‘দিদি’র দুর্গের পতন, বিজেপির কব্জায় পশ্চিমবঙ্গ

কালের আলো রিপোর্ট
প্রকাশের সময়: সোমবার, ৪ মে, ২০২৬ । ১১:৪৪ অপরাহ্ণ

অনেক চেষ্টার পরও ঠেকিয়ে রাখতে পারলেন না মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। পতন হলো তাঁর দুর্গের। বিধানসভার নির্বাচনে গেরুয়া-ঝড়ে তছনছ হয়ে গেল তৃণমূল কংগ্রেসের দেড় দশকের সাজানো বাগান। ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচনের ভোট গণনা ও ফল ঘোষণায় প্রত্যাশার চেয়েও বেশি চমক দেখিয়েছে ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি)। সোমবার (০৪ মে) আনন্দবাজার জানিয়েছে ২৯৩টি আসনের মধ্যে ২০৮টিতে জয় পেয়েছে বিজেপি। অন্যদিকে ক্ষমতাসীন মমতার তৃণমূল কংগ্রেস মাত্র ৭৯টি আসনে বিজয়ী হয়েছে। বাদ বাকী ৬টি আসন পেয়েছে অন্যান্যরা।

২৯৪ আসনের বিধানসভায় সরকার গঠনের জন্য কোনো দলের প্রয়োজন ১৪৮ আসনে জয়। এই নির্বাচনী ফলাফলের মধ্যে দিয়ে তৃণমূলের ‘দিদি’র শাসনের অবসান ঘটলো পশ্চিমবঙ্গে। কেন্দ্রে ক্ষমতাসীন নরেন্দ্র মোদির দল গড়তে যাচ্ছে সরকার। প্রথমবারের মতো পশ্চিমবঙ্গের ক্ষমতার মসনদে এলো বিজেপি। বিপুল জয়ের পর উচ্ছ্বাসে দেশটির প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে লিখেছেন, ‘পশ্চিমবঙ্গে পদ্ম ফুটেছে!’ তার কথায়, ২০২৬ সালের এই নির্বাচন চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে এবং এটি জনগণের শক্তি ও সুশাসনের জয়।

মোদি জানান, পশ্চিমবঙ্গের মানুষের এই অভূতপূর্ব রায় বিজেপির প্রতি আস্থা ও ভরসার প্রতিফলন। তিনি রাজ্যের প্রতিটি নাগরিককে প্রণাম জানিয়ে আশ্বাস দেন, মানুষের স্বপ্নপূরণে সর্বশক্তি নিয়োগ করবে তার সরকার। সমাজের সব স্তরের মানুষের সুযোগ ও মর্যাদা নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতিও দেন তিনি। অন্যদিকে, ভারতের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ পশ্চিমবঙ্গবাসীকে ‘কোটি কোটি প্রণাম’ জানিয়ে এই জয়কে ‘ভয়, তোষণ এবং অনুপ্রবেশকারীদের রক্ষকদের বিরুদ্ধে জোরালো জবাব’ বলে ব্যাখ্যা করেছেন। তার দাবি, এই ফল নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বের প্রতি মানুষের অটুট আস্থার প্রতিফলন।

আরও অবাক করা বিষয় নিজ ঘরের ভবানীপুরেই হেরেছেন তৃণমূলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। পাঁচ বছর আগে নন্দীগ্রামে শুভেন্দু অধিকারীর বিরুদ্ধে লড়তে গিয়ে প্রথম দফায় পরাজিত হয়েছিলেন। এবার মমতারই আসনে মমতার বিরুদ্ধে লড়াইয়ে নেমে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছিলেন বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু। এবারও বিজয়মাল্য পড়লেন ১৫ হাজার ১১৪ ভোট বেশি পেয়ে। পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির মুখ্যমন্ত্রী সম্ভবত শুভেন্দু অধিকারীই হচ্ছেন। ভারতীয় দৈনিক দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস এমন কথা জানিয়েছে। আলোচনায় রয়েছেন রাজ্য বিজেপির বর্তমান সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য। এ ছাড়া রাজ্য বিজেপির সাবেক সভাপতি দিলীপ ঘোষ ও সুকান্ত মজুমদারের নামও শোনা যাচ্ছে। সম্ভাব্য এই তালিকায় আরও আছেন সাবেক সাংবাদিক ও রাজ্যসভার সাবেক সাংসদ স্বপন দাশগুপ্ত।

  • তছনছ তৃণমূল কংগ্রেসের দেড় দশকের সাজানো বাগান
  • ২৯৩টি আসনের মধ্যে ২০৮টিতে জয় পেয়েছে বিজেপি
  • প্রথমবারের মতো পশ্চিমবঙ্গের ক্ষমতার মসনদে বিজেপি
  • নিজ ঘরের ভবানীপুরেই হেরেছেন মমতা
  • বিপুল জয়ের পর উচ্ছ্বাসে ভাসছেন নরেন্দ্র মোদি

