স্বতন্ত্র পে-স্কেল চালুসহ প্রধানমন্ত্রীর কাছে একগুচ্ছ দাবি পুলিশের, ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের আশ্বাস সরকারের

কালের আলো রিপোর্ট
প্রকাশের সময়: রবিবার, ১০ মে, ২০২৬ । ৫:১৪ অপরাহ্ণ

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দুই তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে বিএনপি সরকার গঠনের পর প্রথমবারের মতো চার দিনের পুলিশ সপ্তাহ উদ্বোধন করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারক রহমান। রোববার (১০ মে) ‘আমার পুলিশ, আমার দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ’—এই প্রতিপাদ্য সামনে রেখে রাজধানীর রাজারবাগ পুলিশ লাইনস মাঠে বার্ষিক পুলিশ প্যারেডের মধ্য দিয়ে এ আয়োজনের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন। পরে রাজারবাগ পুলিশ মিলনায়তনে প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ কল্যাণ সভায় এ প্রধানমন্ত্রীর কাছে স্বতন্ত্র পে-স্কেলসহ একগুচ্ছ দাবি উত্থাপন করেন পুলিশ সদস্যরা। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে-বাংলাদেশ পুলিশের ঝুঁকিভাতা, ওভারটাইম ডিউটির বিল, সুদমুক্ত মোটরসাইকেল ঋণ এবং ধাপে ধাপে অনারারি পদোন্নতি।

প্রধানমন্ত্রী পুলিশ সদস্যদের উত্থাপিত এসব দাবি মনোযোগ দিয়ে শুনেছেন; একইসঙ্গে দিয়েছেন ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের আশ্বাসও। এ সময় বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মনজুর মোর্শেদ চৌধুরী। স্বাগত বক্তৃতা করেন আইজিপি মো. আলী হোসেন ফকির। ধন্যবাদ জ্ঞাপন করে বক্তব্য রাখেন অতিরিক্ত আইজিপি (ক্রাইম অ্যাণ্ড অপারেশনস্) খন্দকার রফিকুল ইসলাম। এ সময় ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

বিশেষ কল্যাণ সভায় অংশ নেওয়া পুলিশ কর্মকর্তারা জানান, নির্ধারিত কর্মঘণ্টার বাইরে প্রায় প্রতিদিনই অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করতে হয় সদস্যদের। এ কারণে ঝুঁকিভাতাসহ ওভারটাইম ডিউটির জন্য ৫০ শতাংশ অতিরিক্ত বিল দেওয়ার দাবি জানানো হয়েছে। বিমানবন্দর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ও বাংলাদেশ পুলিশ অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি কামরুল হাসান তালুকদার এই প্রতিবেদককে বলেন, পুলিশের কর্মঘণ্টার নির্দিষ্ট কোনো সীমা নেই। ডিউটি রোস্টারের বাইরেও আমাদের নিয়মিত দায়িত্ব পালন করতে হয়। তাই ওভারটাইম ভাতা ও ঝুঁকিভাতার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনার অনুরোধ জানানো হয়েছে।

এ দাবির বিষয়ে অনুষ্ঠানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, পুলিশ বাহিনীকে একটি জনকল্যাণমুখী ও আধুনিক বাহিনী হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্যে সরকারের আর্থিক সঙ্গতি ও সক্ষমতা বিবেচনায় তাদের যৌক্তিক দাবিসমূহ পূরণ করা হবে। পুলিশিং কার্যক্রমকে আরও গতিশীল ও কার্যকর করতে অতিরিক্ত কর্মঘণ্টায় দায়িত্ব পালনকারী পুলিশ সদস্যদের জন্য বিশেষ নীতিমালার ভিত্তিতে ওভারটাইম ভাতা দেওয়া কথা ভাবছে সরকার, যা তাদের মনোবল বৃদ্ধি ও সেবার মান উন্নয়নে সহায়ক হবে। এ ক্ষেত্রে আইজিপি থেকে কনস্টেবল পদ পর্যন্ত ওভারটাইম ভাতা বিবেচনা করা হতে পারে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরও বলেন, দীর্ঘ কর্মঘণ্টা ও অধিক কর্মচাপ বিবেচনায় পুলিশ সদস্যদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষায় কেন্দ্রীয় ও বিভাগীয় পুলিশ হাসপাতালকে সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধিপূর্বক আরো আধুনিক ও যুগোপযোগী করে গড়ে তোলা হবে এবং প্রয়োজনীয় পরীক্ষান্তে আরও উন্নত হাসপাতাল নির্মাণ করা হবে।

পে-স্কেল প্রসঙ্গে পুলিশ সদর দপ্তরের এক কর্মকর্তা জানান, স্বতন্ত্র পে-স্কেল পুলিশের দীর্ঘদিনের দাবি। বাংলাদেশে বিচার বিভাগ ও সেনাবাহিনীতে স্বতন্ত্র পে-স্কেল চালু আছে। দেশ ও জনগণের জন্য বাংলাদেশ পুলিশ সবচেয়ে বেশি সেবা দিয়ে থাকে। তাই তাদের মতো পুলিশের জন্য স্বতন্ত্র পে-স্কেলের দাবি আজ কল্যাণ প্যারেডের আলোচনায় প্রধানমন্ত্রীর কাছে জানানো হয়েছে। মামলার তদন্তের বেশিরভাগ কাজ করেন থানার উপ-পরিদর্শকরা (এসআই)। কিন্তু তাদের যাতায়াত ব্যবস্থার জন্য যানবাহন অপ্রতুল। মামলার তদন্ত কাজে গতি আনতে ও যাতায়াত ব্যবস্থার সমাধানে মোটরসাইকেল কেনার জন্য সুদমুক্ত লোন ও মোটরসাইকেলের জ্বালানি খরচার বিল দাবি করেছেন বিমানবন্দর থানার ওসি ও বাংলাদেশ পুলিশ অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি কামরুল হাসান তালুকদার।

