আজ পহেলা বৈশাখ

কালের আলো রিপোর্ট
প্রকাশের সময়: মঙ্গলবার, ১৪ এপ্রিল, ২০২৬ । ১২:১৯ পূর্বাহ্ণ

পহেলা বৈশাখ। বাংলা নববর্ষ। দিনটি বাংলা মায়ের প্রতিটি সন্তানকে এক সুতোয় বেঁধেছে। নানা ধর্মের, বর্ণের, বিশ্বাসের বাঙালি যেন এই বৃন্তে এক। তাই একে বলা হয়ে থাকে ‘বাঙালির সার্বজনীন উৎসবের দিন’। বাঙালি আমুদে জাতি। নিজের অস্তিত্বের জানান দেয় তারা প্রাণে প্রাণে, উৎসবে। তেমনি নিজেদের জানান দেয়ার এক সার্বজনীন উৎসব হলো নববর্ষ। চৈত্রের বিদায় আর বৈশাখের আগমন আমাদের জানান দেয় নতুন বছর শুরুর কথা। আজ নতুন ভোরে আলোকিত হোক নতুন বছর ১৪৩৩। নতুন বছরকে নতুন আশা-উদ্দীপনার মধ্যে আবাহন জানাবে বাংলার মানুষ। পঞ্জিকার পালাবদলে আজ মঙ্গলবার (১৪ এপ্রিল) পহেলা বৈশাখের দিন। মুঘল সম্রাট আকবরের আমলে যা ছিল খাজনা উপলক্ষ, তা এখন প্রাণের উৎসব। আবহমানকাল বাংলার গ্রামীণ জনপদে উদযাপিত হওয়া নববর্ষের আয়োজন এখন ছুঁয়েছে নগর জীবনে এবং নতুন মাত্রায়। সর্বত্র উদযাপিত হচ্ছে বাংলার উৎসব, উচ্চারিত হচ্ছে বাঙালিয়ানার জয়গান। এবারের নববর্ষের মূল প্রতিপাদ্য-‘নববর্ষের ঐকতান, গণতন্ত্রের পুনরুত্থান’। এই প্রতিপাদ্য নিয়ে এদিন ‘বৈশাখী শোভাযাত্রা’ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) চারুকলা অনুষদের সামনে থেকে সকাল ৯টায় বের করা হবে। উৎসবমুখর পরিবেশে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে বাংলা নববর্ষ উদযাপনের সার্বিক প্রস্তুতি এরই মধ্যেই সম্পন্ন হয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহ্য ও স্বকীয়তা অব্যাহত রেখে লোক-ঐতিহ্য ধারণ করে বড় পরিসরে এবং বৈচিত্র্যপূর্ণভাবে এবছরও শোভাযাত্রায় সর্বজনীন অংশগ্রহণের আয়োজন করা হয়েছে। বাংলা নববর্ষ উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান পৃথক পৃথক বাণীতে দেশবাসীসহ বাঙালিদের আন্তরিক শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানিয়েছেন। আজ সরকারি ছুটির দিন।

প্রতিবছর বাঙালির জীবনে বৈশাখ একটি অনন্য বার্তা নিয়ে আসে। বিগত জীবনের দীনতা, হীনতা ও জীর্ণতা ঝেড়ে ফেলে নতুন করে উদ্যমী হওয়ার আহ্বান জানায় বৈশাখ। দুঃখ-কষ্ট, বেদনাকে মুছে ফেলে নতুন করে বাঁচার নির্দেশনা দেয়। বৃক্ষের পাতা ঝড়ে পড়ার পরে সেখানে নতুন পাতার আগমন যেমন বৃক্ষকে সাজিয়ে তোলে, তেমনই বৈশাখ নতুন করে প্রাণ সঞ্চার করে মননে। নতুন বাংলা বছরের আজ প্রথম সকালে যে ‘বৈশাখী শোভাযাত্রা’ হতে যাচ্ছে, তাতে গণতান্ত্রিক উত্তরণসহ পাঁচটি বিষয়ে থাকছে ভিন্ন ভিন্ন মোটিফ। এ শিল্পকর্মের মধ্যে থাকছে—মোরগ, হাতি, পায়রা, দোতারা ও ঘোড়া। এর মধ্যে মোরগ দিয়ে গণতান্ত্রিক উত্তরণের কথা তুলে ধরা হয়েছে বলে জানিয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের ডিন আজহারুল ইসলাম শেখ। তিনি বলেন, ‘আজ যে নতুন ভোর, নতুন দেশ, নতুন গণতন্ত্রের সূর্য উদিত হয়েছে, তাকে শুভকামনা জানাতেই আমাদের প্রতীকী মোরগ। মোরগ যেমন আমাদেরকে প্রভাতে সূর্য উঠার আগে জাগিয়ে দিয়ে শুভ কামনা জানায়, আমরাও এ দেশে গণতন্ত্রের পুনরুত্থানকে শুভকামনা জানাই। আমরা চাই, এদেশে আমার ন্যায়বিচার ফিরে আসুক।’ চারুকলার সীমানাপ্রাচীরে আঁকা হয়েছে নকশি কাঁথার আলপনা; আর ভেতরে টানিয়ে রাখা হয়েছিল পাঁচটি পটচিত্র। এসব পটচিত্রে সুন্দরবনজীবীদের দেবী বনবিবি, বাংলা নববর্ষের প্রবর্তক মুঘল সম্রাট আকবর, বাংলাদেশের অভ্যুদয় ও স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন, লোকচিত্রকলা গাজীর পট এবং মঙ্গলকাব্য মনসামঙ্গলের অন্যতম চরিত্র বেহুলাকে তুলে ধরা হয়েছে। শান্তির প্রতীক হিসেবে পায়রা, দেশীয় সংস্কৃতির নিদর্শন হিসেবে নারায়ণগঞ্জের লোকশিল্প জাদুঘরের কাঠের হাতি এবং কিশোরগঞ্জের টেপা আকৃতির ঘোড়া তুলে ধরতে চায় চারুকলা অনুষদ।

