সর্বোচ্চ গৌরবের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে ঐতিহাসিক সিদ্ধান্তে অনন্য উচ্চতায় বিএনপি
প্রকাশিতঃ 5:15 am | March 26, 2025

মো.শামসুল আলম খান, সম্পাদক :
একাত্তরে রক্তরাঙা নতুন সূর্য উঠেছিল সেদিন। ঘোর অন্ধকার-অমানিশা কাটিয়ে বাংলার চিরসবুজ জমিনে রক্তে রাঙানো লাল-সবুজ পতাকার ভ্রূণ জন্ম নিয়েছিল ঐতিহাসিক এই দিনটিতেই। সূচনা হয়েছিল সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের। পরাধীনতার শেকল ভেঙে বিশ্বের বুকে স্বাধীন অস্তিত্ব ঘোষণা করেছিল বীরের জাতি বাঙালি। বাঙালি জাতির সামনে আলোকময় ভবিষ্যতের দুয়ার খুলেছিল এই দিন। রক্ত, অশ্রুস্নাত বিক্ষুব্ধ বিদ্রোহের দিন ২৬ মার্চ। এক সাগর রক্তের বিনিময়ে অর্জিত মহার্ঘ্য স্বাধীনতার ৫৪তম বাষির্কী আজ।
গৌরব ও স্বজন হারানোর বেদনার এই দিনটি একই সঙ্গে গৌরব আর অহঙ্কারেরও। আমাদের কাছে একাত্তর সর্বোচ্চ গৌরবের। চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান একাত্তরের ধারাবাহিকতা। কিন্তু অনেকেই জেনে না জেনে, বুঝে না বুঝে একাত্তর আর চব্বিশকে মুখোমুখি দাঁড় করাতে চাচ্ছে। একাত্তরকে চব্বিশের প্রতিপক্ষ করার চেষ্টা হচ্ছে। বাংলার মধ্যযুগের এক কবি বড়ু চণ্ডীদাস উচ্চারণ করেছিলেন মানব-ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ মানবিক বাণী ‘সবার উপরে মানুষ সত্য, তাহার উপরে নাই’। সমগ্র বিশ্ব যখন হিংসায় উন্মত্ত, রক্ত ঝরছে যখন পৃথিবীর নরম শরীর থেকে, তখন এই বাংলার এক কবি বিশ্বকে শুনিয়ে ছিলেন মানবতার অমর কবিতা। হয়তো তিনি আমাদের একাত্তর দেখলে বলতেন- ‘সবার উপরে মুক্তিযুদ্ধ, তাহার উপরে নাই’।
পুঞ্জিভূত ক্ষোভ থেকে গণবিস্ফোরণ ঘটে রূপান্তরিত হয় জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থান। ছাত্র-জনতাই ছিল স্বত:স্ফূর্ত অভ্যুত্থানের মূল শক্তি। তবে এটিকে দ্বিতীয় স্বাধীনতা বলার যুক্তি নেই। স্বাধীনতা একবারই এসেছে লাখো শহীদের রক্তের বিনিময়ে; যা আমাদের দিয়েছে মানচিত্র, জাতীয় পতাকা, জাতীয় সংগীত ও সংবিধান। এসব সমুন্নত রেখেই পথ চলতে হবে। সংবিধানে কালাকানুনের কালো ছায়া মুছে ফেলতে হবে।
জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থান নিঃসন্দেহে অনন্য ও অবিস্মরণীয় ঘটনা। এভাবে বন্দুকের সামনে হাজার মানুষের আত্মদানের ঘটনা ইতিহাসে বিরল। এই অভ্যুত্থান নবজাগরণ এনেছে। জাতীয় ঐক্যের বাতাবরণ তৈরি করেছে। আন্দোলনের মিছিলে নারীর উপস্থিতি ছিল ব্যাপক; যা অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ ও রাষ্ট্রের অপরিহার্য উপাদান। আমাদের সমাজে মানুষে মানুষে, ধর্মে বর্ণে যে দূরত্ব তৈরি ছিল, তা ঘুচিয়ে দিয়েছে অভ্যুত্থান। তবে অভ্যুত্থানের পর একাত্তর আর চব্বিশকে সমান চোখে দেখা হচ্ছে। দীর্ঘ বিতর্কের পর এই বিষয়ে আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে দেশের প্রধান রাজনৈতিক দল ও আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সরকার গঠনের দ্বারপ্রান্তে থাকা বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি। সংবিধানে ৭১-এর সঙ্গে ২৪-কে একই কাতারে রাখতে আপত্তি জানিয়েছে দলটি। জাতীয় ঐক্যমত্য কমিশনের কাছে লিখিতভাবে দলীয় মতামত জমা দিয়ে দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদ সাংবাদিকদের বলেছেন, ‘জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের প্রস্তাবে ১৯৭১ এবং ২০২৪-কে এক কাতারে আনা হয়েছে, এটি সমুচিত নয় বলে মনে করে বিএনপি। রাষ্ট্রের নাম পরিবর্তন করার প্রয়োজন আছে বলেও তারা মনে করে না।’ বিএনপি’র নীতি নির্ধারক নেতা সালাহউদ্দিন আহমেদ’র এই বক্তব্য একটি রাজনৈতিক দল হিসেবে বিএনপিকে অনন্য এক উচ্চতায় নিয়ে গেছে।
দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রামের পথ ধরেই অর্জিত হয়েছে মহান স্বাধীনতা। গণআন্দোলন থেকে মুক্তিযুদ্ধ জনযুদ্ধে রূপান্তরিত হয়েছে। আর বাঙালির হাজার বছরের ইতিহাসে এটাই ছিল মহত্তম রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। ঠিক তেমনি মুক্তিযুদ্ধের প্রতি বিএনপি ‘চির উন্নত মমশির’ দৃষ্টিভঙ্গির কথা জানান দিয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও ঐতিহাসিক এক দায়িত্ব পালন করেছে। এমন সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত রাজনীতিতে তাদের অমর-অব্যয় করবে নি:সন্দেহে। মুক্তিযুদ্ধের জেড ফোর্সের অধিনায়ক ও সেক্টর কমান্ডার সামরিক কর্মকর্তা থেকে দেশের অন্যতম জনপ্রিয় রাজনৈতিক নেতা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের হাতে গড়া দল বিএনপি সব মত-বিভেদের উর্ধ্বে রাখতে চায় লাখো শহীদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত মহান স্বাধীনতাকে।
বিএনপি’র প্রতিষ্ঠাতা প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের বড় গুণ ছিল, তিনি তাৎক্ষণিকভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারতেন এবং পরবর্তী সময়ে এই সিদ্ধান্তগুলো জিয়াউর রহমান ও বিএনপির জন্য সুফল বয়ে এনেছে। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ থেকে এর শুরু এবং রাষ্ট্র পরিচালনায়ও এর প্রতিফলন দেখা যায়। জিয়াউর রহমান সম্ভবত দীর্ঘসূত্রতা পছন্দ করতেন না। এ কারণেই তিনি দ্রুত সিদ্ধান্ত নিয়ে পাকিস্তানি শাসনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেন এবং মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেন এবং দেশকে শত্রুমুক্ত করতে প্রভাবকের ভূমিকা পালন করেন। সম্ভবত তাঁর সুসন্তান, বাংলাদেশের ভাবী কাণ্ডারি বিএনপি’র ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানও বাবার পথই অনুসরণ করেছেন। মা তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার অনুপস্থিতিতে দলের হাল ধরেছেন, নেতা-কর্মীদের ঐক্য বজায় রেখেছেন। দলীয় সাংগঠনিক ভিত্তি মজবুত করে দলকে দেশের রাজনীতিতে চালকের আসনে বসিয়েছেন। নিজের পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তি গড়েছেন। রাজনৈতিক পরিপক্বতার প্রমাণ দিয়েছেন। নিজের প্রতিটি বক্তব্যে সহনশীলতা, দায়িত্বশীলতা, মার্জিত ও রুচিশীল ভাষার প্রয়োগ ঘটিয়েছেন। চব্বিশ কখনও একাত্তরের সমকক্ষ নয়, একাত্তরের সঙ্গে কোন কিছুর তুলনা চলে না এই বিষয়ে দলের অবস্থান পরিস্কার করে তারেক রহমান দেশের জনসাধারণকে ব্যাপকভাবে আলোড়িত, উদ্বেলিত ও আশান্বিত করেছেন।
কোন কোন মহলের এ নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন, বিরক্তি বা অস্বস্তি থাকলেও বিএনপি অসীম সাহস ও দৃঢ়তার সঙ্গেই সত্য প্রকাশ করেছে। ঐকমত্য কমিশনের বৈঠকে উপস্থিত হয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেছেন, ‘মুক্তিযুদ্ধ একটাই। জুলাই বিপ্লবের মাধ্যমে কোন নতুন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়নি। গণতন্ত্র বিপন্ন হয়েছিল, গণতন্ত্রকে সঠিক পথে নিয়ে আসার জন্যেই এই বিজয় অর্জিত হয়েছে।’
