বিশেষ সংবাদদাতা, কালের আলো:
আর মাত্র ৯ দিন বাদেই ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এক যুগসন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে দেশ। উৎসবমুখর, সুষ্ঠু ও স্বচ্ছ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট অনুষ্ঠানে দৃঢ় অবস্থান নিয়েছেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড.মুহাম্মদ ইউনূস। তবুও রাজনৈতিক অস্থিরতায় জনমনে শঙ্কা, প্রশ্ন আছেই। রয়েছে ধ্বংস হয়ে যাওয়া নির্বাচনী ব্যবস্থার প্রতি জনগণের আস্থা অর্জনের চ্যালেঞ্জও। জয়-পরাজয় যাই হোক শান্তিপূর্ণ নির্বাচন প্রশ্নে সশস্ত্র বাহিনীর ভূমিকা মুখ্য। প্রধান উপদেষ্টাও বারবার তাদের প্রতি নিজের প্রত্যাশার কথা বলেছেন। একাধিকবার সেনা, নৌ ও বিমান বাহিনী প্রধানকে সঙ্গে নিয়ে বসেছেন। সংকটে তাদের ভূমিকার প্রশংসা করেছেন। ম্যাজিষ্ট্রেসি ক্ষমতায় এবার সশস্ত্র বাহিনীকে ভোটের মাঠে রেখেছে ড.ইউনূস সরকার।
সর্বশেষ সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে গত বুধবার (২১ জানুয়ারি) প্রধান উপদেষ্টার সভাপতিত্বে একটি উচ্চপর্যায়ের সভায় সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান সরকার প্রধানকে আশ্বস্ত করেছিলেন নির্বাচনের সময় জনমনে স্বস্তি নিশ্চিত করার। তিনি বলেছিলেন, ‘বাহিনীগুলো পারস্পরিক আলোচনার ভিত্তিতে নানা ধরনের পদক্ষেপ নিচ্ছে। যা সামনের দিনগুলোতে কার্যকর করা গেলে একটি শান্তিপূর্ণ নির্বাচন জাতিকে উপহার দেওয়া সম্ভব।’ শুধু কথার কথা বলেননি সেনাপ্রধান। অভ্যুত্থানের আগে-পরে সশস্ত্র বাহিনী দেশের শান্তি, নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার স্বার্থে দিন-রাত এক করে মাঠে থেকেছে। সরকারপ্রধানকে দেওয়া কথার সঙ্গে কাজের মিল রেখে নির্বাচনের আগ মুহুর্তেও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে ও নির্ভয়ে ভোটকেন্দ্রে যেতে ভোটারদের উৎসাহিত করতে প্রাণান্তকর প্রচেষ্টা গ্রহণ করেছেন সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান, নৌবাহিনী প্রধান এডমিরাল এম নাজমুল হাসান ও বিমান বাহিনী প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল হাসান মাহমুদ খাঁন।
গত বৃহস্পতিবার (২২ জানুয়ারি) থেকে দেশের বিভিন্ন এরিয়া পরিদর্শন শুরু করেন সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান। চট্টগ্রাম ও কুমিল্লা এরিয়া পরিদর্শনের পর ধারাবাহিকভাবে মঙ্গলবার (২৭ জানুয়ারি) রাজশাহী ও রংপুর এবং রবিবার (০১ ফেব্রুয়ারি) ময়মনসিংহে ঊর্ধ্বতন সামরিক কর্মকর্তা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং অসামরিক প্রশাসনের কর্মকর্তাদের সঙ্গে মতবিনিময় সভা করেছেন। নির্বাচনকে শান্তিপূর্ণ ও সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে আন্ত-প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয়, গোয়েন্দা তথ্যের আদান-প্রদান এবং সামগ্রিক নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনায় জোর দিয়েছেন। অভিন্ন বিষয়ে এবার একসঙ্গে গাজীপুর জেলা পরিদর্শন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তাদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় আলোচনা করেছেন তিন বাহিনী প্রধান। মঙ্গলবার (৩ ফেব্রুয়ারি) এই সভায় সেনা, নৌ ও বিমান বাহিনী প্রধান দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে শৃঙ্খলা ও নাগরিকবান্ধব আচরণ নিশ্চিত করতে নির্দেশনা দিয়েছেন।
