দুর্ঘটনা নাকি ধর্ষণের পর হত্যা, কলেজছাত্রীর মৃত্যু নিয়ে ধোঁয়াশা!

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশের সময়: বৃহস্পতিবার, ১১ জুন, ২০২৬ । ৭:১৭ অপরাহ্ণ

চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় শ্রুতি পাল (২১) নামের এক কলেজছাত্রীর মৃত্যুর ঘটনায় রহস্য ও ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে। বন্ধুদের সঙ্গে ঘুরতে যাওয়ার পথে দুর্ঘটনায় তার মৃত্যু হয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে জানা গেলেও, নিহতের পরিবারের পক্ষ থেকে তাকে ধর্ষণ ও হত্যার অভিযোগ তোলা হয়েছে।

তবে, অভিযোগের পক্ষে এখনও অকাট্য কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্টরা। ঘটনাটি সড়ক দুর্ঘটনা নাকি অন্য কোনো অপরাধ, তা নিশ্চিত হতে তদন্ত করছে পুলিশ। যদিও তদন্ত সংশ্লিষ্ট পুলিশের প্রাথমিক ভাষ্য এবং সিসিটিভি ফুটেজ যাচাই-বাছাই করে এখন পর্যন্ত জানা গেছে, দুর্ঘটনাবশতই ভুক্তভোগীর মৃত্যু হয়েছে।

নিহত শ্রুতি পাল চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলার হাইলধর ইউনিয়নের খাসখামা গ্রামের হোমিও চিকিৎসক টিটু পালের মেয়ে। তিনি ফেনী টিচার্স ট্রেনিং কলেজের দ্বিতীয় সেমিস্টারের ছাত্রী এবং তার পরিবার চট্টগ্রামের ডবলমুরিং থানার শেখ মুজিব রোড এলাকায় ভাড়া বাসায় থাকেন।

ঘটনার দিন মাকে ফোন দিয়ে টিউশনিতে যাওয়ার কথা বলে দুপুর আনুমানিক ২টা ৪০ মিনিটের দিকে ফেনীর মহিপাল থেকে মোটরসাইকেলযোগে বন্ধুদের সাথে মিরসরাই অর্থনৈতিক অঞ্চলে ঘুরতে রওনা হন শ্রুতি। পরে এই ঘটনায় নিহতের বাবা টিটু পাল বাদী হয়ে মিরসরাই থানায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মামলা দায়ের করেন।

এর আগে, চমেক হাসপাতালে শ্রুতির মরদেহ নিয়ে আসা মো. তানভির (২৭) ও তার সহযোগী আশরাফ উদ্দিন (২৫)-কে আটক করে নগরের পাঁচলাইশ থানা পুলিশ। পরবর্তীতে মিরসরাই থানায় দায়ের করা মামলায় তাদের গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে পাঠানো হলে আদালত তাদের কারাগারে প্রেরণের নির্দেশ দেন।

গ্রেপ্তারকৃতরা হলেন—কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামের উত্তর বেতাইরা এলাকার মৃত এবাদত হোসেনের ছেলে প্রবাসী মো. তানভীর এবং ফেনী সদরের আলোকদিয়া এলাকার মৃত শাহাবুদ্দিনের ছেলে আশরাফ উদ্দিন। এছাড়া মামলায় আরও ৪-৫ জনকে অজ্ঞাতনামা আসামি করা হয়েছে।

মামলার এজাহার অনুযায়ী, গত রোববার (৭ জুন) দুপুরে শ্রুতি তার মাকে ফোন করে জানান, তিনি টিউশনিতে যাচ্ছেন। এরপর থেকেই তার মোবাইল নম্বরটি বন্ধ পাওয়া যায়। পরে আনুমানিক সন্ধ্যা ৬টার দিকে তার মাকে অজ্ঞাত একটি নম্বর থেকে ফোন করে জানানো হয় যে, মিরসরাই সদর ইউনিয়নের সুফিয়া রোডে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের উত্তর বাইপাস

এলাকায় একটি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় শ্রুতি গুরুতর আহত হয়েছেন এবং তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। খবর পেয়ে স্বজনেরা চমেক হাসপাতালে ছুটে গিয়ে শ্রুতির মরদেহ দেখতে পান।

নিহতের পরিবারের দাবি, পুরো ঘটনাটি একটি সুপরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড এবং এর পেছনে থাকা গণধর্ষণের ঘটনা ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। নিহতের স্বজনদের অভিযোগ, সাধারণ সড়ক দুর্ঘটনায় মানুষের শরীরে যেভাবে ক্ষত বা জখম তৈরি হয়, শ্রুতির শরীরে তেমন কোনো চিহ্ন ছিল না।

