ব্যারাকে ফিরছে সেনাবাহিনী, যুদ্ধের জন্য প্রস্তুতিতে ফোকাস সেনাপ্রধানের

কালের আলো রিপোর্ট
প্রকাশের সময়: বৃহস্পতিবার, ২১ মে, ২০২৬ । ১১:০৫ অপরাহ্ণ

চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের আগে দমন-পীড়নের হাতিয়ার হয়নি বাংলাদেশের সামরিক বাহিনী। আন্দোলনকারীদের ওপর গুলি না চালানোর বিষয়ে সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামানের একটি ঘোষণাই বদলে দেয় আন্দোলনের গতিপথ। ঐতিহাসিক এক পটপরিবর্তনের মাধ্যমে চূড়ান্ত বিজয় নিশ্চিত হয় ছাত্র-জনতার। অনিবার্য গৃহযুদ্ধ ও রক্তবন্যার হাত থেকে রক্ষা পায় দেশ। টানা তিনদিন সরকারবিহীন দেশের দায়িত্ব নিজেদের স্কন্ধে তুলে নিয়ে একটি অন্তর্বর্তী সরকার গঠনে কার্যকর সহায়তার পাশাপাশি জননিরাপত্তা, জনশৃঙ্খলা ও রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা বজায় রেখে ১৮ মাসের মধ্যেই একটি জাতীয় নির্বাচনের বন্দোবস্ত করে সেনাবাহিনী তথা সশস্ত্র বাহিনী।

ক্ষমতা নয় গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে সশস্ত্র বাহিনীর চেইন অব কমাণ্ড অটল-অনড় থাকায় চলতি বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। যার মধ্যে দিয়ে দুই তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠন করে বিএনপি। জনগণকে সঙ্গে নিয়েই অস্থিতিশীল-অস্থির সময় জয় করে প্রশ্নমুক্ত নির্বাচন নিশ্চিতের মাধ্যমে সামরিক বাহিনী প্রমাণ করেছে দেশের গণতন্ত্রের সবচেয়ে সহায়ক শক্তি তাঁরাই। দেখতে দেখতে কেটে গেছে দীর্ঘ সময়। স্বাধীনতার পর আর এতো সময় কখনও ক্যান্টনমেন্টের বাইরে থাকেনি সামরিক বাহিনী। এবার তাঁরা ব্যারাকে ফিরে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে।

বৃহস্পতিবার (২১ মে) সকালে কুমিল্লা সেনানিবাসে সেনাবাহিনীর ফায়ারিং প্রতিযোগিতা-২০২৬ এর সমাপনী ও পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান জানিয়েছেন, দেশ স্থিতিশীল থাকায় সেনাবাহিনী ব্যারাকে ফিরতে শুরু করেছে। গত ১৮ মাস মাঠে দায়িত্ব পালন করেও সেনা সদস্যরা ফায়ারিং প্রতিযোগিতায় যে দক্ষতা দেখিয়েছে তা সত্যিই অভূতপূর্ব বলেও মন্তব্য করেন তিনি। যুদ্ধের জন্য সেনাবাহিনীকে প্রস্তুত করার কথা জানিয়ে তিনি বলেছেন, ‘আমাদের যে কাজ সেনাবাহিনীকে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত রাখা, ডিসিপ্লিন ঠিক রাখা সেগুলো আমরা শুরু করছি, ইনশাআল্লাহ।’ তিনি ফায়ারিং প্রতিযোগিতায় নিজের নিশানাও পরখ করে নেন। এ সময় ৩৩ পদাতিক ডিভিশনের জিওসি ও কুমিল্লার এরিয়া কমান্ডার মেজর জেনারেল মোহাম্মদ নাজিম উদ দৌলা তাঁর পাশে ছিলেন।

গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের দায়িত্বশীলতায় দেশপ্রেমের অত্যুজ্জ্বল উদাহরণ স্থাপন করেছেন বাংলাদেশ সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান, নৌবাহিনী প্রধান এডমিরাল এম নাজমুল হাসান ও বিমানবাহিনী প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল হাসান মাহমুদ খাঁন। ক’দিন আগে অনুষ্ঠিত ডিসি সম্মেলনে মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনিও দেশের নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা রক্ষায় সশস্ত্র বাহিনীর দায়িত্বশীল ভূমিকার প্রশংসা করেন। তিনি দেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে সুসংহত করতে জনগণের ভালোবাসায় ধন্য সশস্ত্র বাহিনীর অবদানকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে তুলে ধরেন।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন নতুন নির্বাচিত সরকারের বয়স তিন মাস ছুঁই ছুঁই। এই সময়টিতে পুলিশ নিজেদের গুছিয়ে তুলছে পুরোদমে। এবার দেশের সার্বভৌমত্ব ও অখণ্ডতার কাণ্ডারি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর স্থায়ী ঠিকানা ক্যান্টনমেন্টে ফিরে যাবার পালা। দীর্ঘ মেয়াদে বেসামরিক দায়িত্ব সামরিক বাহিনীর উন্নত কঠোর প্রশিক্ষণ কার্যক্রমকে স্বাভাবিকভাবেই ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। বহি:শত্রুর আগ্রাসন মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় যুদ্ধ প্রস্তুতি ও আধুনিক সমরকৌশলের মাধ্যমে দ্রুত শক্ত প্রতিক্রিয়া দেখানোর জন্য পুরোমাত্রায় মাঠপর্যায়ের অনুশীলন ও ফরমেশন ট্রেনিং ও সামরিক পরিবেশ বা আবহের আর কোন বিকল্প নেই। রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তার প্রশ্নে প্রতিরক্ষার এই প্রধান স্তম্ভটিকে নিজেদের স্বাভাবিক দায়িত্বে মনোযোগী হতে দিলে জাতির অস্তিত্ব ও মর্যাদাও সুসংহত হবে বলে মনে করেন সামরিক বিশ্লেষকরা।

এ প্রসঙ্গে কুমিল্লা সেনানিবাসে সেনাবাহিনীর ফায়ারিং প্রতিযোগিতা-২০২৬ এর সমাপনী ও পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে কথা বলেন সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান। তিনি বলেন, ‘আমরা দেশের শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষার কাজে এখনও ডেপ্লয়েড আছি। ২০২৪ সালের ২০ জুলাই থেকে আমরা এই কাজ করে যাচ্ছি, এখনও আছি। এখন ১৬ থেকে ১৭ হাজার সারা বাংলাদেশের ৬২টি জেলায় আছে। আমরা অনেক সৈনিক আমরা উইথড্রো করেছি, বাট এখনো সম্পূর্ণ উইথড্রো হয়নি। ইনশাআল্লাহ আমরা আশা করছি যে কিছু সময়ের মধ্যে আমরা সবাই ব্যারাকে ফেরত আসতে পারবো। তারপরও দেশের প্রয়োজনে আমাদের কিছু কাজ করে যেতেই হবে। যতক্ষণ পর্যন্ত সরকার আমাদের চাইবে, মাঠে থেকে বিভিন্ন কাজ করে যাব। যেমন এখন ফিউল ডিপোগুলোতে আমাদের ডিপ্লয়মেন্ট আছে। এ রকম টাইম টু টাইম বিভিন্ন কাজে আমাদের হয়তো সরকারকে সহায়তা করতে হবে।’