সাধারণ মানুষ জানে ম্যাজিষ্ট্রেসি ক্ষমতায় ভোটে সশস্ত্র বাহিনীর উপস্থিতি মানেই অপরাধী-দুর্বৃত্ত পাততাড়ি গুটাতে বাধ্য। রাজনীতিতে এই দাবার চালে এখন পর্যন্ত দুর্দান্ত এক ইনিংস খেলেছে সরকার। টুঁটি চেপে ধরেছে কল্পকাহিনীর সিরিজ রটানো মহলবিশেষের। গত সোমবার (১৯ জানুয়ারি) সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে আইনশৃঙ্খলা সংক্রান্ত উপদেষ্টা পরিষদ কমিটির ২০তম সভায় স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী জানান, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৮ লাখ ৯৭ হাজার ১১৭ জন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হবে। এর মধ্যে রয়েছে সেনাবাহিনীর ১ লাখ, নৌবাহিনীর ৫ হাজার ও বিমান বাহিনীর ৩ হাজার ৭৩০ (স্থলভাগে ১ হাজার ২৫০) সদস্য।

গাজীপুর জেলা পরিদর্শন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তাদের সঙ্গে সেনা, নৌ ও বিমান বাহিনী প্রধানের একত্রিত মতবিনিময় আসন্ন নির্বাচন ও গণভোটকে সামনে রেখে বড় এক চমক হিসেবে দেখা যাচ্ছে। গত বছরের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের দিন তাঁরা একসঙ্গে জাতির সামনে এসেছিলেন। যেখানে জাতির উদ্দেশে ভাষণ দিয়েছিলেন সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান। সেদিন থেকে এখন পর্যন্ত বিভিন্ন অনুষ্ঠানে একসঙ্গে উপস্থিত হয়েছেন তিন বাহিনী প্রধান। নিজেদের মধ্যকার সুদৃঢ় ও ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক এবং টিমওয়ার্ক’র এক অভূতপূর্ব নজির দেখিয়েছেন। আসন্ন নির্বাচনের সঙ্গে জড়িয়ে আছে ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের গতিপ্রকৃতি। সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন উপহার দেওয়ার অঙ্গীকারও তাঁরা করেছেন অনেকবার। গাজীপুরে তিন বাহিনী প্রধান একই সভায় মিলিত হয়ে অঙ্গীকার পূরণে নিজেদের সদিচ্ছাকে দেশবাসীর সামনে মোটা দাগে তুলে এনেছেন।
সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান, নৌবাহিনী প্রধান এডমিরাল এম নাজমুল হাসান ও বিমান বাহিনী প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল হাসান মাহমুদ খাঁন এর মাধ্যমে একটি নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানে নিজ নিজ বাহিনীর সর্বোচ্চ আন্তরিকতাকে দেদীপ্যমান করেছেন। গণতন্ত্রের নতুন যাত্রায় দেশের স্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিতে নিয়ামক শক্তি হিসেবে অন্তর্বর্তী সরকার ও নির্বাচন কমিশনকে (ইসি) নিজেদের লক্ষ্যে পৌঁছতে সর্বাত্মক সহযোগিতার পরিস্কার নমুনা স্থাপন করেছেন। বাস্তবিক অর্থেই ঐক্যবদ্ধ, শৃঙ্খলাবদ্ধ ও ভাতৃত্ববোধে দৃঢ় সশস্ত্র বাহিনীর পক্ষেই শুধুমাত্র এই কঠিনকে বাস্তবে রূপান্তরিত করা সম্ভব। সম্মিলিত ও যুথবদ্ধ প্রয়াস কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জনে পথচলাকে করবে মসৃণ।
গাজীপুর জেলা পরিদর্শন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তাদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় নির্বাচন নিয়ে স্পষ্ট বার্তা দিয়ে সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান বলেছেন, ‘জাতীয় নির্বাচন নিয়ে সরকার, নির্বাচন কমিশন, পুলিশ ও সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনীসহ সবাই আগ্রহী। সেখানে নির্বাচন না হওয়ার কোনো সুযোগ নেই।’ তিনি বলেন, ‘সুন্দর নির্বাচন করার জন্য আমরা সক্ষম। নির্বাচন নিয়ে সবাই আগ্রহী। নির্বাচন নিয়ে সরকার, নির্বাচন কমিশন, পুলিশ ও সেনা, নৌ ও বিমান বাহিনীসহ সবাই আগ্রহী। সেখানে নির্বাচন না হওয়ার কোনো সুযোগ নেই।’

জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান আরও বলেন, নির্বাচনকে প্রভাবিত করার জন্য বিকাশের মাধ্যমে কিছু মানি ট্রানজেকশন হতে পারে। আমরা নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে কথা বলেছি। কিছু ক্রিমিনাল (অপরাধী) থাকতে পারে। সবাই এ ধরনের অপকর্ম করবে না। তিনি বলেন, ‘নির্বাচনের দিন যারা র্যাগিং এবং ভোটারদের ভোটকেন্দ্রে যেতে বাধা দেবে তাদের বিরুদ্ধে সেনাবাহিনী অ্যাকশন নেবে। অপরাধ করলে যতটুকু আইনে রয়েছে ততটুকু শাস্তি পাবে।’
