তাৎপর্যপূর্ণ বক্তব্যে জ্বালানি নিরাপত্তার সক্ষমতায় জোর সেনাপ্রধানের

কালের আলো রিপোর্ট
প্রকাশের সময়: বৃহস্পতিবার, ২৩ এপ্রিল, ২০২৬ । ৩:১০ অপরাহ্ণ

মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরুর পর জ্বালানি তেলের সংকটে ত্রাহি অবস্থা। যদিও দেশে জ্বালানি তেলের কোনো সংকট নেই বলে সরকারের পক্ষ থেকে বারবার বলা হচ্ছে। দেশে ইতিহাসের সর্বোচ্চ জ্বালানি মজুদের কথা জানিয়েছে সরকার। বিকল্প উৎস থেকে পরিশোধিত ও অপরিশোধিত জ্বালানি আমদানির চেষ্টা করছে। যদিও পেট্রোল পাম্পগুলোতে যানবহনের দীর্ঘ সারি। চাহিদা অনুযায়ী তেল পাচ্ছে না বলে অভিযোগ গ্রাহকদের। এমন অবস্থায় দেশে জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে মোটা দাগে প্রশ্ন উঠেছে। সামনে এসেছে দেশে নতুন তেল পরিশোধনাগার স্থাপনের প্রয়োজনীয়তা। চট্টগ্রামের পতেঙ্গায় ১৯৬৮ সালের ৭ মে উৎপাদন শুরু করা ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেডের বার্ষিক শোধনক্ষমতা ১৫ লাখ টন। এটিই সম্বল বাংলাদেশের। চাহিদার ৬৫ থেকে ৭০ লাখ টন আমদানি করতে হয় বিদেশ থেকে। লাখ লাখ ডলার গুনতে হয় সরকারকে।

জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ এই ইস্যুটি নিয়ে কথা বলেছেন বাংলাদেশ সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান। ৬১ বছরের পুরনো ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেডই দেশের একমাত্র ভরসা। আবার একমাত্র তেল পরিশোধনাগারের নানাবিধ সীমাবদ্ধতার বিষয়টি উঠে এসেছে সেনাপ্রধানের বক্তব্যে। বৃহস্পতিবার (২৩ এপ্রিল) ন্যাশনাল ডিফেন্স কলেজে (এনডিসি) ক্যাপস্টোন কোর্সের সমাপনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান স্বাধীনতার ৫৪-৫৫ বছর পার হলেও দেশে দ্বিতীয় কোনো জ্বালানি তেল শোধনাগার (রিফাইনারি) গড়ে না ওঠায় আক্ষেপ প্রকাশ করেছেন। ইরানের সঙ্গে ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রে যুদ্ধে সৃষ্ট সঙ্কট সমাধানে জ্বালানি ও প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়ানোর তাগিদ দিয়ে বলেছেন, ‘জ্বালানি সক্ষমতা যে কতোটা গুরুত্বপূর্ণ তা বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে স্পষ্ট। নিজস্ব শোধনাগার না থাকায় অপরিশোধিত তেল থাকা সত্ত্বেও বিদেশ থেকে বেশি দামে পরিশোধিত জ্বালানি আমদানি করতে হচ্ছে, যার ফলে জ্বালানি খরচ বাড়ছে।’

জ্বালানি সংকট নিয়ে সেনাপ্রধান বলেন, ‘আমাদের দেশে একটি মাত্র রিফাইনারি (ইস্টার্ন রিফাইনারি) রয়েছে যা চাহিদার মাত্র ১০ থেকে ১৫ শতাংশ মেটাতে পারে। বাকি জ্বালানি আমাদের পরিশোধিত অবস্থায় আমদানি করতে হয়, যার ফলে খরচ অনেক বেশি পড়ে। তিনি বলেন, ‘ইস্টার্ন রিফাইনারির উন্নতি বা সম্প্রসারণ আমরা করতে পারিনি। ইরান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলকে ঘিরে বর্তমান যে উত্তেজনা, তা থেকে বোঝা যায় জ্বালানি সঙ্কট কীভাবে প্রতিটি মানুষের জীবনে প্রভাব ফেলে।’ সময়মতো প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও সক্ষমতা অর্জন করতে না পারাকে তিনি একটি বড় সীমাবদ্ধতা হিসেবে উল্লেখ করেন।

