নববর্ষে নবরূপে আত্মশক্তিতে উজ্জীবিত দেশ

কালের আলো রিপোর্ট
প্রকাশের সময়: মঙ্গলবার, ১৪ এপ্রিল, ২০২৬ । ৬:১২ অপরাহ্ণ

মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতিতে অস্থির পুরো বিশ্ব। অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক টানাপোড়েনের ঢেউ বিশ্বজুড়ে। আশা-নিরাশার দোলাচলে দুলছে জীবন। এর মধ্যেই এসেছে বাঙালির প্রাণের উৎসব—পহেলা বৈশাখ। ১৪৩৩ বঙ্গাব্দের প্রথম দিন ছিল মঙ্গলবার (১৪ এপ্রিল)। এই দিনটিতে বাঙালি মেতেছিল প্রাণে প্রাণে। প্রতিবছরের ন্যায় এবারও নতুন শক্তি ও উদ্যোম এবং বাঙালি সংস্কৃতির চেতনা নিয়ে ফিরে এসে আরও উজ্জ্বল করে তুলেছে বাঙালির আত্মপরিচয়কে। হাজারো দুঃখ-কষ্ট ভুলে, হতাশা-গ্লানি মুছে নবরূপে আত্মশক্তিতে উজ্জীবিত সবাই। এদিন সূর্যোদয়ের সঙ্গে শুরু হয় নতুন বঙ্গাব্দের যাত্রা। ভোরের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গে রাজধানীর রমনার বটমূলে সম্মিলিত কণ্ঠে ‘জাগো আলোক-লগনে’ গান পরিবেশনের মধ্য দিয়ে শুরু হয় বর্ষবরণ অনুষ্ঠান। প্রায় দুই ঘণ্টার এ অনুষ্ঠানে গাওয়া হয় মোট ২২টি গান। ঢাকাসহ সারা দেশে বর্ণাঢ্য আয়োজনে উদযাপিত হয় দিনটি। ঢাকায় রমনা বটমূলে ছায়ানটের বৈশাখ আবাহন, চারুকলার বৈশাখী শোভাযাত্রা, মেলা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মধ্যে দিয়ে দিনটিকে বরণ করে নেওয়া হয়।

তীব্র গরমে জনজীবন কিছুটা অস্বস্তিকর হয়ে উঠলেও তাতে ভাটা পড়েনি মানুষের উদযাপনে। সকাল থেকেই রাজধানীর শাহবাগ, রমনা পার্ক, টিএসসি এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা এলাকা ঘিরে মানুষের উপচে পড়া ভিড় লক্ষ্য করা গেছে। পরিবার, বন্ধু কিংবা প্রিয়জনদের সঙ্গে ঘুরে বেড়ানো, ছবি তোলা আর পারস্পরিক শুভেচ্ছা বিনিময়ে মুখর হয়ে উঠে পুরো এলাকা। মঙ্গলবার (১৪ এপ্রিল) সকাল থেকে রাজধানীর শাহবাগ, রমনা, টিএসসি এলাকা ঘুরে দেখা যায়, বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মানুষের উপস্থিতিও বাড়তে থাকে। লাল-সাদা পোশাকে সেজে ওঠা তরুণ-তরুণীরা দল বেঁধে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। অনেকেই ঐতিহ্যবাহী নকশার পোশাকে সেজে ছবি তুলছেন, কেউবা সেলফিতে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন। চারুকলা ইনস্টিটিউটের আশপাশে গালে রঙতুলির আঁচড়ে ‘শুভ নববর্ষ’ লিখিয়ে নিতেও দেখা গেছে অনেককে।

বাড্ডার কালাচাঁদপুর এলাকা থেকে পরিবার নিয়ে নববর্ষ উদযাপনে আসা রাজিব হোসেন বলেন, স্ত্রী-সন্তান নিয়ে এসেছি। গরম একটু বেশি হলেও এই দিনের আনন্দটাই আলাদা। সবাই একসঙ্গে বের হতে পারছি, সেটাই বড় কথা। এদিকে শাহবাগ মোড় ঘেঁষে ফুলের দোকানগুলোতেও দেখা গেছে বাড়তি ভিড়। গোলাপ, গাঁদা ফুলের মালা, রজনীগন্ধাসহ বিভিন্ন ফুল কিনতে মানুষের আগ্রহ ছিল চোখে পড়ার মতো। তবে ক্রেতারাদের অভিযোগ, চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় দামও কিছুটা বেড়েছে। অন্যদিকে, প্রচণ্ড গরমে স্বস্তি পেতে পানির চাহিদাও বেড়েছে ব্যাপকভাবে। বিভিন্ন স্থানে বোতলজাত পানি ও ডাব বিক্রেতাদের সরব উপস্থিতি দেখা গেছে। ডাব বিক্রি হচ্ছে ১২০ থেকে ১৫০ টাকা দরে। আব্দুর রহমান নামের এক ডাব বিক্রেতা বলেন, গরমের কারণে ডাবের চাহিদা অনেক বেশি। সারাদিন ভালো বিক্রি হচ্ছে।

