতা ফিরে আসুক। কেউ চায় না আগের অবস্থা ফিরে আসুক। সবাইকে এক প্ল্যাটফরমে দাঁড়িয়ে ঐক্যবদ্ধভাবে যেকোনো মূল্যে সব ষড়যন্ত্র মোকাবেলা করতে হবে।’ একই অনুষ্ঠানে অভিন্ন কণ্ঠে বিএনপি’র মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, ‘বাংলাদেশের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্ব যেন বিপন্ন হয়, আমর যেন আবার অরক্ষিত হয়ে পড়ি, আমাদের সেই দেশপ্রেমিক সেনাবাহিনী যারা দেশের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে জাতির পাশে এসে দাঁড়িয়েছে, তাদের আবার বিতর্কিত করার হীন প্রচেষ্টা শুরু হয়েছে।’

মাত্র ক’দিন আগে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছিলেন, ‘আমরা আজ একটা অত্যন্ত কঠিন সময় অতিক্রান্ত করছি। শুধু অলীক ধারণা থেকে, বিভিন্ন ইউটিউবিয়ান চিন্তা থেকে বা আবেগের মধ্য দিয়ে চিন্তাভাবনা করলে সমস্যার সমাধান করা যাবে না।’ বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, ‘বর্তমান পরিস্থিতিতে সর্বস্তরের জনগণকে সংযত, সতর্ক ও ঐক্যবদ্ধ থেকে দলমতের ঊর্ধ্বে উঠে দেশের বৃহত্তর স্বার্থে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।’

বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানি’র ভাষ্য ছিল এমন- ‘সেনাপ্রধানকে বিতর্কিত করার কোন সুযোগ নেই। বিতর্কিত না করাটাই ভালো, দেশের জন্য ভালো। উনি উনার জায়গায় আছে, উনার জায়গায় থাকবে। কিন্তু কিছু বিতর্ক ছড়িয়ে পড়ছে। এই বিতর্ক ঠিক হচ্ছে না। ৫ ও ৬ আগস্ট উনি আমাদের মতো দেশের জন্য দায়িত্ব নিয়েছেন। সুতরাং সেনানিবাস ও সেনাপ্রধানের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়, এটাও জাতির জন্য ভালো হবে না।’

দেশের ক্রান্তিকালে বাংলাদেশের গৌরবের স্মারক সশস্ত্র বাহিনী সততা, পেশাদারিত্ব, নিষ্ঠা ও প্রশ্নাতীত আন্তরিকতার সঙ্গে সাংবিধানিক দায়িত্ব পালন নজির স্থাপন করেছে। দেশের শান্তি ও স্থিতিশীলতা রক্ষা, জাতীয় ঐক্য ও সংহতি জোরদারের ক্ষেত্রে রেখে চলেছে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। সঙ্কটকালের কাণ্ডারিদের প্রতি পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস রাখতে হবে। অনাকাঙ্ক্ষিত, অযৌক্তিক ও অনভিপ্রেত বিতর্কের মাধ্যমে তাদের মনোবল নষ্ট করা যাবে না। বর্তমানে সেনাবাহিনীর চেইন অব কমাণ্ড অত্যন্ত শক্তিশালী। বৈশ্বিক পরিসরেও তাঁরা মানবিক বাংলাদেশের কণ্ঠস্বর। কোন অপপ্রচার তাদের অটল মনোবলকে দুর্বল করতে পারবে না। আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি- বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনীর প্রতিটি সদস্যও নেতৃত্বের প্রতি শ্রদ্ধাশীল, অটুট ও অবিচল রয়েছেন। এজন্য তাদের বিষয়ে কথা বলার সময় আমাদের আবেগের বশবর্তী না হয়ে বিবেককে প্রাধান্য দিতে হবে। আবেগতাড়িত মানুষ অহংকারি, অনিয়ন্ত্রিত ও অপরিণামদর্শী হয়ে ওঠে।

