মেয়াদোত্তীর্ণ ইউনিয়ন পরিষদগুলোর (ইউপি) নির্বাচন দিয়েই স্থানীয় সরকারের ভোটযাত্রা শুরু করতে চায় নির্বাচন কমিশন (ইসি)। জাতীয় সংসদের গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশে (আরপিও), নির্বাচন পরিচালনা বিধিমালা ও আচরণবিধির সঙ্গে সমন্বয় রেখে স্থানীয় সরকারের আইন-বিধানবলী সংস্কার করার উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। আইন ও বিধি সংশোধন সংস্কার কমিটির প্রধান ও জ্যেষ্ঠ নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ বর্তমানে কোন স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের বিধিতে কী রয়েছে এবং সরকার আইনে কী ধরনের পরিবর্তন এনেছে—সেসব বিষয়ে স্বচ্ছ ধারণা পেতে তুলনামূলক চিত্র প্রস্তুতের নির্দেশ দিয়েছেন। একই সঙ্গে প্রার্থীদের জামানতের পরিমাণ বাড়ানোর বিষয়টিও আলোচনায় রয়েছে।
জানা যায়, সরকারের তরফে আনুষ্ঠানিক অনুরোধ পেয়ে মেয়াদোত্তীর্ণ বিবেচনায় নিয়ে ধাপে ধাপে নির্বাচন করার পরিকল্পনাও করছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। এরইমধ্যে স্থানীয় সরকারের প্রতিষ্ঠানগুলোর তথ্য সংগ্রহের পাশাপাশি আইন, বিধি সংস্কারের কাজ গুছিয়ে নিচ্ছে নির্বাচন আয়োজনকারী সাংবিধানিক সংস্থাটি। নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ ইতোমধ্যেই বলেছেন, ‘হয়ত অনলাইনে মনোনয়ন জমার সুযোগ থাকবে না। এছাড়া স্বতন্ত্র প্রার্থী হতে ন্যূনতম (১%) সমর্থনের নথি জমা দেওয়ার বাধ্যবাধকতা তুলে দেওয়ার চিন্তা রয়েছে।’
এএমএম নাসির উদ্দিন নেতৃত্বাধীন ইসি ইতোমধ্যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, স্থানীয় ভোটে ইভিএম থাকবে না। অন্তর্বর্তী সরকারের ধারাবাহিকতায় বিএনপি সরকার আইন সংশোধন করেছে, দলীয় প্রতীক থাকছে না স্থানীয় সরকারের নির্বাচনে। ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে পোস্টাল ব্যালটে ভোট চালুর পাশাপাশি ব্যয় ও জামানতের টাকা বাড়ানো হয়। ফেরারি আসামিদের প্রার্থী হতে অযোগ্য করা হয়। অনিয়ম রোধে ক্ষমতা বাড়ানো হয় ভোটগ্রহণ কর্মকর্তাদের। অবহেলায় শাস্তিও বাড়ানো হয়; যুক্ত করা হয়েছে কিছু নির্বাচনি প্রতীক। ভোটের প্রচারে পোস্টার নিষিদ্ধের পাশাপাশি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) অপব্যবহার রোধের বিষয়ও যুক্ত হয় বিধিতে। সিটি, পৌর, উপজেলা, ইউপি ও জেলা পরিষদের বিধিগুলো নিয়ে প্রাসঙ্গিক কিছু কাজও গুছিয়ে রাখছেন ইসি কর্মকর্তারা। নির্বাচন পরিচালনা শাখার কর্মকর্তারা জানান, নির্দলীয় ভোট হওয়ায় কিছু বাধ্যবাধকতা বাদ পড়ে যাবে নির্বাচন পরিচালনা বিধি ও আচরণবিধিতে। এখন পর্যন্ত বেশ কিছু বিষয় বিবেচনোয় রয়েছে, সবগুলো পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে চূড়ান্ত করবে ইসি। জামানত ও নির্বাচনি ব্যয় বাড়ানো, পোস্টার নিষিদ্ধ, বিলবোর্ডে প্রচার, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচারসহ নানা বিষয় পর্যালোচনায় থাকছে। সিটি, উপজেলা, পৌর ও ইউনিয়ন পরিষদের আচরণবিধিগুলো আলাদা হলেও সমন্বয় রেখে খসড়া করা হচ্ছে।
বর্তমান নিয়ম অনুযায়ী, সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ভোটারসংখ্যা পাঁচ লাখ পর্যন্ত হলে মেয়র প্রার্থীর জামানত ২০ হাজার টাকা। পাঁচ লাখ ১ থেকে ১০ লাখ হলে ৩০ হাজার, ১০ লাখ এক থেকে ২০ লাখ হলে ৫০ হাজার এবং ২০ লাখের বেশি হলে এক লাখ টাকা নির্ধারিত রয়েছে। সাধারণ ওয়ার্ড কাউন্সিলর পদের ক্ষেত্রে ভোটারসংখ্যা অনুযায়ী ১০ হাজার থেকে ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত জামানত নির্ধারণ করা আছে। সংরক্ষিত নারী কাউন্সিলর পদের জন্য জামানত ১০ হাজার টাকা। ২০২৪ সালে উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান পদের জামানত ১০ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে এক লাখ টাকা করা হয়েছিল। পৌরসভা নির্বাচনে ২৫ হাজার ভোটার পর্যন্ত এলাকায় জামানত ১৫ হাজার টাকা, ২৫ হাজার ১ থেকে ৫০ হাজার ভোটারের ক্ষেত্রে ২০ হাজার টাকা, ৫০ হাজার ১ থেকে ১ লাখ ভোটারের ক্ষেত্রে ২৫ হাজার টাকা এবং এক লাখের বেশি ভোটারের ক্ষেত্রে ৩০ হাজার টাকা নির্ধারিত রয়েছে। অন্যদিকে কাউন্সিলর পদে জামানত পাঁচ হাজার টাকা, ইউপি চেয়ারম্যান পদে পাঁচ হাজার টাকা এবং সদস্য পদের জন্য এক হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। জেলা পরিষদ নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদের জন্য ২০ হাজার টাকা এবং সদস্য বা মহিলা সদস্য পদের জন্য পাঁচ হাজার টাকা জামানত দিতে হয়।
ইসি সূত্র জানায়, চলতি বছরের মধ্যেই বেশ কিছু স্থানীয় সরকার নির্বাচন সম্পন্ন করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। এ কারণে সংশোধিত আইনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে দ্রুত সময়ের মধ্যে বিধিমালা সংস্কারের কাজ এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। ইসি সচিবালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আগামী এক বছরের মধ্যে দেশের প্রায় চার হাজার ১০০ স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানে নির্বাচন হওয়ার কথা রয়েছে। বিশাল এই নির্বাচন কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করার প্রস্তুতির অংশ হিসেবেই আইন ও বিধি সংস্কারের কাজ চলছে।
কালের আলো/এম/এএইচ

কালের আলো রিপোর্ট
প্রকাশের সময়: শনিবার, ১৬ মে, ২০২৬ । ৪:৩৮ অপরাহ্ণ