নৌবহরে যুক্ত হলো এলসিটি-১০১, সুষ্ঠু নির্বাচনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় প্রস্তুত নৌবাহিনী 

অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশের সময়: বৃহস্পতিবার, ১৫ জানুয়ারি, ২০২৬ । ৭:৩৯ অপরাহ্ণ

বিশেষ সংবাদদাতা, কালের আলো:

এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে দেশের ভবিষ্যৎ। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। এই নির্বাচন সফলভাবে সম্পন্ন করতে নির্বাচন কমিশনের (ইসি) পাশাপাশি গুরুদায়িত্ব রয়েছে দেশপ্রেমী সশস্ত্র বাহিনীরও। ভোটে ম্যাজেষ্ট্রেসি ক্ষমতা নিয়ে মাঠে থাকবে তাঁরা। বড় এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে নিজের দৃঢ় অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছেন নৌবাহিনী প্রধান এডমিরাল এম নাজমুল হাসান। নির্বাচন নিয়ে কোনো শঙ্কা নেই জানিয়ে নির্ধারিত সময়েই অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।

বৃহস্পতিবার (১৫ জানুয়ারি) দুপুরে খুলনা শিপইয়ার্ডে নির্মিত এলসিটি-১০১ এর লঞ্চিং অনুষ্ঠানে তিনি বলেছেন, ‘একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন সম্পন্ন করার জন্য সব ধরনের চ্যালেঞ্জ আমরা মোকবিলা করবো। সশস্ত্র বাহিনীর প্রতিটি সদস্য আন্তরিকতার সঙ্গে তাদের দায়িত্ব পালন করবে।’ নৌবাহিনী প্রধান জানান, ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচন উপলক্ষে দেশের ১৯টি উপকূলীয় জেলায় নৌ বাহিনীর পাঁচ হাজার সদস্য নিয়োজিত থাকবেন। নির্বাচন কেন্দ্র করে নিরাপত্তা জোরদার ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এই মোতায়েন কার্যক্রম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলেও মনে করেন তিনি।

নৌবাহিনী প্রধান বলেন, সরকার ও নির্বাচন কমিশনকে দেওয়া প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী নির্বাচন উপলক্ষে নৌবাহিনী সদস্যরা উপকূলীয় এলাকাগুলোতে দায়িত্ব পালন করবেন। বিশেষ করে খুলনা, চট্টগ্রাম ও দেশের দক্ষিণাঞ্চলের উপকূলীয় জেলাগুলোতে নৌবাহিনীর সদস্যদের সক্রিয় উপস্থিতি থাকবে।

আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটকে গণতান্ত্রিক রূপান্তরের জন্য একটি মাইলফলক হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। সুষ্ঠু এই নির্বাচনের মাধ্যমেই কেবল বাংলাদেশ তার ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে পারবে। তবে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে অবৈধ ও লুট হওয়া আগ্নেয়াস্ত্র নিরাপত্তার জন্য দীর্ঘস্থায়ী হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে মনে করছে মানবাধিকার সংগঠনগুলো। এসব লুট হওয়া আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধারে জোরালো অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। বৃহস্পতিবার (১৫ জানুয়ারি) দুপুরে খুলনা শিপইয়ার্ডে নির্মিত এলসিটি-১০১ এর লঞ্চিং অনুষ্ঠানে এ বিষয়ে গণমাধ্যমকর্মীদের পক্ষ থেকে জানতে চাওয়া হয় নৌবাহিনী প্রধানের কাছে। এ সময় নৌবাহিনী প্রধান দৃঢ়তার সঙ্গে বলেন, ‘অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের জন্য লুণ্ঠিত ও অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে সশস্ত্র বাহিনী যথাযথ ভূমিকা পালন করবে।’