মানুষ আবেগের তাড়নায় ভুল করে বসে কিন্তু বিবেক দিয়ে যখন চিন্তা করে তখন সে ভুল সংশোধনের জন্য ব্যাকুল হয়ে ওঠে। আমরা যখন নিজে সংশোধিত না হয়ে অন্যের দোষের প্রতি একটি আঙ্গুল নির্দেশ করি তখনও দেখা যাবে বাকি চারটি আঙ্গুল আমাদের নিজের দোষটাকে নির্দেশ করছে। তাই নিজের বিবেকের বিচারবুদ্ধিকে বিসর্জন দেওয়া যাবে না। দেশপ্রেমিক সশস্ত্র বাহিনীর ইমেজ, মেধা, পরিশ্রম ও দক্ষতাকে কাজে লাগিয়ে দেশের নাম উজ্জ্বল করতে হবে। তাদের বিরুদ্ধে মিথ্যা প্রচারণার বিরুদ্ধে আমাদের সকলকে সজাগ থাকতে হবে। বিভ্রান্তি ছড়ানোর অপপ্রয়াসকে প্রতিহত করতে হবে। এই দায়িত্ব আমাদের প্রত্যেককেই নিতে হবে। চরম সঙ্কটময় এই সময়ে এটিই আমাদের প্রত্যেকের সর্বোত্তম লক্ষ্য হওয়া উচিত। আমাদের এমন কোনো মন্তব্য করা উচিত নয়, যা সশস্ত্র বাহিনী ও অন্য কারো মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করতে পারে, কারণ এটি সবার জন্য অকল্যাণকর ও ক্ষতিকর হতে পারে। বাংলাদেশ সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী ও বিমান বাহিনী বরাবরই দেশ ও জাতির স্বার্থকেই সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়েছে। দেশের সার্বভৌমত্ব, ভৌগোলিক অখণ্ডতা, নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা রক্ষায় তাদের দৃঢ় অঙ্গীকারাবদ্ধ থাকার নীতি আমাদের আশান্বিত করেছে।

এবার আমরা ফিরে যেতে চাই ৫৪ বছর আগে, ১৯৭১ সালের ছাব্বিশে মার্চে। একাত্তরের এদিনটিতেই দেশকে হানাদারের কবল থেকে মুক্ত করার ডাক এসেছিল। আনুষ্ঠানিক সূচনা ঘটেছিল বাঙালির সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের। পাকিস্তানি শোষকের হাত থেকে প্রিয় মাতৃভূমিকে স্বাধীন করতে রণাঙ্গনে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল বাংলার দামাল ছেলেরা। এরই ধারাবাহিকতায় নয় মাস বহু ত্যাগ-তিতিক্ষা আর রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর অর্জিত হয়েছিল আমাদের স্বাধীনতা। জাতি অর্জন করেছিল একটি জাতীয় পতাকা ও জাতীয় সঙ্গীত। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর গণহত্যা শুরুর পর মধ্যরাতে অর্থাৎ ২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে স্বাধীনতার ঘোষণা মুহুর্তেই মানুষের মাঝে উদ্দীপনার সৃষ্টি করে। এই ঘোষণার পর মানুষের মনে শক্তি, সাহস ও আশার সঞ্চার হয়। কার্যত এই যুদ্ধ ছিল জনযুদ্ধ। দেশের মানুষ সেদিন যুদ্ধে নেমে লড়াই করে বীরের মতো। ত্রিশ লাখ মানুষ প্রাণ দিয়েছিল, লাখ লাখ নারী সম্ভ্রম হারিয়েছিলেন। কিন্তু বীরের জাতি বাঙালি পাকিদের বিদায় করেছিল।

