আমলাদের নিয়ে কেন এতো ‘গাত্রদাহ’?

প্রকাশিতঃ 10:50 pm | June 29, 2021

নিজস্ব সংবাদদাতা, কালের আলো:

অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী বিশ্বের অনেক দেশ করোনা মহামারির সঙ্কট মোকাবেলায় বিপর্যস্ত অবস্থায় রয়েছে। কিন্তু কীভাবে অর্থনীতি সচল রেখে করোনা মহামারির সঙ্কট মোকাবেলা করতে হয় বিশ্ব পরিমন্ডলে তাঁর একটি মডেল দাঁড় করিয়েছে বাংলাদেশ। আর এসব সম্ভব হয়েছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার রাজনৈতিক প্রজ্ঞা, দূরদর্শী ও বলিষ্ঠ নেতৃত্বের দৌলতেই।

করোনা মহামারি মোকাবেলায় সরকারি আমলাদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ইতিবাচক বার্তা নিয়ে এলেও এক শ্রেণির মানুষের জন্য বিষয়টি যেন রীতিমতো মাথাব্যাথার এক কারণ হয়ে ঠেকেছে। ঢালাওভাবে সরকারের সচিব, ডিসি বা ইউএনওদের বিষোদাগার করা হচ্ছে।

অথচ জীবনের ঝুঁকি নিয়ে প্রাণঘাতী এই ভাইরাস প্রতিরোধ যুদ্ধে জেলায় জেলায় একজন সচিবের নেতৃত্বে মাঠপর্যায়ের প্রতিনিধি জেলা প্রশাসক (ডিসি) ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তারা (ইউএনও) সাধারণ মানুষের দূয়ারে দূয়ারে নিজেদের সমর্পণ করেছেন। খাদ্য সামগ্রী বিতরণ থেকে শুরু করে কোভিড-১৯ ব্যবস্থাপনা কার্যক্রমেও শৃঙ্খলা ও চেইন অব কমান্ড ধরে রেখেছেন।

সচিব থেকে শুরু করে মাঠ পর্যায়ের অনেক কর্মকর্তা এ সম্মুখ যুদ্ধের সারিতে থেকে আত্মদান করেছেন। এখনও মৃত্যুঝুঁকি জেনেও মানবতার সেবায় নিজেদের নিবেদন করেছেন, পিছপা হননি। কোন জেলা বা উপজেলা পর্যায়ে দু’একজন কর্মকর্তার অনাকাঙ্খিত ভুলের কারণে গোটা প্রক্রিয়াটিকে প্রশ্নবিদ্ধ করা নিয়েও জনেজনে প্রশ্ন উঠেছে।

ইতোমধ্যেই জেলায় জেলায় সচিবদের দায়িত্ব দেওয়ার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সিদ্ধান্তকে ‘যুগান্তকারী’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী এমপি। তিনি বলেছেন, ‘সচিবদের দায়িত্ব দেওয়ার কারণে জেলায় জেলায় খাদ্য ও ওষুধ বিতরণ কার্যক্রম ভালোভাবে হয়েছে। ইউএনও, ডিসিরা মানুষের দ্বারে দ্বারে গেছেন। এতে মানুষ আরও সাহসী হয়েছেন। কোনো শ্রেণি-পেশার মধ্যে বৈষম্য নেই। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে সবাই ঐক্যবদ্ধ।’

এর আগে গত মঙ্গলবার (৮ জুন) শেরেবাংলা নগরে একনেক সভায় সাভারে বাংলাদেশ লোক প্রশাসন প্রশিক্ষণ কেন্দ্র প্রকল্পের অনুমোদনের সময় পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান বলেছিলেন, ফেরাউনও আমলাতন্ত্রের বিকল্প বের করতে পারে নাই। আমিও ছোট-খাটো আমলা ছিলাম, এখন আমি বড় আমলা। ফেরাউনকে নেতিবাচকভাবে তুলে ধরা হয়। ফেরাউন মানে অনেক বড় রাজা। আরবের অনেক দেশে ফেরাউনের নাম রাখা হয়।

