মো.শামসুল আলম খান/আল হেলাল তালুকদার, কালের আলো, ময়মনসিংহ থেকে
অন্ধকার তাড়িয়ে ছড়িয়েছেন আলোর দ্যুতি। দেশের আর জনগণের প্রশ্নে সাহস ও পরোয়াহীন মন-মনন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমানের। একই সঙ্গে স্থির এবং দুর্বার। সত্য-নিষ্ঠা, ধ্যান-জ্ঞান, মানবিক গুণ, ব্যক্তিত্ব আর দেশপ্রেমে মানুষের হৃদয়ের মণিকোঠায় করে নিয়েছেন ঠাঁই। দীর্ঘদিন এমন এক নেতার শূন্যতা ছিল। তিনি ধীসম্পন্ন, চিন্তাশীল ও পূর্ণতার রাজনীতিক। গণমানুষের মনের কথক। সহজ-সরল আর প্রাঞ্জল ভাষায় মিহি জোৎস্নার মতোই আলোকময় তাঁর প্রতিটি শব্দ-বাক্য উচ্চারণ। ঠিক যেন মাটি ও মমতার যোগনিমন্ত্রণ। জেল-জুলুমের শিকার হয়েছেন বারবার। কিন্তু দমে যাননি। তিমির হননের এই আলোকবর্তিকা এমন এক বাংলাদেশ চান যেখানে কোনো ধরনের জুলুম হবে না, শোষণ হবে না, নিপীড়ন হবে না। নতুন করে আর জন্ম হবে না ফ্যাসিবাদের। তাঁর নেতৃত্বেই পরিবর্তনের স্বপ্ন বুনছেন দেশের সাধারণ মানুষ।
দেশের গণমানুষের কল্যাণ-মঙ্গলের মসৃণ পথ রচনায় উদয়াস্ত পরিশ্রম করছেন আমীরে জামায়াত। ইসলামের বিজয় নিশান উড়াতে চষে বেড়াচ্ছেন দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্ত। তাঁর প্রত্যাশার পথ কণ্টকাকীর্ণ। কিন্তু হাল ছাড়তে চান না সহজেই। ঐক্যের বাংলাদেশ গড়ার শপথে হয়েছেন বলীয়ান। বাংলাদেশকে কাক্সিক্ষত গন্তব্যের সোনালি তোরণে পৌঁছে দিতে অদম্য ডা. শফিকুর রহমান আশ^স্ত করেছেন ময়মনসিংহবাসীকে। তিনি বলেছেন, ‘আল্লাহর মানবিক বিধান কায়েমে আমরা সকলে এক। আমাদের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। আমাদের আল্লাহ এক, নবী এক। আমাদের জীবন বিধান এক। তার ভিত্তিতেই ঐক্যের বাংলাদেশ গড়ব ইনশাআল্লাহ। এতে কোনো বাধা-বিপত্তি মানব না। কোনো বাধার মুখে থেমে যাব না।’
শুক্রবার (২৫ এপ্রিল) সকালে ময়মনসিংহের ঐতিহাসিক সার্কিট হাউজ মাঠে মহানগর ও জেলা জামায়াতের উদ্যোগে আয়োজিত বিশাল কর্মী সম্মেলন কার্যত রূপ নেয় লাখো মানুষের জনসমুদ্রে। দৃপ্তপদভারে এগিয়ে আসা জনস্রোতে দুর্দমনীয় স্পৃহা ও মানসিকতায় জাগরণের নয়া অধ্যায় রচনা করে নতুন এক অঙ্গীকারে সবাইকে একীভূত করলেন জামায়াতের আমীর ডা. শফিকুর রহমান। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা, দুর্নীতির বিষবাষ্পের অবসান আর ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠার প্রশ্নে উচ্চকণ্ঠ জামায়াতে ইসলামীর পঞ্চম নির্বাচিত এই আমীর নতুন পরিবর্তনের আকাক্সক্ষার সঙ্গে এগিয়ে যাওয়ার প্রত্যাশাকে প্রস্ফুটিত করেছেন। তারুণ্যের হাত ধরেই বিজয় এসেছে যুগে যুগে। বাংলাদেশেও স্বৈরতন্ত্রের ভিত্তিমূলকে উপড়ে ফেলেছে তারুণ্য।
