কুড়িগ্রামে রেকর্ড বৃষ্টিপাতে ফসলহানি : ঈদ আনন্দ নেই কৃষক পরিবারে

কুড়িগ্রাম প্রতিবেদক
প্রকাশের সময়: সোমবার, ২৫ মে, ২০২৬ । ৬:৪৩ পূর্বাহ্ণ

আগাম ও রেকর্ড বৃষ্টিপাতের কারণে ব্যাপক ফসলহানির মুখে পড়েছেন কুড়িগ্রাম জেলার কৃষকরা। বৈরী আবহাওয়ার কারণে উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি এবং ফসলের ন্যায্য মূল্য না থাকায় জেলার শত শত কৃষক পরিবার এবার ঈদের আনন্দ থেকে বঞ্চিত হওয়ার শঙ্কায় দিন কাটাচ্ছে।

দেশের উত্তরাঞ্চলের অন্যতম কৃষিপ্রধান জেলা কুড়িগ্রাম। আবহাওয়া পরিবর্তনের কারণে চলতি বছর আগাম ও অতিরিক্ত বৃষ্টিপাতে জেলায় বোরো ধান, পাট, ভুট্টা ও সবজিসহ বিভিন্ন ফসলের খেত নিমজ্জিত হয়ে পড়েছে। কুড়িগ্রামের রাজারহাট উপজেলার চাঁন্দামারী গ্রামের প্রায় শতাধিক কৃষকের শত শত একর বোরো ধান তলিয়ে গেছে।

বাধ্য হয়ে এসব জমি থেকে কোমর পানিতে নেমে আধা পাকা ধান কেটে নিচ্ছেন তারা। মাঠের পাকা বোরো ধানসহ নানা ফসল পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় এবং হাতে নগদ টাকা না থাকায়, আসন্ন ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে চরম দুশ্চিন্তা ও অর্থনৈতিক সংকটে পড়েছেন হাজার হাজার কৃষক।

অতিবৃষ্টির কারণে জেলার বিস্তীর্ণ বোরো ফসলের জমি, আলু, সবজি ও ভুট্টার খেত সম্পূর্ণ তলিয়ে গেছে। ফলে আয়ের প্রধান উৎস নষ্ট হয়ে যাওয়ায় এই অঞ্চলের কৃষকরা ঈদ আনন্দের বদলে পড়েছেন তীব্র আর্থিক সংকটে। হাতে নগদ অর্থ না থাকায় পরিবারের জন্য নতুন পোশাক বা ঈদের প্রয়োজনীয় সওদা করাও তাদের জন্য অসম্ভব হয়ে পড়েছে।

উলিপুর উপজেলার হাতিয়া ইউনিয়নের কৃষক নওশাদ আলী বলেন, “ফসল হারিয়ে চরম আর্থিক সংকটে পড়েছি। এবার কোরবানি দেওয়া তো দূরের কথা, সাধারণ বাজার করাই কষ্টকর হয়ে দাঁড়িয়েছে।”

আরেক কৃষক আমিনুল ইসলাম বলেন, তলিয়ে যাওয়া ফসল কাটতে শ্রমিক সংকট দেখা দিয়েছে, তার ওপর শ্রমিকের মজুরিও বেশি। তাই বাধ্য হয়ে আমরা নিজেরাই ধান কাটছি। ঋণ করে আবাদ করেছিলাম, কিন্তু অতিবৃষ্টির কারণে ধান ভালো হয়নি।

বাজারেও এখন ধানের দাম কম, তাই চরম বিপাকে পড়েছি। ভেবেছিলাম আবাদ ভালো হলে কিছু ধান বিক্রি করে কোরবানি দেব, কিন্তু তা আর হলো না। ছেলে-মেয়ের জন্য ঈদের নতুন কাপড়ও এখনো কিনতে পারিনি।

চিলমারী উপজেলার থানাহাট ইউনিয়নের বালাবাড়ী হাট এলাকার আমেনা বেগম বলেন, বৃষ্টির কারণে ধান শুকাতে পারছি না। আশা ছিল ধান বিক্রি করে জামা-কাপড় কিনব, এখন দেখছি আর কেনা হবে না।

রাজারহাট আবহাওয়া অফিসের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সুবল চন্দ্র সরকার বলেন, চলতি মাসের ১৩ মে এক দিনেই ১৮৩ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়, যা গত এক দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ। এ ছাড়া গত এপ্রিল মাসে ১৭৬ মিলিমিটার এবং ২১ মে পর্যন্ত ৬১০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে।

যাত্রাপুর হাটের ইজারাদার আব্দুর রহিম বলেন, বৈরী আবহাওয়ার কারণে জেলার স্থায়ী-অস্থায়ী পশুর হাটগুলোতে দেশের অন্যান্য অঞ্চল থেকে ক্রেতা ও পাইকাররা আসতে পারছেন না। ফলে বেচাকেনা অনেক কমে গেছে।

সাধারণত প্রতিটি কোরবানির হাটে গড়ে ৭০০ থেকে ৮০০-এর বেশি পশু বিক্রি হতো। কিন্তু এবার দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার কারণে হাটে গড়ে ১০০ থেকে ১৫০টি পশু বিক্রি হচ্ছে। এই বৈরী পরিবেশ স্থানীয় পশুর হাটসহ সামগ্রিক ব্যবসা-বাণিজ্যে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।

এ বিষয়ে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর খামারবাড়ি কুড়িগ্রামের উপপরিচালক আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার কারণে জেলার অনেক কৃষক এবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। ধান, ভুট্টাসহ কাটা ফসল ঘরের শুকনো স্থানে ছড়িয়ে কিংবা উঁচু স্থানে রেখে বাতাস ও রোদে শুকানোর পরামর্শ দিচ্ছে কৃষি বিভাগ।

২০ মে পর্যন্ত কুড়িগ্রাম সদর এবং রৌমারী উপজেলায় ৫১ হেক্টর জমির বোরো ধান, পাট ও শাক-সবজি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যার ফলে ৪০০ জন কৃষকের প্রায় ৩৩ লাখ ৬২ হাজার টাকার ক্ষতি হয়েছে।

কালের আলো/এএইচ/এমএসআইপি 

প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক: মো: শামসুল আলম খান | ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: এম. আব্দুল্লাহ আল মামুন খান | কপিরাইট © কালের আলো সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত

প্রিন্ট করুন