স্বাধীনতা মানে শুধু পরাধীনতা থেকে মুক্তি নয়। নতুন একটি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আয়োজনও শুধু নয়। স্বাধীনতা হলো স্বাধীন রাষ্ট্রে সার্বভৌম জাতি হিসেবে টিকে থাকার আয়োজন। স্বাধীনতা মানে ইচ্ছার স্বাধীনতা, রাজনীতির স্বাধীনতা এবং অবশ্যই অর্থনৈতিক মুক্তি। আজ মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবসে আমরা মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের সকল বীর শহীদ, বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন ও বিভিন্ন গণতান্ত্রিক আন্দোলনে শহীদদের অবদান শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করছি। আমাদের মনে রাখতে হবে, মহান স্বাধীনতা দিবস কেবল আমাদের গর্বের উৎসই নয় এটি শপথের দিনও। ১৯৭১, ১৯৯০ আর ২০২৪ সালের চেতনাকে আমাদের বুকে ধারণ করতে হবে। আমরা যাতে ভুলে না যাই একাত্তরের পর চব্বিশের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানেও বিন্দু বিন্দু স্বপ্নরা মিলিত হয়েছিল জীবনের মোহনায়। হাজারো মানুষ জীবন দিয়ে এই দেশকে একটি সমৃদ্ধ ও গণতান্ত্রিক দেশ হিসেবে দেখতে চেয়েছেন। এই অর্জনকে নসাৎ করার ষড়যন্ত্র চলছে। প্রতিটি নাগরিকের অধিকার রক্ষা, সাম্যের ভিত্তিতে সমাজ নির্মাণ ও সুষ্ঠু গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে আমাদের প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হতে হবে। মহান স্বাধীনতা দিবস আমাদের নতুন শপথের সেই সুযোগ এনে দিয়েছে। স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। এজন্য আমাদের ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টা ও রাজনৈতিক সচেতনতা গুরুত্বপূর্ণ। প্রত্যেক নাগরিককে তাঁর দায়িত্ব পালনে সজাগ-সতর্ক থেকে দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় কাঙ্ক্ষিত ভূমিকা রাখতে হবে। প্রত্যেক নাগরিকের স্বপ্ন বাস্তবায়িত হয় এমন একটি উন্নত, গণতান্ত্রিক ও মানবিক বাংলাদেশ এখন সময়ের সুতীব্র প্রয়োজন।

আধুনিক রাষ্ট্রে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মাধ্যমেই জনগণের সার্বভৌম ক্ষমতা এবং ইচ্ছা প্রতিফলিত হয়। তাই নতুন-আধুনিক ও স্বপ্নময় দিগন্তকে টেকসই করতে অপিরহার্য একটি সুষ্ঠু, অবাধ ও নিরপক্ষে জাতীয় নির্বাচন। প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড.মুহাম্মদ ইউনূস চলতি বছরের ডিসেম্বর কিংবা আগামী বছরের জুনের মধ্যে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের সম্ভাব্য দু’টি সময় নির্ধারণ করে দিয়েছেন। গোটা দেশের মানুষ একটি অর্থবহ নির্বাচনের অপেক্ষায় রয়েছে। হাজারো প্রাণের বিনিময়ে অর্জিত নতুন বাংলাদেশ একটি সমৃদ্ধ ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের আশা জাগিয়েছে। ইতোমধ্যেই নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের সুপারিশকে মাইলফলক হিসেবেই দেখছেন অনেকেই। গণতন্ত্রে উত্তরণের জন্য নির্বাচন যেমন জরুরি তেমনি ভবিষ্যতে রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক কাঠামো সুদৃঢ় করতে সংস্কারকেও অগ্রাহ্য করা যাবে না মোটেও। এই বিষয়টিকে আমাদের সমানতালেই গুরুত্ব দিতে হবে।

বাংলাদেশের ক্রান্তিলগ্নে আইকনিক নেতৃত্বের শুন্যতা পূরণ করেছেন শান্তিতে নোবেলজয়ী ড.মুহাম্মদ ইউনূস। তিনি জাতীয় ঐক্যের প্রতীক হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন। অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা জাতীয় ঐক্য ধরে রাখতে আপ্রাণ চেষ্টা করছেন, মাসখানেক আগে এমনটি বলেছেন সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামানও। অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা তারুণ্য ও অভিজ্ঞতার সমন্বয়ে স্থাপন করেছেন নতুন দৃষ্টান্ত। তরুণদের উদ্ভাবনীশক্তি ও প্রবীণদের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে তিনি বাংলাদেশকে একটি শক্তিশালী ও সুশাসিত রাষ্ট্রে রূপান্তরিত করার উদ্যোগ নিয়েছেন। তাঁর উদ্যোগকে আমাদের সফল করতে হবে। তাকে সর্বাত্মক সহযোগিতা নিশ্চিত করতে হবে। ছাত্র-জনতা নতুন আশার আলো জ্বালিয়েছে। অফুরান সম্ভাবনার এই শক্তিই আমাদের সমৃদ্ধ ভবিষ্যতের চাবিকাঠি। দেশবাসীকে মহান স্বাধীনতা দিবসের শুভেচ্ছা।

লেখক : সম্পাদক ও প্রকাশক, দৈনিক সন্ধানী বার্তা এবং অ্যাকটিং এডিটর, কালের আলো.কম।