স্বাধীন বাংলাদেশে জামায়াতের প্রথম প্রজন্মের এই প্রতিনিধি গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা দিয়েছেন তারুণ্যকে। বিনয়াবনত কণ্ঠেই তিনি বললেন, ‘তোমাদের কাছে আমাদের বিনয়ী অনুরোধ, বিশ্বের সকল পরিবর্তন সাধিত হয়েছে তরুণদের বাহুর উপর ভর করে। এমনকি জুলাই আন্দোলনও হয়েছে তাদের নেতৃত্বেই। তোমরা যে আশা-আকাক্সক্ষা ও স্বপ্ন নিয়ে লড়াই করেছে, সে লড়াই থেকে তোমরা বিশ্রাম নিও না, যতক্ষণ না তোমাদের দাবি পূরণ হয়। তোমরা কুরআনের বিধানকে বুকে ধারণ কর। আল্লাহর শক্তিতে বলিয়ান হয়ে অসত্যের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াও। তোমরা হবে আগামীর নেতা আর আমরা হব তোমাদের সহকর্মী। জাতির খেদমত করার জন্য তোমাদের সুযোগ করে দিতে চাই। এগিয়ে আসো সত্য ও ন্যায়ের দিকে, ইনসাফের দিকে। এগিয়ে আসো দল-মত-ধর্ম নির্বিশেষে সকল মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে। আল্লাহ আমাদের সেই তাওফীক দান করুন, আমীন।’
- কুরআন-সুন্নাহ বিরোধী এবং বিতর্কিত সুপারিশমালা বাতিলের অনুরোধ
- আমরা একটি বৈষম্যমুক্ত, দুর্নীতিমুক্ত ও মানবিক বাংলাদেশ চাই
- কোনো ব্যক্তি বা দলকে ক্ষমতায় বসানো আমাদের উদ্দেশ্য নয়
- ঘুষ-দুর্নীতি করবে না এমন মানুষ ঘরে ঘরে তৈরি করতে হবে
- আগামীর নির্বাচন পিআর পদ্ধতিতে করার দাবি
- সত্য ও ন্যায়ের পথে সংগঠিত থাকার বার্তা
এই বিশাল কর্মী সম্মেলনে সভাপতিত্ব করেন ময়মনসিংহ মহানগর জামায়াতের আমীর ও মর্যাদাপূর্ণ ময়মনসিংহ-৪-সদর আসনের দলীয় প্রার্থী কামরুল আহসান এমরুল। সঞ্চালনায় ছিলেন সেক্রেটারি শহীদুল্লাহ কায়সার। বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য এবং কেন্দ্রীয় প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের সেক্রেটারি অ্যাডভোকেট মতিউর রহমান আকন্দ এবং কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সেক্রেটারি ড. সামীউল হক ফারুকী। সম্মেলনে আরও বক্তব্য রাখেন মহানগর নায়েবে আমীর আসাদুজ্জামান সোহেল, জেলা নায়েবে আমীর অধ্যক্ষ কামরুল হাসান মিলন, কিশোরগঞ্জ জেলা আমীর অধ্যাপক রমজান আলী, নেত্রকোনা জেলা আমীর অধ্যাপক সাদেক আহমাদ হারিছ, জামালপুর জেলা আমীর অ্যাডভোকেট আবদুল আওয়াল, ইসলামী ছাত্রশিবিরের সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি হাফেজ রাশেদুল ইসলাম, মহানগর সাংগঠনিক সম্পাদক অধ্যাপক আল হেলাল তালুকদার, জেলা কর্মপরিষদ সদস্য মাওলানা বদরুল আলম, সনাতন ধর্মাবলম্বীদের নেতা উত্তম ভট্টাচার্য, মহানগর ছাত্রশিবিরের সভাপতি এমদাদুল ইসলাম, জুলাই আন্দোলনের শহীদ সাগরের বাবা আসাদুজ্জামান আসাদ, মাহিনের বাবা জামিল হোসেন সোহেলসহ স্থানীয় জামায়াত ও শিবিরের নেতারা।

আমরা একটি বৈষম্যমুক্ত, দুর্নীতিমুক্ত ও মানবিক বাংলাদেশ চাই