বর্তমানে সশস্ত্র বাহিনীর মূল কর্মকাণ্ড নির্বাচনকেন্দ্রিক জানিয়ে তিনি আরও বলেন, ‘নির্বাচনকে ঘিরে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে অবৈধ অস্ত্রের বিষয়টি চিহ্নিত করা হয়েছে। তিনি জানান, নির্বাচনী প্রচার শুরুর আগেই অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে বিশেষ অভিযান পরিচালনা করা হবে। নির্বাচন কমিশনের নির্দেশনা অনুযায়ী নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই নৌবাহিনীর পূর্ণ ফোর্স মোতায়েন সম্পন্ন হবে এবং তখন থেকেই বিশেষ অভিযান শুরু হবে।

নিজস্ব প্রযুক্তিতে নির্মিত এলসিটি-১০১ যুক্ত নৌবহরে 

নৌবাহিনীর আধুনিকায়ন এবং নৌবহরের ত্রিমাত্রিক সক্ষমতা বৃদ্ধিতে নৌবাহিনীর তত্ত্বাবধানে পরিচালিত খুলনা শিপইয়ার্ড লিমিটেড ৩টি ল্যান্ডিং ক্রাফট ট্যাংক (এলসিটি) নির্মাণের উদ্যোগ গ্রহণ করে। এরই ধারাবাহিকতায় খুলনা শিপইয়ার্ড লিমিটেডে নির্মিত ল্যান্ডিং ক্রাফট ট্যাংক (এলসিটি)-১০১ এর লঞ্চিং অনুষ্ঠিত হয়েছে। এদিন খুলনায় আয়োজিত অনুষ্ঠানে নৌবাহিনী প্রধান এডমিরাল এম নাজমুল হাসান প্রধান অতিথি হিসেবে এলসিটির উদ্বোধন করেন। উপকূলীয় ও এফিবিয়াস অপারেশনের পাশাপাশি দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও মানবিক সহায়তায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে এলসিটি–১০১।

এটি একযোগে ৬টি ট্যাংক অথবা ১২টি এপিসি কিংবা ১৮টি সামরিক যান বহনে সক্ষম। উপকূলীয় ও দ্বীপাঞ্চলে সেনাবাহিনীর ট্যাংক, আর্টিলারি কামান, এপিসি ও অন্যান্য ভারী সরঞ্জাম দ্রুত ও নিরাপদে স্থানান্তরে এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে অনুষ্ঠানে জানান নৌবাহিনী প্রধান এডমিরাল এম নাজমুল হাসান।

রূপসা নদীর তীরে অবস্থিত খুলনা শিপইয়ার্ড লিমিটেড একটি আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন রাষ্ট্রায়ত্ত জাহাজ নির্মাণ প্রতিষ্ঠান। এটি নৌবাহিনীর তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হয়ে যুদ্ধজাহাজ ও বাণিজ্যিক জাহাজ নির্মাণে উল্লেখযোগ্য সক্ষমতা অর্জন করেছে। আইএসও নির্দেশনা অনুসরণ, আন্তর্জাতিক ক্লাসিফিকেশন সোসাইটির তত্ত্বাবধান, আধুনিক অবকাঠামো ও দক্ষ জনবলের মাধ্যমে খুলনা শিপইয়ার্ড এখন দেশের প্রতিরক্ষা শিল্পে একটি আস্থার নাম। নিজস্ব সক্ষমতায় এলসিটি নির্মাণের এই সাফল্য বাংলাদেশ নৌবাহিনীর অপারেশনাল শক্তি বৃদ্ধির পাশাপাশি দেশের জাহাজ নির্মাণ শিল্পের প্রযুক্তিগত উৎকর্ষের এক সুস্পষ্ট প্রমাণ বলেও মন্তব্য করেন এডমিরাল এম নাজমুল হাসান।

সামগ্রিক অর্থনৈতিক উন্নয়নে নিহম গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে 

দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক উন্নয়নে নেভি ইনস্টিটিউট অব হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট (নিহম) গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে বলে আশা প্রকাশ করেছেন নৌবাহিনী প্রধান এডমিরাল এম নাজমুল হাসান। বৃহস্পতিবার (১৫ জানুয়ারি) খুলনায় নেভি ইনস্টিটিউট অব হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট (নিহম)-এর উদ্বোধনকালে তিনি এ কথা বলেন।

