প্রাণচাঞ্চল্য বেড়েছে সচিবালয় ও ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তন। দেশের সব জেলা প্রশাসক (ডিসি) ও বিভাগীয় কমিশনারদের নিয়ে আজ রোববার (৩ মে) থেকে শুরু হচ্ছে তিন দিনের সম্মেলন। এই সম্মেলনেই উঠে আসবে মাঠ পর্যায়ের নানা জটিলতা, অনিশ্চয়তা আর সম্ভাবনার কথা। এবারের সম্মেলনে মোট ৩৪টি কার্য অধিবেশন অনুষ্ঠিত হবে। মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনি শনিবার (২ মে) সচিবালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছেন, রোববার (০৩ মে) সকাল সাড়ে ১০টায় রাজধানীর আব্দুল গনি রোডে ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এই সম্মেলনের উদ্বোধন করবেন।
চার দিনের এই সম্মেলন চলবে আগামী ৬ মে পর্যন্ত। বিভাগীয় কমিশনার ও ডিসিরা সম্মেলনকালে রাষ্ট্রপতি, জাতীয় সংসদের স্পিকার, প্রধান বিচারপতি, প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও দুর্নীতি দমন কমিশনের কর্মকর্তাদের সঙ্গেও মতবিনিময় করবেন। গাজীপুরে অর্থনৈতিক অঞ্চল স্থাপন থেকে শুরু করে রংপুরে হাজার শয্যার হাসপাতাল, নোয়াখালীতে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, সিলেটের চা-বাগানে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়—স্বপ্ন আর বাস্তবের সমন্বয়ে নানা প্রস্তাব জমা পড়েছে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে। সম্মেলন উপলক্ষে আটজন বিভাগীয় কমিশনার ও ৬৪ জেলার ডিসিদের কাছ থেকে এক হাজার ৭২৯টি প্রস্তাব পেয়েছে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ। এর মধ্যে কার্যপত্রে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে ৪৯৮টি প্রস্তাব, এমন তথ্য জানিয়েছেন মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের অতিরিক্ত সচিব (জেলা ও মাঠ প্রশাসন অনুবিভাগ) হুমায়ুন কবির।
শনিবার (২ মে) সচিবালয়ে ‘জেলা প্রশাসক সম্মেলন-২০২৬’ নিয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনি বলেন, ‘নতুন সরকারের কাছে জনগণের যেসব প্রত্যাশা রয়েছে, ডিসি সম্মেলনে সেগুলো আলোচনার মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।’
মন্ত্রিপরিষদ সচিব জানান, প্রস্তাবগুলো বিশ্লেষণ করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সম্মেলন শেষে প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে এক জরুরি অধিবেশনে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা রয়েছে। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের অতিরিক্ত সচিব (জেলা ও মাঠ প্রশাসন অনুবিভাগ) হুমায়ুন কবির জানান, প্রাপ্ত প্রস্তাবগুলোতে জনসেবা বৃদ্ধি, স্বাস্থ্যসেবা বৃদ্ধি, জনদুর্ভোগ কমানো, রাস্তাঘাট ও ব্রিজ নির্মাণ, পর্যটনের বিকাশ, আইন কানুন বা বিধিমালা সংশোধন, জনস্বার্থ সংরক্ষণের বিষয়গুলো অগ্রাধিকার পেয়েছে। সবচেয়ে বেশি ৪৪টি প্রস্তাব স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ সংক্রান্ত।
এবারের সম্মেলনের বিশেষ দিক তুলে ধরে হুমায়ুন কবির বলেন, এবারের সম্মেলন ৩ থেকে ৬ মে চার দিনব্যাপী অনুষ্ঠিত হচ্ছে। গত সম্মেলন তিন দিনব্যাপী ছিল। সম্মেলন চলাকালে বিভাগীয় কমিশনার ও জেলা প্রশাসকরা রাষ্ট্রপতি, জাতীয় সংসদের স্পিকার ও প্রধান বিচারপতির সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ, নির্দেশনা গ্রহণ ও মতবিনিময় করবেন। এ ছাড়াও প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও কমিশনারদের সঙ্গে এবং দুর্নীতি দমন কমিশনের সঙ্গে কার্য-অধিবেশন রয়েছে। এবারের ডিসি সম্মেলনে সর্বমোট ৩৪টি অধিবেশন ও কার্য-অধিবেশন রয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, কার্য-অধিবেশন ৩০টি। এর মধ্যে একটি উদ্বোধন অনুষ্ঠান, রাষ্ট্রপতি, জাতীয় সংসদের স্পিকার ও বাংলাদেশের প্রধান বিচারপতির সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ, নির্দেশনা গ্রহণসহ অন্যান্য আনুষ্ঠানিকতা ২টি। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে মুক্ত আলোচনা এবং বাংলাদেশ অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের সঙ্গে সভা রয়েছে।
এবারের ডিসি সম্মেলনে একটি কার্যালয় (প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়), দুটি কমিশন (নির্বাচন কমিশন ও দুর্নীতি দমন কমিশন) এবং ৫৬টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগ অংশ নেবে বলেও জানিয়েছেন অতিরিক্ত সচিব। সোমবার (৪ মে) দ্বিতীয় দিন অর্থ মন্ত্রণালয়সহ বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগ-সম্পর্কিত আলোচনা হবে। এ ছাড়া এদিন জাতীয় সংসদ ভবনে জাতীয় সংসদের স্পিকারের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ ও মতবিনিময় সভায় অংশ নেবেন ডিসিরা। মঙ্গলবার (৫ মে) তৃতীয় দিন সশস্ত্র বাহিনী বিভাগ, বিদ্যুৎ বিভাগ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগসহ কয়েকটি মন্ত্রণালয় ও বিভাগ সম্পর্কে