কালের আলো/এম/এএইচ
দীর্ঘদিনের মান্ধাতা আমলের ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা কাটিয়ে এবার রাজধানীর সড়কে সক্রিয় করা হয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা ‘এআই ক্যামেরা’। ঢাকার সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে কঠোর এই পথে হাঁটছে সরকার। নতুন এই ব্যবস্থায় সিগন্যাল ভাঙা বা নিয়ম না মানলে পুলিশ না থাকলেও স্বয়ংক্রিয়ভাবে গাড়ির মালিকের মোবাইল ফোন ও ঠিকানায় মামলা চলে যাচ্ছে। নতুন এই ব্যবস্থা চালুর ফলে চালকদের আচরণেও পরিবর্তন এসেছে। সড়কে বিশৃঙ্খলা যেখানে প্রতিদিনের অভিজ্ঞতা সেখানে এখন ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় যুগান্তকারী পরিবর্তন এসেছে।
রাজধানীর গুলশান-১, গুলশান-২, উত্তরা, বিমানবন্দর সড়ক, রামপুরা ট্রাফিক বক্স, মহাখালী, শাহবাগ, হাইকোর্ট ক্রসিং, সচিবালয় সিগন্যাল, কদম ফোয়ারা, মৎস্য ভবন, কাকরাইল মসজিদ ক্রসিং, পুলিশ ভবন, পুরাতন রমনা থানা ক্রসিং, বাংলামোটর, বিজয় সরণি, কারওয়ান বাজার, ফার্মগেট, মিরপুর রোডের ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন এলাকা, গাবতলী ও শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ সরণিসহ গুরুত্বপূর্ণ ১০৫টি ট্রাফিক সিগন্যাল পয়েন্টে এই প্রযুক্তি চালু করা হয়েছে। গত কয়েকদিন রাজধানীর শাহবাগ, সোনারগাঁও বিজয় সরণি, বাংলামোটর, মৎস্য ভবন ও সচিবালয় এলাকা ঘুরে দেখা যায়, ব্যস্ত সড়কে যানবাহনের চাপ আগের মতো থাকলেও ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণে প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারির প্রভাব স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। মোড়ে মোড়ে স্থাপিত এআই ক্যামেরা দিয়ে সিগন্যাল অমান্য, স্টপলাইন ভঙ্গ ও উল্টো পথে চলাচলের মতো ঘটনা পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। কেউ আইন ভঙ্গ করছে না। প্রায় সব চালকের মধ্যে সচেতনতা তৈরি হয়েছে।
এই প্রযুক্তি চালুর আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া শুরু হয় গত ২৯ এপ্রিল, যখন ডিএমপি সদর দপ্তরে ‘এআই বেজড রোড ট্রান্সপোর্ট অ্যাক্ট ভায়োলেশন ডিটেকশন সিস্টেম’সহ মোট ৯টি অ্যাপ উদ্বোধন করা হয়। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) আলী হোসেন ফকির বলেন, এই সিস্টেম কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে ট্রাফিক আইন ভঙ্গকারীদের দ্রুত শনাক্ত করতে সক্ষম হবে, যা সড়কে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা, দুর্ঘটনা কমানো এবং ট্রাফিক ব্যবস্থাপনাকে আরও কার্যকর করবে। এরপর ৩ মে ডিএমপির ভারপ্রাপ্ত কমিশনার মো. সরওয়ার স্বাক্ষরিত গণবিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে চালক ও মালিকদের সতর্ক করা হয়। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, এআই ক্যামেরার মাধ্যমে আইন ভঙ্গের বিষয়ে স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পর দিন থেকেই আনুষ্ঠানিকভাবে এআই সিস্টেমের মাধ্যমে মামলা প্রস্তুতের কার্যক্রম শুরু হয়।
গুলশান-২, বনানীসহ নির্ধারিত এলাকায় হাই-ডেফিনিশন এআই ক্যামেরা বসানো হয়েছে। এই ক্যামেরাগুলো সড়কে চলা প্রতিটি গাড়ি নজরদারি করছে। কোনো গাড়ি লাল সিগন্যাল অমান্য করলে বা উল্টো পথে চললে ক্যামেরা সঙ্গে সঙ্গে ছবি ও ভিডিও ধারণ করছে। এরপর বিআরটিএর ডাটাবেজ থেকে গাড়ির মালিকের তথ্য নিয়ে ডিজিটালভাবে মামলা করা হচ্ছে। এসব বিষয়ে ডিএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ট্রাফিক) মো. আনিছুর রহমান বলেন, ‘আমাদের কাছে এখন পর্যন্ত ১০ হাজারের বেশি ফুটেজ জমা হয়েছে। এসব ফুটেজ যাচাই-বাছাই করছে আমাদের টেকনিক্যাল টিম। ইতোমধ্যে ৫০০ মামলা পাঠিয়ে দিয়েছি। ডিএমপির ট্রাফিক টেকনিক্যাল ইউনিট (টিটিইউ) মূলত এই ফুটেজগুলো বিশ্লেষণ করছে। এই ইউনিটে বর্তমানে জনবল সংখ্যা সাতজন। ধীরে ধীরে জনবল বাড়াব। এসব ফুটেজ বিশ্লেষণ করে আগামী সাত দিনের মধ্যে চালক ও মালিকদের মোবাইল ফোনে এসএমএসের মাধ্যমে ও ডাকযোগে নোটিশ চলে যাবে।
ডিএমপির ট্রাফিক বিভাগ জানায়, নোটিশ পাওয়ার পর মালিক বা চালকদের নির্ধারিত সময়ে হাজির হয়ে জরিমানা পরিশোধ করতে হবে। সময়মতো হাজির না হলে আইন অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এর মধ্যে ম্যাজিস্ট্রেটের মাধ্যমে আইনি প্রক্রিয়ায় সমন বা গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির ব্যবস্থাও রয়েছে। বাংলামোটর মোড়ে অপেক্ষারত এক মোটরসাইকেল চালক বলেন, ‘পরিবর্তন চোখে পড়ার মতো। আমি ক্রসিংয়ের আগে লাল বাতি দেখে থামছি এবং অন্যদেরও বলছি। কেউ শুনছে, আবার কেউ শুনছে না। সবার বুঝে উঠতে হয়তো সময় লাগবে।’ কারওয়ান বাজার মোড়ে পথচারী আনিকা তাবাসসুম জানান, ক্রসিংয়ে গত কয়েক সপ্তাহ ধরে আগের চেয়ে বেশি গাড়ি থেমে যাচ্ছে বলে তিনি লক্ষ্য করেছেন। তিনি বলেন, ‘এই প্রথম ঢাকার কিছু রাস্তা পার হওয়ার জন্য নিরাপদ মনে হচ্ছে।’
ডিএমপির বিদায়ী ভারপ্রাপ্ত কমিশনার মো. সারোয়ার সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে বলেছিলেন, আগামী ৬ মাসের মধ্যে রাজধানীর বেশিরভাগ গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে এ ধরনের ক্যামেরা স্থাপনের মাধ্যমে সিস্টেমটি পূর্ণাঙ্গভাবে চালু হবে। এতে ট্রাফিক সার্জেন্ট ও পরিদর্শকদের মামলা দেওয়ার সংখ্যা কমে আসবে বলে মনে করেন তিনি।

কালের আলো রিপোর্ট
প্রকাশের সময়: শনিবার, ১৬ মে, ২০২৬ । ৯:৫২ পূর্বাহ্ণ