জানা যায়, খুলনা শহর থেকে প্রায় ৮ কিলোমিটার দক্ষিণে খান জাহান আলী সেতুর (রূপসা সেতু) সন্নিকটে লবণচরা এলাকায় অবস্থিত বাংলাদেশ নৌবাহিনী প্রশিক্ষণ ঘাঁটি ‘স্কুল অব লজিস্টিক্স অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট’ প্রাঙ্গণে মনোরম পরিবেশে গড়ে উঠেছে আধুনিক মানের প্রশিক্ষণ কেন্দ্র নিহম। এটি নৌ কল্যাণ ফাউন্ডেশনের ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত একটি পেশাদার প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান যা অভিজ্ঞ ও অধুনিক প্রশিক্ষণ সুবিধার মাধ্যমে ন্যাশনাল স্কিল ডেভেলপমেন্ট অথোরিটি (এনএসডিএ) এর নীতিমালা ও মানদন্ড অনুসরণ পরিচালিত হবে।

নিহম এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে নৌবাহিনী প্রধান এডমিরাল এম নাজমুল হাসান বলেন, ‘হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট খাতে নারী ও পুরুষ প্রশিক্ষণার্থীদের দক্ষ মানবসম্পদ ও কর্মসংস্থানের উপযোগী হিসেবে তৈরি করা এবং একই সঙ্গে প্রশিক্ষণার্থীদের মধ্যে শৃঙ্খলা, কর্মদক্ষতা, নৈতিকতা ও দায়িত্ববোধ গড়ে তোলাই নিহম এর মূল লক্ষ্য। উন্নতমানের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পেশাদার জনশক্তি গড়ে তোলার পাশাপাশি দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক উন্নয়নে নিহম গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে।

সংশ্লিষ্টরা জানান, প্রতিষ্ঠানটিতে প্রাথমিকভাবে এনএসডিএ অনুমোদিত বেকারি ও পেস্ট্রি প্রোডাকশন, ফুড অ্যান্ড বেভারেজ প্রোডাকশন এবং ফুড অ্যান্ড বেভারেজ সার্ভিস ইত্যাদি বিষয়ে আধুনিক ও মানসম্মত তাত্ত্বিক ও ব্যবহারিক প্রশিক্ষণ প্রদান করা হবে। প্রশিক্ষণের উন্নত মান নিশ্চিত করতে দক্ষ প্রশিক্ষক ও শেফের পাশাপাশি আধুনিক অবকাঠামো, উন্নত ক্লাসরুম, সুসজ্জিত কিচেন, আবাসন ব্যবস্থাসহ প্রয়োজনীয় সকল সুবিধা বিদ্যমান রয়েছে। এছাড়াও, নারী ও পুরুষ প্রশিক্ষণার্থীদের জন্য শতভাগ আবাসন সুবিধাসহ পৃথক একটি স্থায়ী ক্যাম্পাস নির্মাণের কার্যক্রম চলমান রয়েছে।

প্রসঙ্গত, বাংলাদেশ নৌবাহিনীর তত্ত্বাবধানে পরিচালিত নিহম বর্তমানে এনএসডিএ অনুমোদিত তিনটি কোর্স নিয়ে কার্যক্রম শুরু করলেও ভবিষ্যতে কোর্স সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে। নৌবাহিনীর শৃঙ্খলা ও পেশাদারিত্বের সমন্বয়ে হসপিটালিটি ও ম্যানেজমেন্ট খাতে আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন দক্ষ জনবল তৈরির পাশাপাশি বিভিন্ন বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষরের মাধ্যমে প্রশিক্ষণার্থীদের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করতে প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম চলমান রয়েছে।

কালের আলো/এমএএএমকে

প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক: মো: শামসুল আলম খান | ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: এম. আব্দুল্লাহ আল মামুন খান | কপিরাইট © কালের আলো সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত

প্রিন্ট করুন