তিনি আরও বলেন, আমলাতন্ত্র মন্দ নয়, আমলাতন্ত্র ভালো, আমলাতন্ত্রের বিকল্পও নাই। সোভিয়েতরা বিকল্প বের করতে পারে নাই, চীনও বের করতে পারে নাই, ফেরাউনও পারে নাই। সেই মহান আমলাতন্ত্র আমাদের মধ্যে আছে। আমলাতন্ত্রের জন্য আমরা সাভারে প্রশিক্ষণ কেন্দ্র প্রকল্পের অনুমোদন দিলাম।

মন্ত্রী বলেন, ফেরাউনকে এখানে নেতিবাচক হিসেবে তুলে ধরছি না। ফেরাউন শক্তিশালী সরকার ছিল।

জানা যায়, ২০২০ সালের ২০ এপ্রিল ত্রাণ বিতরণ কার্যক্রম সমন্বয়ের জন্য ৬৪ জন সচিবকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। প্রতি জেলায় একজন করে সচিব এ দায়িত্ব পালন করবেন। ওইদিন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে এ সংক্রান্ত একটি অফিস আদেশ জারি করা হয়।

প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব ড. আহমদ কায়কাউস স্বাক্ষরিত আদেশে বলা হয়, ‘নিয়োগকৃত কর্মকর্তারা জেলার সংসদ সদস্য, জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান, জনপ্রতিনিধি, স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তি ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে পরামর্শ করে কোভিড-১৯ সংক্রান্ত ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালনার কাজ তত্ত্বাবধান করবেন। একই সঙ্গে ত্রাণ কার্যক্রম বিষয়টি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ও মন্ত্রিপরিষদ বিভাগকে অবহিত করবেন।’

সেই আদেশে আরও বলা হয়, ‘এছাড়া নিয়োগকৃত কর্মকর্তারা জেলার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি পরিবীক্ষণ ও প্রয়োজনীয় সমন্বয় সাধন করবেন। সমন্বয়ের মাধ্যমে পাওয়া সমস্যা সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় বা বিভাগ বা সংস্থাকে লিখিত আকারে জানাবেন। বিষয়টি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ও মন্ত্রিপরিষদ বিভাগকে অবহিত করবেন।’

দেখা গেছে, করোনা সংক্রমণ শুরুর পর সামনে থেকেই এই যুদ্ধ মোকাবেলায় সরাসরি নেতৃত্ব দিচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি ৬৪ জেলার কর্মকর্তাদের সঙ্গে গণভবন থেকে যুক্ত হয়ে সরাসরি কথা বলেছেন। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে ভিডিও কনফারেন্স পরিচালনা করেছেন প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব ড.আহমদ কায়কাউস। আর জেলায় কনফারেন্স পরিচালনা করেছেন জেলা প্রশাসক (ডিসি)।

সেখানে সংসদ সদস্য থেকে শুরু করে অন্যান্য জনপ্রতিনিধি এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ‘ওয়ান টু ওয়ান’ কথা বলেছেন। এ কনফারেন্সের মাধ্যমে কীভাবে তাদের কাজ করতে হবে এবং অসহায়দের কাছে কীভাবে খাবার পৌঁছে দিতে হবে তাঁর পথ বাতলে দিয়েছেন সরকারপ্রধান।

একই সঙ্গে এর মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী মাঠ পর্যায়ের বাস্তবিক সমস্যা জানতে পেরেছেন এবং তাৎক্ষণিক নির্দেশনার মাধ্যমে সমস্যা সমাধান করেছেন। মাঠ প্রশাসনের কর্মকর্তারাও প্রধানমন্ত্রীর সরাসরি দিক নির্দেশনায় সাহসী ও উজ্জীবিত হয়ে নিজেদের সর্বোচ্চ কর্মপ্রচেষ্টা অব্যাহত রাখেন। ফলে দু’একটি জেলা বাদে অন্য কোথাও সমন্বয়হীনতার কোন সমস্যা চোখে পড়েনি। অথচ পুরো প্রক্রিয়াটিকে আমলা নির্ভরতা হিসেবেই আড় চোখে দেখে মুখে ফেনা তুলছেন কেউ কেউ।