মঙ্গলবার (১৪ এপ্রিল) সকাল ৯টার দিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) চারুকলা থেকে বৈশাখী শোভাযাত্রা শুরু হয়। শোভাযাত্রায় নানা বয়সি মানুষের ঢল নামে। বিভিন্ন মোটিফে সাজানো হয়েছে বর্ষবরণের এই শোভাযাত্রা। শোভাযাত্রাকে কেন্দ্র করে চারুকলা এলাকা ও আশপাশের সড়কে নেওয়া হয় বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও স্বেচ্ছাসেবীরাও দায়িত্ব পালন করেন। এই বর্ণাঢ্য আয়োজনের মাঝেই রমনার বটমূলে ভিড় জমান সাধারণ মানুষ। তাদের কাছে এটি কেবল একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান নয়, বরং শেকড়ে ফিরে যাওয়ার এক আবেগঘন উপলক্ষ। সেখানে জীর্ণতা ঘুচিয়ে নতুনের আহ্বানে নববর্ষকে স্বাগত জানায় সব শ্রেণিপেশার মানুষ। বৈশাখি শোভাযাত্রায় অংশগ্রহণকারীদের কণ্ঠে ছিল বাউলদের প্রতি হামলার প্রতিবাদ। আশা এক সাংস্কৃতিক বাংলাদেশ বিনির্মাণের। শোভাযাত্রায় অংশ নেওয়া বিদেশি অতিথিরা জানান, এ আয়োজন শুধু একটি উৎসব নয়, বরং এটি বাঙালির অসাম্প্রদায়িক চেতনা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের এক অনন্য প্রকাশ। তারা আশা প্রকাশ করেন, ভবিষ্যতেও এই উৎসব বিশ্বব্যাপী আরও বেশি মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ থেকে শুরু হওয়া এই শোভাযাত্রা রাজধানীর শাহবাগ, টিএসসি, দোয়েল চত্বরসহ গুরুত্বপূর্ণ সড়ক প্রদক্ষিণ করে উৎসবমুখর পরিবেশ তৈরি করে। দেশি-বিদেশি মানুষের অংশগ্রহণে পুরো এলাকা পরিণত হয় এক মিলনমেলায়। এদিন সকাল ৯টায় শুরু হওয়া শোভাযাত্রাটি চারুকলা অনুষদ থেকে শাহবাগ, দোয়েল চত্বর ও বেগম রোকেয়া হল এলাকা ঘুরে আবার চারুকলা অনুষদের সামনে এসে শেষ হয়। এতে অংশ নেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম, উপ-উপাচার্য সায়মা হক বিদিশা, উপ-উপাচার্য ড. আব্দুস সালাম, বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ছিদ্দিকুর রহমান খান, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য লুৎফর রহমানসহ বিভিন্ন অনুষদের ডিন, শিক্ষক, শিক্ষার্থী, বিভিন্ন দেশের কূটনৈতিক প্রতিনিধি এবং নগরবাসী।

ইউনেস্কো স্বীকৃত এই সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যে অংশ নিতে সকাল থেকেই চারুকলা এলাকায় ভিড় করেন বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। অনেককে দেখা যায় সাদা-লাল রঙের ঐতিহ্যবাহী পোশাকে সজ্জিত হয়ে শোভাযাত্রায় অংশ নিতে। শোভাযাত্রার শুরুতে ছিল মহানগর পুলিশের ১০টি ঘোড়সওয়ার দল। তাদের পেছনে জাতীয় পতাকা বহন করে প্রায় ২০০ শিক্ষার্থীর একটি দল অংশ নেয়। এরপর মূল ব্যানারসহ বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন হলের প্রাধ্যক্ষ, বিভাগীয় চেয়ারম্যান, শিক্ষক, জাতীয়তাবাদী সাংস্কৃতিক সংসদ, কবিতা পরিষদ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মকর্তারা শোভাযাত্রায় অংশগ্রহণ করেন। শোভাযাত্রার আকর্ষণ হিসেবে ছিল পাঁচটি বড় মোটিফ-মোরগ, বেহালা, শান্তির পায়রা, হাতি ও ঘোড়া। এছাড়া প্রায় ৪০ জন শিল্পীর বাদ্যযন্ত্র পরিবেশনা এবং প্রায় ১৫০ ফুট দীর্ঘ পটচিত্রের স্ক্রল পেইন্টিং শোভাযাত্রায় বিশেষ মাত্রা যোগ করে। এতে অংশ নেয় দেশের ১০টি ভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর প্রতিনিধিরাও, যা আয়োজনটিকে বহুসাংস্কৃতিক ঐক্যের প্রতীক হিসেবে তুলে ধরে। শোভাযাত্রায় অংশ নিতে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে আগত হাজারো মানুষ চারুকলা এলাকায় সমবেত হন। শিক্ষার্থী, শিক্ষক, শিল্পী, সাংস্কৃতিক কর্মী ও বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর প্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে পুরো আয়োজন প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে। অংশগ্রহণকারীদের হাতে ছিল রঙিন মুখোশ, প্রতীকী মোটিফ, গ্রামীণ ঐতিহ্যের নানা উপস্থাপন এবং বাঙালির লোকজ সংস্কৃতির অনুষঙ্গ। এবারের শোভাযাত্রায় গ্রামীণ জীবন, প্রকৃতি, বৈচিত্র্যময় জাতিসত্তা এবং সম্প্রীতির বার্তা বিভিন্ন শিল্পকর্ম ও প্রতীকের মাধ্যমে তুলে ধরা হয়। বিশেষ করে পাহাড়ি ও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ আয়োজনটিকে দিয়েছে নতুন মাত্রা।