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমান নিজের বক্তব্যের শুরুতে ময়মনসিংহ জেলা ও মহানগরবাসীর সঙ্গে কুশল বিনিময় করেন। জানতে চান তাঁরা কেমন আছেন? এরপরই তিনি বলতে শুরু করেন, ‘আজকে বাংলাদেশ একটি অঙ্গীকারে আবদ্ধ। আমরা এমন একটি বাংলাদেশ চাই, যেই বাংলাদেশে কোনো ধরনের জুলুম হবে না, শোষণ হবে না, নিপীড়ন হবে না। নতুন কোনো ফ্যাসিবাদের জন্ম নিবে না। আমরা এমন একটি বাংলাদেশ চাই যেখানে মানুষে মানুষে কোনো বৈষম্য থাকবে না, যেখানে আমরা দুর্নীতিতে চ্যাম্পিয়ন হবো না, যেখানে দুর্নীতির দুর্গন্ধও থাকবে না। ঘুষের যাঁতাকলে পিষ্ঠ হয়ে কোনো নাগরিক নীরবে কাঁদবে না। বিচারের বাণী আর নিভৃতে কাঁদবে না। কোন কোন বিচারপ্রার্থীকে আমরা দেখেছি শেষ পর্যন্ত বিচার না পেয়ে আত্মহত্যা করে। সেই চিত্র আর আমরা বাংলাদেশে দেখবো না। এমন বাংলাদেশ চাই, যেখানে দল-ধর্মের অধিকারের ব্যাপারে কোনো ব্যবধান থাকবে না। দেশের প্রতিটি নাগরিকের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠিত হবে ইনশাআল্লাহ। আমরা একটি বৈষম্যমুক্ত, দুর্নীতিমুক্ত ও মানবিক বাংলাদেশ চাই।
বাংলাদেশকে আল্লাহর বিধান এবং সুন্নাহর ভিত্তিতে দেখতে চান উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আমাদের নবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সা. প্রতিষ্ঠিত মদিনার নগর রাষ্ট্রটি ছিল লিখিত সংবিধানের ভিত্তিতে দুনিয়ার প্রথম আধুনিক রাষ্ট্র। এর আগে দুনিয়ার কোনো রাষ্ট্রের লিখিত সংবিধান ছিল না। মদিনা কেন্দ্রিক নগররাষ্ট্র থেকেই দুনিয়ার প্রথম লিখিত সংবিধানের জন্ম। এখান থেকেই হিউম্যান চার্টার্ড তৈরি হয়েছে এবং এটাকে চ্যালেঞ্জ করার দুঃসাহস দুনিয়ার কোনো মতবাদের নেই। মদিনার এই সনদের মাধ্যমেই সকল মানুষের অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছিল।’
ডা.শফিকুর রহমান বলেন, ‘জাতির সাথে বেঈমানী করলে সে যেই ধর্মের লোকই হোক তাকে শাস্তি পেতেই হবে। বিশ্বাসঘাতকদের দুনিয়ার কোনো রাষ্ট্রই ক্ষমা করে না। কারণ এটা রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন। মূল সার্বভৌমত্বের মালিক আল্লাহ রাব্বুল আলামীন। তিনি পবিত্র কুরআনে বলেছেন, ‘হে নবী, আপনি দুনিয়ার মানুষকে জানিয়ে দিন, তিনিই (আল্লাহ) হচ্ছেন দুনিয়ার সকল বাদশাহর মালিক। আসমান-জমিনের একক কর্তৃত্ব একমাত্র তারই।’
কোনো ব্যক্তি বা দলকে ক্ষমতায় বসানো আমাদের উদ্দেশ্য নয়
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর বলেন, দীর্ঘ সাড়ে ১৫ বছর ক্ষমতায় থেকে তাঁরা ধরে নিয়েছিলেন এবং তাদের অহংকারে আমাদের মনে হয়েছিল তারা কিয়ামত পর্যন্ত ক্ষমতায় থাকবেন। তারা দেশের মজলুম মানুষকে নিয়ে উপহাস করতেন। তারা দেশপ্রেমিক লোকদের ফাঁসি দিয়ে হত্যা করে উল্লাস প্রকাশ করেছেন, মিষ্টি বিতরণ করেছেন। তবে তারা আল্লাহর সঠিক বিচার পেয়েছেন।’