এক দশক ধরে কেন্দ্রে ক্ষমতাসীন বিজেপি ২০২১ সালের নির্বাচনেই পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতায় যাওয়ার আশা করেছিল। সেবার পদ্ম না ফুটলেও, বিধানসভায় আসনসংখ্যা ৩ থেকে ৭৭-এ গিয়েছিল। এবার প্রত্যাশা ১৮৫টির বেশি আসনে জয়। সেই লক্ষ্য ছাড়িয়ে যাচ্ছে দলটি। এই ফলাফলে বিজেপি নেতৃত্বও দারুণভাবে বিস্মিত। অভাবনীয় এই জয়ের পেছনে তাঁরা পাঁচটি প্রধান কারণ চিহ্নিত করেছেন বলে দলের অভ্যন্তরীণ সূত্র জানাচ্ছে। এর মধ্যে নারী ভোটারদের ছিল ইতিবাচক প্রভাব। বিরোধী দলগুলো ‘নারীবিরোধী’Ñবিজেপির এমন প্রচার সাধারণ মানুষের মনে সাড়া ফেলেছে। দলের অভ্যন্তরীণ হিসাব অনুযায়ী, রাজ্যে বিজেপির পক্ষে নারী ভোট অন্তত ৫ শতাংশ বেড়েছে। বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যে নারী ও পুরুষ ভোটারের সংখ্যা প্রায় সমান।

বিজেপি সরকারি কর্মচারীদের ‘অধিকার হরণের’ অভিযোগ ঘিরে থাকা ক্ষোভকেও কাজে লাগিয়েছে। ক্ষমতায় আসার ৪৫ দিনের মধ্যে সপ্তম বেতন কমিশন কার্যকর এবং শূন্যপদ পূরণের প্রতিশ্রুতি সরকারি কর্মচারী ও চাকরিপ্রার্থীদের আকৃষ্ট করেছে। এটি প্রায় ২০ থেকে ৫০ লাখ ভোটারের ওপর প্রভাব ফেলেছে। উল্লেখ্য, অন্যান্য রাজ্যের তুলনায় পশ্চিমবঙ্গে সরকারি চাকরিজীবী ভোটারের সংখ্যা বেশি। ‘মোদি বনাম মমতা’ প্রচারই এবারের নির্বাচনে বাজিমাত করেছে। কেন্দ্রীয় প্রকল্প বাস্তবায়িত না হওয়া এবং পরিকাঠামোর অভাবকে হাতিয়ার করেছিল বিজেপি। রাজ্যে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির এক ডজনের বেশি জনসভার প্রতিশ্রুতি মধ্যবিত্ত ও তরুণ ভোটারদের (২০-২৯ বছর বয়সী ১.৩১ কোটি ভোটার) ব্যাপকভাবে আকৃষ্ট করেছে।

রাজনৈতিক হিংসাপ্রবণ এই রাজ্যে কেন্দ্রীয় বাহিনীর বিপুল সদস্য মোতায়েন সাধারণ ভোটারদের মনে সাহস জুগিয়েছে। তা ছাড়া আর জি কর কাণ্ডসহ রাজ্যের আইনশৃঙ্খলার অবনতি নিয়ে প্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর প্রচার শাসক দলের বিরুদ্ধে বড় প্রভাব ফেলেছে। রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের নিরলস প্রচারও ভোটারদের নির্ভয়ে ভোট দিতে উদ্বুদ্ধ করেছে। ভোটার তালিকা থেকে ‘বহিরাগত’ বা ভুয়া ভোটারদের বাদ দেওয়ার ক্ষেত্রে বিজেপি সফল হয়েছিল। ‘যৌক্তিক অসংগতি’র ভিত্তিতে ২৭ লাখের বেশি নাম বাদ দেওয়া পড়ে ভোটার তালিকা থেকে। ভোটার তালিকা ‘স্বচ্ছ’ করতে বিজেপির এই প্রচার ভোটেও প্রভাব ফেলেছে।

বিজেপির বিরুদ্ধে ভোট লুট করার অভিযোগ মমতার
আনুষ্ঠানিক ফল ঘোষণার আগেই বিজেপির বিরুদ্ধে ভোট লুট করার অভিযোগ করেছেন রাজ্যের বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। একই সঙ্গে মারধরের শিকার হয়েছেন বলেও দাবি করেছেন তৃণমূল সুপ্রিমো। সোমবার (৪ মে) রাত ৮টার দিকে নিজ আসন ভবানীপুরের সাখাওয়াত মেমোরিয়াল স্কুল গণনাকেন্দ্র থেকে বেরিয়ে সাংবাদিকদের সামনে এসব অভিযোগ করেন মমতা। তৃণমূল সুপ্রিমো বলেন, ‘বিজেপি ভোট লুট করেছে। আমাকে মারা হয়েছে, গায়ে হাত দেওয়া হয়েছে। জোর করে হারানো হয়েছে। আমি আবার ফিরে আসব।’ নির্বাচন কমিশনকে নিশানা করে মমতা আরও দাবি করেন, ‘অন্তত ১০০ আসন লুট করা হয়েছে। কমিশনকে অভিযোগ করেও কোনও লাভ হয়নি। কেউ কর্ণপাত করছে না’। এদিকে, মমতা স্কুল গণনাকেন্দ্র থেকে বের হতেই তাকে উদ্দেশ্যে করে চোর-চোর স্লোগান স্লোগান দিতে শুরু করেন বিজেপি কর্মীরা।

