গ্রাফিতি যেন প্রতিবাদ-বিক্ষোভের বিশাল ক্যানভাস

অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশের সময়: মঙ্গলবার, ৫ আগস্ট, ২০২৫ । ১২:৩৬ পূর্বাহ্ণ

নিজস্ব প্রতিবেদক, কালের আলো:

দেয়ালের ক্যানভাস জুড়ে নবজাগরণের গ্রাফিতি। জুলাই গণঅভ্যুত্থান উত্তর সময়ে দেশজুড়ে লাখো শিক্ষার্থীদের আঁকা এসব গ্রাফিতির ভাষা ছিল এক এবং অভিন্ন। শহিদ আবু সাঈদের চির উন্নত মম শির, কারবালা প্রান্তরে মুগ্ধর ছুটে চলা, আর আছে কাজী নজরুলের দ্রোহের আগুন। জুলাই অভ্যুত্থানে প্রতিবাদের অন্যতম ভাষা ছিল গ্রাফিতি। দেয়ালগুলো পরিণত হয় প্রতিবাদ-বিক্ষোভের বিশাল ক্যানভাসে।

ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে গত ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতন হয়। বিজয় উদ্যাপনে দেশজুড়ে গ্রাফিতি ও দেয়ালচিত্র আঁকেন শিক্ষার্থীরা। রংতুলির আঁচড়ে ফুটে ওঠে বিপ্লব, বিদ্রোহ ও বিজয়ের চিত্র। এর আগে জুলাই ও আগস্টের শুরুতেও চলে গ্রাফিতি আঁকা। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর প্রাথমিক ও মাধ্যমিকের পাঠ্যবইয়েও পরিবর্তন আনা হয়। বিনা মূল্যের এসব পাঠ্যবইয়ে যুক্ত করা হয় জুলাই অভ্যুত্থানের গ্রাফিতি বা দেয়ালে আঁকা ছবি।

২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে ঘটে যাওয়া গণঅভ্যুত্থান শুধু রাজনৈতিক বাস্তবতা বদলায়নি, জাগিয়ে তুলেছে এক সাংস্কৃতিক প্রতিরোধ। ২০২৫ সালে তার বর্ষপূর্তিতে ‘২৪-এর রঙে গ্রাফিতি ও চিত্রাঙ্কন’ শিরোনামে দেশের শত শত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা অংশ নেন দেয়ালচিত্র কর্মসূচিতে। শহর থেকে গ্রাম, সমতল থেকে পার্বত্যাঞ্চল দেয়াল হয়ে উঠেছে ইতিহাসের দলিল। দেয়ালজুড়ে আঁকা হচ্ছে আন্দোলনের দৃশ্য, শহীদের মুখচ্ছবি, ক্যালিগ্রাফি, প্রতীক, স্মৃতিচারণমূলক স্লোগান; যা একদিকে আবেগ ও আর্তি, অন্যদিকে ঐতিহাসিক দলিল। গ্রাফিতিতে উঠে এসেছে গণভবনে পতাকা উত্তোলন, শহীদদের শেষ মুহূর্ত, আন্দোলনের জনজোয়ার এবং অসংখ্য নাম না জানা তরুণ-তরুণীর আত্মত্যাগ।

গত বছরের বুধবার (১৬ অক্টোবর) প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস পরিদর্শনকালে আইন উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. আসিফ নজরুল, তৎকালীন তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা নাহিদ ইসলাম, যুব ও ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া এবং প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী (বর্তমানে তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা) মাহফুজ আলমকে সঙ্গে নিয়ে তিনি জুলাই ও আগস্ট মাসে ছাত্র নেতৃত্বাধীন গণ-অভ্যুত্থানের সময় তরুণ বিপ্লবীদের আঁকা বর্ণিল ও বিচিত্র গ্রাফিতি ঘুরে দেখেন। ওই সময় তিনি বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন চলাকালে ঢাকাসহ দেশের অন্যান্য শহর ও নগরের দেয়ালে তরুণ শিক্ষার্থীদের আঁকা সেরা গ্রাফিতি নিয়ে একটি আর্ট বুক প্রকাশের জন্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নির্দেশ দেন। সে অনুযায়ী ‘দি আর্ট অব ট্রায়াম্ফ’ নামের একটি আর্ট বুক প্রকাশ করা হয়।

বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন চলাকালে তরুণ চিত্রশিল্পীদের আঁকা-লেখায় ঢাকা সারা দুনিয়ার গ্রাফিতি রাজধানী হিসেবে পরিচিতি পায়। দেয়ালগুলো পরিণত হয় প্রতিবাদ-বিক্ষোভের বিশাল ক্যানভাসে। সরকারকে নানা শক্তিশালী বার্তা দিতে তাঁরা বিভিন্ন সৃজনশীল ও হৃদয়গ্রাহী স্লোগান ও কবিতা লিখেন। এসব বার্তা যেন বিপ্লবের চেতনা ও বৈষম্যহীন বাংলাদেশের আকাক্সক্ষার শিল্পিত প্রতিফলন। ছাত্ররা দেশবাসীর সমর্থন আদায়ে শিল্পকর্মের মাধ্যমে মুক্তির বার্তা পৌঁছে দিয়েছিলেন।

প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস বাংলাদেশে আসা বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিদলকে এই আর্ট বুক উপহার দিয়েছেন। পরে ঢাকায় রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় মার্কিন প্রতিনিধিদলের সঙ্গে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে তাদের হাতে এ উপহার তুলে দেন তিনি। এছাড়া সেপ্টেম্বরের শেষ সপ্তাহে জাতিসংঘের ৭৯তম সাধারণ অধিবেশনে যোগ দিতে নিউইয়র্ক সফরের সময়ও ড. মুহাম্মদ ইউনূস কানাডার প্রধানমন্ত্রীসহ বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানদের হাতে দি আর্ট অব ট্রায়াম্ফ নামের আর্ট বুকটির কপি তুলে দেন।

গত ১৫ সেপ্টেম্বর প্রধান উপদেষ্টা মার্কিন প্রতিনিধিদলের কাছে গ্রাফিতির ঐতিহাসিক তাৎপর্য তুলে ধরে বলেছিলেন, এসব গ্রাফিতিতে স্বৈরাচার শেখ হাসিনার পাশবিক শক্তিকে প্রতিহত করতে নৃশংস এক বাহিনীর মুখোমুখি আন্দোলন-বিক্ষোভে অংশ নেওয়া শিক্ষার্থী ও যুবকদের দাবিদাওয়া, আবেগ-অনুভূতি, আশা-আকাক্সক্ষা চিত্রিত হয়েছে।

কালের আলো/এইচএন/এমএএইচ

প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক: মো: শামসুল আলম খান | ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: এম. আব্দুল্লাহ আল মামুন খান | কপিরাইট © কালের আলো সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত

প্রিন্ট করুন