এমনকি যে মোটরসাইকেলে দুর্ঘটনা ঘটেছে বলা হচ্ছে, সেটিতেও কোনো স্ক্র্যাচ বা ক্ষতির দাগ নেই। অথচ হাসপাতালে নিহতের মরদেহ পরীক্ষার সময় দেখা গেছে, তার যৌনাঙ্গে মারাত্মক ক্ষতবিক্ষত চিহ্ন এবং পেটে আঘাতের দাগ রয়েছে, যা পাশবিক নির্যাতন ও ধর্ষণের স্পষ্ট ইঙ্গিত দেয়।

তারা আরও বলেন, তথাকথিত চালক মো. তানভিরের শরীরে দুর্ঘটনার সামান্যতম আঁচড়ও ছিল না। দুর্ঘটনার নাটক সাজিয়ে পার পেতেই সে শ্রুতিকে মুমূর্ষু অবস্থায় হাসপাতালে নিয়ে আসে।

তবে মিনহাজ নামের এক পথচারী প্রত্যক্ষদর্শী জানান, ঘটনার দিন বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের উত্তর বাইপাস এলাকায় পেছন থেকে অজ্ঞাত একটি ট্রাক ধাক্কা দিলে মোটরসাইকেলটি দুর্ঘটনার কবলে পড়ে।

এতে মোটোরসাইকেল থেকে ছিটকে সড়ক বিভাজকের ওপর আছড়ে পড়েন শ্রুতি। সেখান থেকে গুরুতর আহত অবস্থায় তার বন্ধুরা তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যায়।

এদিকে নিহত শ্রুতির বাবা টিটু পাল বলেন, আমার মেয়ে অত্যন্ত রক্ষণশীল ও শৃঙ্খলিত পরিবেশে বড় হয়েছে। প্রবাসী তানভির প্রেমের সম্পর্কের সুবাদে বেড়ানোর নাম করে আমার মেয়েকে মিরসরাইয়ের কোনো অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে যায়।

সেখানে তানভির ও তার বন্ধুরা মিলে আমার মেয়েকে ধর্ষণের পর অমানবিক নির্যাতন করে হত্যা করেছে। এরপর ঘটনা ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করতে দুর্ঘটনার নাটক সাজিয়েছে।

ঘটনার দিন মিরসরাই সেবা আধুনিক হাসপাতালের জরুরি বিভাগের চিকিৎসক ডা. শুভ জানান, মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় আহত দুজনকে হাসপাতালে আনা হয়েছিল। তাদের মধ্যে শ্রুতি পালের অবস্থা আশঙ্কাজনক হওয়ায় তাকে চমেক হাসপাতালে রেফার করা হয় এবং তার বন্ধু তানভিরই তাকে সেখানে নিয়ে যান।

মিরসরাই থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ফরিদা ইয়াসমিন বলেন, হাসপাতাল এলাকা থেকে অভিযুক্ত দুজনকে আটক করে পাঁচলাইশ থানা পুলিশ। পরে তাদের মিরসরাই থানায় হস্তান্তর করা হয়। পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে প্রয়োজনীয় তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করেছে এবং নিহতের বাবার মামলার পর থেকে তদন্ত কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে। দ্রুতই প্রকৃত ঘটনা উন্মোচিত হবে।

মিরসরাই সার্কেলের সহকারী পুলিশ এসপি নাদিম হায়দার জানান, এটি নারীবিষয়ক অত্যন্ত স্পর্শকাতর ইস্যু হওয়ায় তাৎক্ষণিকভাবে মামলা গ্রহণ করে আসামিদের জেলে পাঠানো হয়েছে। প্রাথমিকভাবে জানা গেছে, আটজনের একটি গ্রুপ মোটরসাইকেলযোগে মিরসরাই অর্থনৈতিক অঞ্চলে যাচ্ছিলেন এবং পথিমধ্যে ইউটার্ন এলাকায় এই দুর্ঘটনা ঘটে।

তাদের যাত্রাপথের সবগুলো সিসিটিভি ক্যামেরা নিবিড়ভাবে যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে, যাতে স্পষ্ট হওয়া যায় তারা কোথাও বাড়তি সময়ক্ষেপণ করেছিলেন কি না। তদন্ত শেষে আসল সত্য বেরিয়ে আসবে।

কালের আলো/এএইচ/এমএসআইপি 

প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক: মো: শামসুল আলম খান | ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: এম. আব্দুল্লাহ আল মামুন খান | কপিরাইট © কালের আলো সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত

প্রিন্ট করুন