সেনাপ্রধান আরও বলেন, ‘আমাদের যে প্রধান কাজ ক্যান্টনমেন্টে ফেরত এসে প্রশিক্ষণগুলো করে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুতি, আমাদের নিজস্ব যে পদ্ধতি আছে, নিজস্ব ওয়ে আছে সেগুলো আস্তে আস্তে আমাদের শুরু করতে হবে। এজন্য ফায়ারিং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমরা এতদিন ফায়ারিং সেভাবে করতে পারিনি। এখন ফায়ারিং কমপ্রেশন হলো। আমি রেজাল্ট দেখলাম, দক্ষতা দেখলাম, আমি অত্যন্ত আশান্বিত যে এতদিন ফিল্ডে থাকার পরেও আমাদের ফায়ারিং সক্ষমতা কমেনি। এটা একটা ভালো লক্ষণ। আমাদের আস্তে আস্তে ট্রেনিং ইভেন্টগুলো শুরু করতে হবে। আমাদের যে কাজ সেনাবাহিনীকে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত রাখা, ডিসিপ্লিন ঠিক রাখা সেগুলো আমরা শুরু করছি, ইনশাআল্লাহ।’

বিশ্লেষকরা মনে করেন, বাংলাদেশ সেনাবাহিনী আপন ঠিকানায় ফিরে গেলে পুলিশসহ অন্যরা নিজেদের কার্যকারিতা ও সক্ষমতা যাচাই করতে পারবে। সামরিক বাহিনী দিনের পর দিন ব্যারাকের বাইরে থেকে এই কাজটি করবে এটি প্রত্যাশাও ভূ-রাজনৈতিক জটিল সমীকরণে আত্মঘাতী। বিভিন্ন বাহানায় জাতির আস্থা-বিশ্বাস ও স্থিতিশীলতার প্রতীক এই বাহিনীকে ক্যান্টনমেন্টের বাইরে আভ্যন্তরীণ নিরাপত্তায় ব্যস্ত রাখলে জাতীয় নিরাপত্তা চরম ঝুঁকিতে পড়ার শঙ্কা থাকে। সশস্ত্র বাহিনী সংকটময় মুহুর্ত থেকে গণতান্ত্রিক উত্তরণে পথ দেখিয়ে নিজেদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালন করেছে। এখন নিজেদের মূল পেশাগত দায়িত্বে ফোকাস করতে পারলেই সার্বভৌমত্বের অতন্দ্র প্রহরীরা নিরাপদ ও সুরক্ষিত করতে পারবে বাংলাদেশকে। পেশাগত আধুনিক প্রশিক্ষণ, কৌশলগত চিন্তা এবং প্রযুক্তিনির্ভর সক্ষমতা বৃদ্ধির মাধ্যমে নিজেদের সময়োপযোগীতার মানদণ্ডে ভাবমূর্তিকেও করবে আরও উজ্জ্বল।

আন্ত:বাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) জানায়, অনুষ্ঠানে সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে বিজয়ীদের মাঝে পুরস্কার বিতরণ করেন। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ফায়ারিং প্রতিযোগিতায় ১৭ পদাতিক ডিভিশন চ্যাম্পিয়ন ও প্যারা কমান্ডো ব্রিগেড রানারআপ হওয়ার গৌরব অর্জন করে। প্রতিযোগিতায় সৈনিক পিয়াল মন্ডল, ১৭ পদাতিক ডিভিশন শ্রেষ্ঠ ফায়ারার; সৈনিক তানভীর হোসেন, ১০ পদাতিক ডিভিশন দ্বিতীয় শ্রেষ্ঠ ফায়ারার এবং সৈনিক জবা আক্তার, ২৪ পদাতিক ডিভিশন শ্রেষ্ঠ মহিলা ফায়ারার হওয়ার কৃতিত্ব অর্জন করেন।

আইএসপিআর আরও জানায়, চলতি বছরের ১৬ মে ৩৩ পদাতিক ডিভিশনের সদর দপ্তরের সার্বিক ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত এই ফায়ারিং প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সকল ফরমেশন, লজিস্টিকস্ এরিয়া, ৫টি স্বতন্ত্র ব্রিগেড এবং প্যারা কমান্ডো ব্রিগেডসহ সর্বমোট ১৭টি দল অংশগ্রহণ করে। এ সময় উর্ধ্বতন সেনা কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

কালের আলো/এমএএএমকে

প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক: মো: শামসুল আলম খান | ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: এম. আব্দুল্লাহ আল মামুন খান | কপিরাইট © কালের আলো সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত

প্রিন্ট করুন