এই শোভাযাত্রাটি সকাল ৯টায় চারুকলা অনুষদের ৩ নম্বর (উত্তর) গেট থেকে শুরু করে শাহবাগ থানার সামনে গিয়ে ইউ-টার্ন নেবে। সেখান থেকে রাজু ভাস্কর্য ও টিএসসি প্রাঙ্গণ ডান পাশে রেখে দোয়েল চত্বর হয়ে বাংলা একাডেমির সামনে দিয়ে পুনরায় চারুকলা অনুষদে এসে শোভাযাত্রা শেষ হবে। এখানে ৩৫ জন বাদ্যযন্ত্রশিল্পীর পরিবেশনায় জাতীয় সংগীত, এসো হে বৈশাখ এবং দেশাত্মবোধক সংগীত শোভাযাত্রার আবহকে আরও উদ্দীপনাময়, প্রাণবন্ত ও তাৎপর্যপূর্ণ করে তুলবে। শোভাযাত্রায় ২০০ জন শিক্ষার্থী বাংলাদেশের পতাকা বহন করবেন। পহেলা বৈশাখে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে কোনো ধরনের মুখোশ পরা এবং ব্যাগ বহন করা যাবে না। তবে চারুকলা অনুষদ প্রস্তুতকৃত মুখোশ হাতে নিয়ে প্রদর্শন করা যাবে। নববর্ষের শোভাযাত্রায় কোনো ধরনের ইংরেজি প্ল্যাকার্ড ব্যবহার করা যাবে না। এছাড়া বেলুন ও ফেস্টুন উড়ানো এবং আতশবাজি পোড়ানো যাবে না। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ভুভুজিলা বাঁশি বাজানো ও বিক্রি করা থেকে বিরত থাকার জন্যও জানানো হয়।

জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে পহেলা বৈশাখ আজ বাঙালির ঐক্যবদ্ধ হওয়ার সবচেয়ে বড় মঞ্চ। জীর্ণ পুরাতনকে ধুয়ে মুছে দিয়ে নতুনের আহ্বানে বাঙালি আজও গেয়ে ওঠে ‘এসো হে বৈশাখ, এসো এসো’। ইতিহাস ঘেঁটে দেখা যায়, মূলত ১৫৫৬ সালে কার্যকর হওয়া বাংলা সন প্রথম দিকে পরিচিত ছিল ফসলি সন নামে, পরে তা পরিচিত হয় বঙ্গাব্দ নামে। রাজস্ব আদায়ের সুবিধার জন্য সম্রাট আকবরের যুগে বৈশাখ থেকে প্রবর্তন হয়েছিল বাংলা সালের। বর্ষ শুরুর সেই দিনটিই এখন বাঙালির প্রাণের উৎসব। বাদশাহ আকবরের নবরত্ন সভার আমির ফতেহ উল্লাহ সিরাজি বাদশাহি খাজনা আদায়ের সুবিধার জন্য ফসলি সালের শুরু করেছিলেন হিজরি চান্দ্রবর্ষকে বাংলা সালের সঙ্গে সমন্বয় সাধন করেছিলেন ও পয়লা বৈশাখ থেকে বাংলা নববর্ষ গণনা শুরু করেছিলেন। আর বৈশাখ নামটি নেওয়া হয়েছিল নক্ষত্র ‘বিশাখা’র নাম থেকে। বিশাখা থেকে নাম হলো বৈশাখ। পয়লা বৈশাখের দিনে উৎসবের শুরুটাও সেই আকবর আমলেই। এ দিনে তিনি মিলিত হতেন প্রজাদের সঙ্গে। সবার শুভ কামনা করে চারদিকে বিতরণ করা হতো মিষ্টি। এরপর ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি আমলে বর্ষবরণ উৎসব চলে আসে জমিদারবাড়ির আঙিনায়। খাজনা আদায়ের মতো একটি রসহীন বিষয়ের সঙ্গে যুক্ত হয় গান বাজনা, মেলা আর হালখাতার অনুষ্ঠান। আজ আর খাজনা আদায় নেই। তবে ‘হালখাতা’ রয়েছে। দেশের ব্যবসায়ী মহলে ‘হালখাতা’ অনুষ্ঠান মানে নতুন অর্থবছরের হিসাব খোলা। নতুন বছরের প্রথম দিনটিতে নতুন একটি ‘লাল কভারের’ খাতায় হিসাব খুলে নতুন উদ্যমে শুরু করা হয় ব্যবসা। সেখানে অতীতের ভুল ভ্রান্তিগুলো পর্যালোচনা করা হয়। হালখাতা থেকে নেওয়া হয় নতুন পরিকল্পনা ও কর্মসূচি।

কালের আলো/এম/এএইচ

প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক: মো: শামসুল আলম খান | ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: এম. আব্দুল্লাহ আল মামুন খান | কপিরাইট © কালের আলো সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত

প্রিন্ট করুন