পরে মমতাকে বের করে নিয়ে যান নিরাপত্তাকর্মীরা। কালীঘাটের উদ্দেশে চলে যান তৃণমূল সুপ্রিমো। সোমবার (৪ মে) ফলাফল ঘোষণা শুরুর পর সারাদিন সেখানে এগিয়ে ছিলেন মমতা। কিন্তু বিকেলের পর উত্তপ্ত পরিস্থিতি হলে সাময়িক সময়ের জন্য ভোট গণনা বন্ধ থাকে। এরপর আবার ফলাফল ঘোষণা শুরু হলে দেখা যায় মমতা পিছিয়ে গেছেন। এর আগে দুপুরে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী ও তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক জরুরি বার্তা দিয়েছিলেন। জয় নিয়ে আশাবাদের কথা জানান। মন খারাপ না করে কর্মীদের লড়াই করতে আহ্বান জানান। অন্যদিকে রাজ্য বিজেপির সাবেক সভাপতি সুকান্ত মজুমদার এটিকে বাংলার মানুষের গণতন্ত্রের জয় বলে অভিহিত করেন। তৃণমূলের পায়ের তলা থেকে মাটি সরে গেছে, বলেন তিনি। ভিডিও বার্তায় মমতা দুপুরে বলেন, ‘দয়া করে কাউন্টিং এজেন্ট, প্রার্থীরা এলাকা ছেড়ে আসবেন না। স্ট্রং রুমে যেখানে ভোট গণনা হচ্ছে, সেটা ছেড়ে কেউ আসবেন না। এটা বিজেপির প্ল্যান।’

অন্যান্য রাজ্যে কারা এগিয়ে
তামিলনাড়ুর ২৩৩টি আসনে জনপ্রিয় অভিনেতা বিজয়ের থালাপতির দল তামিলগা ভেট্টি কাজাগাম (টিভিকে) এগিয়ে আছে ১৩৭ আসনে। দলটি এককভাবে সবচেয়ে বেশি আসনে এগিয়ে থেকে একক বৃহত্তম দলের অবস্থানে রয়েছে। তামিলনাড়ুতে অল ইন্ডিয়া আন্না দ্রাবিড় মুনেত্র কাজাগম (এআইএডিএমকে) জোট এগিয়ে আছে ৬৩টি আসনে। ক্ষমতাসীন মুখ্যমন্ত্রী এম কে স্টালিনের ডিএমকে জোট এগিয়ে ৬১টিতে। দীর্ঘদিন ধরে তামিলনাড়ুর রাজনীতিতে ডিএমকে ও এআইএডিএমকের মধ্যে যে দ্বি–দলীয় প্রতিযোগিতা চলে আসছিল, এবার তাতে নতুন মাত্রা যোগ করেছে টিভিকে।

কেরালায় ১৪০টি আসনের পূর্ণ গণনার প্রবণতায় কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন ইউনাইটেড ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউডিএফ) এগিয়ে আছে ৮৭টি আসনে। জয় পেয়েছে ১৭ আসনে। ক্ষমতাসীন বাম জোট লেফট ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (এলডিএফ) এগিয়ে আছে ৩৮টিতে। অন্যরা ১৫টিতে এগিয়ে। বিজেপির নেতৃত্বাধীন এনডিএ এগিয়ে ৩টি আসনে। কেরালায় প্রতি নির্বাচনেই ক্ষমতার হাতবদল হয়। এবারও সেই ধারা অব্যাহত থাকার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। আসামে ১২৬টি আসনের গণনায় বিজেপির নেতৃত্বাধীন এনডিএ এগিয়ে আছে ৯৭টি আসনে। প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেস এগিয়ে আছে ২৭টিতে। এআইইউডিএফ জোট ২টি আসনে এগিয়ে আছে। কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল পুদুচেরির ৩০টি আসনের মধ্যে ২৯টির প্রবণতায় বিজেপি নেতৃত্বাধীন এনডিএ জোট এগিয়ে আছে ১৫টিতে। সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজন ১৬টি আসন। কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন ইউপিএ এগিয়ে ১টিতে এবং অন্যান্যরা ৩টিতে।

কালের আলো/এমএসপি/এমকে

প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক: মো: শামসুল আলম খান | ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: এম. আব্দুল্লাহ আল মামুন খান | কপিরাইট © কালের আলো সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত

প্রিন্ট করুন