অনেকেই মনে করেন, বাংলাদেশ রাষ্ট্র আছে বলেই চব্বিশের জুলাই গণঅভ্যুত্থান সংঘটিত হয়েছে। এই গণঅভ্যুত্থান একাত্তরের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে না। যারা মনে করেন যে, জুলাই অভ্যুত্থান মুক্তিযুদ্ধের বিকল্প আরেকটি মুক্তিযুদ্ধ, তারা বোকার স্বর্গে বাস করছেন। অসম্ভব ভুল একটি রাজনৈতিক সমীকরণ করছেন নিজেদের খেয়াল খুশিমতো। এই রাজনৈতিক সমীকরণ কখনোই জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। চব্বিশের অভ্যুত্থান আসলে মুক্তিযুদ্ধের আকাক্সক্ষা পূরণেরই একটি সংগ্রাম। এটি আমাদের গণতন্ত্র ও স্বাধিকার অর্জনের চেতনাকে শানিত করে এবং সব অন্যায়-অবিচার ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী হতে অনুপ্রেরণা জোগায়।
স্বাধীনতা শব্দটি একদিকে যেমন উদাত্ত, তেমনি মধুরও। ৩০ লক্ষ শহীদ আর চার লাখ মা-বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে অর্জিত হয়েছে বাংলাদেশ। এই অর্জন কালের গর্ভ থেকে ভূমিষ্ঠ হওয়ার। গোবিন্দ হালদারের লেখায় আপেল মাহমুদ যথার্থই গেয়ে ওঠেছিলেন-‘মোরা একটি ফুলকে বাঁচাব বলে যুদ্ধ করি।’ সম্মিলিত মনের শক্তিতে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর সুসজ্জিত কামানের গোলার মুখে বাঙালি ঝাঁপিয়ে পড়ে নির্ভয়ে। অকাতরে বিলিয়ে দেয় নিজের জীবন। একাত্তরের ২৫ মার্চ মধ্যরাত থেকে শুরু হওয়া ধ্বংসস্তূপের মধ্য থেকে উঠে দাঁড়ায় বাংলার মানুষ। মুক্তিযুদ্ধ ও দেশ স্বাধীন করার দৃপ্ত শপথ গ্রহণ করে। ঘরে-বাইরে যুদ্ধরত প্রতিটি প্রাণে প্রাণে জাগে স্পন্দন। বাঙালির মনে রোপিত হয় নতুন রাষ্ট্র বাংলাদেশের বীজ। মহান মুক্তিযুদ্ধে মৃত্যুপণ লড়াই ও রক্তসমুদ্র পাড়ি দিয়ে বাঙালি ছিনিয়ে আনে চির আরাধ্য স্বাধীনতা।
বাঙালি জাতির জীবনে সবচেয়ে গৌরব ও অহংকারের বিষয় হলো একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ। একাত্তরের মহান স্বাধীনতা সংগ্রামের কথা আমরা ভুলে যেতে পারি না। একাত্তর আর মুক্তিযুদ্ধকে বাদ দিয়ে বাংলাদেশ একেবারেই অস্তিত্বহীন। একটি বিষয় মনে রাখা অতীব জরুরি- চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ভূমিকা অনস্বীকার্য। আমরা জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানকে সম্মান করি। ছাত্র-জনতার এই গণঅভ্যুত্থান আমাদের জন্য এক বিশাল গর্বের। জুলাই গণঅভ্যুত্থানে যারা প্রাণ দিয়েছেন, তারাও আমাদের বীর সন্তান। কিন্তু এরপরও একাত্তর অতুলনীয়। মহান স্বাধীনতা সবার ওপরে। দেশের প্রতিটি নাগরিককে অন্তরে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ধারন করতে হবে। মুক্তিযুদ্ধ শুধু একাত্তরের ঘটনা নয়, এটি আমাদের অস্তিত্বের ভিত্তি এবং আমাদের আত্মপরিচয়। ইতিহাসের এই মহামূল্যবান অধ্যায় যেন আমরা কখনো বিস্মৃত না হই। মনে রাখতে হবে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা হারালে পথ হারাবে প্রজন্ম। এজন্য জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের বৈঠকে মুক্তিযুদ্ধের বিষয়ে বিএনপি’র লিখিত মতামত দেশবাসীর হৃদয়কে স্পর্শ করেছে। তাদের এই সিদ্ধান্ত হতে পারে ভবিষ্যত বাংলাদেশের জন্য আলোকরেখা।
লেখক : প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক, কালের আলো.কম ও প্রধান সম্পাদক, দৈনিক সন্ধানী বার্তা।