তিনি বলেন, আমরা কোনো অন্যায়ের সাথে আপস করব না। আমাদের একমাত্র ভরসা আল্লাহর ওপর। সুতরাং আমরা ভয় করব একমাত্র আল্লাহকে। আমি বলতে চাই, কেউ যেন আমাদের দিকে চোখ তুলে না তাকায়। যুগে যুগে নবী-রাসূল আলাইহিস সাল্লামগণ এবং তাদের অনুসারীগণ অসত্যের বিরুদ্ধে আপসহীন লড়াই সংগ্রাম করে জীবন দিয়েছেন, তবু কারো কাছে মাথা নত করেননি। আপনারা ঐক্যবদ্ধ থাকুন। ঐক্যের শক্তিতেই বিজয় আসবে ইনশাআল্লাহ। কোনো ব্যক্তি বা দলকে ক্ষমতায় বসানো আমাদের উদ্দেশ্য নয়। মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠাই আমাদের লক্ষ্য।’
দেশের জনগণের মাধ্যমেই আগামীর বাংলাদেশ বিনির্মাণ করতে হবে আমীরে জামায়াত বলেন, ‘সোনার দেশ গড়তে হলে সোনার মানুষ চাই। এজন্য আল্লাহকে ভয় করতে হবে। আল্লাহর ভয়ে যে হৃদয় সিক্ত, সে কারো জীবন, সম্পদ, ইজ্জত ও সম্মানের ওপর হাত দিতে পারে না। বরং সে অন্যের পাহারাদার হয়ে যায়।’ তিনি বলেন, ‘সমাজের প্রভাবশালীদের জন্য বিচার এক ধরনের, আর সাধারণ মানুষের জন্য আরেক ধরনের; সেটি চলতে দেওয়া যাবে না, সেটি বর্তমানে অচল। প্রেসিডেন্ট-প্রধানমন্ত্রী অপরাধী হলে তারাও পার পাবেন না। ইসলামের বিরুদ্ধে অপপ্রচার করা হয় এরা ক্ষমতায় গেলে দেশ পঙ্গু হয়ে যাবে। কারণ দেশের দুর্নীতিবাজদের হাত কাটলে তো গোট দেশটাই একটা হাত কাটা দেশে পরিণত হবে।
আমরা বলি, প্রথমে তাদের সতর্ক করা হবে, তাদের সম্মান-মর্যাদার ব্যবস্থা করা হবে। তাদের বৈধ আয় রোজগারের ব্যবস্থা করে সুন্দরভাবে বাঁচার অধিকার নিশ্চিত করা হবে। তারপরও যদি চুরি-ডাকাতি করে, তখন তাদের শাস্তি দেওয়া হবে। পেটের দায়ে যারা চুরি করবে তাদের হাত কাটা হবে না। ইসলাম তাদের আয়ের ব্যবস্থা করে দিবে। যারা বাড়ি-গাড়ি, ব্যাংক-বীমা করার জন্য চুরি করবে তাদের প্রকাশ্যে হাত কাটার ব্যবস্থা করা হবে; যাতে গোটা দেশ এটা থেকে শিক্ষা নেয়। এরকম দুয়েকটি উদাহরণ নিশ্চিত করতে পারলে আশা করি চুরি বন্ধ হয়ে যাবে। এভাবে যিনার ব্যাপারেও উদাহরণ তৈরি করতে পারলে যৌন হয়রানিও বহুলাংশে বন্ধ হয়ে যাবে। মা বোনেরা নিরাপত্তা পাবেন। আল্লাহর বিধান কায়েম হলে দুর্নীতিবাজ ও সন্ত্রাসীরা নির্মূল হবে। যারা সৎ ও পরিচ্ছন্নভাবে জীবন নির্বাহ করবে তাদের জন্য স্বস্তিদায়ক হবে। তারা নিরাপত্তা পাবেন, মুক্ত পরিবেশ পাবেন। তাদের থাকবে না কোনো ভয়-ভীতি।’
ঘুষ-দুর্নীতি করবে না এমন মানুষ ঘরে ঘরে তৈরি করতে হবে
মানবিক বাংলাদেশ গড়তে হলে সমাজকে চাঁদাবাজ মুক্ত হতে হবে, দখলদার ও সন্ত্রাস মুক্ত হতে হবে বলে মনে করেন জামায়াতের আমীর। তিনি বলেন, ‘আল্লাহকে ভয় করে চলে এমন একদল লোক তৈরি করতে হবে; যারা মিথ্যা কথা বলবে না, যারা মানুষকে ধোঁকা দিবে না। প্রতারণা করবে না, কারো ইজ্জতে হাত দিবে না। ঘুষ-দুর্নীতি করবে না এমন মানুষ ঘরে ঘরে তৈরি করতে হবে। তবেই মানবিক বাংলাদেশ গড়া সম্ভব।’
প্রধান উপদেষ্টার প্রতি কুরআন-সুন্নাহ বিরোধী এবং বিতর্কিত সুপারিশমালা বাতিলের অনুরোধ
অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড.মুহাম্মদ ইউনূসের প্রতি কুরআন-সুন্নাহ বিরোধী এবং বিতর্কিত সুপারিশমালা বাতিলের অনুরোধ জানান ডা. শফিকুর রহমান। তিনি অন্তর্বর্তী সরকার ও নারীবিষয়ক সংস্কার কমিশন প্রসঙ্গে বলেন, ‘আমরা এই সরকারের প্রতি আধা-আধি সন্তুষ্ট। এটা কোনো দলীয় সরকার নয়। তারা একমতের মানুষ নন। তাদের সকল কর্মকাণ্ড একমুখী হয় না। ফলে দেশবাসীকে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়তে হয়। কিছু দিন আগে নারীবিষয়ক সংস্কার কমিশন সরকারের নিকট সুপারিশমালা জমা দিয়েছে। তাদের সুপারিশমালায় কুরআন-সুন্নাহ বিরোধী বেশকিছু বিষয় রয়েছে। তারা সমাজকে যে জায়গায় নিয়ে যেতে চান, তা জাতির জন্য লজ্জাকর। তারা দেশকে এক সর্বনাশা পরিস্থিতির দিকে ঠেলে দিতে চায়, আমরা তা হতে দিবনা ইনশাআল্লাহ।
আমাদের এই অঞ্চলের মানুষের একটি নির্দিষ্ট কৃষ্টি-কালচার, তাহজিব-তামাদ্দুন এবং আচার-প্রথা রয়েছে, যা যুগ যুগ ধরে চলে আসছে। তার ব্যত্যয় ঘটতে দেওয়া হবে না। তাদের সমাজবিধ্বংসী সুপারিশমালা আমরা মানব না। মাননীয় প্রধান উপদেষ্টার উদ্দেশে বলতে চাই, আপনি দেশে ফিরে প্রথমেই কুরআন-সুন্নাহ বিরোধী এবং বিতর্কিত সুপারিশমালা বাতিল করুন। এই জাতীয় কমিশনে ঈদানদার মহিলাদের অন্তর্ভূক্ত করতে হবে, যারা কুরআন-হাদিসের পর্যাপ্ত জ্ঞান রাখেন।’
দ্রব্যমূল্য প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘দেশবাসী পবিত্র রমজান মাসটি সুন্দরভাবে কাটাতে পেরেছেন। কিন্তু আবার মনে হচ্ছে, দ্রব্যমূল্য অস্থিতিশীল হতে যাচ্ছে। সরকারের উচিত সে দিকে নজর দেওয়া। সমাজের শৃঙ্খলা বিনষ্টকারীদের পাকড়াও করুন। দ্রব্যমূল্যের সিন্ডিকেট ভেঙে দিন। গণহত্যা প্রসঙ্গে আমীরে জামায়াত বলেন, যারা গণহত্যা সংঘটিত করেছে তাদেরকে আইনের বাইরে রাখবেন না। তাদের বিচার নিশ্চিত করুন। তাদের বিচার দৃশ্যমান করুন। বিগত সাড়ে ১৫ বছরের জঞ্জাল দূর করতে পর্যাপ্ত সংস্কার করুন। কালো টাকা ও পেশিশক্তি থেকে বের হয়ে এসে সঠিক প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার জন্য সমানুপাতিক নির্বাচনের ব্যবস্থা করুন।’
আগামীর নির্বাচন পিআর পদ্ধতিতে করার দাবি
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন পিআর পদ্ধতিতে করার দাবি জানিয়ে জামায়াত আমীর বলেন, ‘শুনতে পাচ্ছি আগামীর সংসদ উচ্চ ও নিম্ন দুই কক্ষ বিশিষ্ট করার প্রস্তাব করা হচ্ছে। মূল কর্তৃত্ব থাকবে নিম্ন কক্ষের হাতে; যেটা গঠিত হবে বর্তমান নির্বাচন পদ্ধতিতে। আর উচ্চ কক্ষের নির্বাচন হবে পিআর পদ্ধতিতে। দেশবাসীর প্রশ্ন উচ্চ কক্ষ যদি পিআর সিস্টেমে হয় তবে নিম্ন কক্ষ নয় কেন? আমাদের স্পষ্ট বক্তব্য হল আগামীর নির্বাচন পিআর পদ্ধতিতে হতে হবে। দুনিয়ার ৬২টি দেশ পিআর সিস্টেমে নির্বাচন করে। সম্প্রতি ইউরোপ সফর করে এলাম। ইউরোপের ২৬টি দেশের মধ্যে ১৬টি দেশ পিআর সিস্টেমে নির্বাচন করে। তারা যদি এই সুফল যুগ যুগ ধরে পেয়ে থাকে এই সুফল থেকে জাতিকে বঞ্চিত করার আমরা কে? এই অধিকার জাতিকে জাতির হাতে তুলে দিতে হবে। এটি যারা মানবে না তারা হলো বিচার মানি তালগাছটা আমার। আমরা বলবো, বিচার মানুন, রায়ে তালগাছ যার তাঁর হাতে চলে যাবে। এই বিচারটি হতে হবে ন্যায় বিচার।’