সভায় নৌবাহিনী প্রধান এডমিরাল এম নাজমুল হাসান বলেছেন, ‘দিনে-রাতে বিভিন্ন সময় অপারেশনের মাধ্যমে দুষ্কৃতকারীদের আটক করা হচ্ছে। সবসময় যেন তারা ভয় ও আশঙ্কার মধ্যে থাকে সেই পরিবেশ অব্যাহত রাখতে হবে। আমাদের সবার উদ্দেশ্য একটাই—সুষ্ঠু, সুন্দর এবং নিরপেক্ষ নির্বাচন।’ সুষ্ঠু নির্বাচনি পরিবেশ নিশ্চিতের কথা জানিয়ে বিমানবাহিনী প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল হাসান মাহমুদ খাঁন বলেন, ‘সুষ্ঠু নির্বাচনের পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে আমাদের। সে উদ্দেশে সাধারণ ভোটারদের মনে আস্থা জোগাতে হবে। যারা মাঠে মোতায়েন থাকবেন তাদের সবার দৃশ্যমান উপস্থিতি বাড়াতে হবে, কাউকে বসে থাকা যাবে না।’
আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) বিজ্ঞপ্তিতে জানায়, পরিদর্শনকালে সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনী প্রধান বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের সম্মেলন কক্ষে ঊর্ধ্বতন পর্যায়ের সামরিক কর্মকর্তা, ঢাকা বিভাগের গাজীপুর, নরসিংদী ও নারায়ণগঞ্জ জেলার বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও অসামরিক প্রশাসনের কর্মকর্তাদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন। এসময় আসন্ন জাতীয় নির্বাচন শান্তিপূর্ণ, নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করার লক্ষ্যে আন্তঃপ্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয় এবং সামগ্রিক নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন। এছাড়াও পরিদর্শনকালে তিন বাহিনীর প্রধান ‘ইন এইড টু দ্য সিভিল পাওয়ার’র আওতায় মোতায়েনরত সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের কার্যক্রম সরেজমিনে পর্যবেক্ষণ ও প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দেন।

এদিকে, জাতীয় সংসদ নির্বাচনে স্থানীয় বেসামরিক প্রশাসনকে সহায়তা করতে মঙ্গলবার (০৩ ফেব্রুয়ারি) থেকে সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যরা দেশের বিভিন্ন জায়গায় পৌঁছে গেছে বলে জানিয়েছেন সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের মহাপরিচালক (অপারেশন অ্যান্ড প্ল্যান) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আলী হাইদার সিদ্দিকী। তিনি বলেন, ‘নির্বাচন উপলক্ষে প্রতিটি জেলা ও উপজেলায় সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনীর সদস্যরা পৌঁছে গেছেন।’ মঙ্গলবার (৩ ফেব্রুয়ারি) সচিবালয়ে আইন-শৃঙ্খলা সংক্রান্ত কোর কমিটির বৈঠকে তিনি এ তথ্য জানান। সভায় সভাপতিত্ব করেন স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা জাহাঙ্গীর আলম। ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আলী হাইদার সিদ্দিকী বলেন, ‘নির্বাচন উপলক্ষে প্রতিটি জেলা ও উপজেলায় সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনীর সদস্যরা পৌঁছে গেছেন। আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে চলমান অভিযানে সেনাবাহিনী এখন পর্যন্ত ৭ হাজার ৭৩১টি অস্ত্র উদ্ধার করেছে।’ স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা জাহাঙ্গীর আলমও আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে কোনো ধরনের সমস্যা হবে না বলে তিনি আশ্বস্ত করেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, দিন-তারিখ ঘোষণার পর বর্তমান পরিস্থিতি আগের নির্বাচনের তুলনায় অনেক ভালো এবং আসন্ন নির্বাচন হবে গ্রহণযোগ্য ও উৎসবমুখর।’
কালের আলো/এমএএএমকে

অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশের সময়: বুধবার, ৪ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ । ১২:১২ পূর্বাহ্ণ