গরমে নাভিশ্বাস জীবন

কালের আলো রিপোর্ট
প্রকাশের সময়: বুধবার, ৩ জুন, ২০২৬ । ৬:৪২ অপরাহ্ণ

রাজধানীর অধিকাংশ সড়ক ফাঁকা।  মানুষের চলাচল বেশ কম। যাঁরা বাধ্য হয়ে বের হয়েছেন, তাঁরা টের পেয়েছেন গরমে নাভিশ্বাস ওঠা কাকে বলে। ঘরের ভেতরও গুমোট অবস্থা। এর মধ্যে বিদ্যুৎ গেলে তো কথাই নেই, একেবারে সেদ্ধ হওয়ার দশা। একই অবস্থা সারা দেশেই। বিশেষ করে সারা দেশে দিনভর বিদ্যুতের আসা যাওয়ায় ত্রাহি অবস্থা জনজীবনের।

বুধবার (৩ জুন) ঢাকাসহ দেশের অন্তত ৪৫টি জেলার ওপর দিয়ে মৃদু থেকে মাঝারি ধরনের তাপপ্রবাহ বয়ে যাচ্ছে। এই তাপপ্রবাহ বৃহস্পতিবারও (৪ জুন) অব্যাহত থাকতে পারে। আবহাওয়া অধিদপ্তরের আবহাওয়াবিদ হাফিজুর রহমান এমন তথ্যই জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, বর্তমানে রংপুর, রাজশাহী, খুলনা, বরিশাল ও ঢাকা বিভাগে তাপপ্রবাহ বয়ে যাচ্ছে। চট্টগ্রাম বিভাগের ব্রাহ্মণবাড়িয়া, চাঁদপুর ও নোয়াখালী জেলাও তাপপ্রবাহের আওতায় রয়েছে।

ভ্যাপসা গরমে অতিষ্ঠ জনজীবন। তপ্ত রোদে দিনমজুর, রিকশাচালকরা রোজগারের তাগিদে পথে নামলেও ভয়ংকর রোদে কাহিল হয়ে পড়ছেন। হাসপাতালে বেড়েছে রোগী। হাঁসফাঁস করছে অন্য প্রাণিকুলও। ঘরের মধ্যে ফ্যান চললে মনে হয় আগুনের হল্কা। আবার ঘরের বাইরে বের হলেই যেন আগুনের ঝাপটা।  বিশেষ করে অল্প সময়ের মধ্যে শরীর ঘামে ভিজে যাচ্ছে। মনে হয় কোথা থেকে যেন আগুনের হল্কা বের হচ্ছে। আবার এই ভ্যাপসা গরম থেকে কোনো এসি ঘরে প্রবেশ করলে কিংবা ফ্যানের বাতাস গায়ে লাগলে বেশ কিছুটা প্রশান্তি এনে দেয়। কিন্তু এই ঠান্ডা-গরমে অনেকেই এখন কাশিতে আক্রান্ত হচ্ছেন। ঘরে ঘরে এখন সর্দি-কাশি দেখা যাচ্ছে। আবার শরীরে জ্বরও আসে।

এই ভ্যাপসা গরমে দেদার বিক্রি হচ্ছে বিভিন্ন ধরনের ফলের জুস। আবার আখের রস। এ ছাড়া ফুটপাতের মানহীন বরফমিশ্রিত লেবুর শরবত বিক্রি বেড়েছে। এই ভ্যাপসা গরমে জমজমাট ব্যবসা হচ্ছে বিভিন্ন ধরনের পাতলা গেঞ্জির। যা অনায়াসে বিক্রি হতে দেখা যাচ্ছে ফুটপাথের বিভিন্ন ভ্যানে। গরমের সুযোগে অনেক বেশি দাম হাঁকছেন বিক্রেতারা।

আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, আগামী আরও দুদিন তাপপ্রবাহ অব্যাহত থাকতে পারে। তবে কোথাও কোথাও বৃষ্টিপাত হলেও তাৎক্ষণিকভাবে গরম পুরোপুরি কমার সম্ভাবনা নেই। এদিকে, গত সোমবার আবহাওয়া অধিদপ্তর জুন মাসের আবহাওয়ার পূর্বাভাস দিয়ে এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, জুনে স্বাভাবিকের চেয়ে কম বৃষ্টিপাত হতে পারে। এ মাসে একাধিক লঘুচাপের সম্ভাবনা আছে। সেগুলোর মধ্যে একটি মৌসুমি নিম্নচাপে পরিণত হতে পারে। সাধারণত দেশে জুন মাসে গড় বৃষ্টিপাত হয় ৪৫৯ মিলিমিটার। এটি বছরের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাতের মাস। দেশে সবচেয়ে বেশি ৫২৩ মিলিমিটার গত বৃষ্টি হয় জুলাইয়ে।

চলতি বছর এপ্রিল ও মে মাসে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি বৃষ্টি হয়েছে। এপ্রিলকে দেশের সবচেয়ে গরমের মাস ধরা হয়। মাসটিতে ৭৫ শতাংশের বেশি বৃষ্টিপাত হয়েছে, যা খুব অস্বাভাবিক। এপ্রিলের বৃষ্টিতে বিশেষত হাওরাঞ্চলে বোরো ধানের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।

বাংলাদেশে তীব্র গরমের কারণে প্রতি বছর বিপুল কর্মঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে। আর্থিক দিক থেকেও এই ক্ষতির পরিমাণ বিশাল। বিশ্বব্যাংকের এক নতুন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে বাংলাদেশে ক্রমবর্ধমান তাপজনিত অসুস্থতায় শুধু ২০২৪ সালেই প্রায় ২৫ কোটি কর্মদিবস নষ্ট হয়েছে। এতে অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়েছে ১ দশমিক ৩৩ বিলিয়ন থেকে ১ দশমিক ৭৮ বিলিয়ন ডলার, যা জিডিপির প্রায় ০.৩ থেকে ০.৪ শতাংশ। টাকার অংকে এই ক্ষতির পরিমাণ ২১ হাজার কোটিরও বেশি।

বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়, যখন তাপমাত্রা ৩৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়ে যায়, তখন কর্মীদের উৎপাদনশীলতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। গরম বেড়ে যাওয়া বাংলাদেশ অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। গবেষণাটিতে ১৯৭৬ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত দেশের তাপমাত্রা ও আপেক্ষিক আর্দ্রতা বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এর পাশাপাশি ২০২৪ সালে ১৬ হাজারের বেশি মানুষের ওপর পরিচালিত দুই ধাপের একটি জরিপের তথ্যও ব্যবহার করা হয়েছে।

এতে দেখা যায়, ১৯৮০ সাল থেকে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ১.১ ডিগ্রি সেলসিয়াস এবং ‘অনুভূত তাপমাত্রা’ (ফিলস লাইক টেম্পারেচার) ৪ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়েছে। এর ফলে ডায়রিয়া, দীর্ঘস্থায়ী কাশি, শ্বাসযন্ত্রের রোগ এবং ক্লান্তির মতো স্বাস্থ্য সমস্যা বেড়েছে। তাপপ্রবাহের কারণে বিষণ্ণতার মতো মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যাও তৈরি হয়েছে।

কালের আলো/এমএএএমকে

প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক: মো: শামসুল আলম খান | ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: এম. আব্দুল্লাহ আল মামুন খান | কপিরাইট © কালের আলো সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত

প্রিন্ট করুন