দেখতে চান ইসির এসিড টেস্ট
বর্তমান নির্বাচন কমিশন (ইসি) সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘তাঁরা জাতিকে উদাহরণ সৃষ্টিকারী নির্বাচন উপহার দেওয়ার কথা বলছেন। আমার তাদের এসিড টেস্ট দেখতে চাই। আমরা তাদের উদ্দেশে বলতে চাই, স্থানীয় সরকার না থাকার কারণে জাতি নানা সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছে। তাই আগে স্থানীয় সরকার নির্বাচন দিন। স্থানীয় নির্বাচনের এসিড টেস্ট এর মাধ্যমে আপনাদের সক্ষমতা এবং সদিচ্ছা দেখতে চাই। আপনাদের কাজে সন্তুষ্ট হলে জনগণ আপনাদের সর্বতোভাবে সহযোগিতা করে যাবে। আর যদি তার ব্যত্যয় ঘটে তবে জনগণ আপনাদের হলুদ নয় লাল কার্ড দেখাবে। কোনো দল বা গোষ্ঠীকে বিশেষ কোনো সুবিধা দেওয়া হলে তা আমরা কিছুতেই মানব না। আমরা ১৮ কোটি মানুষকে সুবিধা দেওয়ার পক্ষে। ঘরে ঘরে ন্যায় ও সত্যের আওয়াজ পৌঁছে দিন।’
সত্য ও ন্যায়ের পথে সংগঠিত থাকার বার্তা
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমান ময়মনসিংহের কর্মী সম্মেলন থেকে দেশবাসীকে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিয়েছেন। জাতির উদ্দেশে তিনি বলেছেন, ‘নিজেদেরকে ঐক্যবদ্ধ রাখুন। ন্যায় ও সত্যের পথে সংগঠিত থাকুন। হয়তো অপরাধীদের দমন করার জন্য সরকারকে সহযোগিতা করতে আমাদেরও রাস্তায় নামতে হতে পারে। তার জন্য আপনারা তৈরি হোন এবং সতর্ক থাকুন। অতীতে যা চলেছে এখনো যদি তাই চলে তবে এত রক্ত এত জীবন গেল কেন? এত শহীদ এত আহত এত পঙ্গু তাদের কাছে আমরা কী জবাব দিব? জাতির কাছে কীভাবে মুখ দেখাব! তাই শহীদ ও আহতদের প্রতি সম্মান রেখে বাংলাদেশকে জঞ্জালমুক্ত, কলুষমুক্ত, ঘুষ-দুর্নীতিমুক্ত, দুঃশাসনমুক্ত করার জন্য আমরা আবারও জীবন দিতে প্রস্তুত আছি। অতীতের দুরাচার, স্বৈরাচার, দুর্নীতিবাজ লুটেরাদের থেকে শিক্ষা নিন।’
তিনি প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়ে বলেন, ‘দেশের ২৮ লক্ষ কোটি টাকা কারা চুরি করেছে? ফ্যাসিবাদ পালিয়ে গেছে। এখন আর কোনো ভয় নেই। তাই নির্ভয়ে বলুন এই টাকা আওয়মী লীগ ও তাদের দোসররা চুরি করেছে। তারা বিদেশে টাকা পাচার করেছে। আমরা সরকারকে বলছি পাচারকৃত সকল টাকা ফেরত আনা হোক। দুর্বৃত্তরা টাকা পয়সা চুরি করে বিদেশে পালিয়ে গেছে। তাই আমি ইউরোপ সফরে গিয়ে তাদেরকে বলেছি আমাদের টাকা ফেরত পেতে সহযোগিতা করুন এবং দুর্বৃত্তদের আমাদের হাতে তুলে দিন।’
কালের আলো/এমএসএএকে/এমএএএমকে

অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশের সময়: শুক্রবার, ২৫ এপ্রিল, ২০২৫ । ৩:১৩ অপরাহ্ণ