ন্যাশনাল ডিফেন্স কলেজে (এনডিসি) ক্যাপস্টোন কোর্সের সমাপনী অনুষ্ঠানে আরও বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে বক্তব্য রাখেন জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান। প্রতিরক্ষা বাহিনীর আধুনিকায়নে জোর দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ‘দেশের সমুদ্রপথ নিরাপদ রাখতে শক্তিশালী নৌবাহিনী এবং আকাশপথের সুরক্ষায় শক্তিশালী বিমানবাহিনী অপরিহার্য। পর্যাপ্ত এয়ারক্রাফট ও নৌযান ক্রয়ে গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, আমরা যুদ্ধ করার জন্য নয়, যুদ্ধ এড়ানোর সক্ষমতা অর্জনের জন্য প্রস্তুতি নিই। আর শক্তিশালী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ছাড়া কার্যকর পররাষ্ট্রনীতি বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয়।’

প্রতিষ্ঠানের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার বিষয়ে সেনাপ্রধান স্পষ্ট করে বলেন, ‘যে অর্গানাইজেশনে জবাবদিহিতা নেই, সেটি উন্নতি করবে না। আমরা চাই সামরিক বাহিনী কী করছে, তা দেশের মানুষ আরও বেশি জানুক। সাধারণ মানুষের জানার ও প্রশ্ন করার অধিকার আছে। রোহিঙ্গা ইস্যুসহ বিভিন্ন জাতীয় সমস্যার কথা উল্লেখ করে জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান তরুণ প্রজন্মকে আরও সচেতন ও দক্ষ হওয়ার আহবান জানান। তিনি সতর্ক করে বলেন, বর্তমান বিশ্বে যেকোনো ভুলের মূল্য অনেক বেশি। তাই নেতৃত্ব ও জাতীয় নিরাপত্তায় বেসামরিক-সামরিক সমন্বিত প্রচেষ্টার ওপর জোর দেন তিনি।

সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান এর এসব বিষয়ে বক্তব্যকে বেশ তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা। তাঁরা বলছেন, দেশে বছরে জ্বালানি তেলের চাহিদা প্রায় ৯০ লাখ টন। এর মধ্যে বিপিসি আমদানি করে ৬৫ থেকে ৭০ লাখ টন। এর বাইরে বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো নিজেদের প্রয়োজনে ফার্নেস অয়েল আমদানি করে। সম্প্রতি বেসরকারি পর্যায়ে জ্বালানি তেল আমদানি, পরিশোধন ও বিক্রির অনুমতি দিয়েছে সরকার। বিপিসি অপরিশোধিত তেল (ক্রুড অয়েল) আমদানি করে ১৫ লাখ টন। বাকিটুকু পরিশোধিত জ্বালানি তেল। সবচেয়ে বেশি আমদানি হয় ডিজেল, যা মোট সরবরাহের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ। তবে লাভ বেশি আসে অকটেন, পেট্রল আর জেট ফুয়েল বিক্রি করে। এখন সরকার যদি দ্রুত সময়ের মধ্যে পরিশোধিত জ্বালানি তেলের চাহিদা বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে রাষ্ট্রায়ত্ত তেল শোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেড দ্বিতীয় ইউনিট বাস্তবায়নের উদ্যোগ গ্রহণের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হলে লাখ লাখ ডলার বৈদেশিক মুদ্রার সাশ্রয় হবে। সেনাপ্রধানের এই বক্তব্যকে যারপরনাই আশার আলো হিসেবে দেখছেন জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা।

আন্ত:বাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) জানায়, মিরপুর সেনানিবাসের ন্যাশনাল ডিফেন্স কলেজে গত পাঁচ এপ্রিল শুরু হয় ক্যাপস্টোন কোর্স। তিন সপ্তাহব্যাপী এ কোর্সে অংশ নেন সংসদ সদস্য, জ্যেষ্ঠ সামরিক ও পুলিশ কর্মকর্তা, শিক্ষাবিদ, জ্যেষ্ঠ চিকিৎসক, সরকারি ও বেসরকারি সংস্থার উচ্চপদস্থ প্রতিনিধি, কুটনীতিকসহ ৪৫ জন।

কালের আলো/এম/এইচএন

প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক: মো: শামসুল আলম খান | ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: এম. আব্দুল্লাহ আল মামুন খান | কপিরাইট © কালের আলো সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত

প্রিন্ট করুন