আলোচনা হবে। একই দিনে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট ভবনে প্রধান বিচারপতির সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করবেন ডিসিরা। এদিন নির্বাচন কমিশন-সংক্রান্ত বিষয়েও আলোচনার কথা রয়েছে। বুধবার (৬ মে) সম্মেলনের শেষ দিনে স্বরাষ্ট্র, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়সহ বেশ কয়েকটি মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত বিষয়ে আলোচনা হবে। এদিন রাতে রাজধানীর চীন-মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তাদের সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের সভা অনুষ্ঠিত হবে। সেখানে ডিসিসহ প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তারা প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে রাতের খাবার খাবেন। সরকারের নীতি-নির্ধারক এবং জেলা প্রশাসক ও বিভাগীয় কমিশনারদের মধ্যে সামনা-সামনি মতবিনিময় এবং প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দেওয়ার জন্য সাধারণত প্রতি বছর ডিসি সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। গত বছর অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে ১৬-১৮ ফেব্রুয়ারি তিন দিনব্যাপী ডিসি সম্মেলন হয়। কার্য-অধিবেশনগুলোতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, উপদেষ্টা, বিশেষ সহকারী, সিনিয়র সচিব, সচিব এবং আওতাধীন দফতর, অধিদফতর ও সংস্থার প্রধানরা উপস্থিত থাকবেন। গত (২০২৫ সালে) ডিসি সম্মেলনে স্বল্পমেয়াদি, মধ্যমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি মিলে মোট ৪০০টি সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় জানিয়ে হুমায়ুন কবির বলেন, সিদ্ধান্ত সামগ্রিক বাস্তবায়নের হার ৪৪ শতাংশ।
স্বাস্থ্য ও জনকল্যাণে প্রস্তাব
রংপুর বিভাগে এক হাজার শয্যা বিশিষ্ট সরকারি হাসপাতাল চালু করা। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নয়নে প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা গ্রহণ। ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রগুলোতে মিডওয়াইফারি পদ সৃজন ও পদায়ন। হাসপাতাল ও ক্লিনিকের বর্জ্যের বিজ্ঞানসম্মত পরিশোধনাগার নির্মাণ।
শিক্ষা ও সংস্কৃতি
সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোতে আইসিটি, হিন্দু ধর্ম ও গ্রন্থাগার বিজ্ঞানে সহকারী শিক্ষক নিয়োগ। দেশের সব দরিদ্র প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীর শিক্ষা সম্পূর্ণ অবৈতনিক ঘোষণা। সিলেটের সব চাুবাগানে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় স্থাপন ও বিদ্যমান বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় জাতীয়করণ। প্রতিটি জেলার শিল্পকলা একাডেমিতে কালচারাল আর্কাইভ স্থাপন।
অর্থনীতি ও শিল্পে
গাজীপুরে অর্থনৈতিক অঞ্চল স্থাপনের মাধ্যমে শিল্পকারখানা নির্দিষ্ট এলাকায় স্থানান্তর। দেশীয় বাইসাইকেল শিল্পকে প্রণোদনা দেওয়া। কৃষিপ্রধান জেলাগুলোতে স্থানীয় উদ্যোক্তাদের জন্য স্বল্প সুদে বড় আকারের ঋণ সুবিধা। কক্সবাজারে লবণ প্রসেসিং প্ল্যান্ট স্থাপন।
যোগাযোগ ও পরিকাঠামো
নোয়াখালীতে আন্তর্জাতিক মানের বিমানবন্দর স্থাপন। সিলেট ওসমানী বিমানবন্দর সড়কের লাক্কাতুরা থেকে বিমানবন্দর পর্যন্ত এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণ। ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক আট লেনে উন্নীতকরণ। পার্বত্য অঞ্চলে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ ও শতভাগ বিদ্যুতায়ন।
প্রশাসন ও ভূমিসংক্রান্ত প্রস্তাব
প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার মাধ্যমে জিপি, এডিশনাল জিপি ও এজিপি নিয়োগ। ভূমিসংক্রান্ত সব আইন একত্র করে একটি সংকলন প্রণয়ন। ‘ভূমি অপরাধ প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন, ২০২৩’ সংশোধন। জেলা কারাগারের হাসপাতালগুলোতে পর্যাপ্ত ডাক্তার ও জনবল নিয়োগ।
পরিবেশ ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা
প্রতিটি পৌরসভা ও ইউনিয়নে পরিকল্পিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কেন্দ্র ও ওয়াটারপ্লান্ট নির্মাণ। পার্বত্য এলাকায় ইটভাটা বন্ধে ইটের বিকল্প ‘ব্লক’ ব্যবহারে প্রকল্প প্রাক্কলন পরিবর্তন। ভরাট হয়ে যাওয়া খাসপুকুর খনন।
অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব
জেলা পর্যায়ে গুজব ও ফ্যাক্ট চেকিং সেন্টার স্থাপন। পর্যায়ক্রমে জেলা/উপজেলা পর্যায়ে প্রয়োজনীয় বিদেশি ভাষা শিক্ষাকেন্দ্র স্থাপন। রিক্রুটিং এজেন্সিগুলো ঢাকা থেকে জেলাভিত্তিক পুনর্বিন্যাস। মডেল মসজিদের ইমাম-মুয়াজ্জিনদের চাকরি স্থায়ীকরণ ও বেতন-ভাতা বৃদ্ধি। টিআর ও কাবিখা কর্মসূচির আওতায় খাদ্য সহায়তার পরিবর্তে নগদ অর্থ বরাদ্দ প্রদান। #
কালের আলো/এসআর/এএএন

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশের সময়: শনিবার, ২ মে, ২০২৬ । ৯:২৭ অপরাহ্ণ