কল্যাণ প্যারেডের আলোচনায় তিনি প্রধানমন্ত্রীর কাছে দাবি তুলেছেন, তদন্ত ব্যয় বেড়েছে। সেটি বাড়িয়ে দেওয়া হোক। তদন্ত কাজে জড়িত এসআইদের জন্য থানা থেকে আলাদা কোনো যানবাহন নেই। মোটরসাইকেল কিনতে অগ্রিম সুদমুক্ত লোন ও জ্বালানি খরচ দিলে তদন্ত কাজে গতি বাড়বে। কল্যাণ প্যারেডে অংশ নেওয়া কর্মকর্তারা আরও জানান, প্যারেডে খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের (কেএমপি) একজন নারী কনস্টেবল অনারারি পদোন্নতি দাবি উত্থাপন করেছেন। তিনি বলেন, আমাদের পুলিশ সদস্যরা যারা কনস্টেবল বা ইন্সপেক্টর ওই জায়গা থেকে রিটায়ার্ড করে। বিশেষ করে কনস্টেবলরা যাতে রিটায়ার্ডের আগে অন্তত একটা র্যাংক পদোন্নতি দিয়ে অবসরে পাঠানো হয়; যেটা সেনাবাহিনীতে আছে। এতে করে সরকারের আবার কোনো আর্থিক ভর্তুকিও লাগবে না। অনারারি পদোন্নতি কনস্টেবল থেকে ইন্সপেক্টর পর্যন্ত এটা চাওয়া হয়েছে। কল্যাণ প্যারেডে অংশ নেওয়া একজন ডিআইজি বলেন, পুলিশের থানা, ব্যারাক, থানা ফাঁড়িসহ বিভিন্ন ইউনিটের অপারেশনাল কাজের জন্য নতুন ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে উন্নয়ন প্রকল্প বাবদ অর্থ বরাদ্দ দীর্ঘদিন বন্ধ রয়েছে। সেটি নতুন করে চালুর আর্জি জানানো হয়েছে।

অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, বর্তমানে অনেক পুলিশ কনস্টেবল ৪০ বছর চাকরি করে অবসর গ্রহণ করেও পরবর্তী পদোন্নতি পান না। সেজন্য বিশেষ নীতিমালা ও সন্তোষজনক চাকরির রেকর্ড বিবেচনায় অবসরকালীন সময়ে কিছু সংখ্যক পুলিশ সদস্যকে কনস্টেবল থেকে অনারারি সহকারী উপ-পরিদর্শক (এএসআই) পদে; সহকারী উপ-পরিদর্শক (এএসআই) থেকে অনারারি উপ-পরিদর্শক (এসআই) পদে এবং উপ-পরিদর্শক (এসআই) থেকে অনারারি পরিদর্শক (ইন্সপেক্টর) পদে পদোন্নতি দেওয়া হবে। তিনি বলেন, পুলিশের বিভিন্ন ইউনিটের ভবন/কার্যালয় নির্মাণ ও আবাসন সমস্যা দূরীকরণে বর্তমান সরকার আন্তরিক। এ ক্ষেত্রে ভূমি অধিগ্রহণসহ প্রয়োজনীয় অর্থের সংস্থান করা সরকারের অগ্রাধিকার তালিকায় রয়েছে।

বিগত দুই মাসে দেশে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির দৃশ্যমান উন্নতি হয়েছে উল্লেখ করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি আরও উন্নত করতে চিহ্নিত সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজ ও মাদক কারবারিদের বিরুদ্ধে বিশেষ অভিযান চলছে। তথ্য প্রযুক্তির উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে অপরাধের ধরন ও মাত্রা বদলেছে। এ ক্ষেত্রে পুলিশ সদস্যদের সংশ্লিষ্ট বিষয়ে আধুনিক প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা অর্জন করতে না পারলে অপরাধ দমনে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য ও সাফল্য অর্জন সম্ভব নয়। তিনি আরও বলেন, জুয়া, অনলাইন জুয়া, সাইবার ক্রাইম ও মানি লন্ডারিং প্রতিরোধে আরো যুগোপযোগী আইন প্রণয়নের জন্য এরই মধ্যে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। এ কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী আইন প্রণয়ন করা হবে। সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, মব কালচার পুরোপুরি বন্ধ করার লক্ষ্যে বিদ্যমান আইনকে সংশোধন ও সংযোজন করে যুগোপযোগী করা হবে। মন্ত্রী এসময় পুলিশ বাহিনীকে জনপ্রত্যাশা ও জনআকাঙ্ক্ষা অনুয়ায়ী দায়িত্ব পালনের নির্দেশ দেন।

কালের আলো/এমএএএমকে

প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক: মো: শামসুল আলম খান | ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: এম. আব্দুল্লাহ আল মামুন খান | কপিরাইট © কালের আলো সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত

প্রিন্ট করুন