এদিকে, জমজমাট আয়োজন ও বর্ণাঢ্য সাংস্কৃতিক পরিবেশনার মধ্য দিয়ে জাতীয় প্রেসক্লাবে ‘বাংলা নববর্ষ ১৪৩৩’ উদ্যাপন করা হয়েছে। এদিন সকাল থেকে দিনভর এ আয়োজনে অংশ নেন প্রেসক্লাবের সদস্য ও তাঁদের পরিবারের সদস্যরা। সকাল ৮টায় প্রেসক্লাবের সদস্য ও তাঁদের পরিবারের জন্য খই, মুড়ি-মুড়কি, পায়েস, বাতাসা, খিচুড়ি ও পান্তা-ইলিশসহ ঐতিহ্যবাহী খাবারের আয়োজন করা হয়। পরে মধ্যাহ্নভোজেও দেশীয় নানা বিশেষ খাবার পরিবেশন করা হয়। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের সূচনা হয় প্রেসক্লাব সদস্যদের সন্তানদের পরিবেশনায় ‘এসো হে বৈশাখ এসো’ গান দিয়ে। তারপর একের পর এক বাউল, ভাওয়াইয়া ও দেশীয় গান পরিবেশন করে দর্শকদের মুগ্ধ করেন শিল্পীরা। অনুষ্ঠানে বাউলগান পরিবেশন করেন পুতুল বাউল, উপমা বাউল, উল্কা হোসেন, ইমু বাউল ও শামিম বাউল। এ ছাড়া শিল্পকলা একাডেমির শিল্পী সোহানুর রহমান, আবিদা রহমান ও মোহনা দাস সংগীত পরিবেশন করেন। অনুষ্ঠানের বিশেষ আকর্ষণ ছিল ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ঐতিহ্যবাহী পুতুলনাচ।

বর্ষবরণ উৎসবে প্রধান অতিথি ছিলেন তথ্যমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন। তিনি বলেন, সংস্কৃতির বহুত্ববাদ না বুঝে কেউ কেউ নববর্ষের গায়ে নানা মতের মুখোশ পরাতে চায়। বাংলা নববর্ষের ইতিহাস তুলে ধরে তথ্যমন্ত্রী বলেন, মোগল আমলে যখন বাংলা সনের প্রবর্তন করা হয়, তখন তাঁরা হিজরি সাল থেকে সংখ্যা গ্রহণ করেন। এর সারবস্তু হিসেবে কৃষকের ফসল ও হালখাতার সংস্কৃতিকে গ্রহণ করেন। এর মধ্যেই বাংলাদেশি সংস্কৃতি নিহিত রয়েছে। তথ্যমন্ত্রী আরও বলেন, বাংলা নববর্ষ উদ্যাপনের মধ্য দিয়ে ধর্ম-বর্ণনির্বিশেষে মানুষের মিলন ঘটে। এই উৎসব জাতীয় ঐক্যের এক অনন্য রূপ। দেশকে যেমন নিজের পায়ে দাঁড় করাতে হবে, তেমনি দেশীয় সংস্কৃতিকে তুলে ধরতে হবে। সকাল ৯টায় প্রেসক্লাবের সভাপতি হাসান হাফিজের সভাপতিত্বে আয়োজিত অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন প্রেসক্লাবের বিশেষ অনুষ্ঠান ও আপ্যায়ন উপকমিটির আহ্বায়ক কাদের গণি চৌধুরী। অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন সাধারণ সম্পাদক আইয়ুব ভূঁইয়া ও সাবেক সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আবদাল আহমদ। ব্যবস্থাপনা কমিটির সদস্য ও সাংস্কৃতিক উপকমিটির আহ্বায়ক কাজী রওনাক হোসেন অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন। এ ছাড়া প্রেসক্লাবের কোষাধ্যক্ষ বখতিয়ার রাণা, ব্যবস্থাপনা কমিটির সদস্য শাহনাজ বেগম, মোহাম্মদ মোমিন হোসেন, মাসুমুর রহমান খলিলী, এ কে এম মহসীন, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি শহিদুল ইসলাম, সাধারণ সম্পাদক খুরশীদ আলমসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমের সম্পাদক, সাংবাদিক ও তাঁদের পরিবারের সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।

কালের আলো/এম/এএইচ

প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক: মো: শামসুল আলম খান | ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: এম. আব্দুল্লাহ আল মামুন খান | কপিরাইট © কালের আলো সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত

প্রিন্ট করুন