একটি সূত্র বলছে, কোন কোন রাজনীতিক বলেছেন, রাজনীতিকরা যে ত্রাণ দিচ্ছেন সেটা না কী প্রশাসনিক কর্মকর্তারা দিচ্ছেন, সাধারণ মানুষ এমনটিই মনে করছে। কিন্তু এখানে সত্যের অপলাপ হয়েছে যেন। মাঠপর্যায়ের প্রতিনিধি জেলা প্রশাসক (ডিসি) ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তারা (ইউএনও) বেশ দৃঢ়তার সঙ্গেই বলছেন, ত্রাণ বিতরণ কার্যক্রম পরিচালনা করছে সরকার।

তারা নিজেদের কোন ক্রেডিট হয়েছেন এমন উদাহারণ নেই। পাশাপাশি তাঁরা মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর দক্ষ ও বিচক্ষণ সিদ্ধান্তের বিষয়টিই মোটা দাগে ফোকাস করছেন। এমনকি আমলারা জনপ্রতিনিধিদের নিয়ে পুরো বিষয়টি সমন্বয় করায় সামগ্রিক কার্যক্রমে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত হয়েছে। স্বাধীনতার পর এবারই প্রথম বৃহৎ ত্রাণ বিতরণ কর্মযজ্ঞে কোন রকম অনিয়ম-দুর্নীতি হলেই কঠোর অ্যাকশনেরও ভুরি ভুরি নজির স্থাপিত হয়েছে।

ঢালাওভাবে আমলাদের বিরুদ্ধাচারণের ঘটনায় উষ্মা প্রকাশ করে মাঠ পর্যায়ের এক কর্মকর্তা কালের আলোকে বলেন, ‘ভালোকে ভালো খারাপকে খারাপ হিসেবেই বিবেচনা করতে হবে। ঢালাওভাবে পুরো প্রক্রিয়াকে গালমন্দ করা সমুচিত নয়। অনেক ভালো রাজনীতিক যেমন আছেন তেমনি ভালো আমলাও রয়েছেন। দু’একজনের দক্ষতার অভাবে ঢালাওভাবে পুরো সিস্টেমকে দোষারোপ করা ঠিক নয়।’

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মাঠ পর্যায়ের অপর এক কর্মকর্তা কালের আলোকে বলেন, ‘রাজনীতিকদের মাঝে দ্বন্দ্ব-মনকষাকষি নতুন বিষয় নয় মোটেও। কোন পক্ষ কোন কার্যক্রমে নেতৃত্বে থাকলে অপর পক্ষ সেখানে নিষ্ক্রিয় থাকে। কিন্তু জেলা প্রশাসক বা ইউএনওরা পুরো কার্যক্রম সমন্বয় করায় সব পক্ষের লোকজনই সক্রিয় থেকেছেন।

সরকারের ক্যাবিনেট সেক্রেটারী, মুখ্য সচিব বা প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সচিব-সবাই কিন্তু একবাক্যে জনপ্রতিনিধিদের নিয়ে সমন্বয় করে কাজ করারই নির্দেশনা দিয়েছেন। দু’এক জায়গায় ডিসি, ইউএনও বা কোন সচিব ব্যর্থ হতে পারেন। কোন জ্যেষ্ঠ রাজনীতিককে হয়তো পুরোপুরি ঠিকভাবে সম্মান বা মূল্যায়ন করতে পারেননি। সেটি সংশ্লিষ্ট দায়িত্বপ্রাপ্তের ব্যর্থতা। কিন্তু এ কারণে সবাই ব্যর্থ হয়েছে বা আমলারা ক্ষমতা নিয়ে নিয়েছে এসব কথাবার্তা পুরোপুরি অবান্তর এবং প্রশ্নবোধক।’

একটি সূত্র মনে করছে, জেলায় জেলায় সচিবদের দায়িত্ব দেওয়ার কারণে আন্ত:মন্ত্রণালয় বা আন্ত:বিভাগের মধ্যে একটি শক্তিশালী সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। কোন জেলায় কোন সমস্যা তৈরি হলে সংশ্লিষ্ট দায়িত্বপ্রাপ্ত সচিব তাৎক্ষণিক সেই মন্ত্রণালয়ের সচিবের নজরে এনেছেন বিষয়টি। এতে করে দ্রুত সমস্যার সমাধান হয়েছে। আন্ত: মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রমেও গতি এসেছে।

কালের আলো/ডিএসবি/এমএম